ঘটনাস্থল ঘুরে দমকল ও প্রশাসনের আধিকারিকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে গুরুতর অভিযোগ। গুদামটি নাকি যথাযথ অগ্নি-নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই চলছিল। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত জরুরি বেরোনোর পথ— এসবের ঘাটতির কথা সামনে আসে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন অনিবার্য: এতদিন তদারকি কোথায় ছিল?
আনন্দপুর ওয়াও মোমো অগ্নিকাণ্ড: মৃত ১৬ শ্রমিক, দায় কে নেবে ?
28 Jan 2026
২৬ জানুয়ারি ভোররাতে, কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ওয়াও মোমোর একটি গুদামে আগুন লাগে। জায়গাটি ব্যবহার হত খাদ্য প্রস্তুতি, প্যাকেজিং এবং স্টোরেজের কাজে। সেখানে কর্মরত ছিলেন বহু শ্রমিক। কেউ রাতের শিফটে, কেউ কাজ শেষে বিশ্রামে। পুড়ে শেষ হল ১৬টা মৃতদেহ। ১৬টা পরিবারের ভালোবাসা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ— একমুহূর্তে থেমে গেল।
প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, আগুন ছড়াতে সময় লাগেনি। বেরোনোর রাস্তা ছিল না বললেই চলে। প্রধান দরজা খোলা যায়নি, এমন অভিযোগও উঠেছে। বিকল্প জরুরি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না বলেই উদ্ধারকর্মীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। এর ফলে ভেতরে থাকা মানুষগুলি ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন। দমকলের একের পর এক ইঞ্জিন পৌঁছয়। ভেতরে অনেক দাহ্য জিনিস ছিল, জায়গা ছিল খুব সঙ্কীর্ণ, আর জিনিসপত্র এলোমেলোভাবে রাখা ছিল তাই আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পরও পুরো আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে না। ততক্ষণে পরিষ্কার এটি আর শুধু আগুন নেভানোর ঘটনা নয়, এটি লাশ উদ্ধারের প্রস্তুতি। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। আরও অনেকে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন। পরিচয় নিশ্চিত করতেও অনেকটা সময় লেগেছে।
ঘটনাস্থল ঘুরে দমকল ও প্রশাসনের আধিকারিকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে গুরুতর অভিযোগ। গুদামটি নাকি যথাযথ অগ্নি-নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই চলছিল। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত জরুরি বেরোনোর পথ— এসবের ঘাটতির কথা সামনে আসে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন অনিবার্য: এতদিন তদারকি কোথায় ছিল?
ফায়ার লাইসেন্স, বিল্ডিং সেফটি, শ্রমিকদের কাজ ও থাকার পরিবেশ— এসব কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল? নিয়মিত পরিদর্শন কি হয়নি, নাকি হয়েছিল কিন্তু কার্যকর হয়নি? এই প্রশ্নগুলি নতুন নয়, প্রতিবারই কোনো বড় দুর্ঘটনার পর উঠে আসে, কিছুদিন থাকে, তারপর চাপা পড়ে যায়।
আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ওয়াও মোমো || গ্যারেজ থেকে শুরু, আজ কোটির ব্যবসা, অসাধ্যসান যে পথে
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ দায়ের করেছেন। ক্ষতিপূরণ, বিচার, দায়ীদের শাস্তির দাবি উঠেছে। কিন্তু আগেও দেখা গিয়েছে, এই দাবিগুলি প্রায়শই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায়।
ঘটনার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিরোধীরা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। শাসকপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে কঠোর পদক্ষেপের। কিন্তু এর আগেও এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বারবার। মানুষ দেখছে, এমন ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটছে। জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই নজরদারি এতদিন কোথায় ছিল?
২০১১ সাল থেকে রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার। ২০১০ সাল থেকে কলকাতা পুরসভা। ২০০৯ থেকে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভা। ২০০৮ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ। এত বছরের ধারাবাহিক প্রশাসনিক উপস্থিতির পরেও যদি একটি গুদাম এভাবে চলতে পারে, তবে তদারকি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১০ মিনিটের প্রতিশ্রুতি বাতিল: গিগ কর্মীদের সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট?
Gig worker: ডেলিভারি কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এবং তাদের আন্দোলনের ধরন পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, অ্যাপগুলো কর্মীদের উপর যে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, তা কেবল একটি নিয়ম বদলে দূর হওয়ার নয়।
দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ঘটনাস্থলে পৌঁছতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় নিয়েছেন, এই বিলম্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনও যাননি। সরকারি ব্যস্ততার কারণ থাকতে পারে, কিন্তু জনমানসে এই অনুপস্থিতি দাগ কেটেছে। কারণ একই সময়ে শহর বইমেলার আলোয় ব্যস্ত, মঞ্চে ছবি তোলা চলছে— এই বৈপরীত্য মানুষ চোখ এড়িয়ে যেতে দেয় না। এই ১৬ জনের প্রত্যেকের পরিবার আছে। তারা জানতেন, কলকাতায় কাজ আছে। কিন্তু জানতেন না, নিরাপত্তা নেই। প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি উন্নয়নকে এতটাই প্রাধান্য দিচ্ছি যে মানুষের নিরাপত্তা গৌণ হয়ে যাচ্ছে?
ওয়াও মোমোর নাম এখন আলোচনায়। ব্র্যান্ডটির বড় ব্র্যান্ড হিসেবে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু বিস্তারের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিকাঠামো তাল মিলিয়েছে কি? বড় ব্র্যান্ড মানেই বড় দায়িত্ব। শ্রমিক নিরাপত্তা, লাইসেন্স, নিয়ম মেনে গুদাম পরিচালনা— এসব আনুষ্ঠানিকতা নয়, জীবন-মরণের প্রশ্ন। এই অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নটাই সামনে এনে দিয়েছে, শুধু একটি সংস্থাকে নয়, পুরো শিল্পক্ষেত্রকে।
গুদামের মালিককে আটক করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। নিরাপত্তা গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। অগ্নি-নিরাপত্তা নীতি আরও কড়াভাবে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
We hate spam as much as you do