তদন্তের শুরুতেই আমাদের বুঝতে হবে ডিজিটাল প্রমাণের প্রকৃতি। বাস্তব জগতের প্রমাণের সাথে এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটি রক্তাক্ত ছুরি বা একটি বন্দুক বছরের পর বছর লকারে রাখা যায়, কিন্তু ডিজিটাল প্রমাণ হলো অত্যন্ত 'ভোলাটাইল' বা পরিবর্তনশীল। একটি সার্ভার রিস্টার্ট হলে, একটি ক্যাশ মেমরি পরিষ্কার করলে বা একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ডিলিট করে দিলে সেই প্রমাণ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এজন্য ফরেনসিক বিজ্ঞানের প্রথম এবং প্রধান নীতি হলো—'অপরাধস্থলের অখণ্ডতা রক্ষা করা'।
অদৃশ্য কুরুক্ষেত্র ও বিপন্ন মানবতা: ডিজিটাল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ও নীল-নকশা । (চতুর্থ পর্ব !)
গৌতম হালদার
8 ফেব্রুয়ারি 2026
প্রমাণের বিজ্ঞান ও ডিজিটাল তদন্ত: ফরেনসিক, আইপি ট্র্যাকিং ও সত্য উদঘাটনের যান্ত্রিক গোলকধাঁধা সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইটি কেবল আবেগের বা প্রতিবাদের নয়, এটি মূলত এক কঠিন প্রযুক্তিগত যুদ্ধ। যখন কোনো ভুক্তভোগী সম্মানহানি বা আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন বিচারক বা আইনি ব্যবস্থা কোনো কান্না, আর্তনাদ বা মৌখিক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে রায় দিতে পারেন না। আইনের চোখে একমাত্র সত্য হলো 'প্রমাণ', এবং সাইবার জগতে এই প্রমাণের ভাষা হলো বাইনারি কোড, লগ ফাইল এবং মেটাডেটা। এই চতুর্থ পর্বে আমরা প্রবেশ করব তদন্তের সেই অন্দরমহলে, যেখানে ফরেনসিক বিজ্ঞান এবং ডিজিটাল তদন্তকারীরা অপরাধীদের ফেলে যাওয়া অদৃশ্য সূত্রগুলো জোড়া লাগিয়ে সত্যের কঙ্কাল উন্মোচন করেন। পাশাপাশি আমরা আলোচনা করব সেই রূঢ় বাস্তব এবং সমস্যাগুলো নিয়ে, যার কারণে অনেক সময় চোখের সামনে অপরাধ ঘটা সত্ত্বেও অপরাধীদের ধরা সম্ভব হয় না। তদন্তের এই পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং এটি এক জটিল গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং আইনি সীমাবদ্ধতা।
তদন্তের শুরুতেই আমাদের বুঝতে হবে ডিজিটাল প্রমাণের প্রকৃতি। বাস্তব জগতের প্রমাণের সাথে এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটি রক্তাক্ত ছুরি বা একটি বন্দুক বছরের পর বছর লকারে রাখা যায়, কিন্তু ডিজিটাল প্রমাণ হলো অত্যন্ত 'ভোলাটাইল' বা পরিবর্তনশীল। একটি সার্ভার রিস্টার্ট হলে, একটি ক্যাশ মেমরি পরিষ্কার করলে বা একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ডিলিট করে দিলে সেই প্রমাণ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এজন্য ফরেনসিক বিজ্ঞানের প্রথম এবং প্রধান নীতি হলো—'অপরাধস্থলের অখণ্ডতা রক্ষা করা'। অপরাধ সংঘটনের পর তদন্তকারীদের প্রথম কাজ হলো মূল ডিভাইস বা ডেটার কোনো পরিবর্তন না করে তার একটি হুবহু প্রতিচ্ছবি বা 'ইমেজ কপি' তৈরি করা। এখানেই আসে 'হ্যাশ ভ্যালু' (Hash Value)-র ধারণা, যাকে ডিজিটাল জগতের ডিএনএ বলা হয়। এটি একটি গাণিতিক অ্যালগরিদম যা যেকোনো ডিজিটাল ফাইলের জন্য একটি অনন্য আলফানিউমেরিক কোড তৈরি করে। তদন্তের শুরুতে একটি হার্ড ডিস্ক বা মোবাইল ফোনের যে হ্যাশ ভ্যালু থাকে, আদালতের শুনানির শেষ দিন পর্যন্ত তা হুবহু এক থাকতে হবে। যদি একটি দাড়ি বা কমা-ও ফাইলের ভেতরে পরিবর্তিত হয়, তবে হ্যাশ ভ্যালু বদলে যাবে এবং আদালত সেই প্রমাণ নাকচ করে দেবে। এই সূক্ষ্মতা রক্ষা করাই তদন্তের প্রথম চ্যালেঞ্জ, কারণ সামান্য অদক্ষতায় একটি শক্তিশালী কেস দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ হলো অপরাধীর 'ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট' বা পদচিহ্ন অনুসরণ করা। ফরেনসিক বিজ্ঞানের জনক এডমন্ড লকার্ডের সেই বিখ্যাত উক্তি—"প্রতিটি যোগাযোগই কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যায়"—ডিজিটাল জগতেও সমানভাবে সত্য। অপরাধী যতই চতুর হোক, সে যখন ইন্টারনেটে প্রবেশ করে, তাকে কোনো না কোনো আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) অ্যাড্রেস ব্যবহার করতেই হয়। এই আইপি অ্যাড্রেস হলো ডিজিটাল জগতের বাড়ির ঠিকানা। পুলিশ বা সাইবার সেল প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বা পেমেন্ট গেটওয়ের কাছে এই আইপি অ্যাড্রেস এবং 'অ্যাক্সেস লগ' চেয়ে পাঠায়। এই লগ বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে, কোন সময়ে, কোন ডিভাইস থেকে এবং কোন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীর (ISP) মাধ্যমে অপরাধী ওই সিস্টেমে প্রবেশ করেছিল। এর সাথে যুক্ত হয় 'মেটাডেটা' বিশ্লেষণ। একটি সাধারণ ছবির ভেতরেও লুকিয়ে থাকে জিপিএস কোঅর্ডিনেট, ক্যামেরার মডেল এবং ছবি তোলার সঠিক সময়। ইমেলের ক্ষেত্রে 'ইমেল হেডার' বিশ্লেষণ করে জানা যায় সেই ইমেলটি কোন সার্ভার হয়ে এসেছে। এই প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক মনে হলেও, বাস্তবে এর পথটি কণ্টকাকীর্ণ এবং এখানেই তদন্তকারীরা সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হন।
তদন্তের প্রধান সমস্যা বা অন্তরায়গুলো আমাদের অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বুঝতে হবে, কারণ এই সমস্যাগুলোর জন্যই হাজার হাজার মামলার কিনারা হয় না। প্রথম এবং সবথেকে বড় সমস্যা হলো—'ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক' (VPN) এবং প্রক্সি সার্ভারের ব্যবহার। আধুনিক অপরাধীরা তাদের আসল আইপি অ্যাড্রেস গোপন রাখার জন্য ভিপিএন ব্যবহার করে। এর ফলে পুলিশ যখন আইপি ট্র্যাক করে, তখন দেখা যায় অপরাধী বসে আছে আমেরিকা বা রাশিয়ায়, কিন্তু বাস্তবে সে হয়তো কলকাতার কোনো গলিতে বসে অপরাধ করছে। ভিপিএন হলো এক ধরণের ডিজিটাল মুখোশ, যা তদন্তকারীদের ভুল পথে চালিত করে। যদিও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিপিএন ভেদ করা বা 'ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন' করা সম্ভব, কিন্তু তা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল, যা সাধারণ ছোটখাটো মামলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না।
দ্বিতীয় বড় সমস্যাটি হলো 'এখতিয়ার' বা জুরিসডিকশন-এর জটিলতা। ইন্টারনেট হলো সীমাহীন, কিন্তু পুলিশের ক্ষমতা সীমানা দ্বারা আবদ্ধ। দেখা গেল, ভুক্তভোগী বসে আছেন পশ্চিমবঙ্গে, অপরাধী বসে আছে ঝাড়খণ্ডে বা নাইজেরিয়ায়, আর যে সার্ভারটি ব্যবহার করে অপরাধ করা হয়েছে (যেমন ফেসবুক বা গুগলের সার্ভার), তা অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়ায়। এই ত্রিদেশীয় বা আন্তঃরাজ্য আইনি জটিলতায় তদন্ত থমকে যায়। আমেরিকার সার্ভার থেকে তথ্য পেতে হলে 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি' (MLAT)-এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। একটি ছোট তথ্যের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, আর ততদিনে অপরাধী তার সমস্ত ডিজিটাল চিহ্ন মুছে ফেলে গা ঢাকা দেয়। এই দীর্ঘসূত্রিতা বা 'রেড টেপিজম' হলো সাইবার তদন্তের অন্যতম প্রধান শত্রু।
তৃতীয় সমস্যাটি প্রযুক্তিগত—'সিজি-ন্যাট' (CGNAT) বা ক্যারিয়ার গ্রেড নেটওয়ার্ক অ্যাড্রেস ট্রান্সলেশন। আমাদের দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর সংখ্যা আইপি অ্যাড্রেসের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। তাই ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীরা (ISP) একটিমাত্র পাবলিক আইপি অ্যাড্রেস একই সময়ে শত শত গ্রাহককে ভাগ করে দেয়। পুলিশ যখন তদন্ত করে দেখে যে একটি নির্দিষ্ট আইপি থেকে অপরাধ হয়েছে, তখন দেখা যায় ওই একই সময়ে ওই একই আইপি ব্যবহার করছেন আরও ৫০০ জন নির্দোষ মানুষ। এই খড়ের গাদা থেকে সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে খুঁজে বের করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় 'ডেটা রিটেনশন' বা তথ্য সংরক্ষণের সমস্যা। ভারতের আইন অনুযায়ী আইএসপি-রা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (সাধারণত এক বা দুই বছর) লগ ফাইল ধরে রাখতে বাধ্য, কিন্তু ভিপিএন কোম্পানি বা বিদেশি অ্যাপগুলো অনেক সময়ই তথ্য সংরক্ষণ করে না বা ভারতীয় আইন মানতে চায় না। ফলে তদন্তকারীরা যখন তথ্যের জন্য পৌঁছান, তখন দেখেন সার্ভার থেকে সব মুছে ফেলা হয়েছে।
