আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা আজ নিজ দেশে পরবাসী হয়ে উঠছি। যেখানে মাতৃভাষায় কথা বলাটাই হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে গর্বের বিষয়, সেখানে আজ বাংলার শুদ্ধ রূপ যেন এক কৌতুকের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন গর্বভরে বলি যে আমাদের সন্তান বাংলা জানে না, তখন আমাদের কণ্ঠে এক ধরণের কৃত্রিম অহংকার খেলে যায়। এই যে হীনম্মন্যতা, এই যে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার হীন প্রচেষ্টা—এটি কি আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? এই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে মায়েরা তাদের সন্তানদের বিদায় দিয়েছিলেন রাজপথে, তাদের সেই নীরব চোখের জল আজ আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে
মাতৃভাষার আর্তনাদ : অবক্ষয়ের করাল গ্রাস ও আমাদের অন্তিম দায়বদ্ধতা
গৌতম হালদার
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রথম অংশ
রক্তস্নাত ইতিহাস ও বর্তমানের নির্লজ্জ ঔদাসীন্য
বাহান্নর সেই তপ্ত দুপুরের রাজপথ যখন রফিক,শফিক, জব্বার আর বরকতদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তখন কি তারা একবারের জন্যও ভেবেছিলেন যে, সাত দশক পরে তাদের উত্তরসূরিরা সেই ভাষাকেই অবজ্ঞার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে?
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ পাতা, রঙিন পাঞ্জাবি, সাদা শাড়ি আর আল্পনা আঁকা বেদীতে কিছু পুষ্পস্তবক অর্পণ—ব্যাস, দায়বদ্ধতা এটুকুই। কিন্তু যে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া হলো, সেই ভাষার শুদ্ধতা আজ কোথায়? আমাদের দৈনন্দিন যাপনে, আমাদের সংলাপে, আমাদের মননে আজ মাতৃভাষা এক অবহেলিত বিমাতা। আমরা তথাকথিত আভিজাত্য প্রদর্শনের নেশায় নিজেদের ভাষাকেই বিকৃত করতে দ্বিধাবোধ করছি না। ইংরেজি আর বাংলার এক কদর্য সংমিশ্রণ তৈরি করে আমরা যে 'বাংরেজি' সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছি, তা আমাদের মেরুদণ্ডহীনতারই নামান্তর। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টেলিভিশন পর্দা—সর্বত্রই ভাষার এই অপপ্রয়োগ এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। আমরা ভুলে গেছি যে, একটি জাতির মৃত্যু হয় তখন, যখন তার ভাষা তার আপন মহিমা হারিয়ে ফেলে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আমরা কি আদৌ আমাদের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি? আমাদের সন্তানদের আমরা যে শিক্ষা দিচ্ছি, সেখানে বাংলা ভাষা কতটুকু স্থান পাচ্ছে? ইংরেজি মাধ্যম বা বিদেশি ভাষার মোহে অন্ধ হয়ে আমরা আমাদের শাশ্বত সাহিত্য, আমাদের ঐতিহ্যবাহী শব্দভাণ্ডারকে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছি। যে ভাষা পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যা অর্জিত হয়েছে রক্তের বিনিময়ে, সেই ভাষার বানান ভুল করা কিংবা অশুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা এখন যেন এক ধরণের আধুনিকতা। এই আধুনিকতা আসলে এক ধরণের মানসিক দাসত্ব। আমরা আজ আধুনিক হতে গিয়ে নিজেদের শেকড় ছিঁড়ে ফেলছি। এই চরম ঔদাসীন্য আর বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আমাদের ভাষাকে এক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি আজ আমরা সোচ্চার না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের পরিচয় সংকটের সেই কালো মেঘ ঘনীভূত হবে, যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা আজ নিজ দেশে পরবাসী হয়ে উঠছি। যেখানে মাতৃভাষায় কথা বলাটাই হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে গর্বের বিষয়, সেখানে আজ বাংলার শুদ্ধ রূপ যেন এক কৌতুকের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন গর্বভরে বলি যে আমাদের সন্তান বাংলা জানে না, তখন আমাদের কণ্ঠে এক ধরণের কৃত্রিম অহংকার