বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রামের মূর্তি নিয়ে উপস্থিত হন এবিভিপি-র সদস্যেরা। একই ভাবে রাম পুজোর আয়োজন করে এনএসএফ। একটি পুজো হয়েছে ত্রিগুণা সেন সভাঘরের উল্টো দিকে। আর একটি পুজো হয় প্রযুক্তি ভবনের নীচে।
যাদবপুর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ABVPর রামপূজোয় উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা ? প্রতিবাদে SFI ও অন্যান্য বাম ছাত্ররা
২৬ মার্চ ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রামনবমীর পুজো। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতার পথে দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠন এবিভিপি। ‘জয় শ্রীরাম’ -এর বিরুদ্ধে উঠল ‘ইনকিলাব জ়িন্দাবাদ’ স্লোগান। ছুটির দিনে উত্তপ্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর।
জানা গিয়েছে, গত বুধবারই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে পুজোর অনুমতি চেয়েছিলেন এবিভিপি-র নেতারা। দাবি, যাদবপুরে মৌখিক অনুমতি মিললেও, মেলেনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের মূল ফটকের বাইরে হচ্ছে রামের পুজো।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রামের মূর্তি নিয়ে উপস্থিত হন এবিভিপি-র সদস্যেরা। একই ভাবে রাম পুজোর আয়োজন করে এনএসএফ। একটি পুজো হয়েছে ত্রিগুণা সেন সভাঘরের উল্টো দিকে। আর একটি পুজো হয় প্রযুক্তি ভবনের নীচে।
যাদবপুর ক্যাম্পাসের প্রযুক্তি ভবনের নীচে রামনবমীর আয়োজন করা হয়েছে।
অভিযোগ, পুজো চলাকালীন সেখানে এসে জড়ো হন বাম মনোভাবাপন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্যেরা। দু’দলের মধ্যে শুরু হয় স্লোগান যুদ্ধ। বচসা যাতে বেশি দূর না গড়ায়, আসরে নামেন উপাচার্য। এবিভিপি-র দাবি, উপাচার্য মৌখিক অনুমতি দিলেও কোনও লিখিত অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই প্রথম নয়। গত কয়েক বছর ধরেই যাদবপুরের ক্যাম্পাসে রামনবনী পালনের প্রচেষ্টা করছিল এবিভিপি। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হচ্ছিল না। ২০২৫-এ তাই হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি না দিলেও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাদবপুর ক্যাম্পাসে রামনবমী পালন করে আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। সে বারও তেমন কোনও সংঘাতের মধ্যে পড়েনি তারা।
তবে দুই পক্ষের মধ্যে এই নিয়ে স্লোগান যুদ্ধে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস চত্বর। এই রামনবমী পালন নিয়ে SFI-এর কলকাতা জেলা সম্পাদক শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে যদি ধর্মাচরণ হয়, সেখানে তো বিভিন্ন ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা থাকে। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখাই দরকার। তাছাড়া রামনবমীকে কেন্দ্র করে যদি কোনও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হয়, আমরা রুখে দাঁড়াব। ২০২৪ সালে রামনবমীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিল, সহকারী উপাচার্য আক্রান্ত হয়েছিলেন ABVP-র হাতে। এই হুলিগানিজম আমরা চাই না, তাই কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব নিতে বলেছি।'
তা সত্ত্বেও দেখা গেল বিশাল আয়োজন করে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়েই পালিত হল রামনবমীর পুজো। এ প্রসঙ্গে শুভদীপ বলেন, 'আমাদের কমরেডরা ক্যাম্পাস চত্বরেই রয়েছে। নিজেরা মারপিট ক্যাম্পাস চত্বরে করতে চাই না। কিন্তু কোনও ছাত্র যদি এমন কোনও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অভিযোগ তোলে তবে আমরা কর্তৃপক্ষকেও জানাব এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলব।'
বৃহস্পতিবার এবিভিপি-র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি নিখিল দাস বলেন, “আমরা যখন পুজো করছিলাম, তখন অতিবাম কিছু ছাত্র এসে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তবে উপাচার্য নিজে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। আমাদের পুজো নির্বিঘ্নে হচ্ছে। বেলা ৩টে অবধি পুজো হল।”
বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টের (RSF) তরফে অভিযোগ তোলা হয়, এখানে বাইরে থেকে এবিভিপির সদস্যরা এসে পুজোয় অংশ নিচ্ছেন। শিল্পা মণ্ডল নামে একজনের কথা বলেন তাঁরা—যিনি পশ্চিমবঙ্গ এবিভিপির সদস্য। যদিও শিল্পা মণ্ডলের দাবি, ‘ইফতার পার্টিতে বাইরে থেকে লোক আসে না? তখন তো কোনও কথা বলে না। রাম সবার, রাম বহিরাগত নয়।’
পাল্টা বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টের (RSF) ইন্দ্রানুজ রায় বলেন, ‘এখানে শুধু ইফতার নয়, এখানে সরস্বতী পুজো, বিশ্বকর্মা পুজো সবই হয়। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্যরাও এতে অংশ নেয়। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে রামনবমীকে একটা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রামনবমীর মিছিলে কী হয়, তা-ও আমরা দেখি। তাই আমরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন হিসেবে এর বিরোধিতা করি। গতবারও বাইরে থেকে এসে উস্কানমূলক গান বাজিয়ে এখানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা হয়েছিল।’
যদিও বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, লিখিত ভাবে পুজোর আয়োজনের জন্য কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে শান্তিপূর্ণ ভাবে পুজো করলে সমস্যা নেই। অন্য দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে যাতে কোনও অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি না হয়, তার জন্য মোতায়েন রয়েছে পুলিশও।
চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য বলেন, ‘যাঁরা পুজো করছেন, তাঁরা পুলিশের কাছে একটা সিকিউরিটির জন্য বলেছিল। অন্যদিকে আমরাও যাদবপুর পুলিশ স্টেশনকে অ্যালার্ট থাকতে বলেছি। আমরা কখনই চাই না ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকুক। তবে নির্দেশ দেওয়া আছে, আমি ওদের না বললে, ওরা ক্যাম্পাসে ঢুকবে না। ভিতরে আমাদের সিকিউরিটি আছে।’
যাদবপুরের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যও অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা ক্যাম্পাসে পুজোর অনুমতি দেননি। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডল বলেন, “বুধবার ছাত্রেরা এসেছিল আমাদের কাছে। আমরা লিখিত ভাবে কোনও অনুমতি দিইনি। তবে বাধাও দিইনি।”
অন্য দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ বলেন, “ক্যাম্পাসে অনুমতি চেয়েছিল একটি দল, সে অনুমতি দেওযা যায়নি। কারণ এখানে শুধুই সরস্বতীপুজোর অনুমতি রয়েছে। কিন্তু মূল ফটকের বাইরে যদি কিছু হয়, তাতে আমাদের কিছু করার নেই। আজ রামনবমীর সরকারি ছুটি, ক্যাম্পাস সম্পূর্ণ বন্ধ।” তিনি দাবি করেন, যাঁরা পুজো করছেন তাঁরাও পুলিশ নিরাপত্তার দাবি করেছিলেন। তবে ক্যাম্পাসের ভিতর তিনি পুলিশ ঢুকতে দিতে চাননি। বরং নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল।
We hate spam as much as you do