Tranding

04:57 AM - 04 Mar 2026

Home / Article / মধ‍্যপ্রাচ‍্যে সংঘাতঃ তেলের ভার ও আগামীর ভারতের সমস্যা।

মধ‍্যপ্রাচ‍্যে সংঘাতঃ তেলের ভার ও আগামীর ভারতের সমস্যা।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি মূলত সরবরাহ কেন্দ্রিক। বিশেষ করে ডিজেলের দামের ওপর ভারতের সামগ্রিক পণ্যমূল্য নির্ভরশীল। ভারতের লজিস্টিক বা পণ্য পরিবহণ খাতের প্রায় ৭০ শতাংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল এবং এই ট্রাক বা লরিগুলি মূলত ডিজেলে চলে। যদি জ্বালানির দাম বাড়ে, তবে ট্রাক ভাড়ায় তাৎক্ষণিক বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি, ফল এবং খাদ্যশস্যের দাম এক লহমায় বেড়ে যায়। খুচরো মূল্য সূচক বা সিপিআই-তে জ্বালানির প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকলেও এর পরোক্ষ প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ যদি কেবল খাদ্য এবং যাতায়াতের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়, তবে বাজারে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমে যায়। এটি সরাসরি ভারতের জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের গতিকে মন্থর করে দেয়।

মধ‍্যপ্রাচ‍্যে সংঘাতঃ তেলের ভার ও আগামীর ভারতের সমস্যা।

মধ‍্যপ্রাচ‍্যে সংঘাতঃ তেলের ভার ও আগামীর ভারতের সমস্যা।

গৌতম হালদার
Mar 3, 2024

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সামরিক উত্তেজনা ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এটি কেবল একটি সাময়িক বৈদেশিক নীতি বা কূটনীতির মারপ্যাঁচ নয়, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শক্তি স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের ওপর এক গভীর আঘাত। ভারতের জ্বালানি আমদানির অবকাঠামো এবং রাজকোষের বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় যে, হরমুজ প্রণালীতে সামান্যতম অস্থিরতাও ভারতের জাতীয় অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে সক্ষম। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার প্রায় অর্ধেক মেটানো হয় বিদেশ থেকে আনা এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। এই বিশাল আমদানির সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে, যার একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৬ লক্ষ ব্যারেল তেল এবং প্রচুর পরিমাণে এলএনজি এই রুট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ফলে এই জলপথ যদি কোনো কারণে রুদ্ধ হয় বা সেখানে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হয়, তবে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।

অর্থনৈতিক মানদণ্ডে এই সংকটের প্রথম এবং সবথেকে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে ভারতের আমদানি ব্যয়ের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য এবং সংবেদনশীল সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০-৭৫ ডলারের স্বাভাবিক স্তর থেকে লাফিয়ে ১০০ বা ১১০ ডলারে পৌঁছে যায়, তবে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে টান পড়বে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের দীর্ঘমেয়াদী তথ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ১ ডলার বৃদ্ধি পেলে ভারতের বার্ষিক আমদানি বিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি বেড়ে যায়। সেই হিসেবে যদি তেলের দাম ৩০ ডলার বৃদ্ধি পায়, তবে ভারতের অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ভারতের চলতি হিসাব ঘাটতি বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটকে এক ধাক্কায় বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে দেবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতীয় রুপির মূল্যের ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়লে এবং ডলারের তুলনায় রুপির সরবরাহ বাজারে বৃদ্ধি পেলে রুপির অবমূল্যায়ন অনিবার্য। অতীতে দেখা গেছে যে, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে রুপির মূল্য ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। রুপি দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো ভারতের জন্য আমদানি করা প্রতিটি পণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা, যা মুদ্রাস্ফীতির আগুমে ঘি ঢালার সমান।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি মূলত সরবরাহ কেন্দ্রিক। বিশেষ করে ডিজেলের দামের ওপর ভারতের সামগ্রিক পণ্যমূল্য নির্ভরশীল। ভারতের লজিস্টিক বা পণ্য পরিবহণ খাতের প্রায় ৭০ শতাংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল এবং এই ট্রাক বা লরিগুলি মূলত ডিজেলে চলে। যদি জ্বালানির দাম বাড়ে, তবে ট্রাক ভাড়ায় তাৎক্ষণিক বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি, ফল এবং খাদ্যশস্যের দাম এক লহমায় বেড়ে যায়। খুচরো মূল্য সূচক বা সিপিআই-তে জ্বালানির প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকলেও এর পরোক্ষ প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ যদি কেবল খাদ্য এবং যাতায়াতের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়, তবে বাজারে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমে যায়। এটি সরাসরি ভারতের জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের গতিকে মন্থর করে দেয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তেলের দামের উচ্চমূল্য বজায় থাকলে তা মুদ্রাস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার ৪ শতাংশের অনেক উপরে ঠেলে দিতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করবে। সুদের হার বাড়লে সাধারণ মানুষের গৃহঋণ বা গাড়ি ঋণের ইএমআই বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্পের জন্য মূলধন সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