খেলে যায়। এই যে হীনম্মন্যতা, এই যে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার হীন প্রচেষ্টা—এটি কি আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? এই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে মায়েরা তাদের সন্তানদের বিদায় দিয়েছিলেন রাজপথে, তাদের সেই নীরব চোখের জল আজ আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে। আমরা আজ সেই অভিশপ্ত প্রজন্মের অংশ যারা ভাষার মূল্য দিতে জানে না। সাংস্কৃতিক আকাশ যখন অপসংস্কৃতির মেঘে ঢাকা পড়ে যায়, তখন ভাষাই হয় প্রথম শিকার। আর আমরা আজ সেই শিকারীর সাথে হাত মিলিয়েছি। একুশের প্রভাতফেরিতে যখন আমরা খালি পায়ে হাঁটি, তখন কি মাটির স্পর্শে আমাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে? নাকি ওটা কেবল একটা প্রথা মাত্র? আমাদের ভাষার যে লালিত্য, যে মাধুর্য—তা আজ অযত্ন আর অবহেলায় ধূসর হয়ে গেছে। আমরা বিদেশি সাহিত্যের তর্জমা পড়ে রোমাঞ্চিত হই, অথচ আমাদের নিজেদের মহাকাব্যগুলো ধুলো জমছে লাইব্রেরির কোণে। এই বৌদ্ধিক দেউলিয়াপনা আমাদের জাতি হিসেবে কতটুকু নিচে নামিয়ে আনবে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? ভাষা বাঁচাও আন্দোলন কেবল রাজপথের শ্লোগান নয়, এটি হওয়া উচিত প্রতিটি ঘরের প্রার্থনা। প্রতিটি মা যখন তার সন্তানকে প্রথম শব্দ শেখান, সেখানেই লুকিয়ে থাকে ভাষার ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই মা-ই যদি আজ বিজাতীয় সুরের মোহে আচ্ছন্ন হন, তবে ভাষার মৃত্যু অনিবার্য। এই মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমরা আজ কোন উত্তরণের পথ খুঁজব? সময়ের চলমান স্রোতে গা ভাসানো সহজ, কিন্তু সেই স্রোত আজ আমাদের এক অতল অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে কোনো নিজস্বতা নেই, নেই কোনো গর্বের ইতিহাস। আমাদের চারপাশের বিজ্ঞাপনী বোর্ড থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের নথিপত্র—সবখানেই বাংলার প্রতি এক চরম অবজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট। শব্দের ভুল প্রয়োগ, ব্যাকরণগত ত্রুটি আর বিজাতীয় ঢঙে কথা বলার প্রবণতা আমাদের এই পবিত্র ভাষার আত্মাকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করছে। একুশের প্রভাতফেরিতে বর্ণমালার যে মিছিল আমরা দেখি, তা কি কেবল প্রদর্শনী? আমাদের মজ্জায় মজ্জায় আজ বিজাতীয় করাল থাবা বসেছে। আমরা নিজের ঐতিহ্যকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শিখেছি। যে ভাষা বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের হাত ধরে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দখল করেছিল, সেই ভাষাকেই আজ আমরা কলুষিত করছি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। এই উদাসীনতা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে শুদ্ধ বাংলার জন্য আমাদের দ্বিতীয়বার লড়াই করতে হবে। বায়ান্নর রক্ত আমাদের কাছে কেবল ঋণ নয়, এটি একটি আমানত। আর আমরা আজ সেই আমানত খিয়ানতকারী এক অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত হয়েছি। এই আর্তনাদ যেন কেবল অরণ্যে রোদন না হয়, এটি যেন হয় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক সুতীব্র ভূমিকম্পের সূচনা।
দ্বিতীয় অংশ
রাজনীতির পঙ্কিল আবর্ত ও আঞ্চলিকতার বিষবাষ্পে দগ্ধ মাতৃভাষা
মাতৃভাষার অবমাননার ইতিহাসে সবচেয়ে নক্কারজনক, বীভৎস ও কলঙ্কিত অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে আমাদের বর্তমান রাজনীতির পঙ্কিল আবর্তে। এটি কেবল একটি ভাষাগত ত্রুটি নয়,বরং একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক পতন।
