'অ-রি'-র কান্ডকারখানা
সুমিত গাঙ্গুলী 11th july 2021
[এই ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে যে পাঠকগণ ফিরে দেখতে চান কেমন ছিল সেই সব '৯০-এর দিনগুলো, কিংবা নব্বইজাতকরা যখন ফিরতে চায় তাদের ছেলেবেলায়, তখন তারই পটভূমিকায় এই সম্পূর্ণ কাল্পনিক গল্পটি লেখা হচ্ছে, স্থান-কাল-পাত্র সবই কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে কোনো মিলই নেই। থাকলে তা নিতান্ত আকস্মিক।]
"অসীম, ব্যায়াম নিয়মিত না করলে কিন্তু শরীর ভেঙে যাবে। ভালো কথা বলছি রোজ সকালে উঠে ব্যায়াম করতে হবে, না হলে কিন্তু..." কথা শেষ হলো না সুনীলদার। অসীম বলে উঠলো: "আর হবে না সুনীলদা। এবার থেকে রোজ আসবো।"
"ঠিক আছে। এই সপ্তাহে আমি সময় পাবো না। নিজে বাড়িতে প্র্যাকটিস করবি। আর ব্যায়াম করলেই তো শরীর থাকবে। নাহলে ডোনাল্ডের মতো বল করতে পারবি?"
"ডোনাল্ড রোজ ব্যায়াম করে?"
"নাহলে অত ফিট থাকে? দক্ষিণ আফ্রিকার ফিল্ডিং দেখিস নি? জন্টি রোডস?"
সুনীলরা পাড়ায় নতুন এসেছে। কিছু ছেলেমেয়েদের ব্যায়াম শেখায়। বলে এটা সাধনা। শরীরই মন্দির। অসীম ওর কাছে ব্যায়াম শেখে। শুকতারার তুষার শীল-এর শরীর গড়তে যোগ ও ব্যায়াম পড়ে। ওর ইচ্ছা বড় হয়ে ক্রিকেটার হবে। তবে ডোনাল্ড হবে না। ও হবে কপিল বা বোথাম, ইমরান, হ্যাডলি। খুব ছয় মারবে আর খালি ইন সুইং বা আউট সুইং দেবে।
"হ্যাঁ রে, অভিষিক্তা আর রিক্তা আজ এলো না কেন?"
"জানিনা সুনীলদা। স্কুলে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করবো।" সুনীল বেরিয়ে পড়ে। আজ শনিবার। হাফছুটি স্কুল। তার ওপর মামার বাড়ি নেমন্তন্ন। গোটা বাড়ি, মায় ভাড়াটেরাও যাবে, ও-ও যাবে। সন্ধ্যেবেলা। মামার বাড়ি সামনে, বাড়ির সবাই তাই নিয়ে কথা বলছিলো। পাড়ায় খুব চোরের উৎপাত হয়েছে। বাড়ি ফাঁকা থাকলে কে জানে কী হবে। যদিও কিছু চুরি করছে না, খালি মুখোশ পরে আর লোমশ হাত জানলা দিয়ে বাড়িয়ে ভয় দেখায়। অসীমের খালি মনে হয়, ইস, যদি 'শান্ত-শেলী-মোটু'দের মতো একটা 'ত্রয়ী সত্যসন্ধানী' বানানো যেত, তাহলে বেশ হতো। বলেওছিল একবার রিক্তাকে। রিক্তা বলেছিল, "আর একজন চাই। নাহলে জমে না। আমার দিদিটা রামভীতু। ওটাকে বললেই বাবাকে লাগিয়ে দেবে।" যাই হোক, বাড়ি ফিরে অসীম আজকের কাগজটা নিলো।
দেখল, অস্ট্রেলিয়াকে জিততে হলে দ্বিতীয় ইনিংসে করতে হতো ১১৬। তারা গতকাল ১১১তেই শেষ হয়ে গেছে। ডোনাল্ড আর ডি ভিলিয়ার্সই অস্ট্রেলিয়াকে খতম করেছে। বর্ডার, বুন, টেলর, স্লেটার, মে, হিলি, মার্ক ও'রা সব ঝড়ে উড়ে গেছে। ম্যাকডরমট আনতাবড়ি চালিয়ে ২৯ করেছে। ওদিকে সৌরভ গাঙ্গুলির বাংলা উড়িষ্যাকে হারিয়েছে। কবে যে আবার সৌরভ দলে চান্স পাবে?
হঠাৎ মায়ের ডাকে হুঁশ ফিরতে দৌড়লো স্নান করতে। কদিন আগেই নতুন বছর গেছে। কমাস বাদেই তো ফাইনাল পরীক্ষা।
*****
"কী রে, তোরা ব্যায়াম করতে গেলি না? সুনীলদা বলছিল!" অসীম বললো রিক্তাকে।
"আর বলিস না! দিদির জ্বর হয়েছে। এমন ভীতু, বলে কিনা 'হাওয়া লেগেছে!' যত্তোসব। আজ বিকেলে তোদের পাড়ায় যাবো। পিসির বাড়ি -- দিদিকে 'ঝাড়াতে'। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি থাকবি? ক্যারমটা বার করিস। খেলা যাবে।" রিক্তা বললো।
"দাঁড়া, দাঁড়া! কী বললি? হাওয়া! ঝাড়ফুঁক! তোর দিদিটা না -- রামভীতু।" অসীম বললো।
"যা বলেছিস! --" রিক্তা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় অনিমাদি ক্লাসে ঢুকলেন। খুব রাগী। সবাই চুপচাপ অঙ্ক বই বের করলো। খুব শক্ত একটা 'সরল' অঙ্ক করতে করতে অসীমের চোখে পড়লো স্কুলের মাঠের পেছনের বন্ধ কারখানার ভাঙা চিমনির দিকে। পাশের মহুয়া গাছে কাঠঠোকরাটা সমানে ঠক ঠক করে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাৎ বিকট সুরে বেজে উঠলো হিন্দি গান:
'ইস দিল মে কৈসি বেকরারি হ্যায়
তু ক্যা জানে, তু ক্যা জানে
উলফৎ কি আগে দুনিয়া হারি হ্যায়
তু না মানে, তু না মানে।'
আচারওয়ালা এসে গেছে। আজ 'রঙ্গ'-এর গান বাজাচ্ছে। পাশ থেকে সুমন ফিসফিসিয়ে বললো, "ভাই, কাল রবিবার আমাদের পাড়ায় ভিডিও আসছে! তাতে 'রঙ্গ' আনছে! আসবি!"