রাজস্ব কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে ভারত সরকার এক চরম উভয় সংকটের মুখে পড়বে। ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি তাদের মোট কর রাজস্বের এক উল্লেখযোগ্য অংশ আদায় করে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর বসানো আবগারি শুল্ক এবং ভ্যাট থেকে। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, তবে সরকারের কাছে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথমত, আমদানিকৃত তেলের বর্ধিত মূল্য সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, যার ফলে জনরোষ তৈরি হতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি লাগামছাড়া হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকার নিজের করের অংশ কমিয়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু কর কমানোর অর্থ হলো সরকারের রাজস্ব আয়ে বিশাল ঘাটতি তৈরি হওয়া। ভারতের মতো দেশে যেখানে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, সেখানে রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি পেলে রাজকোষীয় শৃঙ্খলা বা ফিসকাল ডেফিসিট লক্ষ্যমাত্রা লঙ্ঘন করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলির কাছে ভারতের ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা বা ক্রেডিট রেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দেবে।

কৃষিক্ষেত্র এবং সার শিল্পের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব হবে মারাত্মক। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সার ব্যবহারকারী দেশ এবং এই সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। ভারতের এলএনজি আমদানির একটি বিরাট অংশ কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে আসে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই জলপথ অবরুদ্ধ হলে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে সার তৈরির খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সরকার যদি কৃষকদের সারে ভর্তুকি দিতে চায়, তবে সরকারের ভর্তুকি বিল কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি ভর্তুকি না দেওয়া হয়, তবে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষকদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সেচ কাজের জন্য ব্যবহৃত পাম্প সেটগুলিও মূলত ডিজেল বা বিদ্যুৎ চালিত। তেলের দাম বাড়লে সেচের খরচ বাড়ে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের চরম দুর্দশার মুখে ঠেলে দেয়। ফলস্বরূপ, গ্রামীণ অর্থনীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাকে থামিয়ে দিতে পারে।
​শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে পেট্রোকেমিক্যাল এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হবে। প্লাস্টিক, রাবার, কৃত্রিম তন্তু, রং এবং লুব্রিকেন্ট শিল্প পুরোপুরি অপরিশোধিত তেলের উপজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই কাঁচামালগুলির দাম বাড়লে ভারতীয় পণ্য বিশ্ববাজারে তার প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা হারাবে। বিশেষ করে ভারতের টেক্সটাইল এবং অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ রপ্তানি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রপ্তানি আয় কমলে এবং আমদানি ব্যয় বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্য আরও বিপর্যস্ত হবে। বিমান চলাচল বা এভিয়েশন খাতের অবস্থা হবে আরও শোচনীয়। ভারতের বিমান সংস্থাগুলির মোট পরিচালনার খরচের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা এটিএফ-এর পেছনে। তেলের দাম ১০০ ডলার পার করলে বিমান ভাড়া এতটাই বাড়বে যে পর্যটন এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে, যা হোটেল এবং পরিষেবা শিল্পের ওপর পরোক্ষ আঘাত হানবে।
​শেয়ারবাজার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা রক্তক্ষরণ ঘটাবে। শেয়ারবাজার অনিশ্চয়তা অপছন্দ করে। যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়া মাত্রই বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বা এফপিআই ভারতসহ উদীয়মান বাজারগুলি থেকে টাকা তুলে নিয়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে পরিচিত সোনা বা মার্কিন ডলারে বিনিয়োগ শুরু করবে। মূলধন বহির্গমন বা ক্যাপিটাল আউটফ্লো শুরু হলে শেয়ার সূচকের পতন ঘটবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হবে। বিশেষ করে তেল বিপণন সংস্থাগুলি এবং পরিবহণ খাতের শেয়ারের দাম দ্রুত কমতে শুরু করবে। যদিও ওএনজিসি বা অয়েল ইন্ডিয়ার মতো তেল উত্তোলনকারী সংস্থাগুলি বিশ্ববাজারে চড়া দামের কারণে সাময়িক লাভবান হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক বাজারের পতন সেই লাভকে ছাপিয়ে যাবে।
​কৌশলগত দিক থেকে ভারতের পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা আপৎকালীন তেল মজুতের সীমাবদ্ধতাও এখানে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারতের বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালোর এবং পদুরে যে ভূগর্ভস্থ কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার রয়েছে, তাতে বড়জোর ৯ থেকে ১০ দিনের ভারতের মোট তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারগুলির কাছে আরও প্রায় ৬৫ দিনের তেল মজুত থাকে। কিন্তু যদি হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে এই মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসবে। বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়া বা আফ্রিকা থেকে তেল আনার চেষ্টা করা হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভৌগোলিক নৈকট্য এবং কম পরিবহণ খরচের সুবিধা সেখানে পাওয়া সম্ভব নয়। কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে আফ্রিকা বা ইউরোপ থেকে তেল আনতে গেলে জাহাজের ভাড়া এবং বীমার প্রিমিয়াম বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা তেলের ল্যান্ডেড কস্ট বা গন্তব্যে পৌঁছানোর খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে।

​সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এই অর্থনৈতিক চাপ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তেলের দাম বাড়লে গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ে, যা প্রতিদিনের যাত্রী এবং সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলে। রান্নার গ্যাসের বা এলপিজির দাম বাড়লে মধ্যবিত্তের হেঁশেলের বাজেট ওলটপালট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে, যা যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। মুদ্রাস্ফীতির কারণে যখন মানুষের প্রকৃত আয় বা রিয়েল ইনকাম কমে যায়, তখন দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। এটি সরাসরি পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলিতে সাধারণ মানুষের ব্যয় করার ক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট ভারতকে তার জ্বালানি নীতি ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দিলেও, স্বল্প মেয়াদে ভারত একটি অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ভারত বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রচার চালাচ্ছে, কিন্তু ভারতের বিশাল শিল্প এবং পরিবহণ পরিকাঠামো এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, রাতারাতি এই নির্ভরশীলতা কাটানো অসম্ভব। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা ভারতের জন্য কেবল ডলারের অঙ্কে ক্ষতি নয়, এটি ভারতের শিল্পোন্নয়নের গতিকে অন্তত কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। ভারতের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের পতন কেবল তেলের দাম বৃদ্ধির কারণেই ঘটতে পারে বলে অনেক আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা সতর্কবার্তা দিয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, পশ্চিম এশিয়ার এই সামরিক উত্তেজনা ভারতের জন্য একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক মরণফাঁদ। এটি ভারতের রাজকোষীয় ঘাটতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বাজারের থলি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই উত্তেজনা প্রশমন না হলে, ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে এক গভীর মন্দার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে এই জলপথের অনিশ্চয়তা। আজকের বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এর অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা হলেও এর আসল চিত্র কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হওয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনার উপরে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে এর দায়বদ্ধতা থেকে ভারতের সরকার কিন্তু এর দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারবেন না।

Your Opinion

We hate spam as much as you do