আমরা যখন বাহান্নর আন্দোলনের কথা বলি,তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক চেতনা, যেখানে প্রতিটি নেতার বাক্য ছিল বাঙালির অস্তিত্বের ইশতেহার। কিন্তু বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিপক্ষকে হীনবল করার এক কর্দমাক্ত হাতিয়ার। এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের ছত্রছায়ায় লালিত উগ্র কর্মীবাহিনী আজ জনসভার মঞ্চ থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দা পর্যন্ত ভাষাকে যে স্তরে নামিয়ে এনেছেন, তা ভাবলে মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। নেতাদের মুখ থেকে যখন শুদ্ধ বাংলা শব্দের পরিবর্তে অশালীন গালিগালাজ, সস্তা চটুল স্লোগান আর কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত প্রকাশিত হয়, তখন সেই ভাষার আত্মা ডুকরে কেঁদে ওঠে। এই রাজনৈতিক অবক্ষয় আমাদের সমাজকে এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ, যারা তাঁদের নেতাদের আদর্শ মনে করে অন্ধভাবে অনুসরণ করেন, তারা যখন দেখেন যে ক্ষমতার দাপটে থাকা ব্যক্তিরা অমার্জিত এবং বিকৃত ভাষায় কথা বলেও প্রবল বাহবা পাচ্ছেন, তখন তাঁরাও সেই কদর্যতাকে 'আধুনিকতা' বা 'বীরত্ব' বলে ভ্রম করেন। রাজনীতির মঞ্চে আজ শব্দের গাম্ভীর্য হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে চূড়ান্ত পেশিশক্তির আস্ফালন। জনসভার মাইকে যখন কোনো নেতা অত্যন্ত নিম্নরুচির শব্দ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেন, তখন তিনি কেবল নিজের পরিচয় দেন না, বরং কোটি কোটি মানুষের কানে সেই বিষাক্ত বীজ বপন করে দেন। এই "রাজনৈতিক অপভাষা" আজ এক মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কর্মীরা যখন দেখেন তাঁদের নেতা ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন, তখন তাঁরাও সেই ধারা বজায় রেখে মিছিলে ও দেওয়াল লিখনে আরও কদর্য ভাষার প্রলেপ দেন। তথ্য-প্রমাণ হিসেবে যদি আমরা গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রচারের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে সেখানে তাত্ত্বিক লড়াইয়ের চেয়ে কদর্য ব্যক্তিগত আক্রমণই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই রাজনৈতিক ক্লেদাক্ততার সমান্তরালে আমাদের সমাজদেহে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে আরও এক ভয়ঙ্কর বাস্তব সত্য—তা হলো ঘটি ও বাঙাল সংঘাতের কদর্য বিষবাষ্প। ১৯৪৭ সালের সেই অভিশপ্ত দেশভাগ আমাদের ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু আমাদের আত্মিক যোগসূত্র ছিল এই প্রাণের বাংলা ভাষা। অথচ আজ আমরা সেই অখণ্ডতাকে তুচ্ছ আঞ্চলিকতার দোহাই দিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছি। ঘটি ও বাঙালদের কথ্য ভাষার টান, শব্দের প্রয়োগ বা উচ্চারণগত ভিন্নতা নিয়ে যে ধরণের নীচ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে শুরু হয়েছে, তা কখনোই বাঞ্ছনীয় ছিল না এবং এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করছে। আমরা যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষাকে 'গেঁয়ো' বা 'অশুদ্ধ' বলে দাগিয়ে দিয়ে তাকে নিয়ে রসিকতা করি, তখন আমরা আসলে আমাদের মাতৃভাষারই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গকে অস্বীকার করি। ভাষার এই কৃত্রিম বিভাজন কেবল শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের মানসিক দূরত্বকেও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক পক্ষ যখন অন্য পক্ষকে নিচু দেখানোর জন্য ভাষাকে হাতিয়ার করে, তখন সেই বিষবাষ্পে আমাদের বায়ান্নর চেতনা ফিকে হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, বাহান্নর সেই রক্তঝরা রাজপথে যখন রফিক, বরকতরা লুটিয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁদের শরীরে ঘটি বা বাঙাল বলে কোনো আলাদা মোহর ছিল না; সেখানে ছিল কেবল এক অখণ্ড 'বাঙালি' পরিচয়। ওপার বাংলার বা এপার বাংলার টান—সবই তো একই গঙ্গার ধারা। অথচ আজ তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও যখন 'বাঙাল' বা 'ঘটি' পরিচয়ে একে অপরকে ভাষাগত আক্রমণ করে, তখন বোঝা যায় আমাদের শিক্ষার মান আসলে কতটা ঠুনকো। এই আঞ্চলিক সংঘাত আজ আমাদের চলচ্চিত্রের সংলাপ থেকে শুরু করে ঘরোয়া আড্ডাতেও এক বিষাক্ত রূপ নিয়েছে। এই হীনম্মন্যতা এবং সংকীর্ণতা আজ আমাদের পরিচয়ের মূলে পচন ধরিয়ে দিয়েছে।