অসীম বললো, "আমি কদিন আগেই ভিডিওতে দেখলাম।" অমিত পেছন থেকে বললো, "এই, আজ 'ডিস্কো ড্যান্সার' দিয়েছে মেট্রো চ্যানেলে।" অসীম মনে মনে বললো: তার মানে আজ আর রিকশা পাবো না। ততক্ষনে সরল-আচার-রঙ্গ ছাড়িয়ে ওর মাথায় অন্য বুদ্ধি ঘুরছে, কিন্তু কিছুতেই দাঁড়াচ্ছে না বুদ্ধিটা।
*****
যা ভেবেছে অসীম। একটাও রিকশা নেই। এখন চলো হাঁটতে হাঁটতে। মা বললো, "জ্বালাতনের মাথায় বাড়ি! একটাও রিকশা নেই! সব সিনেমা দেখতে গেছে। রাস্তার পাশের জানলা দিয়ে ভেসে আসছে:
ইসকমে জিয়ে ইসকমে মরে
হাম জ্যায়সে দিলওয়ালোঁ কি
গোরো কি না কালোঁ কি
দুনিয়া হ্যায় দিলওয়ালোঁ কি।
যাই হোক, হাঁটতে হাঁটতে অসীম ভাবছিল অভিষিক্তা আর রিক্তার কথা: দু'জনে যমজ হলেও একটা রামভীতু আর একটা বেশী সাহসী। সেই যেবার একদল হনুমান কোথা থেকে দৌড়তে দৌড়তে গোটা এলাকায় উৎপাত করছিলো, রিক্তা নাকি বারবার দেখতে যাচ্ছিলো, কামড়ালে বেশ হতো! এলাকায় চোর এসেছে শুনে বলে কিনা "আমি হলে হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারতাম!" সুমন বলেছিল, "এর বেশি সাহস। ভাগ্যে দুঃখ আছে কোনোদিন।" সুনীলদাকে সেবার কী কাকুতিমিনতি। কী ব্যাপার? না অসীমের মতো ওকেও ভল্ট খেয়ে পাঁচিল ডিঙানো শেখাতে হবে। বোঝো ঠ্যালা! তারপর ঘাড় ভেঙে পড়ে থাকে আর কি! এই ভল্ট খাওয়া অবশ্য সুনীলদার পেটেন্ট। পাচিলের ওপর দুহাতের চারখানা আঙুল রাখতে পারলেই হলো। ব্যস! ওমনি গোটা শরীর তাতে ভর দিয়ে লাফ মেরে ওপারে। এটা শুধু অসীমকেই শিখিয়েছে, আর কাউকে না। এই নিয়ে রিক্তা অসীমের ওপর খচে আছে।
ভাবতে ভাবতে পাড়ায় চলে এলো, ওর বাড়ির সামনে বড় মাঠ। তার একপ্রান্তে মন্দির। তার চাতালে বাপি, বুবাই, সোমু, ননী, তুলো, ছোটকা, অজয় আর সমীর বসে বসে বড় আর্ট পেপারে কী সব আঁকা দেখছে। অসীম হাঁ করে দেখতে দেখতে বাড়ি ঢুকছে আর ভাবছে ব্যাপারটা কী! এক্ষুনি দেখতে হবে। কোনোরকমে পোশাক ছেড়ে হাত-পা-ধুয়ে দুটো খেয়েই দৌড়! দুদিন তো ছুটি! পড়তে হবে না। দেখা যাক কী ব্যাপার।
*****
"কী ব্যাপার রে? মন্দিরে আর্ট পেপার নিয়ে কী করছিস?" অসীম বলে উঠলো মন্দিরে এসে। বাপি বললো, "এই তো অসীম এসে গেছে। আরে আমরা আসলে এই পাড়ার একটা ম্যাপ বানিয়েছি।"
"অ্যাঁ! ম্যাপ! কী হবে ম্যাপ দিয়ে?"
"কোন কোন জায়গায় গাছ আর ঝোপ আছে আর কোথায় কোথায় পাখির বাসা আছে, কী পাখির বাসা আছে, তার জন্য ম্যাপ বানালাম।"
"কী হবে তা দিয়ে?" অসীম তখনও অবাক।
"পাখির ছানা ধরবো! ধরে পুষবো।" তুলো বললো।
"আজ রাত, মানে এই সাতটা নাগাদ -- সন্ধ্যে আর কী -- তোদের ঘরের পাশে যে পাঁচিলটা কেলোকাকু আর পশুমামার বাড়ির সাথে তিনকোণা জয়েন্টটা করছে -- সেখানে অনেকগুলো গাছের ঝাড়। ওখানে টিয়াপাখির বাসা আছে। আমার ভাই বুবাইকে তুলবো! তুই থাকবি?"
