বিজেপি-বিরোধী স্ট্যালিনের সরকারের সঙ্গে গত কয়েক বছরে বার বার সংঘাতে জড়িয়েছেন রবি। গত বছর স্বাধীনতা দিবসে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রবির চা-চক্রে অংশ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন। ২০২৩ সাল থেকে রাজভবনে সেই চা-চক্র বয়কট করে চলেছে স্ট্যালিনের সরকার। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে রাজ্যপালকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছিল তামিলনাড়ু সরকার। চলতি বছরের শুরুতে তামিলনাড়ু বিধানসভায় জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননার অভিযোগ তোলেন রাজ্যপাল রবি।
হঠাৎ ২০ মাস আগে পদত্যাগ রাজ্যপাল বোসের, আলোচনা ছাড়াই পরবর্তী নিয়োগের অভিযোগ
Thu, 05 Mar 2026
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগেই রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড়। হঠাৎই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদ থেকে ইস্তফা দিলেন সিভি আনন্দ বোস। বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন বলেও সূত্রের খবর। আপাতত তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আর এন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
'পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল শ্রী সি. ভি. আনন্দ বোসের আকস্মিক পদত্যাগের খবরে আমি স্তম্ভিত এবং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই মুহূর্তে তাঁর পদত্যাগের পেছনের কারণগুলো আমার জানা নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমি অবাক হব না যদি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যপালের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করে থাকেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এইমাত্র আমাকে জানালেন যে, শ্রী আর. এন. রবিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত করা হচ্ছে। এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রথা বা রীতি অনুযায়ী তিনি আমার সাথে কোনও আলোচনা করেননি।
এই ধরনের পদক্ষেপ ভারতের সংবিধানের স্পিরিট বা চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলে আঘাত হানে। কেন্দ্রের উচিত সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর নীতিগুলিকে সম্মান করা এবং এমন কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা যা গণতান্ত্রিক রীতি এবং রাজ্যের মর্যাদাকে খর্ব করে'।
বিজেপি-বিরোধী স্ট্যালিনের সরকারের সঙ্গে গত কয়েক বছরে বার বার সংঘাতে জড়িয়েছেন রবি। গত বছর স্বাধীনতা দিবসে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রবির চা-চক্রে অংশ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন। ২০২৩ সাল থেকে রাজভবনে সেই চা-চক্র বয়কট করে চলেছে স্ট্যালিনের সরকার। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে রাজ্যপালকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছিল তামিলনাড়ু সরকার। চলতি বছরের শুরুতে তামিলনাড়ু বিধানসভায় জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননার অভিযোগ তোলেন রাজ্যপাল রবি। সরকারের লিখে দেওয়া ভাষণ পাঠ না-করেই ছাড়েন অধিবেশন। সেই তামিলনাড়ুর সদ্যপ্রাক্তন রাজ্যপালকে এ রাজ্যের দায়িত্ব সামলাতে হবে।
এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক্তন রাজ্যপাল বোসের সংঘাতও সর্বজনবিদিত। প্রকাশ্যেই বোস সমালোচনা করেছিলেন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির। আবার যখন এ রাজ্যের রাজ্যপাল হয়ে এসেছিলেন, তখন বাংলায় ‘হাতেখড়ি’ও নিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গের দত্তকপুত্র হতে চেয়েছিলেন বোস। কেরল থেকে এ রাজ্যে নিজের ভোটাধিকার স্থানান্তর করতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, তাঁর হাতে ভোটার হওয়ার প্রয়োজনীয় ফর্ম-৮ তুলে দেন বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও) এবং বিএলও সুপারভাইজ়ার। প্রথম দফায় প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, তার পরেই কেন ইস্তফা দিলেন তিনি?
অনেকে মনে করছেন, বোসের এই ইস্তফা পূর্ব পরিকল্পিত নয়, বরং ‘আচমকা’। তিনি নিজেও নাকি প্রস্তুত ছিলেন না ইস্তফার জন্য। মাঝেমধ্যেই তিনি দিল্লি যেতেন। বৃহস্পতিবার সেই দিল্লিতে বসেই আচমকা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। অনেকে মনে করছেন, নেপথ্যে থাকতে পারে কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপির ‘চাপ’। তবে বোস নিজে এই নিয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।
২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বোস। মেয়াদ ছিল ২০২৭-এর নভেম্বর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের ২০ মাস আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়লেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যপালের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) তাঁর পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা দিল্লিতে আছি। রাজ্যপাল তাঁর ইস্তফাপত্র রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠিয়ে দিয়েছেন।’’ লোকভবন সূত্রে খবর, রাষ্ট্রপতি ভবন তাঁর পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি বিশেষ বিমানে তিনি দিল্লি পৌঁছন। বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটের সেই সফরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর ওএসডি পদত্যাগের খবরটি জানান। লোকভবনের মিডিয়া সংবাদমাধ্যমকে জানান, 'আমরা এই মুহূর্তে দিল্লিতে আছি। রাজ্যপাল তাঁর ইস্তফাপত্র রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠিয়ে দিয়েছেন।'
তবে কেন এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে রাজ্যপাল নিজে বা রাজভবনের তরফে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
প্রধান ক্ষেত্রগুলি ছিল:
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ: রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে রাজ্য সরকারের সাথে তাঁর দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে। তিনি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তী উপাচার্য নিয়োগ করায় শিক্ষামন্ত্রীর সাথে তাঁর বাগযুদ্ধ চরমে পৌঁছায়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি: রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অশান্তি বা ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগে তিনি বারবার সরব হয়েছেন। গ্রাউন্ড জিরোতে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
বকেয়া পাওনা ও কেন্দ্রীয় নীতি: রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে তিনি একাধিকবার কড়া রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠিয়েছেন।
উল্লেখ্য, আর. এন. রবি একজন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এবং প্রশাসক । নির্বাচনের আগে তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে বাংলার দায়িত্ব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
'রাজ্যপাল হিসেবে সি ভি আনন্দ বোস সর্বদা সাংবিধানিক মর্যাদা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে ভোটের মুখে এই বিদায়ে প্রশাসনিক স্তরে কিছু রদবদল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল।'
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক
সিভি আনন্দ বোসের এই প্রস্থান বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় শূন্যতা বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে সংঘাত ও সক্রিয়তার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন, তা কি আগামী দিনেও বজায় থাকবে? নাকি নতুন রাজ্যপালের হাত ধরে নবান্ন-রাজভবন সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যাবে? আপাতত সব নজর এখন দিল্লির দিকে, যেখান থেকে পরবর্তী স্থায়ী রাজ্যপালের নাম ঘোষণা হতে পারে।
We hate spam as much as you do