বামেদের মুল আন্দোলন হল বেকারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মতো জীবন-জীবিকার বিষয়ে আরও তীব্র জনতার আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তিন, রাজ্য স্তরে বাস্তবতা অনুযায়ী বিজেপিকে পরাজিত করার কৌশল। ভোটের ক্ষেত্রে বাংলায় যে বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধেই সিপিএম লড়বে, তা দ্ব্যর্থহীন ভাবেই বলেছেন ইয়েচুরি। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি অপরাজেয় নয়! এটা মনে রেখেই এগোতে হবে।’’
কেন্দ্রীয় নেতা সদ্য প্রয়াত মদন ঘোষ ও মৃদুল দে-র স্মরণ-সভায় সিপিআইএমের নেতৃত্ব। প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে।
স্মরণসভায় ইয়েচুরি ! বাংলায় বিজেপি - তৃণমূলের বিরুদ্ধেই সিপিআইএম লড়বে
১১ মে ২০২৩
লোকসভা নির্বাচনের আর এক বছর বাকি। তার আগে দেশ জুড়ে বিজেপির মোকাবিলায় ত্রিমুখী কৌশল নিয়ে এগোনোর বার্তা দিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। বিজেপির বিরুদ্ধে গোটা দেশে অভিন্ন বিরোধী জোট যে বাস্তবসম্মত নয়, বরং রাজ্যভিত্তিক পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচনী কৌশল ঠিক হবে, সে কথা আগেই স্পষ্ট করেছে সিপিএম। কিন্তু ত্রিমুখী পরিকল্পনার মধ্যে জাতীয় স্তরের বিষয় নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে বিরোধী দলগুলির সর্বাত্মক প্রচারের কথা বলেছেন ইয়েচুরি। যার ফলে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা হলে কি লোকসভা ভোটের আগে এ রাজ্যে বিজেপি-বিরোধী প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএমকে একসঙ্গে দেখা যেতে পারে? মনে করা যেতে পারে, স্থানীয় রাজনৈতিক বিন্যাসই এমন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সিপিআইএম দুই সদ্যপ্রয়াত কেন্দ্রীয় নেতা মদন ঘোষ ও মৃদুল দে-র স্মরণ-সভায় বুধবার কলকাতায় বক্তা ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি। প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে ওই আলোচনায় জাতীয় পরিস্থিতি এবং আগামী লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ এসেছিল। কর্নাটকের বিধানসভা নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে ইয়েচুরি বলেন, দক্ষিণের ওই রাজ্যে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা যে ভাবে ভয়ঙ্কর মেরুকরণ ও বিভাজনের চেষ্টা করেছেন, তার প্রেক্ষিতে দেশে বিজেপি সরকারকে পরাস্ত করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদকের কথায়, ‘‘এই সরকারই সংবিধান, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমকে দখলে নেমেছে। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং প্রজাতান্ত্রিক চরিত্রকে রক্ষার জন্য সরকার থেকে বিজেপিকে দূরে রাখা জরুরি।’’
এই সূত্রেই লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের তিন দফা পরিকল্পনার কথা বলেছেন ইয়েচুরি। এক, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা থেকে শুরু করে জাতভিত্তিক জনগণনার জন্য জাতীয় স্তরের বিষয়ে রাজ্যে রাজ্যে প্রচার। যেখানে বিভিন্ন শক্তিই সমবেত হবে। এখনও পর্যন্ত বিজেপি-বিরোধী বিভিন্ন দল দিল্লিতে জাতীয় স্তরের বিষয়ে একত্রে সরব হয়েছে। এই প্রেক্ষিতেই জল্পনা হচ্ছে, দিল্লিতে যে ভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে তৃণমূল ও সিপিআইএম একসঙ্গে গিয়েছে, বাংলাতেও তেমন কোনও কর্মসূচি হতে পারে কি না। ইয়েচুরি অবশ্য এর কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তবে বলেছেন, ‘‘বিজেপি-বিরোধিতায় তৃণমূল আন্তরিক কি না, তা তাদেরই স্পষ্ট করতে হবে।’’
ইয়েচুরি জানিয়েছেন দীর্ঘ সময় বহু বিষয়ে প্রয়াত দুই নেতার সঙ্গে বহু বিষয়ে আলোচনার স্মৃতি। তিনি বলেছেন, ‘‘কৃষিকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার বিপদ নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে মদন ঘোষের সঙ্গে। আর মৃদুল দে’র সঙ্গে, বিশেষ করে দুনিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। আজ তাঁরা নেই। যন্ত্রণা আছে। কিন্তু তাঁদের পথ ধরে এগিয়ে চলা আমাদের কাজ।’’
বামেদের মুল আন্দোলন হল বেকারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মতো জীবন-জীবিকার বিষয়ে আরও তীব্র জনতার আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তিন, রাজ্য স্তরে বাস্তবতা অনুযায়ী বিজেপিকে পরাজিত করার কৌশল। ভোটের ক্ষেত্রে বাংলায় যে বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধেই সিপিএম লড়বে, তা দ্ব্যর্থহীন ভাবেই বলেছেন ইয়েচুরি। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি অপরাজেয় নয়! এটা মনে রেখেই এগোতে হবে।’’
দেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন ইয়েচুরি। তিনি বলেন, ‘‘দেশের সরকার আসলে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ সঙ্গী হয়ে চলছে। আবার দেখাচ্ছে এমনভাবে যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করছে। রাশিয়ার থেকে তেল আমদানি করছে ঠিকই। কিন্তু কম দামে তা পাওয়া যাচ্ছে। আর ভারতে পরিশোধিত হয়ে রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, ইউরোপে। ইউরোপে রপ্তানি করা তেলে ৯৫ শতাংশ পরিশোধিত হচ্ছে রিলায়েন্সের পরিশোধনাগারে। একদিকে সাম্রাজ্যবাদ, আরেকদিকে দেশের শাসকদের ঘনিষ্ঠ সরকার। কর্পোরেট-হিন্দুত্ব জোট আমজনতার জীবনজীবিকার হাল শোচনীয় করছে।’’
মহম্মদ সেলিম স্মৃতিচারণায় প্রয়াত দুই নেতারই চিন্তা এবং সংগ্রাম, দুই স্তরেই বিচরণের নানা উদাহরণ। তিনি বলেন, ‘‘প্রতিক্রিয়ার শক্তি চিন্তাকে সঙ্কীর্ণ গলিতে আটকে রাখতে চায়। তাই প্রগতির পক্ষে লড়াইয়ের সেনানিদের মগজে শান দিতে হয়। জীবনবোধকে উন্নত করতে হয়। মতাদর্শ আত্মস্থ করতে হয়। মদন ঘোষ এবং মৃদুল দে’রা সেই চেষ্টা করে গিয়েছেন। অন্যদেরও সহায়তা করেছেন।’’
স্মরণ-সভায় ছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পলিটব্যুরো সদস্য সূর্যকান্ত মিশ্র, রামচন্দ্র ডোম প্রমুখ।
We hate spam as much as you do