অসীম বললো, "না না, আমি তখন রেডিও শুনবো।" মনে মনে বললো: টিয়াপাখির খেয়েদেয়ে কাজ নেই ওখানে বাসা বানাবে। হুঁহ!
"ঠিক আছে। তুই তখন ঘরে থাকবি তো? দরকার হলে ডাকব 'খন।"
মাথা নেড়ে অসীম বাড়ি গেলো। বুদ্ধিটা এসে গেছে। ফুল প্রুফ।
*****
দুপুরে খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়ে বায়না ধরলো অসীম। সে বাড়িতেই থাকবে আর টিভি দেখবে। তারপর সাতটা থেকে বিবিধ ভারতীতে 'ফৌজি ভাইয়োঁ কে লিয়ে জয়মালা' শুনবে, তারপর রিক্তা এলে ক্যারম খেলবে, তারপর নটার পর ও খেতে যাবে। তাতে একচোট হইচই হলো। ঠাকুমা বললো, "ছটাতেই সবাই চলে যাবে! বাড়িতে তুই একা থাকবি? ঐতো, সোনারাও যাবে, বাবুয়ারাও যাচ্ছে, গোটা বাড়ি ফাঁকা, তায় আবার চোরের উপদ্রব।" অসীম তাও জেদ ধরে বসলো। সে কিছুতেই শুনবে না। শেষে বাবা-জ্যাঠারা বলল, "ঠিক আছে থাক। ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে। নাম ধরে না ডাকলে সাড়া দিবি না। আমরা বা চেনা কেউ হলে দরজা খুলবি। আর মাঝের গেটে তালা মেরে গেলাম।" অসীমদের বাড়ির গলিতে গেট নেই। মূল বাড়িতে যাওয়ার গেট আছে। যদিও তাতে অসুবিধে নেই। ও চাল টপকে যেতে পারে।
সবার যেতে যেতে ছটা বাজলো। জানুয়ারি মাস, বেশ শীত পড়েছে। অসীম কালো সোয়েটার , ব্যায়াম করার কালো প্যান্ট, নীল উলের গ্লাভস, আর কালো হনুমান টুপি পরল। আর মুখ ঢেকে নিলো কালো স্কার্ট রুমালে। ঠিক ছটা চল্লিশে রেডিও চালিয়ে, ঘরের লাইট জ্বালিয়ে ও বাড়ির চাল বেয়ে ওই তিনবাড়ির জয়েন্ট পাঁচিলের ঝোপ মার্কা জায়গায় ঝোপের মধ্যে ডুবে গেল। যা ভেবেছে তাই। ওখানে কোনো বাসাই নেই, টিয়া তো দূরের কথা। এখন অপেক্ষা ওরা কখন আসে। অসীম যেখানে বসে আছে, সেখান থেকে দেখলো পশুমামার ছোটমেয়ে টুকাইদি ওদের বাথরুমে ঢুকলো স্নান করতে। ঠিক তখনই লোডশেডিং। সারা পাড়া অন্ধকারে ডুবে গেল।
এমন সময় পাঁচিলের ওদিকে তিন্নিপিসীদের বাড়ির গলিতে শোনা গেলো বাপির গলা: "নে! উঠে পড় সোমু! আমরা আছি।" বুবাইয়ের গলা ভেসে এলো, "অসীমকে ডাক না।" বাপির উত্তর: "ছেড়ে দে। ও রেডিও শুনছে।"
অসীম দেখলো অন্ধকারে একটা রোগা, বেঁটে ছায়ামূর্তি পাঁচিল ধরে ব্যালেন্স করতে করতে হেঁটে আসছে। ও বুঝলো ওটা সোমু।
মূর্তিটা যখন ওর খুব কাছে, এক হাতের মধ্যে, তখনই ও খোনা গলায় বললো, "এঁই, কেঁ রেঁ? হুঁহ!" সোমু "বাবাগো" বলে মারলো এক লাফ, ঝোপ টপকে অসীমের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়লো পশুমামাদের বাথরুমের অ্যাসবেস্টসের ওপর। সেটা ভেঙে ঢুকে গেল সোমু। তখনও ধরে আছে গাছ-ঝোপঝাড়ের পাতা-ডাল। ঝুলন্ত অবস্থায় ও যখন ওঠার চেষ্টা করছে, তখন টুকাইদি আতঙ্কে একটা চিৎকার দিলো -- আর তখনই এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য বিদ্যুৎ এসে আবার অন্ধকার। একদিকে টুকাইদির চিৎকার, অন্যদিকে সোমুর হাঁচড়-পাঁচড় করে উঠে আসা দেখে অসীম ঝাঁপ দিলো কেলোকাকুর বাড়িতে। সোমুও তাই।
