Tranding

03:53 AM - 22 Feb 2026

Home / Article / কমিউনিষ্ট ইশতেহার: ১৭৮ বছরের নিপীড়িতের আন্দোলনের দিশারী এবং ভারতবর্ষ নিয়ে কিছু কথা।

কমিউনিষ্ট ইশতেহার: ১৭৮ বছরের নিপীড়িতের আন্দোলনের দিশারী এবং ভারতবর্ষ নিয়ে কিছু কথা।

কমিউনিষ্ট ইশতেহারের ১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের মুখবন্ধে এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে কমিউনিষ্ট ইশতেহার লেখার পিছনে মূল যে ভাবনা কাজ করেছিল সেটা হল - অর্থনৈতিকভাবে, সমাজ গঠনের প্রত্যেক ঐতিহাসিক সময়কালের, রাজনৈতিক এবং বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণের ঐতিহাসিক সময় গুলির, ইতিহাস আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। যে সংগ্রাম সমাজ বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে শোষিত এবং শোষকের ভিতর, শাসক এবং শাসিতের ভিতর চলেছে। স্বাভাবিক ভাবেই এটা পরিষ্কার যে শ্রেণী সংগ্রাম কে ভিত্তি করেই নতুন আন্দোলন নির্মাণ ও সমাজ নির্মাণের রূপরেখা ছিল, কমিউনিষ্ট ইশতেহারে। এই ইশতেহার কে প্রধান চারটি অধ্যায়ে ভাগ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলস।

কমিউনিষ্ট ইশতেহার: ১৭৮ বছরের নিপীড়িতের আন্দোলনের দিশারী এবং ভারতবর্ষ নিয়ে কিছু কথা।

কমিউনিষ্ট ইশতেহার: ১৭৮ বছরের নিপীড়িতের আন্দোলনের দিশারী এবং ভারতবর্ষ নিয়ে কিছু কথা।


শুভ্রদীপ অধিকারী 
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


১৮৪৭ সালে যখন তৎকালীন কমিউনিষ্ট লীগ তার দ্বিতীয় অধিবেশন আয়োজন করতে যাচ্ছে; মার্ক্স ও এঙ্গেলস তখন আয়োজকদের কাছে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পৌঁছলেন যে লীগের পরবর্তী কর্মসূচি হবে তাদের ইশতেহার তৈরী। কমিউনিষ্ট লীগের নয়া শ্রমিক শ্রেণী অংশের অনুগামীদের কাছে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কমিউনিজমের নীতিমালা এবং প্রশ্নমালা রূপে সেগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল, ইশতেহার প্রকাশের কিছুদিন পর, সেগুলি 'কমিউনিজমের দাবিসমূহ ' রূপে প্রকাশিত হয়। এক্ষেত্রে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কাছে রচনার মূল ভিত্তি ছিল ১৮৪৬ এবং ১৮৪৭ এর অধিবেশনের প্রস্তাবনা এবং কমিউনিষ্ট লীগের প্রথম কংগ্রেসের কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনার সারাংশ। পরবর্তী কালে এটি 'জার্মান ওয়ার্কার্স এডুকেশনাল সোসাইটির ' ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়, যার প্রকাশক ছিলেন জে, ই, বুর্ঘার্ড নামে এক জন জার্মান লীগ সদস্য। যদিও মার্ক্স ও এঙ্গেলসের নাম লেখক হিসাবে প্রকাশিত হয় ১৮৫০ এর ইংরেজি সংস্করণে, যার অনুবাদক ছিলেন হেলেন ম্যাকফারলেন নামের একজন মহিলা। এই সংস্করণ টি প্রকাশিত হয়েছিল 'দ্য রেড রিপাবলিকান ' নামক পত্রিকায়, যার সম্পাদক ছিলেন জুলিয়ান হার্নে। এর পূর্ববর্তী সকল সংস্করণেই লেখকের নাম ছিল উহ্য। দীর্ঘ ১৭৮ বছরের পথচলায় এই কমিউনিষ্ট ইশতেহারের সাথে যুক্ত হয়েছে বহু মনীষীর নাম। ২০২০ এর কোভিড আক্রান্ত সময়ে, মন্দার চরমে যখন পৃথিবী ,তখন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ভেনেজুয়েলা সর্বত্র ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ ২১শে ফেব্রুয়ারি এই বইটি পাঠ করেন। এরফলে আন্তর্জাতিক এক প্রভাব গড়ে ওঠে যা পরবর্তী কালে 'রেড বুক ডে ' হিসাবে পালন হয়ে আসছে।

কী আছে কমিউনিষ্ট ইশতেহারে?

কমিউনিষ্ট ইশতেহারের ১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের মুখবন্ধে এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে কমিউনিষ্ট ইশতেহার লেখার পিছনে মূল যে ভাবনা কাজ করেছিল সেটা হল - অর্থনৈতিকভাবে, সমাজ গঠনের প্রত্যেক ঐতিহাসিক সময়কালের, রাজনৈতিক এবং বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণের ঐতিহাসিক সময় গুলির, ইতিহাস আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। যে সংগ্রাম সমাজ বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে শোষিত এবং শোষকের ভিতর, শাসক এবং শাসিতের ভিতর চলেছে। 
স্বাভাবিক ভাবেই এটা পরিষ্কার যে শ্রেণী সংগ্রাম কে ভিত্তি করেই নতুন আন্দোলন নির্মাণ ও সমাজ নির্মাণের রূপরেখা ছিল,  কমিউনিষ্ট ইশতেহারে। এই ইশতেহার কে প্রধান চারটি অধ্যায়ে ভাগ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলস। প্রথম টা অবশ্যই এই শ্রেণীসংগ্রামের যুযুধান দুই পক্ষ ১) বুর্জোয়া বা উৎপাদিত পণ্যের মালিক শ্রেণী ও ২) প্রলেতারিয়েত কিংবা সর্বহারা বা উৎপাদনে প্রধান শ্রমদানকারী শ্রেণীর বিষয়ে। দ্বিতীয়, কমিউনিষ্ট এবং প্রলেতারিয়েতদের ওপর। সেখানে তাঁরা পরিস্কার বলেছেন, যে প্রলেতারিয়েত দের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো পার্টি নির্মাণের কোনো অভিপ্রায় কমিউনিষ্টদের নেই। তৃতীয়তঃ, বিভিন্ন সমাজতন্ত্রী এবং কমিউনিষ্টদের সাহিত্যের বিশ্লেষণ ও সমালোচনা সেখানে রয়েছে। চতুর্থ, সমাজে কমিউনিষ্টদের অবস্থান ও অন্যান্য বিরোধী দলের সাথে তাদের সম্পর্ক কি হবে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সেখানে রয়েছে।

