-আপনি আমাকে তো ভুলে যাবেন। এক মিস্টি টানে কথাগুলো আজও কানে ভাসছে। ওর চোখে ঘুম নেই, লাবন্য কি আমাকে মনে রেখেছে? আদীভাকে লাবন্য বলে সম্বোধন করেছিল ফেরার আগে। সেইসময় প্রথম প্রথম প্রথম ঘন ঘন দুরভাসে কথা হতো। তারপর সপ্তাহে একবার, পরের মাসে কয়েকবার কথা হতে হতে দুমাসের মধ্যে একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো যোগাযোগ । চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারে নি কুশল। ইমরান, দুলালদের সঙ্গে মুখবইয়ে মোবাইলে কথা হলেও আদীভার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি, কেউ কোনো সংবাদ দিতে পারে নি। কি হলো মেয়েটার পৃথিবীটা তো আজকের দিনে ছোটো হয়ে গেছে!
"স্বপ্ন ভাঙার ঘুম"
সৌমিত্র ঘোষ
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রায় চোদ্দ বছর পর কুশল বাংলাদেশ যাচ্ছে। কুশল কিসের টানে বাংলাদেশে যাচ্ছে! সকলে প্রশ্ন করলেও উত্তরটা নিজেই জানে না। জন্মেও পরিবারের কেউ সেখানে থাকেনি তবু এক অজানা আত্মিক টান যেন দেশটি ওকে আকর্ষন করে । কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, দেশটা তো একদিন একই ছিল, বুড়ো খোকারা আলাদা করে দিল, একই ভাষা,রবী নজরুলের পায়ের ধূলো, এক আকাশ, এক বৃষ্টি ভেজা সোঁদা গন্ধ নাড়ির টান ছাড়া কি !
উত্তেজনায় রাত্রে ঘুম আসছে না, আশির দশকে যখন গিয়েছিল, তখনকার থেকে এখন হয়তো অনেক বদলে গেছে! তখন এক বন্ধুর তুতো বোনের বিয়েতে গিয়েছিল, কি অসাধারণ অনুভূতি সাথে করে নিয়ে এসেছিল। ঢাকা থেকে ১৭ কিমি দুরে নারায়ণগঞ্জ, সে কি আতিথেয়তা! পাশাপাশি বাড়ির পরিবারগুলো যেন এক সূতোয় গাঁথা ছিল। কোনো দিন বিনু পিসির বাড়িতে খাওয়া তো কোনো দিন খালিদ চাচার বাড়ি। সবাই কি বেঁচে আছেন? কে জানে ! ইমরান, দুলাল, বিষ্ণু, আখতার ওদের আগলে রেখেছিল। ওদের সঙ্গেই ঢাকা শহরটাকে প্রথম চেনা । ওখানেই তো প্রথম চেনা আদীভাকে, আদীভা পারভীন, সবে মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। বিলুর তুতো বোনের ক্লাসমেট, তাপসীর বিয়েতে এসেছিল। সেখানেই আলাপ, ওর মিষ্টি ব্যাবহার, আয়ত চোখে সরলতা সেদিন মুগ্ধ করেছিল কুশলকে।
-আপনি আমাকে তো ভুলে যাবেন। এক মিস্টি টানে কথাগুলো আজও কানে ভাসছে। ওর চোখে ঘুম নেই, লাবন্য কি আমাকে মনে রেখেছে? আদীভাকে লাবন্য বলে সম্বোধন করেছিল ফেরার আগে। সেইসময় প্রথম প্রথম প্রথম ঘন ঘন দুরভাসে কথা হতো। তারপর সপ্তাহে একবার, পরের মাসে কয়েকবার কথা হতে হতে দুমাসের মধ্যে একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো যোগাযোগ । চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারে নি কুশল। ইমরান, দুলালদের সঙ্গে মুখবইয়ে মোবাইলে কথা হলেও আদীভার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি, কেউ কোনো সংবাদ দিতে পারে নি। কি হলো মেয়েটার পৃথিবীটা তো আজকের দিনে ছোটো হয়ে গেছে!
এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, চেকিং, মাইগ্রেশনসহ সব কাজ শেষ হলেও প্লেন উড়তে দুঘন্টা দেরি হবে ।
লাবন্য, মিতভাষী ওর আয়ত চোখের চাউনি কুশলের মনে ছবি এঁকে রেখেছে। তবু, জীবন যুদ্ধের লড়াই ওদের দুরে সরিয়ে দিয়েছে । একের পর এক ললনার ভীড়ে, ব্যাস্ততা আর কলকাতার বৈচিত্র্যময় জীবনে মানুষ নিজের অস্তিত্বের বিস্মৃতি ঘটে, আর ও তো এক সপ্তাহের অতিথি । তবু, আদিভা ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে আছে।
মাত্র এক সপ্তাহের আলাপে যে নিজের শরীর দিয়ে দিতে পারে সে এতদিনে কতজনের সঙ্গে শুয়েছে তা কে জানে! কিন্তু ওকে পাবার বাসনায় যে প্রতিশ্রুতি, অভিনয় ওকে করতে হয়েছে, তাতে সদ্য প্রস্ফুটিত কুঁড়ির পূর্ণতা পাওয়া কি অস্বাভাবিক ছিল? আমার জীবনে কত মেয়ে এসেছে আবার চলে গেছে, কেউ তো এভাবে মনে আসে না তাহলে ১৬ বছরের আদীভা কেন আমাকে আজ এভাবে টানছে? ভাবতে ভাবতে ঘড়ির কাঁটা সবে পনেরো মিনিট সরেছে।
সেদিন বিষ্ণু ওর বাড়িতে লাবন্যকে কাছে পাবার সুযোগ করে দিয়েছিল। ওর বাবা মা ধানমন্ডিতে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গেছিলেন। ওরা দুজনে সেদিন প্রানভরে শ্বাস বিনিময় করেছিল, প্রতিশ্রুতির বন্যায় সদ্য যৌবনা আদীভার চোখে আনন্দাশ্রু দেখেছিল।
-তুমি আমাকে ভুলে যাবা না তো? ওর বুকে মাথা রেখে কাকুতি করে বলেছিল আদীভা।
অভিনয়ের মুন্সিয়ানায় কুশল উত্তর দিয়েছিল, "তুমি আমার লাবন্য। আমি ধর্ম বুঝি না, আমি তোমায় বিয়ে করবো। ভুলতে পারবো না তোমায়, কি করে থাকবো তোমায় ছাড়া। লাবন্য তুমি আমার, আর কারো হতে পারো না। যেদিন ভুলে যাবে জানবে আমার মৃত্যু হয়েছে ।"
ওর মুখে হাতটা চাপা দিয়ে বলেছিল, -এমন বলবা না, আল্লাহর কাছে দোয়া করবো তুমি ভালো থাকবা। কথা দিলাম আমি তোমারই থাকবো।
সেদিন নিজেকে উজার করে সঁপে দিয়েছিল আদীভা। একরাশ বিশ্বাস উপহার দিয়ে,আর এক আকাশ ভালোবাসা কে সঙ্গে নিয়ে বিদায় নিয়েছিল ও।
ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো কুশলের। চেষ্টা করলে তো আমি যোগাযোগ করতেই পারতাম, জানি না আদৌ কি খুঁজে পাবো? একবার কি বিষ্ণু কে ফোন করবো? আখতার কে? না থাক ঢাকা গিয়ে যা করার করবো।
ঘোষনা হচ্ছে বাংলাদেশগামী প্লেনে যাত্রীদের ওঠার কথা। কুশল ধীরে ধীরে এগুতে লাগলো।
ঢাকায় নেমে মাইগ্রেশনের কাজ মিটিয়ে বেরিয়ে ক্যাব ধরে গুলশানের একটি মাঝারি হোটেলে রুম ভাড়া নিলো।
-হ্যালো কুশল বলছি। ইন্ডিয়ার কুশল।
- আরে দোস্তো ! তুমি কি এখানে? এ তো বাংলাদেশের নাম্বার।
-হ্যাঁ ভাই । কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি নি, এখন তোমার নাম্বারটাই পেলাম।
-তুমি কোথায় আসো? কবে এলে?
-ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে শরিফুল লজে।
ইমরানের সঙ্গে কথা মতো হোটেলেই থাকলো, পরের দিন বিকেলে ইমরান হোটেলে দেখা করে বললো, দোস্ত আমার বাসা থাকতে তুমি লজে থাকবে ? প্রায় জোর করেই নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলো। ওর অভ্যর্থনায় কুশল লজ্জা পেলো। সত্যি বাংলাদেশের মানুষ এখনও কতটা আন্তরিক! অভিভূত না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।
প্রত্যেকের কথা জিজ্ঞেস করে মোটামুটি জানতে পারলো কেউ বিদেশে বা কেউ প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী, কিন্তু লাবন্যের (আদীভা) কথা জানতে চাইলে ইমরান একটু উদাস হয়ে গেলো। কিছুক্ষন পরে নীরবতা ভেঙে ইমরান বলতে লাগলো, যার কথায় ঘৃণা দুঃখ হতাশায় ভরা ।
অবিবাহিত অবস্থায় মা হয় আদীভা, আমরা ভাবতে পারি নাই ও এতো নিচে নাইমতে পারে । ওর আব্বা আম্মা ওকে খুব পিটিয়েছে তবু বাচ্চা নষ্ট করে নাই। কোন শয়তান কুকাজ করেছে তা পর্যন্ত বলে নাই। এক নিঃশ্বাসে কথা শেষ করতেই কুশল ইমরানের হাত ধরে বললো , 'ভাই আমি দেখা করতে চাই।'
-দুর বেশ্যা মাগীর সঙ্গে দেখা করে কি হবে?