রাজনীতির এই ভাষাগত পতন এবং আঞ্চলিকতার এই কদর্য লড়াই মিলেমিশে আজ আমাদের মাতৃভাষাকে এক জগািখচুড়ি অবস্থায় নিয়ে গেছে। নেতারাই যখন একে অপরকে আঞ্চলিক টান নিয়ে কটাক্ষ করেন, তখন সাধারণ কর্মীবাহিনী তাকে 'যুক্তি' হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে রাজপথের প্রতিটি লড়াই আজ ভাষার শরীরে ক্ষত তৈরি করছে। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যখন এই রাজনৈতিক বক্তৃতাগুলো শুনবে বা এই আঞ্চলিক বিদ্বেষ দেখবে, তারা আমাদের ভাষা নিয়ে কী ধারণা পোষণ করবে? আমরা কি তাদের হাতে একটি কলুষিত, অশ্লীল ও খণ্ডিত ভাষা তুলে দিয়ে যাবো? এই প্রশ্নটি আজ আমাদের অস্তিত্বের সামনে সবচেয়ে বড় দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আজ ভাষার মর্যাদা রক্ষার চেয়ে ক্ষমতার গদিতে বসাটাকেই বড় করে দেখছে, আর এই সুযোগে আমাদের প্রাণের ভাষা তার শাশ্বত শ্রী হারিয়ে ফেলছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ভাষার শরীরে যদি একবার পচনের দাগ লাগে, তবে তা মুছতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যাবে। এই যে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি, এটি কেবল শব্দের লড়াই নয়,এটি আমাদের সংস্কৃতির ভাঙন। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী আজ এই রাজনৈতিক অপভাষার বিরুদ্ধে নিরব থাকছেন কেবল ক্ষমতার ভয়ে বা সুযোগ-সুবিধার লোভে। সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা; তারা শুদ্ধতার চেয়ে উগ্রতাকেই সঠিক পথ বলে ধরে নিচ্ছে। আমাদের চারপাশের পরিবেশ আজ এমন হয়ে গেছে যে, কেউ যদি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিনম্র ও শুদ্ধ বাংলায় সত্য কথা বলেন, তবে তাকে দুর্বল ও সেকেলে বলে হাসাহাসি করা হয়। আমরা আজ বাহান্নর সেই অমর একুশের গান গাই, কিন্তু আমাদের কর্মে সেই গানের এক বিন্দু প্রতিফলন নেই। আমরা আজ রক্তের অক্ষরে কেনা স্বাধীনতাকে শব্দের জঞ্জাল দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি।
তৃতীয় অংশ
সামাজিক পচন, আধুনিকতার ছদ্মবেশে অপব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ ও নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা
মাতৃভাষার অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পচনের প্রতিচ্ছবি। এই পর্বে আমাদের প্রবেশ করতে হবে সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে প্রতিদিন আমাদের প্রাণের ভাষাকে 'আধুনিকতা' আর 'বিশ্বায়নের' দোহাই দিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে বলি দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সমাজ আজ এক অদ্ভুত ও কদর্য দ্বৈত সত্তায় ভুগছে। একদিকে আমরা একুশের ভোরে খালি পায়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শোকাতুর হওয়ার নিপুণ অভিনয় করি, আর অন্যদিকে বছরের বাকি ৩৬৪ দিন সেই ভাষাকেই যত্রতত্র লাঞ্ছিত করি। তথ্য-প্রমাণ হিসেবে যদি আমরা আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তবে শিউরে উঠতে হয়। ইংরেজি মাধ্যমের তথাকথিত আভিজাত্যের মোহে আমরা আমাদের সন্তানদের এমন এক শেকড়হীন জগতে ঠেলে দিচ্ছি যেখানে বাংলা ভাষা কেবল একটি 'অপ্রয়োজনীয় বোঝা'। অনেক নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা বাংলায় কথা বলতে পারলে লজ্জিত বোধ করে, আর তাদের অভিভাবকরা পরম তৃপ্তিতে সমাজের উঁচু তলায় গর্ব করে বেড়ান যে তাঁদের সন্তান বাংলা ঠিকমতো জানে না। এই যে এক বিশাল পরিচয়হীন প্রজন্ম আমরা স্বহস্তে তৈরি করছি, তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? তারা শেক্সপীয়র বা মিল্টন মুখস্থ আওড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' কিংবা নজরুলের 'বিদ্রোহী'র সেই আদিম তেজ তাদের রক্তে কোনো স্পন্দন জাগায় না। এই বৌদ্ধিক দেউলিয়া পনা আমাদের জাতীয় মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে অসার ও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
