হাদির মৃত্যুর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে আগুন দেবে, ভাঙচুর চালাবে তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না আফরোজা খাতুন নামে একজন অভিভাবক।
সনজিদার রবীন্দ্র প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে ভাঙচুর, হাদি মৃত্যুর অজুহাতে বাংলাদেশে মৌলবাদী তান্ডব
19 Dec 2025
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান হাদি কবিতা লিখতেন, গড়ে তুলেছিলেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। তার কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতার আবৃত্তি সোশাল মিডিয়ায় বেশ প্রশংসাও কুড়িয়েছে।
সেই হাদির মৃত্যুর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে আগুন দেবে, ভাঙচুর চালাবে তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না আফরোজা খাতুন নামে একজন অভিভাবক।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা রাতে ঘরে থেকেই বুঝতে পারছি ছায়ানটে হামলা হবে। অথচ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বুঝতে পারেননি বা ছায়ানটকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। আমার সন্তান তো এখানে লেখাপড়া করে। এটা স্কুল। ওরা আমার সন্তানের স্কুলে আগুন দিয়েছে।"
আফরোজা বলেন, “রাতে যখন মোবাইল ফোনে ছায়ানটে হামলার ভিডিও দেখছিলাম, পাশে বসে আমার ছেলে বলছে, 'মা চলো- আমাদের স্কুল ভেঙে ফেলতেছে'। তখন যে কতটা খারাপ লেগেছে। রাতে যখন শুনছিলাম ছায়ানটে হামলা হতে পারে, ধানমন্ডি থানার ওসিকে কয়েকবার আমি ফোনে চেষ্টা করেছি। তিনি ফোন ধরেননি।"
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর শাহবাগসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে হামলার খবরের মধ্যে, একদল বিক্ষোভকারী রাত ১টার পর জড়ো হতে থাকেন ধানমন্ডির শংকরে ছায়ানট ভবনের সামনে।
বৃহ্স্পতিবার রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মাঝামাঝি সময়ে একদল বিক্ষোভকারী ধানমন্ডির সাততলা এ ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন তলায় গিয়ে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে এসে এ হামলা করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। প্রথমে পার্কিং লটের দিকে আগুন দেওয়া হয়। পরে তারা ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
এ সময় হামলাকারীরা ‘ভারতের দালাল’, ‘ভুয়া’,’ নারায়ে তাকবীর’, ‘ভাঙো’ এসব স্লোগান দেয়। প্রয়াত সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি কেটে নষ্ট করার সময় ‘নাস্তিক’ বলে সম্বোধন করেছে।
মিলনায়তনে হামলাকারীর যা পেয়েছেন সেটিই ভাঙচুর করেছেন। তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনতলার একটি ভবনে পুড়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে স্তুপকারে পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া বই।
পুরো মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে থাকা মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্প কর্ম ভেঙে ফেলা হয়েছে।
প্রতিটি তলায় থাকা সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এবং সেখানে পরিচালিত বিদ্যালয়ের সবগুলো কক্ষ ও অফিস রুমের বেশিরভাগ আসবাব ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাগজপত্র ও সরঞ্জাম তছনছ করা হয়েছে।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও বাদ যায়নি। আলমারির গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল ভেঙেচুড়ে ওলট পালট করা হয়েছে। রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, মূল মিলনায়তনসহ, শৌচাগারও রেহাই পায়নি ভাঙচুরের তাণ্ডব থেকে।
সকাল হতেই আফরোজা খাতুনের মত বেশ কয়েকজন অভিভাবক এসে হাজির হন ছায়ানট ভবনের সামনে। কেউ কেউ এসেছেন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে।
শংকরের বাসিন্দা দীপান্বিতা রায় ও সুশান্ত রায়ের সন্তান অপরাজিতা রায় ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তারা বলেছেন, হামলার কথা জেনে সারা রাত ঘুমুতে পারেননি। হাদির মৃত্যুর সঙ্গে ছায়ানটের কী সম্পর্ক থাকতে পারে, তা কিছুতেই মেলাতে পারছেন না।
সুশান্ত রায় বলেন, “হাদিকে যেভাবে মারা হয়েছে, তা আমরা কেউই সমর্থন করি না। আমরা সবাই এই হত্যার বিচার চাই। কিন্তু ছায়ানটে হামলা করলো যারা, তারা কি হাদির চেতনাকে ধারণ করেন? রাতে যে তাণ্ডব চলেছে, তা থামাতে সরকার পুরো ব্যর্থ হয়েছে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, হামলাকারীদের মধ্যে একটি অংশ ছিল লুটপাটকারী। তারা বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার ভাঙচুর করে খুঁজেছে টাকা-পয়সা আছে কি না। কেউ কেউ কিছু বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে।
ধানমন্ডি থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা মিথুন সিংহ বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার কিছু পরেই ছায়ানটে হামলার ঘটনা ঘটে।
রাত আড়াইটায় যখন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেয়, তার আগেই হামলাকারীদের তাণ্ডবে তছনছ করা হয় দেশের সংস্কৃতিচর্চার সবচেয়ে বড় এই প্রতিষ্ঠানটি।
এ হামলার পর ছায়ানট ভবনে পরিচালিত ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের’ ক্লাসসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
We hate spam as much as you do