উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মনোজ নারাভানের বই প্রকাশের অনুমতি দেয়নি। জানা যাচ্ছে, ওই স্মৃতিকথায় ২০২০ সালের ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষ, বিশেষ করে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ এবং বিতর্কিত অগ্নিপথ নিয়োগ প্রকল্প নিয়ে উল্লেখ রয়েছে। রাহুল কোন কোন বিতর্কিত অংশ উদ্ধৃত করতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট হয়নি। সংসদীয় কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গেও তিনি সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
প্রাক্তন সেনাপ্রধানের ‘অপ্রকাশিত ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’ নিয়ে রাহুলকে তীব্র বাধা বিজেপির। কিন্তু কেন?
February 4, 2026
সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ নারাভানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃতি পড়তে গিয়ে সোমবার লোকসভায় তীব্র বিতর্কে জড়ালেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শাসকদলের একাধিক সাংসদ আপত্তি তোলেন যে, কোনও অপ্রকাশিত বই সংসদের ভিতরে উদ্ধৃত করা যায় না। রাহুল দাবি করেন, ওই বইয়ের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “শাসক শিবির আসলে কিসের ভয় পাচ্ছে”? রাহুল যখনই ওই বইয়ের প্রসঙ্গ তোলেন, তখনই তাঁর মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এর জেরে সংসদে তুমুল হট্টগোল শুরু হয় এবং একাধিকবার অধিবেশন মুলতুবি রাখতে হয়। শেষ পর্যন্ত দিনের জন্য লোকসভা মুলতুবি ঘোষণা করা হয়।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মনোজ নারাভানের বই প্রকাশের অনুমতি দেয়নি। জানা যাচ্ছে, ওই স্মৃতিকথায় ২০২০ সালের ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষ, বিশেষ করে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ এবং বিতর্কিত অগ্নিপথ নিয়োগ প্রকল্প নিয়ে উল্লেখ রয়েছে। রাহুল কোন কোন বিতর্কিত অংশ উদ্ধৃত করতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট হয়নি। সংসদীয় কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গেও তিনি সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় রাহুল বক্তব্য শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই হস্তক্ষেপ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সেই সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। রাজনাথ বলেন, “উনি সংসদকে জানান, ওই বইটি আদৌ প্রকাশিত হয়েছে কি না। এখানে বইটি পেশ করুন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, বইটি এখনও প্রকাশিত হয়নি। কোনও পরিস্থিতিতেই বিরোধী দলনেতাকে এই বিষয়ে কথা বলতে দেওয়া যায় না।” এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও হস্তক্ষেপ করে বলেন, “একটি ম্যাগাজিনে যে কোনও কিছু লেখা যেতে পারে। কিন্তু বইটি যখন প্রকাশই হয়নি, তখন সেটি কীভাবে উদ্ধৃত করা যায়?” স্পিকার ওম বিড়লা সংসদের বিধি ৩৪৯ প্রয়োগ করে রাহুলকে নির্দেশ দেন, সংসদের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কহীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, বই বা অন্য কোনও উপাদান উদ্ধৃত না করতে। তিনি বারবার রাহুলকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্যেই বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধ করেন এবং বলেন, ওই ভাষণে ভারত-চিন সম্পর্কের কোনও উল্লেখ নেই।
তবে রাহুল নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা-র সঙ্গে যুক্ত। বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্য তাঁর আগে বক্তৃতা দিতে গিয়ে কংগ্রেসের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলায়, তিনি বাধ্য হয়েই সেনাপ্রধানের স্মৃতিকথার প্রসঙ্গ তুলেছেন বলে দাবি করেন। একটি ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনের ফটোকপি দেখিয়ে রাহুল বলেন, “এটি একজন প্রাক্তন সেনাপ্রধানের স্মৃতিকথা থেকে নেওয়া। এখানেই বোঝা যাবে, কে দেশপ্রেমিক আর কে নয়।” যুব কংগ্রেসও ওই ম্যাগাজিন রিপোর্টের অংশবিশেষের ছবি প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয়েছে ২০২০ সালের লাদাখ সীমান্ত অচলাবস্থার এক উত্তপ্ত পর্বে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর উপর ছেড়ে দিয়েছিল।