তারপর দুজনেই কেলোকাকুদের বাড়ির পেছনের পাঁচিলের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। অসীম সুনীলদার কায়দায় পাঁচিল টপকালো, সোমু যথারীতি হাঁচড়িয়ে-পাঁচড়িয়ে টপকালো। টপকিয়েই রাস্তা। রাস্তার ওপারে ঘেরা মাঠ। ওখানে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। ঐ মাঠ ঘেরা হলেও দুদিকের দরজাই ভাঙা। সোমু দরজার দিকে দৌড়চ্ছে, অসীম পাঁচিলের দিকে। লক্ষ্য; মাঠে ঢুকেই কোনাকুনি গিয়ে রিক্তার পিসির বাড়ি ঢুকবে পাঁচিল টপকে। পিছনে পড়ে আছে টুকাইদির চিৎকার, কেলোকাকাদের বাড়িতে 'কে? কে?' চিৎকার, ফেলুমামার 'কী হলো? কী হলো?', সবকিছু। সোমু দরজা দিয়ে ঢুকছে মাঠে, অসীম প্রায় পাঁচিলের কাছে, এমন সময় পোড়াবাগানের দিক থেকে, মানে ঐ রাস্তার দক্ষিণ দিক থেকে আওয়াজ এলো: 'চোর! চোর!' আবছা অন্ধকারে অসীম দেখলো কালো পোষাক ঢাকা এক লম্বা ছায়ামূর্তি ঘেরামাঠের পাঁচিল টপকাচ্ছে। অসীম পাঁচিল টপকালো সুনীলদার কায়দায়। এবং তখনই ওর মনে হলো ঐ ছায়ামূর্তিটাও একইভাবে পাঁচিল টপকালো! অসীম কিছু না ভেবে কোনাকুনি দৌড়াচ্ছে, সোমু উল্টোদিকের গেট দিয়ে প্রায় বেরিয়ে গেছে। ছায়ামূর্তিটা লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘেরামাঠের পাঁচিল টপকালো অসীমের আগে এবং অসীম টপকানো দেখে নিশ্চিত হলো, 'হ্যাঁ, হুবহু ওই পদ্ধতি! যাই হোক, কিছু না ভেবে ও রিক্তার পিসির বাড়ির পাঁচিলটা টপকালো।
*****
চারিদিক শুনশান! বাইরের কোনো শব্দ আসছে না। অন্ধকারে চোখ সয়ে না গেলে অসীম কিছু দেখতে পেত না। পা টিপে টিপে হাঁটছিলো অসীম। শুকনো পাতায় যাতে শব্দ না হয়। বাড়ির জানলাটায়(নীচের ঘরের) গারদ নেই। ভেতরে টেবিলে একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। জানলার পাশে অর্ধেক পিঠ জানলার দিকে করে কে যেন বসে। হ্যারিকেনের আলোয় মনে হলো অভিষিক্তা। আর বাঁ দিকের সোফায় বসে রিক্তা। অসীম দেখলো এই সুযোগ। নীল গ্লাভস পরা হাতটা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে বলে উঠলো, "হুঁহুঁহুঁহুঁহুঁ।" বিকট একটা চিৎকার করে বাঁদিকের সোফায় বসে থাকা মেয়েটা ঢলে পড়লো। আর জানলার দিকে পিঠ করে বসে মেয়েটা হাতটা জোরে চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে অসীম বুঝলো অন্ধকারে গন্ডগোল হয়ে গেছে। পিঠ জানলার দিকে করে বসে ছিলো রিক্তা। আর বাঁদিকের সোফায় ছিল অভিষিক্তা। রঙ নাম্বার হয়ে গেছে বুঝতে পেরে ও হাতটা ঝটকা মেরে টেনে নিলো।
হাত টেনে নিয়ে জানলা থেকে সরে এলো অসীম। ততক্ষনে রিক্তা গারদহীন জানলা টপকে বাইরে এসে গেছে। অসীম পেছন ফিরে মার দৌড়! আর পাঁচিল ডিঙ্গালো সুনীলদার কায়দায়। ঘেরামাঠে পড়তে পড়তে শুনলো সেই ঝাউতলার দিক থেকে আওয়াজ আসছে: 'চোর! চোর!'
*****
ওদিকে রিক্তা দেখলো একটা কালো পোশাকের বাচ্চা ছেলে পুরো সুনীলদার শেখানো কায়দায় পাঁচিল টপকালো। ও তো অবাক! এটা তো অসীম ছাড়া আর কারুর জানার কথা নয়। ততক্ষনে পিসেমশাই আর দাদারা এসে গেছে। পাশের বাড়ির মোটা সঞ্জু এসেছে। পিসেমশাই বললেন, "কোথায়? কী হয়েছে?" সঞ্জু বললো, "সেই ছোট চোরটা! আমি তিনটে চোরকে মাঠ দিয়ে ছুটতে দেখেছি! একটা এই বাড়িতে ঢুকেছিলো নির্ঘাত! দুটো ছোট, একটা বড়।" "খোঁজ, খোঁজ শিগগির", বড় দাদা বললো, "হ্যাঁ রে, তুই মুখ দেখেছিস?" রিক্তা মাথা নাড়লো, "না। মুখ ঢাকা ছিলো। তবে বড় ছেলে নয়।"
পিসি জানলা দিয়ে বললেন, "শিগগির এসো, অভির জ্ঞান ফিরেছে।" "এই আর এক মেয়ে -- এটা তো ভয়ে ই মরলো", পিসেমশাই বললেন।
অভিষিক্তা বললো, "বাবা গো, একটা কালো হাত ঐ জানলা দিয়ে ঢুকেছিল। তারপর আমি আর কিছু জানিনা।" রিক্তা বললো, "আমি চেপে ধরেছিলাম, ছাড়িয়ে নিলো ঝটকা মেরে।"
মোটা সঞ্জু বলেছিলো, "ইস, ধরে রাখতে পারলি না? বোকা মেয়ে।" সঞ্জুর বাবা বললেন, "আর তুমি কত সাহসী! যখন দেখলি তিনটে চোরই দৌড়চ্ছে ঘেরামাঠ দিয়ে! চিৎকার করলি না কেন?" সঞ্জু বললো, "বুঝবো কী করে ওরা চোর?"
"না! বুঝবো কী করে? বুদ্ধির ঢেঁকি। পোড়াবাগান থেকে আওয়াজ এলো না?" সঞ্জুর বাবা বললেন।
হঠাৎ কিসের একটা হইচই, পিসি বললো, "ক্লাবের মাঠ থেকে আসছে না? চল রিকু! গিয়ে দেখি।" রিক্তা বললো, "চলো পিসি।"
*****
ওদিকে অসীম পোড়া মাঠ টপকে, কেলোকাকুর বাড়ির পাঁচিল বেয়ে, নিজের বাড়ির চাল বেয়ে যখন ঘরে ঢুকলো, তখন ওকে কেউ দেখতে পায়নি। সবাই তখন ক্লাবের মাঠ, মানে ওদের বাড়ির সামনে মন্দিরের মাঠে জটলা করছে। প্রায় ১৫০-২০০ লোক। তখন 'ফৌজি ভাইয়োঁ কে লিয়ে জয়মালা' শুরু হয়েছে। সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়েছে, মানে পাঁচিলে গিয়ে বসা থেকে পঁচিশ মিনিটে এত সব হয়ে গেছে। অসীম সোয়েটার, প্যান্ট, মোজা, গ্লাভস, রুমাল, টুপি খুলে জায়গামত রাখলো। কমিকসের বই আর ক্যারম তুললো খাটে। জয়মালায় সেদিনের অ্যাঙ্কর রাজা মুরাদ তার জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলছিলো, 'ফৌজি ভাইয়োঁ! অগর ম্যায় ফিল্মোঁ মে নহী হোতা, তো বশরতীয়াঁ আপকি তরহ এক ফৌজি হোতা!'
যাই হোক, এসব করে ও যখন একটু ধাতস্থ, তখন সাতটা দশে দেখে ওর মা জানলা দিয়ে বলছে, "তুই কী করছিস!" অসীমের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো।
"এই তো, রেডিও শুনছি।"
মা বললো, "আমি যাচ্ছি, দরজা খোল!" এমন সময় আলো চলে এলো।
*****
মা এসে বলল, "সারা পাড়ায় চোর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পোড়াবাগান, ঘেরামাঠ, নবপল্লী, ঝাউতলা -- সব জায়গায়। হ্যাঁ রে, তুই ভয় পাসনি?"
"দূর, আমি তো হ্যারিকেন জ্বালালাম --" বুদ্ধি করে এসেই অসীম ওটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। "চলোতো বাইরে, দেখি, কী হয়েছে।"
বাইরে দেখে মাঠ আর রাস্তায় বিরাট ভীড়। লোক থিকথিক করছে। রিক্তা আর ওর পিসিও আছে। অসীম এগিয়ে গিয়ে বললো, "কখন এলি?" রিক্তা খুব সন্দেহের চোখে ওর দিকে দেখে বললো, "বিকেলে! তুই কোথায় ছিলি এতক্ষন!"
"ঘরে দরজা আটকে বসেছিলাম। সবাই মামার বাড়ি গেছে।"
"তুই যাসনি?"
"না। তুই এলে ক্যারম খেলবো বলে। আগে রেডিও শুনছিলাম। স্পেশ্যাল জয়মালা।" ফিক করে হেসে বললো অসীম।
হঠাৎ সোমুর উত্তেজিত গলা, "আর আমি সাইকেলের টায়ারটা মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিলাম ঘেরামাঠের দিকে, হঠাৎ দেখি একটা লম্বা লোক পাঁচিল টপকে নবপল্লীর দিকে চলে গেল কাঠগুদামের মাঠ টপকে।"
সোমুর মা সপাটে মারলেন এক চড়, "রাতের বেলা পড়া ফেলে টায়ার চালানো?"
সোমু গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, "আরে লোডশেডিং ছিল তো!" আবার চড়। "কেন? হ্যারিকেন ছিল না?" "আহাহা, মারছো কেন ছেলেটাকে?" কাকু বললো, "এই তো, বিশুদার বাড়িতেও চোর পড়েছিলো।" পাশ থেকে মোটা সঞ্জু বলে উঠলো -- "চোর একটা না, তিনটে! একটা বড়, দুটো ছোট।" অসীম তো হাঁ। বলে কী? রিক্তা ওর দিকে তাকালো। ও-ও দেখলো। কিছু বললো না। সবাই অবাক। "অ্যাঁ!বলিস কী?" বলে উঠলো পালদাদু। উনি সবকথাতেই বলেন 'বলিস কী?' অসীম একবার ভয় পেয়ে গেছিল: 'সে কী! কী বলে ফেললাম আবার!'
সঞ্জু বললো, "তাই বলছি! আমি ঘরে পড়ছিলাম। লোডশেডিং হলো। ছাতের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনলাম পোড়াবাগান থেকে চোর চোর আওয়াজ। ছাতে উঠে ঘেরামাঠের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে চোর মাঠে দৌড়চ্ছে। একটা ছোট চোর দরজা দিয়ে বেরোলো(অসীম বুঝলো, ওটা সোমু), আর একটা চোর কোণের দিকে চলে গেলো, পরে জানা গেল সেটা নিনিকাকিমার বাড়ি ঢুকেছিল(অসীম বুঝলো ওটা ও নিজে), আর একটা পাঁচিল ডিঙিয়ে ঝাউতলার দিকে গেলো।"
"ওকেই আমি দেখেছিলাম", সোমু বললো। অসীম ভাবছে ভাগ্য ভালো মোটাটা অন্ধকারে চিনতে পারেনি। নাহলে --
নিনিকাকিমা, মানে রিক্তার পিসি বললো, "আর আমার বাড়িতে যেটা ঢুকেছিল, সেটা তো জানলা দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল। আমার বড় ভাইঝিটা তো অজ্ঞানই হয়ে গেলো। এখন যা হোক, জ্ঞান ফিরেছে। আর ছোটটা হাতটা চেপে ধরেছিলো। কিন্তু চোরটা পালিয়ে গেলো।
"তোর কী সাহস!" -- "ঐটুকু মেয়ে!" -- "বলিস কী?" -- "এ তো বীরাঙ্গনা!" -- "ঝাঁসির রানী!" -- পাশ থেকে মিঠিদিদি বললো, "তুই তো প্রীতিলতা হবি! কাল বাড়ি আসিস। বই গিফট দেবো।"
পশুমামা বললো, "নাঃ! কালই থানায় একটা জয়েন্ট পিটিশন দিতে হবে। ক্লাবে মিটিং ডাকো!"
যাই হোক, আস্তে আস্তে সব ফাঁকা হতে শুরু করলো।
নিনিকাকিমা বললো, "এই রিকু, তুই অসীমের বাড়ি চলে যা। ওর মামার বাড়ি নেমন্তন্ন। যাওয়ার সময় দুজনকেই নিয়ে নেবো।" অসীমের মা বললো, "ভালোই হলো! অসীমও তাই বলছিল। যা, দুজনে ক্যারম খেল।"
সোমু-বাবাইরা বললো, "চল চল! অসীম? রিকু? কিছু কথা আছে।"
*****
অসীম বললো, "শোন, কাল কখনই মিঠিদিদির বাড়ি যাবি না। গেলেই অমুক প্রসঙ্গে… তমুক প্রসঙ্গে… কেন ওদের দল একমাত্র… এইসব বই ধরাবে! আর গুচ্ছ জ্ঞান! হাওড়ার কলেজটায় পড়ে আর কী সব ইউনিয়ন করে!" তুলো বললো, "হ্যাঁ ভাই! সেদিন আমার দিদিকে ধরে জিজ্ঞাসা করে, 'বলতো, গতি বস্তুর ভেতরে না বাইরে থাকে?' আমার দিদি তো হাঁ। বল দেখি, ও ইলেভেনে পড়ে। এসব ও জানবে কি করে জানবে?"
রিক্তা বললো, "তাও ভালো! আমাদের পাড়ায় বাবানদাকে চিনিস তো! সে আর এক পাগল -- দেখা হলেই 'বোকা বুড়ো-চালাক বুড়ো-পাহাড়ের' গানটা শোনাবে -- সেদিন দেখি ঘরের মধ্যে একা চেঁচাচ্ছে 'এক হি রাস্তা -- এক হি রাস্তা' করে! যত্তোসব!"
সোমু বললো, "বাদ দে! ভাই আমি আজ বেঁচে গেছি! অসীম বললো, "মানে?"
"আরে, মোটা সঞ্জুও ঠিকই দেখেছে! আমি, আর একটা ছোট চোর আর বড় চোরটা ঘেরামাঠ দিয়ে দৌড়োচ্ছিলাম। কিন্তু তিনটে নয়, চোর আসলে দুটো! আমি বলিনি, বললে মা মারতো! আমি তোদের পাঁচিলে উঠেছিলাম! ছোট চোরটা তোদের ঐ পাঁচিলে বসে ছিল।"
অসীম বললো, "বুঝলাম! খুব জোর বেঁচে গেছিস! এখন বাড়ি যা! যা চোরের উৎপাত, আবার না ঢুকে পড়ে।"
ওরা সব বেরিয়ে গেলো অসীমদের গলি থেকে। অসীম আর রিক্তা ঢুকলো অসীমদের ঘরে। রেডিওটা তখনও চলছে। অসীম যাওয়ার সময় বন্ধ করতে ভুলে গেছিলো। জয়মালা শেষ। তখন কী একটা প্রোগ্রামে গান হচ্ছে:
মো সে ছল কিয়ে হ্যায়
হায় রে হায় হায়!
দেখো! সইয়াঁ বেঈমান।
*****
"কী খেলবি? বোর্ড গেম না কলাগাছ?" জিজ্ঞাসা করলো অসীম। রিক্তা অন্যমনস্কভাবে বললো, "বোর্ড গেম।" তারপর মুখ ঘুরিয়ে অসীমকে জিজ্ঞাসা করলো -- "হ্যাঁ রে? তোর গ্লাভস দুটো কই?" "কোন গ্লাভস?" অসীমের মুখ শুকিয়ে গেলো, বুক ঢিপঢিপ করছে। "নীল রঙের উলের গ্লাভস", রিক্তা বললো। "কোনটা?" অসীমের ডিম আটকে এসেছে। রিক্তা ঝট করে ওর দিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো, "যেটা পরে খানিক আগে জানলা দিয়ে হাত গলিয়েছিলি।" অসীম দরদর করে ঘামছে। কোনোরকমে ঢোঁক গিলে বললো, "ওঃ! তুই বুঝে গেছিস? ওই তো আলনায় রেখেছি। যেখানে ছিল সেখানেই!"
রিক্তা বললো, "তুই কী ভাবলি? বুঝবোনা? আরে বাবা এই বিখ্যাত ভল্ট খাওয়া এই অঞ্চলে তুই আর সুনীলদা ছাড়া কেউ পারে! এবার বল তো, ব্যাপারটা কী?"
অসীম সব স্বীকার করে তার পরে বললো, "তোর মুখে অভিষিক্তার ভয় খাওয়ার কথা, মানে 'হাওয়া লাগা' শুনেই মাথায় আসে বুদ্ধিটা! ওকে ভয় দেখাতে হবে। কিন্তু কিছুতেই প্ল্যানটা ছকতে পারছিলাম না। তারপর দুপুরে যখন বাবাই-সোমুরা বললো এই ঘরের পিছনের পাঁচিলে উঠবে তখন ধান্দা করলাম চোরের উপদ্রবের সুযোগ নিয়ে ওদের ভয় দেখিয়ে তোর পিসির বাড়ি গিয়ে অভিষিক্তাকে ভয় দেখাবো। তা সোমুর ওই বাথরুমে ঢুকে যাওয়ার জন্য একটু বেশি হইচই ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। শুধু তোকে অভিষিক্তা ভেবেছিলাম।" ফিক করে হাসলো অসীম।
রিক্তা বললো, "আমায় প্ল্যানে নিলে আরও পাকাপোক্ত কাজ হতো। তা নয়! ধরা পড়লে তোর কী হতো বল তো! আর ঐ তিনটে চোর?"
"বুঝতেই পারছিস ছোটদুটো আমি আর সোমু! কিন্তু বড়টা?"
"বড়টা নিশ্চয়ই আসল চোর --"
"জানিনা। কিন্তু --"
"কিন্তু কী?"
"আরে তুই যেমন আমায় ভল্ট খেতে দেখে চিনেছিস, তেমন আমিও তো ওই চোরকে একই ভল্ট খেতে দেখেছি!"
"অ্যাঁ! তার মানে --"
"জানিনা! কিন্তু সুনীলদা --"
"ধুৎ! সুনীলদা চোর হবে কেন?"
"শোন। আজ অবধি কী কিছু চুরি হয়েছে?"
"না। তা হয়নি --"
"তবে? তিনটে অন্য ব্যাপার হতে পারে। এক, অন্য কিছুর থেকে নজর ঘোরাতে এই কাজ; দুই, নিছক শয়তানি, পাগলামি; তিন, দুষ্টুমি।"
"তিন নম্বরটা বাদ দে। সুনীলদা দুষ্টুমি করবে না।"
"রইলো বাকি দুটো। প্রথমটা হলে সাংঘাতিক, দ্বিতীয়টা হলে অন্য ব্যাপার।"
"হ্যাঁ কিন্তু এ সবই হবে, যদি ঐ লোকটা সুনীলদা হয়।"
"হ্যাঁ। অন্য কেউ হলে অন্য কথা। শোন রিক্তা, তুই আজ বাড়ি যাস না। পিসির বাড়ি থেকে যা। সকালে সুনীলদার বাড়ি যাবো!"
"গিয়ে কী বলবি?"
"যা বলার আমি বলবো। তুই কিছু বলবি না। মনে রাখবি যদি সুনীলদাই আমাদের লোক হয়, তাহলে শুধুমাত্র চার্জ নয়, মেন্টাল-সাইকোলজিক্যাল চাপ দিতে হবে। ওর ঘরে বসে দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে ওকে ধরে ফেলছে, এতে ও ডেঞ্জারাস হয়ে যেতে পারে। দেখা যাক।"
রিক্তা খানিক চুপ থেকে বললো, "ঠিক আছে! কিন্তু তুই বেশি ভাও দেখাস না! সাইকোলজিক্যাল বানান বলতো!"
"তুই আমার বিদ্যে যাচাই করবি না খেলবি?"
দুজন খেলায় মেতে ওঠে। রেডিওয় তখন চলছে অন্য গান:
ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম
তোমায় তা দিলাম।
*****
পরদিন রবিবার! সকালে সুপারবয়, ব্যাটম্যান, জাঙ্গল বুক, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, টেলস্পিন, ডাক টেলস দেখতে দেখতে দুপুর বারোটা। তারপর খেয়ে দেয়ে উঠে একটু শুয়ে বিকেল চারটের সময় রিক্তা এলো। বললো, "যাবি সুনীলদার বাড়ি? সকালে যাওয়া হলো না।"
অসীম বললো, "চল! আজ হারানো সুর দিয়েছে। গানগুলো ভালো, কিন্তু সিনেমাটা আমি দেখবো না। চল, যাওয়া যাক।"
দুজন মিলে এসে দেখলো, সুনীলদা তখন উত্থিত পদ্মাসন করছে। বললো, "কী রে, তোরা? এই সময়ে?"
অসীম কোনো ভণিতা না করেই বললো, "জানো সুনীলদা! কালও চোর এসেছিলো!"
"হুঁ। কী যে হচ্ছে!" অন্যমনস্কভাবে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সুনীল বললো।
"আমি দেখেছি", অসীম বললো।
"কী দেখেছিস?" মাথা ঘুরিয়ে সুনীল জিজ্ঞাসা করলো।
"চোরটাকে পাঁচিল ডিঙাতে।"
সুনীল চমকে উঠে বললো, "মানে?"
রিক্তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই সেও চরম টেনশনে।
অসীম ঠান্ডা গলায় বললো, "ঠিক আমাদের মতো।" সুনীল অস্বস্তি মেশানো গলায় ওদের দিকে না তাকিয়ে বললো, "আমাদের মতো মানে?"
"মানে আমরা যেভাবে পাঁচিল ডিঙাই। মানে তুমি যেভাবে আমায় শিখিয়েছো।"
সুনীল জানলা দিয়ে কাঠগুদামের মাঠের দিকে তাকিয়ে বললো, "তাতে কী হয়েছে?"
অসীম রিক্তার হাত ধরে বললো, "সেটা তুমিই ভালো বলতে পারবে কী হয়েছে। চল, বাড়ি যাই! হারানো সুরের গানগুলো বেশ ভালো।"
সুনীল মাথা ঘুরিয়ে দেখলো ওরা দুজন বেরিয়ে যাচ্ছে।
*****
পরেরদিন সকাল। অসীম সুনীলের বাড়ি ঢুকতে গিয়ে দেখলো রিক্তাও আসছে। বললো, "কী রে? অভিষিক্তা?" রিক্তা ফিক করে হেসে বললো, "এখনও ধাক্কাটা সামলাতেই পারেনি।"
সুনীলের মা ওদের গলা শুনে বেরিয়ে এসে বললেন, "এই তো তোরা! সুনীল তো সেই কাল রাতে হাওড়া চলে গেছে দিদি-জামাইবাবুর কাছে! ওখান থেকে আজ ট্রেন ধরে জামশেদপুর যাবে! একটা চাকরি জোগাড় করে দিয়েছে ওর জামাইবাবু। অনেকদিনই কথা হচ্ছিলো। কাল নটা নাগাদ ওরা এসে সুনীলকে নিয়ে গেলো। দাঁড়া। তোদের জন্য একটা চিঠি খামে করে রেখে গেছে।" বলে তিনি ভেতরে গেলেন।
রিক্তা আর অসীম তো হাঁ। অসীম বললো, "যাহ! পাখি ফুড়ুৎ।" রিক্তা বললো, "তুই এখনও নিশ্চিত! সুনীলদাই…"
"তুই এখনও নিশ্চিত নোস?"
বলতে বলতে সুনীলের মা চিঠিটা দিয়ে বললেন, "ঘরে বোস! কিছু খেয়ে যা।"
ওরা বসলো ঘরে। উনি খাবার আনতে গেলেন। ওরা চিঠিটা পড়তে লাগলো:
খুদে হোমস আর মিস মার্পল,
বড় বাড়াবাড়ি করে ফেললি। তবে প্রফেসর মরিয়ার্টিকে ধরা অত সহজ নয়। এরপর কিন্তু সেবাস্টিয়ান মোরানও আসবে! সাবধান।
শুভেচ্ছাসহ,
প্রফেসর জেমস মরিয়ার্টি
"বোঝো কান্ড!" অসীম বললো।
"এ তো হুমকি! কিন্তু কারণটা কী?" রিক্তা বললো।
"দুই আর তিন নম্বর বাদ। রইলো বাকি এক।" অসীম হেসে বললো।
এমন সময় সুনীলদার মা ওদের জন্য জয়নগরের মোয়া এনে দিলেন। বললেন, "কী লিখেছে রে?"
"ওই… আবার সুনীলদা ফিরবে…সাথে বন্ধুরাও থাকবে।"
"তাই! দেখলি তোদের কত ভালোবাসে! খালি বলে তোদের কথা!"
"জেঠিমা, একটা পাতা আর একটা পেন দেবে? খাম হলে ভালো হয়।"
"সেসব আছে। দিচ্ছি।"
"তুই কী রে!" রিক্তা বললো, "সবই চাইলি!"
"দেখ না!" অসীম বললো। সুনীলের মা একটা পেন, একটা পাতা, একটা খাম এনে দিয়ে "এই নে" বলে চলেন।
অসীম চিঠি লিখে মুখ বন্ধ করে খামটা জেঠিমার হাতে দিয়ে রিক্তার সাথে বেরিয়ে এলো। রিক্তা বললো, "কী লিখলি, একবার দেখালিও না। ক্লাসের পরীক্ষা দিচ্ছিলি নাকি?"
অসীম বললো, "না রে। লিখলাম:
ব্যায়ামবীর,
প্রাচ্যের সেরা বন্দুকবাজের ঠাঁই হয়েছিলো জেলে আর প্রফেসরকে রাইখেনবাখের তলায় শুতে হয়েছিলো। এসব চেষ্টা করবেন না।
ভবদীয়,
অ.ঘো. ও রি.ম.
"মানে?" রিক্তা বললো।
"মানে ও আমাদের হোমস বা মার্পল বললেও আমরা তো তা নিজেদের বলতে পারি না। তাই অসীম ঘোষাল আর রিক্তা মজুমদারই লিখলাম।"
"না না, ওই প্রফেসর আর বন্দুকবাজ কে? সুনীলদার ওই দুটো সাহেবই বা কে?
"যাহ কেলো। তুই শার্লক হোমস পড়িসনি?"
"না তো!"
"ধুস। বাড়ি যা। আগে পড়।"
"বল না! বল না!" রিক্তা অসীমের ঘাড়, মাথার চুল টানতে লাগলো। অসীম ছুটতে লাগলো…রিক্তাও… পাশের বাড়ি থেকে ঝুমার গলা ভেসে আসছে:
তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করো, মলিন মর্ম মুছায়ে।