আরও ভয়াবহ ও লজ্জাজনক বিষয় হলো আমাদের বর্তমান গণমাধ্যম এবং বিনোদন জগতের ভূমিকা। এফএম রেডিওর জকি থেকে শুরু করে টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক—সবার মধ্যেই আজ এক ধরণের কৃত্রিম ও কদর্য 'বাংরেজি' বলার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। তারা এমন এক স্বরভঙ্গিতে কথা বলেন যা না বাংলা, না ইংরেজি। শব্দের মাঝখানে অকারণে বিদেশি শব্দ গুঁজে দিয়ে তারা এক ধরণের সাংস্কৃতিক সংকর তৈরি করছেন যা আমাদের ঐতিহ্যের ওপর এক বিষাক্ত প্রলেপ। বিজ্ঞাপন জগতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চটকদার প্রচার আর সস্তা জনপ্রিয়তার নেশায় বাংলার বানান ও ব্যাকরণকে কীভাবে প্রতিদিন জনসমক্ষে ধর্ষণ করা হচ্ছে। রাজপথের আকাশচুম্বী বিজ্ঞাপনী বোর্ডে ভুল বানানের যে মহোৎসব চলে, তা আমাদের জাতীয় দৈন্যেরই এক জলজ্যান্ত দলিল।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কথা না বললেই নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার মন্তব্য বক্সে যে ভাষায় আজ মতপ্রকাশ করা হয়, তা অনেক সময় ভাষা নয়, বরং এক ধরণের বিকৃত শব্দের আর্তনাদ। সেখানে বাক্য নেই, ছন্দ নেই, আছে কেবল বিকৃত উচ্চারণের নোংরা মহড়া। ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা যাকে আমরা 'রোমানাইজড বেঙ্গলি' বলছি, তা আমাদের সেই পবিত্র বর্ণমালার অস্তিত্বকেই আজ চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই সামাজিক পচনের মূলে রয়েছে আমাদের নেতৃত্বের চরম ও ক্ষমাহীন ব্যর্থতা। যখন রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে অশালীন শব্দ প্রয়োগ করেন কিংবা আঞ্চলিকতাকে একে অপরের বিরুদ্ধে উপহাসের হাতিয়ার বানান, তখন সাধারণ মানুষ তাকেই ধ্রুব সত্য বা বৈধ আচরণ হিসেবে ধরে নেয়। ঘটি ও বাঙাল সংঘাতের যে বিষবাষ্প আজ নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের ভাষার অখণ্ডতাকে ভেতর থেকে উইপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগ আমাদের ভূগোলকে খণ্ডিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলা ভাষা ছিল আমাদের হৃদপিণ্ডের সেই অদৃশ্য নাড়ির যোগসূত্র। অথচ আজ তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মীরা আঞ্চলিক টান নিয়ে যে ধরণের নীচ ও রুচিহীন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে মেতে ওঠেন, তা দেখে বায়ান্নর শহীদরা হয়তো কবরে শুয়েও আর্তনাদ করছেন। নেতৃত্ব যখন ভাষাকে কলুষিত করে, তখন সেই বিষক্রিয়া কোনো বিশেষ দলেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা চুঁইয়ে চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের অন্তিম স্তরে। আজ কোনো নিমন্ত্রণপত্র থেকে শুরু করে হাসপাতালের সাইনবোর্ড কিংবা সরকারি দপ্তরের নোটিশ বোর্ড—কোথাও বাংলার শুদ্ধ বানান চোখে পড়া যেন এক দুর্লভ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আমরা ভাষার অবমাননা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আর এই অভ্যস্ততাই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। যখন একটি জাতি তার ভাষার অপব্যবহারকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সেই জাতির পতন সুনিশ্চিত।
চতুর্থ পর্ব:- উপলদ্ধি থেকে দেখে পরিত্রাণের অগ্নিপথ ও অবিনাশী জাতিসত্তার অন্তিম শপথের আহবান।