এর আগেও, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সংবাদসংস্থা পিটিআই ওই বইয়ের কিছু অংশ প্রকাশ করেছিল বলে দাবি করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, মোদী সরকারের চালু করা অগ্নিবীর নিয়োগ প্রকল্প সেনাবাহিনীর কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত এবং নৌ ও বায়ুসেনার কাছে ছিল আকাশ থেকে বজ্রপাত-এর মতো। সূত্রের খবর, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোনও বিষয় প্রকাশের আগে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন, বিশেষ করে লেখক যদি সংবেদনশীল পদে অধিষ্ঠিত থেকে থাকেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে মনোজ নারাভানে জানিয়েছিলেন, প্রকাশকরা বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে জমা দিয়েছে এবং সেটি এখনও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “আমার কাজ ছিল বই লেখা এবং প্রকাশকের হাতে তুলে দেওয়া। মন্ত্রকের অনুমতি নেওয়ার দায়িত্ব প্রকাশকদের। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেটি পর্যালোচনায় রয়েছে।”
লোকসভা দিনের জন্য মুলতুবি হওয়ার পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি কেবলমাত্র প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ নারাভানে যা লিখেছেন, সেটিরই উল্লেখ করেছেন। রাহুলের কথায়, “ওই বইটি প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সেটি ধুলোর স্তূপে পড়ে রয়েছে। প্রাক্তন সেনাপ্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এত ভয় কেন? উনি কী বলেছেন, তা নিয়েই বা এত আতঙ্ক কেন?” রাহুলের দাবি, ওই স্মৃতিকথা প্রকাশিত হলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ্যে আসবে। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনাথ সিংজির বিষয়ে অনেক কিছু জানা যাবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী সম্পর্কে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে সেনাকে ব্যর্থ করেছে, তাও সামনে আসবে।”
আরও একধাপ এগিয়ে রাহুল মন্তব্য করেন, “ওরা ভয় পাচ্ছে, কারণ বইটি প্রকাশিত হলে নরেন্দ্র মোদী ও রাজনাথ সিংয়ের আসল চেহারা মানুষের সামনে চলে আসবে। চীন যখন এগোচ্ছিল, তখন সেই ৫৬ ইঞ্চির বুক কোথায় ছিল, তাও জানা যাবে।” এর আগে সংসদের ভিতরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছিলেন, “যদি নারাভানের বই প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারতেন। তথ্য যদি সঠিকই হয়, তা হলে তিনি আদালতে যাননি কেন?” তবে এরপরও রাহুল বিষয়টি তুলতে থাকেন। তিনি বলেন, সরাসরি উদ্ধৃতি না পড়লেও পরোক্ষভাবে বিষয়টি তিনি তুলে ধরবেন। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতেই ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়।
সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু অভিযোগ করেন, রাহুল সংসদের নিয়ম অমান্য করছেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছেন। রিজিজু বলেন, “আপনি দেশকে খারাপ আলোয় দেখাতে চাইছেন। এতে আপনার কী লাভ হবে?” একই সঙ্গে তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করেন, রাহুলকে বক্তব্য রাখতে না দিতে। হট্টগোলের মধ্যেই সংসদ দুপুর ৩টা পর্যন্ত মুলতুবি রাখা হয়। পরে অধিবেশন শুরু হলে ফের বিষয়টি তুলতে চান রাহুল। তখন রাজনাথ সিং অভিযোগ করেন, তিনি সংসদকে বিভ্রান্ত করছেন। কিরেণ রিজিজু আবারও বলেন, রাহুলের মন্তব্য জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে আঘাত করতে পারে। ফলে সংসদে ফের অচলাবস্থা তৈরি হয়। সূত্রের খবর, চেয়ারম্যানের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে মঙ্গলবার সংসদে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনার কথা ভাবছে ট্রেজারি বেঞ্চ।
We hate spam as much as you do