- না ভাই আমায় একটু ব্যাবস্থা করে দাও চির কৃতজ্ঞ থাকবো। অনুনয়ের সুরে কুশল অনুরোধ করলো।
বিরক্ত হয়ে ইমরান বললো, -তোমার সমস্যা কি দোস্তো?
-আমার অনেক কিছু জানবার আছে।
অনেক আলোচনার পর, বিষ্ণুর সঙ্গে যোগাযোগ করে, বিস্তর ফোনাফুনি করে আদীভার সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের নিকটবর্তী গ্রাম জালিয়াখালিতে নাকি ওরা থাকে, এনজিও তত্ত্বাবধানে বন্যা বিধ্বস্ত এই গ্রামে একটি স্কুলে আদীভা পড়ায়, এবং কিছু কাজকর্ম করে।
পরের দিন কাকভোরে একটি গাড়ি ভাড়া করে কুশল, ইমরান ও বিষ্ণু পাড়ি দিলো লাবণ্যের সন্ধানে।
এ এমন এক জনপদ, সময় যেন এখানে শত বছর ধরেই আটকে আছে। অর্থনীতি পড়ে আছে প্রাণধারণের স্তরে। মাছ ধরা, মাটি কাটা আর ধান চাষ ছাড়া জীবিকা নেই সাধারণ মানুষের। চারদিকে নিচু বাঁধ ছিল একসময়। সাত বছর আগের ঘূর্ণিঝড় আইলা তার অনেকটাই ভেঙে দিয়ে গেছে। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস আর মানুষের ঘরবসতির মধ্যে এমন কিছুই নেই, যা তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারে। কয়েক দিন আগের রোয়ানুর সময়ও তারা ভয়ে ভয়ে ছিল। কিন্তু এ দফায় নদী আর উঠে আসেনি। কেউ সেখানে আদীভা পারভীন বা কাদের মিয়াঁর সংবাদ দিতে পারলো না, অতঃপর এনজিওর টিচারের কথা উঠতে এক গ্রামের দশ বছরের ছেলে বলে উঠলো, লাবনি দিদিকে খুঁজসো?
কুশল অতি উৎসাহী হয়ে বললো হ্যাঁ রে হ্যাঁ চল তো!
বিষ্ণু ইমরান অবাক হয়ে একে অপরের দিকে চেয়ে হনহন করে এগিয়ে যাওয়া কুশলকে অনুসরণ করতে লাগলো।
রাস্তার ওপর ছোট্ট বেড়ার ঘর। ঘর তো না যেন খাঁচা। আলো-বাতাসহীন ছোট্ট গোলপাতার খুপরি।
দরজায় শত ছিদ্রের পর্দা ঢাকা, বেড়ার দরজাটা আধো ভাঙা অবস্থায় ঝুলছে। ঘরে কে আছেন একটু শুনবেন? অতি উৎসাহী হয়ে কুশল প্রশ্ন করলো। শীর্ণ শরীরে এক আধ বয়সী মহিলা পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়াতেই ইমরান ও বিষ্ণু বলে উঠলো চাচী কি অবস্থা তোমার!
-আল্লার ইচ্ছায় চলসে।
নানা কথাবার্তার ফাঁকে আদীভার প্রবেশ পরিবেশকে শব্দহীন করে তুললো। দারিদ্রতার যন্ত্রনায় কোথায় সেই লাবণ্য! বয়সটাকে আরও দশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। এক পলকে সবাইকে দেখে ঘরের এক কোনে দাঁড়িয়ে বোবার মতো চেয়ে রইলো।
লাবণ্য! তুমি আমার সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটাবে?
আদীভা উত্তর না দিয়ে শুধু সবার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলটা নাড়াতে লাগলো।
কুশল উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললো, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, তোমাদের কি মত?
নিঃশব্দ ঘরে শুধু পাখির ডাকের শব্দ ভেঙে ইমরান বলে উঠলো ভালো তো! আমি মৌলবীর সঙ্গে কথা বলছি।
-নাহ! কিছুটা প্রতিবাদী স্বরে আদীভা জবাব দিল। সবাই অবাক! আমার সন্তান আছে, মা আছে। সন্তানের বংশ পরিচয় জানেন? আমি যে বেশ্যা!
-তোমার সবটুকু জেনেই তোমাকে নিয়ে যেতে চাই কুশল দৃঢ় কণ্ঠে বললো।
ততক্ষণে ওই গ্রামের মুরুব্বীরা চলে এসেছে। অসম ধর্মের ভালোবাসার কোনো দাম রইলো না হিন্দু -মুসলমানের ধ্বজাধারীদের কাছে।
শোনা গেছে শেষ পর্যন্ত কুশলের আর ফেরা হয়নি আদীভাকে নিয়ে। ওদের স্বপ্ন রক্তাক্ত থেকে গেছে নদীর জলে।
We hate spam as much as you do