Tranding

06:52 PM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / জন্মদিনে ঋত্বিক ঘটক ! সংস্কৃতির এক অনন‍্য প্রতিভা

জন্মদিনে ঋত্বিক ঘটক ! সংস্কৃতির এক অনন‍্য প্রতিভা

উদ্বাস্তু জীবনের কষ্ট, দারিদ্র্য নিয়ে তিনি ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে ‘কোমল গান্ধার’ এবং ‘সুবর্ণরেখা’ নির্মাণ করেন। দুটি ছবিই মানুষের জীবন যন্ত্রণা ও দারিদ্র্যের কষাঘাতকে সার্থকভাবে তুলে ধরে। কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ এই ছবি দুটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি।

জন্মদিনে ঋত্বিক ঘটক ! সংস্কৃতির এক অনন‍্য প্রতিভা

জন্মদিনে ঋত্বিক ঘটক ! সংস্কৃতির এক অনন‍্য প্রতিভা


November 4, 2022


দেশভাগের বেদনা কখনো ভুলতে পারেননি তিনি। তার সৃষ্টিকর্মে ফিরে ফিরে এসেছে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাস্তুহারা মানুষের অসহনীয় কষ্টের দৃশ্য। দুই বাংলার সাধারণ বাঙালির জীবন সংগ্রাম তিনি অমর করেছেন সেলুলয়েডে। তিনি ঋত্বিক ঘটক, বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো অসামান্য সৃষ্টিকর্মের সুবাদে বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি অমর হয়ে আছেন।

 

ঋত্বিক ঘটকের জন্ম  ঢাকায় ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। তার বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি নাটক ও কবিতা লিখতেন। বড় ভাই মণীষ ঘটকও বিখ্যাত লেখক। ফলে ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা চলে যান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। কিন্তু পূর্ব বঙ্গকে এবং বিশেষ করে পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারে হৃষিকেষ লেনে তাদের বাসস্থানের কথা তিনি ভুলতে পারেননি কখনো। কলকাতাকে তিনি দেখেছেন ‘বাঙাল’ ও ‘উদ্বাস্তু’র চোখ দিয়ে। তিনি  ১৯৪৮ সালে তার প্রথম নাটক ‘কালো সায়র ‘লেখেন। মঞ্চ নাটকে তিনি ছিলেন বেশ সক্রিয়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সদস্য ছিলেন। সে সময় নাটক লিখতেন, অভিনয় এবং পরিচালনাও করতেন। গোগল এবং ব্রেশটের রচনাবলী বাংলায় অনুবাদ করেন তিনি।

নাটকের সূত্রেই ১৯৫১ সালে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। নিমাই ঘোষ পরিচালিত ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে সহকারী পরিচালকের কাজ করেছিলেন। সিনেমাটিতে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৫২ সালে ‘নাগরিক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত ‘অযান্ত্রিক’ ও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। সুবোধ ঘোষের ছোট গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয় ‘অযান্ত্রিক’ ছবিটি। ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল আর তার পুরনো ঝক্করমার্কা গাড়ির মধ্যকার সম্পর্ক ছবির মূল ঘটনা। পরিচালকের মুন্সীয়ানায় এক সময় গাড়িটিকে মনে হতে থাকে মানবিক সত্তাবিশিষ্ট। সম্পূর্ণ নতুন এক দুঃখবোধের জন্ম হয় ছবিটি দেখলে। যন্ত্র সভ্যতায় নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গী হিসেবে যন্ত্রকেই মনে হতে থাকে অনেক মানবিক। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষভাবে প্রশংসা কুড়ায়।

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। শিবরাম চক্রবর্তির লেখা বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে এই ছবিটি তৈরি করেন ঋত্বিক ঘটক। তবে তিনি কাহিনিতে যোগ করেন নতুন মাত্রা। হাস্যরস থেকে অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম হয় গভীর উপলব্ধির। ছবির মূল চরিত্র কিশোর কাঞ্চনের চোখ দিয়ে তিনি দেখেন মমতাহীন কলকাতা শহরকে। ১৯৫৮ সালে তিনি হিন্দি ছবি ‘মধুমতি’র কাহিনিকার হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা ও প্রশংসা পান। বিমল রায় পরিচালিত এবং দিলিপ কুমার-বৈজন্তিমালা অভিনীত ছবিটির কাহিনি ছিল পুনর্জন্মভিত্তিক যা বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সফল হয়েছিল এবং সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়ায়। মূলত, এই সিনেমা থেকেই হিন্দি চলচ্চিত্রে পুনর্জন্মভিত্তিক কাহিনির ধারা শুরু হয়।


১৯৬০ সালে মুক্তি পায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’। অসামান্য একটি ছবি। পূর্ববঙ্গের এক স্কুল শিক্ষকের পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে আসে কলকাতায়। সে পরিবারের বড় মেয়ে নীতার সামান্য চাকরির টাকায় চলে পুরো সংসার। চরম দারিদ্র্য কিভাবে মানুষের মনুষ্যত্বকেও খর্ব করে ফেলে তার করুণ দলিল ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ছবির প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় নীতা হেঁটে বাড়ি ফিরছে অনেক দূর থেকে। রাস্তায় ছিঁড়ে যায় তার পুরনো চটি জুতো। এই একটি দৃশ্যের মাধ্যমেই পরিচালক ইঙ্গিত দেন তার কঠোর জীবন সংগ্রামের। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নীতার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেন সুপ্রিয়া দেবী।

 

উদ্বাস্তু জীবনের কষ্ট, দারিদ্র্য নিয়ে তিনি ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে ‘কোমল গান্ধার’ এবং ‘সুবর্ণরেখা’ নির্মাণ করেন। দুটি ছবিই মানুষের জীবন যন্ত্রণা ও দারিদ্র্যের কষাঘাতকে সার্থকভাবে তুলে ধরে। কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ এই ছবি দুটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঋত্বিক ঘটক তার জন্মভূমিতে আসেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। অদ্বৈত মল্লবর্মণের চিরায়ত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে তার পরিচালনায় নির্মিত হয় এক অসাধারণ চলচ্চিত্র। তিতাস নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবন, প্রেম, লোকজ ঐতিহ্য সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয় ছবিতে। এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্রটি আমাদের অমূল্য সম্পদ।

 

১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিক ