আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহুর অবস্থান এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৪ সালের শেষভাগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বর্তমানে তার আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই পরোয়ানার ফলে তিনি রোম সংবিধানে স্বাক্ষরকারী বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণে আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিপদে পড়েই ইরান যুদ্ধ
15 মার্চ 2026
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট ও বেলফোর স্ট্রিট অবরোধ।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের এই সন্ধিক্ষণে এসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। একদিকে যখন ইসরায়েলি বিমানবাহিনী (IAF) তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক বিমান হামলা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই জেরুজালেমের বেলফোর স্ট্রিটে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গড়ে উঠেছে এক বিশাল জনরোষের প্রাচীর। এই সংকট কেবল সামরিক নয়, বরং এটি নেতানিয়াহুর আইনি জটিলতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফাটল এবং বিশ্বমঞ্চে একঘরে হয়ে পড়ার এক করুণ আখ্যান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহুর অবস্থান এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৪ সালের শেষভাগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বর্তমানে তার আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই পরোয়ানার ফলে তিনি রোম সংবিধানে স্বাক্ষরকারী বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণে আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির তথ্য অনুযায়ী, তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা হাঙ্গেরির মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশে যেতে পারছেন, যা একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার বিশ্ব নেতৃত্বকে একটি ক্ষুদ্র বৃত্তে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এছাড়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতো বৈশ্বিক সংগঠনগুলোর "অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাও" (Accountability Now) ক্যাম্পেইনের প্রভাবে জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র দেশগুলোও বর্তমানে ইসরায়েলে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স স্থগিত রেখেছে, যা তেল আবিবের জন্য এক বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মানচিত্রে এখন এক অদ্ভুত দ্বি-স্তরীয় বাস্তবতা বিরাজ করছে। একদিকে ইয়ায়ির লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, যাতে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু অন্যদিকে, ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর ওপর জনগণের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে প্রধানমন্ত্রী তার নিজের দুর্নীতি মামলার বিচার বিলম্বিত করতে এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় এড়াতে ইচ্ছে করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন। "ব্রাদার্স ইন আর্মস" এবং জিম্মি পরিবারের সদস্যরা এখন রাজপথে নেমে অভিযোগ করছেন যে, নেতানিয়াহু জিম্মিদের মুক্তির চেয়ে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর বর্তমান কোয়ালিশন বা জোট সরকারটি এখন তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে। এই জোটের প্রধান সংকট হলো কট্টর রক্ষণশীল (হারেদি) ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগদান নিয়ে। যেখানে আইডিএফ (IDF) ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে জনবল সংকটে ভুগছে, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো হারেদিদের জন্য বিশেষ ছাড় বাতিলের দাবি তুলেছে। বিপরীতে, 'শাস' (Shas) এবং 'ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম' (UTJ) দলগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, হারেদি তরুণদের সেনাবাহিনীতে বাধ্য করলে তারা ৩০ মার্চের বাজেট পাসের আগেই সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে।
আগামী ৩০ মার্চ, ২০২৬ তারিখটি নেতানিয়াহুর ভাগ্যের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। এই তারিখের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাজেট পাস করতে না পারলে আইন অনুযায়ী ১ এপ্রিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেসেট বা সংসদ ভেঙে যাবে এবং নতুন নির্বাচন অনিবার্য হয়ে পড়বে। নাফতালি বেনেটের মতো বিকল্প নেতাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং জোটের শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাসের কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, নেতানিয়াহু বর্তমানে এক বিশাল জুয়া খেলছেন—বাইরে যুদ্ধ জারি রেখে দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগানো এবং ভেতরে জোট শরিকদের সাথে দেনদরবার করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আর সাধারণ মানুষের তীব্র ঘৃণা তাকে এমন এক খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে, যেখানে তার চিরাচরিত "রাজনৈতিক জাদুকরী" কৌশলগুলোও হয়তো আর শেষ রক্ষা করতে পারবে না।
একই সঙ্গে যুক্ত করে গোটাটাই সুপরিকল্পিতভাবে ট্রাম্প সহযোগিতা নিয়ে একই সাথে ৩ টি সংকটের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।
১-সরাসরি তেলের অধিকার নিশ্চিত করতে আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ আরো বিস্তৃত করে ছড়িয়ে দেবার কৌশল।
২- আমেরিকার সাহায্য নিয়ে নিজের দেশে নিজেকে আড়াল করে সুরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা।
৩- গাজা গণহত্যার কে সুনির্দিষ্ট ভাবে ভুলিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের প্রভাব বিস্তার করে ভয়ের ও যুদ্ধের বাতাবরণে ২ শক্তি হিসেবে নিজেকে পুজীবাদী দুনিয়ার জায়গা স্থায়ী করার চেষ্টা।
মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কারণ ছাড়া আরো কয়েকটি বিশেষ কারণ এরসঙ্গেই ভিত্তি করে যুক্ত আছে যেগুলো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেই সেগুলো প্রকাশিত হতে থাকবে বলেই অনুমান করতেই হচ্ছে।
We hate spam as much as you do