বিলাপের প্রহর আজ শেষ হয়েছে,এখন সময় এক সুতীব্র ও আপসহীন প্রত্যাঘাতের। এই চতুর্থ পর্বে দাঁড়িয়ে আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে, মাতৃভাষা বাঁচানোর আন্দোলন কেবল শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা হবে এক চরম আত্মপ্রবঞ্চনা। আমাদের এই দ্বিতীয় পর্বের 'ভাষা বাঁচাও' আন্দোলনকে হতে হবে প্রতিটি গৃহকোণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখর পর্যন্ত এক অবিরাম অভিযান। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের মগজের ভেতর জেঁকে বসা সেই 'সাংস্কৃতিক দাসত্ব'কে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ঘটিয়ে বাংলাকে কেবল একটি পাঠ্য বিষয় নয়, বরং বিজ্ঞান, দর্শন ও কারিগরি শিক্ষার প্রধান আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রতিটি গবেষণা পত্র, প্রতিটি প্রকৌশল বিদ্যা যখন বাংলা ভাষায় অনূদিত ও মৌলিকভাবে রচিত হবে, তখনই আমাদের ভাষা তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অলিন্দে যারা বসে আছেন, তাঁদের প্রতি আজ আমাদের চরম হুঁশিয়ারি—ভাষাকে আর কোনো সংকীর্ণ রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে দেওয়া হবে না। যারা জনসমক্ষে ভাষার শরীরে অশালীনতার বিষ ঢেলে দেন, তাঁদের আইনগতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক প্রতিটি স্তরে বাংলার শুদ্ধ ও সাবলীল প্রয়োগকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ডিজিটাল দুনিয়ার অরাজকতা বন্ধ করতে আমাদের এক এক জন 'সাইবার যোদ্ধা' হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা বাংলাকে বিকৃত করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে এক বিশাল সচেতনতামূলক ব্যুহ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি বিকৃত কমেন্ট বা কন্টেন্টের নিচে শুদ্ধ ও তীক্ষ্ণ প্রতিবাদী মন্তব্যের পাহাড় তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী ভাষাকে নিয়ে উপহাস করার সাহস না পায়। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে লাইব্রেরিমুখী করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় আধুনিক পাঠাগার ও ভাষা চর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি মা-বাবাকে এই শপথ নিতে হবে যে, তাঁদের সন্তানের প্রথম উচ্চারণ যেন হয় নির্ভুল ও মাধুর্যপূর্ণ। নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে যারা 'বিশ্ব নাগরিক' হওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে—পৃথিবীর দরবারে কেবল সেই জাতিই শ্রদ্ধেয় হয়, যার নিজের একটি শক্তিশালী ও শুদ্ধ ভাষা থাকে। আমরা যদি আজ আমাদের ঘরের ভেতরে বাংলার প্রদীপ জ্বালিয়ে না রাখি, তবে বাইরের ঝোড়ো হাওয়া আমাদের পরিচয়কে চিরতরে নিভিয়ে দেবে।
এই মহাকাব্যিক আর্তনাদের অন্তিমে দাঁড়িয়ে আমি, গৌতম হালদার, আজ মহাকালের সামনে এক অবিনাশী শপথ গ্রহণ করছি। আমরা সেই জাতি যারা রক্ত দিয়ে বর্ণমালা কিনেছি, আমরা সেই জাতি যারা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বলেছি—'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই তেজোদীপ্ত হুঙ্কার যেন আমাদের ধমনীতে আবার বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো কাজ করে। পরিস্থিতি আজ দাবি করছে এক সুতীব্র মানসিক বিপ্লব। যারা আমাদের সুন্দর মাতৃভাষার অবমাননা করছে, তাদের জন্য আমরা দায়ী থাকব না; বরং আমরাই হবো সেই অতন্দ্র প্রহরী যারা আগামী দিনের পৃথিবীতে বাংলাকে এক অপরাজেয় ও শুদ্ধতম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। আজ থেকে প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিটি কলমে, প্রতিটি সংলাপে কেবল শুদ্ধতারই জয়ধ্বনি হবে। আমরা ভুলে যাবার জাতি নই, আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর জাতি। এই আর্তনাদ যেন পুনর্জাগরণের গানে রূপান্তরিত হয়ে বাঙালির প্রতিটি রক্তকণিকায় স্পন্দিত হয়। মহাকালের পাতায় আমাদের নাম যেন 'ভাষার ঘাতক' হিসেবে নয়, বরং 'ভাষার ত্রাণকর্তা' হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকে। আমাদের জয় নিশ্চিত, কারণ সত্য ও রক্ত কোনোদিন বৃথা যায় না। মাতৃভাষা দীর্ঘজীবী হোক, বাঙালির জাতীয় চেতনা অক্ষুণ্ণ থাকুক।
We hate spam as much as you do