২০১১-র সেন্সাস অনুযায়ী ভারতে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ভাষা হিন্দি (২৫.১৯%)। দ্বিতীয় কাশ্মীরী (২২.৯৭%), তৃতীয় গুজরাটি (২০.৪%), চতুর্থ মণিপুরী (২০.০৭%), এবং পঞ্চম বাংলা (১৬.৬৩%)। দুঃখের বিষয়, অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত দুটি ভাষার বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক – উর্দু (- ১.৫৮%) ও কোঙ্কনি (- ৯.৩৪%)।
বিশ্বজুড়ে বিপন্ন মাতৃভাষা, আক্রান্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাঃ কিছু তথ্য ২য় পর্ব
সুমন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক
২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২৩
পূর্ব প্রকাশের পর ২য় পর্ব................
ভাষা পরিবার:
৪৭৮ টি ভাষা সম্বলিত ট্রান্স নিউগিনি ভাষা পরিবারে (family of languages) যে ভাষাগুলি রয়েছে সেই ভাষাগুলিতে কথা বলেন পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র ০.০৫ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, জার্মান, ইংরাজি, স্প্যানিশ, ইত্যাদি ৪৪৭টি ভাষার ভাষা-পরিবার ইন্দো ইউরোপিয়ান ফ্যামিলি অফ ল্যাঙ্গুয়েজেজ-এর ভাষাগুলি তে কথা বলেন পৃথিবীর ৪৬ শতাংশ মানুষ। সারা পৃথিবীতে এমন মোট ১৪২টি ভাষা পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান ৬টি পরিবারের ভাষা গুলিতে কথা বলেন বিশ্বের জনসংখ্যার ৬ ভাগের ৫ ভাগ মানুষ। ভাষার সংখ্যার ভিত্তিতে প্রথম স্থানে রয়েছে নাইজার-কঙ্গো পরিবার। ভাষার সংখ্যা ১৫৩৬। ভাষা সংখ্যার বিচারে পরের পরিবার গুলি হল অস্ত্রোনেসিয়ান (১২২৫), ট্রান্স নিউগিনি (৪৭৬), সাইনো-টিবেটান (৪৫৬), ইন্দো-ইউরোপীয় (৪৪৭), এবং আফ্রো-এশিয়াটিক (৩৬৯)।
বিপন্ন ভাষা:
২০১০ এ M. Paul Lewis ও Gary F. Simons ভাষার বিপন্নতার পরিমাপের জন্য ১৩ টি স্তরের একটি মাপ দন্ড উদ্ভাবন করেন। তার নাম দেন Expanded Graded Intergenerational Disruption Scale, সংক্ষেপে EGIDS। এই EGIDS scale অনুযায়ী সারা বিশ্বে ব্যবহৃত ৭১৫১টি ভাষার মধ্যে ৩০৪৫টি অর্থাৎ ৪২.৫৮ শতাংশ ভাষা আজ বিপন্ন। ২০২১ সালে Ethnologue প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিপন্ন (endangered) ভাষা ছিল ৪০.৭২ শতাংশ। কাজেই বোঝাই যায়, মাত্র দু বছরের ব্যবধানে সারা বিশ্বের আরো দুই শতাংশ ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। UNESCO-র 'Atlas of the World's Languages in Danger' (2010) এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ১৯৫০ থেকে ২০১০-র মধ্যে পৃথিবীর বুক থেকে ২৩০ টি ভাষা চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। আরও প্রায় ১০% ভাষা গুরুতরভাবে বিপন্ন (critically endangered)। একই সময়কালে ভারতবর্ষে ৫ টি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বিশ্বে ১৭৮টি এমন ভাষা আছে রে ভাষায় কথা বলেন ১০-৫০ জন। ১৪৬টি ভাষায় কথা বলেন ১০-এরও কম মানুষ। আমাদের অরুণাচল প্রদেশের গুরুতরভাবে বিপন্ন একটি ভাষা আবিষ্কৃত ও সংযোজিত হয় ২০১০-এ। নাম 'কোরো'। কথা বলেন ৮০০-১০০০ জন। UNESCO-রই সাম্প্রতিক আরও একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, সারা বিশ্বে ৬০৮ টি ভাষা গুরুতরভাবে বিপন্ন। (গুরুতরভাবে বিপন্ন ভাষা বলতে সেই সমস্ত ভাষাকে বোঝানো হয় যে ভাষাগুলি কেবলমাত্র পরিবারের পিতামহ ও পিতামহী বা তাদের চেয়েও বৃদ্ধ কেউ ব্যবহার