ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করার আমেজ এখনো কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্য করা যায়। পাটিসাপটা, নারকেলের পিঠা, দুধপুলি, ভাজা-পুলি, সরভাজা, ভেজানো দুধপুলি, ঘন দুধে ভেজানো দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, নারকেল কোরা, চিনির পুর দেওয়া মুগ ডালের পিঠা, বিভিন্ন ধরনের পিঠা এই উৎসবকে মুখরিত করে তোলে।
শীতের মাঝে বাঙালির পিঠে পুলি কৃষিজীবির প্রাণের উৎসব
January 15, 2023
মকর সংক্রান্তি আর পৌষ পার্বণে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে পৌষ পার্বণ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ। পৌষ মাসের শেষ দিনটি হল পৌষ সংক্রান্তি, বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়।
এছাড়া ভারতীয় সংস্কৃতিতে উত্তরায়নের সূচনা হিসেবে পরিচিত একে শুভ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন, তার মধ্য দিয়ে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো, হলো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সারাদিন ঘুড়ি ওড়ানোর পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাজি ফাটিয়ে, ফানুশ উড়িয়ে উৎসবের সমাপ্তি করা হয়। বহুদিন আগে থেকে এই দিনটি কৃষিজীবী বাঙালির বড় আনন্দের দিন। নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসব, আগে এই দিনটিতে পরলোকগত পূর্বপুরুষ, বাস্তু দেবতার উদ্দেশ্যে পিঠা, পায়েস নিবেদন করতেন।
তাছাড়া আগের দিন গৃহস্থ বাড়ির উঠানে আশেপাশের ঘরের দরজায় জানালার আশেপাশে ঘরের মেঝেতে চালের গুড়া দিয়ে আলপনা করা হতো এবং আরো অনেক কিছু ফুল, পাতা, কলকা, এঁকে এই দিনটিকে আরো বেশি স্মরণীয় করা হতো। আর এই প্রথা এখনো পর্যন্ত বর্তমানে চলছে।
এই সময় নতুন শস্য অথবা নতুন ধান প্রতিটি বাঙালির ঘরে খামারে ওঠে। তাই নতুন ফসল ওঠার আনন্দে এই পৌষ পার্বণ উৎসবটি বেশ জোরালো হয় বলে মনে করা হয়। এই সময় অনেকেই ভাবেন যে, নতুন শস্যের সাথে সাথে লক্ষীও ঘরে প্রবেশ করবে। তাছাড়া আঞ্চলিক ভাষায় যাকে “আউনি বাউনি” পুজো বলা হয়।
এই পুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় আগে থেকেই। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে পালিত একটি শস্য উৎসব যার নাম পৌষ পার্বণ। এই উৎসবের ক্ষেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষক পরিবারের বিভিন্ন রকমের পালনীয় অনুষ্ঠান করে থাকেন, এই পৌষ পার্বণের মধ্যে দিয়ে।
হেমন্ত কালে এমন ধান ঘরে প্রথম তোলার প্রতিক হিসেবে কয়েকটি পাকা ধানের শিষ ঘরে এনে কিছু নির্দিষ্ট আচরণ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। বাঙালি মনে করেন যে, এই দিনটিতে লক্ষী স্বয়ং নতুন শস্যের সাথে সাথে গৃহস্থের বাড়িতে প্রবেশ করে।
তাছাড়া পূর্বপুরুষ দের মনে করে নতুন শস্যের বিভিন্ন রকমের পিঠা এবং খাবার তৈরি করে তাদেরকে নিবেদন করা হয়। এর সাথে সাথে পূজা, পার্বণ, তো রয়েছেই। ধান চাল কে লক্ষ্মী হিসেবে মনে করা হয়। তাই চালের গুঁড়ো দিয়ে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, আলপনা, দিয়ে দেবী লক্ষীকে ঘরে আহ্বান জানানো হয়, যাতে ঘরে ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি পায়।
এই উৎসবটি পবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক হিসেবে মনে করা হয়। তাছাড়া উৎসবটি শীতের মাঝামাঝি সময়ে পালন করা হয় বলে, শীতকালে যে খেজুরের গুড় হয় সেটা দিয়ে পিঠে পুলি তৈরি করা এবং খাওয়া বেশ সুন্দর একটা অনুভূতি দেয়।
আতপ চাল ঢেঁকিতে গুড়ো করে আগেকার দিনের মানুষ পিঠে পুলি তৈরি করতেন, কিন্তু বর্তমানে এখন অনেক মেশিন উঠেছে, যার মাধ্যমে খুবই কম সময়ের মধ্যে, কম কষ্ট করে চালের গুঁড়ো তৈরি করে তা দিয়ে বিভিন্ন রকমের পিঠে পুলি তৈরি করা হয়। অনেকখানি মজাদার ছিল আগেকার দিনের পৌষ পার্বণ।
ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করার আমেজ এখনো কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্য করা যায়। পাটিসাপটা, নারকেলের পিঠা, দুধপুলি, ভাজা-পুলি, সরভাজা, ভেজানো দুধপুলি, ঘন দুধে ভেজানো দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, নারকেল কোরা, চিনির পুর দেওয়া মুগ ডালের পিঠা, বিভিন্ন ধরনের পিঠা এই উৎসবকে মুখরিত করে তোলে।
শীত কাল, যাকে উপভোগ করার সময় খুবই স্বল্প। তবে ওই যে, বাঙালির “বারো মাসে তেরো পার্বণ।” আর হেমন্তের প্রাণ হলো নবান্নে ওঠা নতুন চালের হরেক রকম পিঠে-পুলি। পিঠের জুটি আবার নতুন গুড়। পুরো স্বাদে আহ্লাদে ব্যাপার। সামনেই মকর সংক্রান্তি। পিঠে খাওয়ার এই তো সময়। আর পিঠে-পুলি বললেই কথাটা উল্টো ভাবে খেয়ালে আসে। অর্থাৎ কিনা পুলি পিঠে। শীতের আমেজে প্রতি বাঙালির ঘরে ঝোলা গুড়ের সাথে জাস্ট জমে যায়। তবে জেনে নেওয়া যাক কীভাবে তৈরি করা হয় পুলি পিঠে।
পুলি পিঠে বানানোর উপকরণ হিসেবে লাগবে চালের গুড়ি, নুন, নারকেল কোড়া আর গুড়। গরম জলে পরিমাণ মতো নুন ফেলে তা নিয়ে চালের গুড়িটাকে ভালো করে মেখে নিতে হবে। অন্যদিকে নারকেল কোড়ার সাথে গুড় মিশিয়ে পুরটা তৈরি করে রাখতে হবে। এবার মাখা চালের গুড়ি থেকে একটু একটু করে হাতে নিয়ে তাকে গোল বাটির মতো বানিয়ে তাতে পুর ভরে দু’পাশ জুড়ে মুখটা আটকে দিতে হবে। এভাবে তৈরি হবে পুলি। তবে এখানেই শেষ নয় এই পুলি গুলোকে গরম জলে ফুটিয়ে তবেই ঝোলা গুড় সহযোগে পরিবেশন করা যাবে।
তবে পুলি অনেক ধরণের হয়। ভাপিয়ে নিলে ভাপা পুলি, দুধে ডুবিয়ে নিলে দুধ পুলি ইত্যাদি। তবে শীতের দিনে গরম গরম নয় বরং ঠান্ডা হলেই বেশি ভালো লাগে এই পিঠে। শীতের সন্ধ্যে হোক বা সকালের টিফিন পিঠে হলে মন্দ হয় না।
We hate spam as much as you do