কমিউনিষ্ট ইশতেহারের সাথে ভারতের কী সম্পর্ক?

ভারতবর্ষে প্রথম কমিউনিষ্ট ইশতেহার প্রকাশ করেন রাঞ্ছড়দাস ভুবন লোটওয়ালা নামে তৎকালীন বোম্বে শহরের এক ব্যক্তি, ১৯২২ সালে। সেটি ছিল ইংরাজিতে এবং তার দাম ছিল ছয় আনা। যদিও প্রথম ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়, ১২ আগস্ট ১৯২৬ থেকে ২১শে জুলাই,১৯২৭ এর ভিতর গণবাণী  পত্রিকায়। এই অনুবাদ টি করেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তৎকালীন ওয়ার্কার্স এন্ড পিসেন্টস পার্টির বাংলা মুখপত্র ছিল গণবাণী পত্রিকা, সেখানে ছটি খন্ডে এটি প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অনুবাদ টি হয়েছিল, কলকাতারই একটি উর্দু সাপ্তাহিক পত্রিকা আল - হিলালে, যার সম্পাদক ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। যদিও প্রথম দুটি অধ্যায় ভিন্ন বাকী দুটি অংশ কে তিনি ছাপেননি। তবে, ইশতেহারের আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গিকতাকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। প্রথম পূর্ণাঙ্গ উর্দু অনুবাদ প্রকাশিত হয়, আব্দুল বারীর কলমে, লাহোর থেকে ১৯৩০ এর দশকের শুরুর দিকে। প্রথম তামিল অনুবাদ করেন , তামিলনাড়ুর ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী, জাতি সাম্যের লড়াইয়ের পুরোধা পুরুষ ই ভি রামাস্বামী ( পেরিয়ার)। এক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য ছিল যে, এই ধরনের কমিউনিষ্ট সচেতনতা রাশিয়ার বহু পূর্বে ভারতবর্ষে হওয়া উচিত ছিল । সেটি বহুবিধ ষড়যন্ত্রের কারণে হওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, ষড়যন্ত্রকারীরা নিপুণ ভাবে এদেশের মানুষ কে শিক্ষা, জ্ঞান, আন্তর্জাতিক সচেতনতা, আত্ম - সম্মান থেকে দূরে সরিয়ে, বর্বরোচিত পরিস্থিতিতে রেখেছে। তাছাড়া, ভগবান ও ধর্মের নামে এমন এক মানসিকতা তাদের পরাধীন করে রেখেছে যে ভগবানের নামই পরিত্রাণের পথ বলে তারা মেনে নেয়। এছাড়াও ১৯৪৫ এর ভিতর ভারতের দশটি ভাষায় কমিউনিষ্ট ইশতেহার অনুবাদ হয়, যা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে শুধু নয়, ভারতের সমাজ বৈষম্যের লড়াই কেও নতুন দিশা দেখায় ! তাই কোনমতেই কমিউনিষ্ট ইশতেহার কে ভারতে অপ্রাসঙ্গিক বলে মেনে নেওয়া যায়না।

আজকের দিনে প্রাসঙ্গিকতা

এমন একটা সময় আমরা রয়েছি, যখন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (International Labour Organisation) হিসেব অনুযায়ী ১৮ কোটি ৬০ লক্ষ কর্মহীন, বেসরকারী হিসেবে প্রায় ১৩শতাংশ যুবক কর্মহীন। এদেশেও প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ কর্মহীন। দেশের অর্ধেক মানুষের হাতে মাত্র ৩শতাংশ সম্পদ। ক্ষুধার সূচকে, দেনার বোঝায় যখন নিষ্পেষিত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। যখন, উগ্র জাতিপ্রেম এবং ধর্মের মোহে বুঁদ করে রাখা হচ্ছে সব হারানো মানুষকে। সেই পরিস্থিতিতে মতাদর্শগত ভাবে সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির ঠিকানা এই কমিউনিষ্ট ইশতেহারে হয়েছে। যে দুনিয়ায় মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে ৯৫শতাংশ সম্পদ রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ৮৩১ মিলিয়ন মানুষ চূড়ান্ত দারিদ্র্যে রয়েছে যে পৃথিবীর। সেখানে সব হারানো মানুষকে জোট বেঁধে রাজপথ মুখরিত করবার ছবিও আমাদের সামনে আসছে। এদেশেও হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যা, বছর বছর বিলিয়নরের সংখ্যা লাফিয়ে বৃদ্ধি এবং ক্ষুধার হাহাকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কমিউনিষ্ট ইশতেহার আবারও আলোচনায় আনা আবশ্যিক। দেখা যাক দুনিয়ার সর্বহারা গোটা দুনিয়া জয় করতে পারে কি না!

Your Opinion

We hate spam as much as you do