করে থাকেন এবং তাও বিরল ও আংশিক ভাবে)। তার মধ্যে ৩৬২টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৮২), ব্রাজিল (৪৫), অস্ট্রেলিয়া (৪২), ভারতবর্ষের (৪১) মত দশটি দেশে অবস্থান করছে। গুরুতরভাবে বিপন্ন ভাষার সংখ্যার নিরিখে প্রথম স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। Ethnologue-র তথ্য অনুযায়ী নিউজিল্যান্ডের ১০০% দেশীয় ভাষা আজ বিপন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটি ৯২% এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৮৯%।
ভারতবর্ষের ভাষা চিত্র:
সংবিধান প্রনয়ণের সময় ভারতের অষ্টম তফসিলে ভাষার সংখ্যা ছিল ১৪। ১৯৬৭ (১), ১৯৯২ (৩), এবং ২০০৪-এ সংযোজিত ৪টি ভাষা নিয়ে মোট ভাষার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২। স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আরো ৩৮টি ভাষা এই তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবি রয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনটি সেন্সাস এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ভাসাভাষীর ১২টি ভাষার মধ্যে শতাংশের বিচারে একমাত্র হিন্দি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বগামী। বাকি সব কটি ভাষায় কথা বলা মানুষ শতাংশের বিচারে কমেছে। ১৯৫১-র সেন্সাসে হিন্দি, পাঞ্জাবি উর্দু এই তিনটি ভাষায় ৪২% মানুষ কথা বলতেন। ২০১১য় শুধুমাত্র হিন্দিতে কথা বলেন ৪৩.৬৩% মানুষ। Business Standard-এর ২৪/৯/২০১৯ এর একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৪১-এ দেশের ৬০% মানুষ হবেন হিন্দিভাষী।
২০১১-র সেন্সাস অনুযায়ী ভারতে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ভাষা হিন্দি (২৫.১৯%)। দ্বিতীয় কাশ্মীরী (২২.৯৭%), তৃতীয় গুজরাটি (২০.৪%), চতুর্থ মণিপুরী (২০.০৭%), এবং পঞ্চম বাংলা (১৬.৬৩%)। দুঃখের বিষয়, অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত দুটি ভাষার বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক – উর্দু (- ১.৫৮%) ও কোঙ্কনি (- ৯.৩৪%)।
সংস্কৃত বনাম অন্যান্য দেশীয় ধ্রুপদী ভাষা:
অষ্টম তফসিলের বাইশটি ভাষার মধ্যে যে ভাষায় সবচেয়ে কম সংখ্যক মানুষ কথা বলেন সেটি হল সংস্কৃত। এই ভাষায় কথা বলেন মাত্র ২৪,৮২১ (যদিও ২০০১ এর তুলনায় ২০১১ তে সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৭৬%)। লক্ষ্যনীয় বিষয়, সংস্কৃত উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে মোট ব্যয় করে ৬৪৩.৮৪ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে দেশের অন্য পাঁচটি ধ্রুপদী ভাষা – তামিল তেলেগু কন্নড় মালায়ালাম এবং ওড়িয়া ভাষার জন্য কেন্দ্রের মোট ব্যয় ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই পাঁচটি ভাষার উন্নয়নের জন্য মোট যে অর্থ ব্যয় হয় তার ২২ গুন ব্যয় করা হয় একমাত্র সংস্কৃত ভাষা উন্নয়নের খাতে।
এদেশে বিপন্ন ভাষা:
২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের তরফ থেকে সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে ৪২ টি ভাষা গুরুতর ভাবে বিপন্ন । UNESCO র- আর একটি প্রতিবেদনে জানা যায় উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা সর্বাধিক। অরুণাচলে ২৯ টি আসামে ২০ টি মনিপুরে ১৮ টি এবং নাগাল্যান্ডে ১৭ টি ভাষা আজ বিপন্ন। এছাড়াও হিমাচল প্রদেশের ১৬ টি ভাষা বিপন্ন।
মাতৃভাষায় শিক্ষা
Ethnologue-র প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর আড়াইশো কোটি শিশু ০-১৯ বছরের কোঠার মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে ১৬৫ কোটি শিশু তাদের প্রথম ভাষায় (L1) পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। বাকিরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পৃথিবীর ৩৫ শতাংশ শিশুর শিক্ষা শুরু হয় অজানা কোনো ভাষায় বা এমন কোন ভাষায় পারিবারিক পরিসরে যার কোন ব্যবহার নেই। এই শিশুদের অনেকেই শিক্ষাজীবনের শুরুতেই এক প্রবল প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। ফলে ব্যাহত হয় শিক্ষা। আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশেই ৭০ থেকে ১০০% শিশু মাতৃভাষায় (L1) পড়াশুনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মরক্কো, সুদান, মিশরের মতো দেশে প্রায় একশ শতাংশ শিশু মাতৃভাষা ব্যতীত অন্য ভাষায় তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করে। ভারতবর্ষে ৮৬% শিশু মাতৃভাষায়(L1) পড়াশোনা করে। বাংলাদেশে ৮০%। পক্ষান্তরে পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায় ৯৩% শিশুর শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা (L1) ব্যতীত অন্য ভাষা, পাপুয়া নিউগিনিতে ৯২% শিশু অন্য ভাষায় পাঠ নেয়। সারা পৃথিবীতে দেশ পিছু ৩.৭ টি করে ভাষায় পাঠদান হয় স্কুল স্তরে। ফিলিপিন্সে সর্বাধিক (৩১); ভারতবর্ষে ৩০ টি ভাষায় পাঠদান করা হয়।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ ও মাতৃভাষায় শিক্ষা:
১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ও পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে WTO-GATS-এর নির্দেশে ক্রমশ বেড়েছে শিক্ষার পণ্যায়ন । সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমের কর্পোরেট দাবিকে মেনে বেড়েছে শিক্ষার কেন্দ্রীকরণ। তার প্রভাব পড়েছে মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপরেও। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এই কর্পোরেট সংস্কৃতিরই এক বিপজ্জনক প্রতিফলন।
শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ এর অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নীতিকে কার্যত বিসর্জন দিয়ে পঞ্চম শ্রেণী অবধি মাতৃভাষায় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । শিক্ষানীতির বিভিন্ন অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন্দ্রীকরণের স্বার্থে হিন্দি ভাষার প্রসারের পথ তৈরি করা হয়েছে। সংস্কৃতকে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে, এমনকি উচ্চ শিক্ষাতেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সমগ্র শিক্ষা নীতিতে কোথাও উর্দু ভাষার কোন উল্লেখ নেই। Home language / mother tongue / local language / regional language – সবকটিকে সমার্থক হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা গেছে শিক্ষা নীতিতে। এর সুদূর প্রভাব পড়বে মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর।
তাই বিশ্বের ভাষা বৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে, শিশুর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশের জন্য, আরো দীর্ঘ ও তীব্র আন্দোলন আজও আরো বেশি করে প্রয়োজন। তাই ৭১ বছর পেরিয়েও অমর একুশে আজও প্রাসঙ্গিক।
We hate spam as much as you do