সাবিত্রীবাঈ এমন এক যুগের মহিলা যে সময়ে মেয়েদের স্বাধীন কন্ঠ বিশেষ শ্রুতিগোচর হত না। সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে লিঙ্গসাম্য, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দুঃখের বিষয়, এ যুগে এসে আমরা তাঁর কথা এবং ভারতের নারীবাদী চিন্তনে তাঁর অবদানের কথা ভুলে গেছি।
সমাজ সংস্কারক, শিক্ষক ও কবি সাবিত্রীবাঈ ফুলের ১৯১তম জন্মদিনে মনে রেখে
গতকাল ছিল সমাজ সংস্কারক, শিক্ষক ও কবি সাবিত্রীবাঈ ফুলের জন্মদিন , ১৮৪৮ সালে তিনি পুনে শহরে প্রথমবারের মতো মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় ‘ভিদে ওয়াদা’ স্থাপন করেছিলেন
সাবিত্রীবাই ফুলে ১৮৩১ সালে ৩ জানুয়ারি বোম্বে প্রেসিডেন্সির নাইগাঁওতে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪০ সালে ৯ বছর বয়সে ১২ বছর বয়েসী জ্যোতিরাও ফুলের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। সাবিত্রীবাই ও জ্যোতিরাও দম্পতির সন্তানসন্তানাদি ছিলো না, তবে তারা এক ব্রাহ্মণ বিধবার পুত্র যশভান্ত রাওকে দত্তক নেন।
সাবিত্রীবাই জ্যোতিরাও ফুলে একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক, শিক্ষক ও কবি। তিনি ও তার সহধর্মিণী একত্রে ব্রিটিশ শাসনামলে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। ১৮৪৮ সালে তিনি পুনে শহরে প্রথমবারের মতো মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় ভিদে ওয়াদা স্থাপন করেন। তিনি তৎকালীন সমাজে প্রচলিত গোত্র ও লিঙ্গভেদে প্রচলিত বৈষম্য দূরীকরণে নিয়োজিত ছিলেন এবং মহারাষ্ট্রের সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।জ্যোতিরাও ফুলে ১৮৪৮ সালে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করলে সাবিত্রীবাই সেই বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষিকা ছিলেন। এই দম্পতি একসঙ্গে বিভিন্ন গোত্রের শিশুদের বিদ্যাদানে নিয়োজিত হন এবং সর্বমোট ১৮টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পাশাপাশি এই দম্পতি একটি কেয়ার সেন্টার খুলেন। এখানে ধর্ষিতা নারীদের ও তাদের সন্তানদের সাহায্য করা হতো। সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাবিত্রীবাই একাধিক কবিতা রচনা করেছেন। তার দুইটি কাব্যগ্রন্থ কাব্য ফুলে (১৮৫৪) এবং বভন কাশি সুবোধ রত্নকর (১৮৯২)) সালে প্রকাশিত হয়। পুনে সিটি কর্পোরেশন সাবিত্রীবাই ফুলের সম্মানে ১৯৮৩ সালে একটি স্মারক স্থাপন করেন। ২০১৫ সালে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তার সম্মানে সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে ভারতীয় ডাক বিভাগ ফুলের সম্মানে একটি ডাকটিকেট প্রকাশ করে। সাবিত্রীবাই ও তার পুত্র যশোবন্ত ১৮৯৭ সালে নালাসোপারাতে মহামারি রূপ নেওয়া বিউবনিক প্লেগে আক্রান্ত রোগীদের সেবার জন্য একটি চিকিৎসালয় খুলেন। এখানেই রোগীদের সেবা করার সময় তিনি প্লেগে আক্রান্ত হন এবং ১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।
সাবিত্রীবাঈ এমন এক যুগের মহিলা যে সময়ে মেয়েদের স্বাধীন কন্ঠ বিশেষ শ্রুতিগোচর হত না। সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে লিঙ্গসাম্য, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দুঃখের বিষয়, এ যুগে এসে আমরা তাঁর কথা এবং ভারতের নারীবাদী চিন্তনে তাঁর অবদানের কথা ভুলে গেছি।
সাবিত্রীবাঈয়ের জীবনে এমন বিস্ময়কর ঘটনার অভাব নেই। অস্পৃশ্যতার প্রকোপ যে সময় মারাত্মক, ঠিক সেই সময়েই সাবিত্রী তাঁর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একটি জলের কুয়ো স্থাপন করেন, যেখানে ‘নিচু’ জাতের মানুষ কোনো অসম্মান ছাড়াই জল নিতে পারতেন।
সে যুগে স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েদের চুল কেটে ফেলার রেওয়াজ ছিল। এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন সাবিত্রী। তিনি এক স্ট্রাইকের ডাক দেন যার ফলে কোনো মানুষ ক্ষৌরকর্মীদের কাছে চুল কাটবেন না। এতেই শেষ নয়। সেই সময়ে মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের বৃদ্ধ স্বামীদের মৃত্যুর পর তাঁরা বিভিন্ন ভাবে নিপীড়িত হতেন। এর মধ্যে যৌন নিপীড়নের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সময় এই মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়তেন ও ভ্রূণহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতেন। এই মেয়েদের জন্য সাবিত্রীবাঈ একটা আশ্রম স্থাপন করেন, যেখানে তাঁরা ও তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানেরা স্থান পেতে পারতেন।
সাবিত্রীবাঈ এমন এক যুগের মহিলা যে সময়ে মেয়েদের স্বাধীন কন্ঠ বিশেষ শ্রুতিগোচর হত না। সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে লিঙ্গসাম্য, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দুঃখের বিষয়, এ যুগে এসে আমরা তাঁর কথা এবং ভারতের নারীবাদী চিন্তনে তাঁর অবদানের কথা ভুলে গেছি। যত দিন না তাঁর মতো করে সমাজ ভাবতে পারছে, বা তাঁর ভাবনাকে গ্রহণ করতে পারছে তত দিন আমাদের দেশের নারীবাদ সীমিত এবং সুবিধাভোগী শ্রেণির মতবাদ হয়েই থেকে যাবে।
We hate spam as much as you do