চতুর্থ এবং অত্যন্ত বিতর্কিত সমস্যাটি হলো 'এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন'। হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো অ্যাপগুলো দাবি করে যে তাদের মেসেজ প্রেরক এবং প্রাপক ছাড়া আর কেউ পড়তে পারে না, এমনকি কোম্পানি নিজেও না। এটি সাধারণ মানুষের গোপনীয়তার জন্য ভালো হলেও, তদন্তের ক্ষেত্রে এটি এক বিশাল দেওয়াল। অপরাধীরা এই এনক্রিপশনের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। যখন কোনো জঙ্গি বা প্রতারক চক্র এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করে, তখন তদন্তকারী সংস্থাগুলো সেই বার্তা ডিক্রিপ্ট করতে বা পড়তে পারে না। গোপনীয়তার অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার এই দ্বন্দ্বে সুবিধা নিচ্ছে অপরাধীরা। পুলিশ কেবল মেটাডেটা (কে, কখন, কার সাথে কথা বলেছে) পায়, কিন্তু কী কথা বলেছে তা জানা সম্ভব হয় না, যা আদালতে প্রমাণ হিসেবে অনেক সময় অপর্যাপ্ত হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়াও রয়েছে তদন্তকারী অফিসারদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব এবং পরিকাঠামোগত দুর্বলতা। সাইবার অপরাধের ধরণ প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে। আজ যে কৌশলে অপরাধ হচ্ছে, কাল তা পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের পুলিশি ব্যবস্থা এবং তদন্তকারীরা সবসময় সেই গতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের আপডেট করতে পারছেন না। সাইবার ল্যাবের অভাব, আধুনিক সফটওয়্যারের অপ্রতুলতা এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি তদন্ত প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দেয়। অনেক সময় সাধারণ পুলিশ স্টেশনে সাইবার অপরাধের অভিযোগ এলে তারা বুঝতে পারেন না কোন ধারায় মামলা রুজু করবেন বা কীভাবে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করবেন। ফলে প্রাথমিক স্তরেই প্রমাণের বারোটা বেজে যায়।
তবে এই সমস্ত হতাশার মধ্যেও আশার আলো হলো তদন্তের আধুনিকীকরণ। এখন 'ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স' (OSINT) বা ওসিন্ট টুল ব্যবহার করে তদন্তকারীরা পাবলিকলি লভ্য তথ্য থেকেই অপরাধীর প্রোফাইল তৈরি করছেন। ডার্ক ওয়েব মনিটরিং-এর মাধ্যমে চুরি যাওয়া ডেটা ট্র্যাক করা হচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই এখন তদন্তে ব্যবহৃত হচ্ছে প্যাটার্ন রিকগনিশন বা অপরাধের ধরণ শনাক্ত করার জন্য। বেসরকারি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং এথিক্যাল হ্যাকাররা এখন পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। এই 'পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ' মডেলটি তদন্তের গতি বাড়িয়েছে। সমস্যা আছে, কিন্তু সমাধানের পথও তৈরি হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে, ডিজিটাল তদন্ত কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটি একটি বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানে যেমন সীমাবদ্ধতা আছে, তেমনি আছে সত্যে পৌঁছানোর অকাট্য যুক্তি। অপরাধী ভিপিএন ব্যবহার করুক বা ডার্ক ওয়েবে লুকাক, সে কোনো না কোনো ভুল করবেই। তদন্তকারীর ধৈর্য এবং প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগই সেই ভুলের সুযোগ নিয়ে অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। এই পর্বে আমরা তদন্তের বিজ্ঞান এবং তার সমস্যাগুলো জানলাম, যা আমাদের পরবর্তী পর্বের আইনি আলোচনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
We hate spam as much as you do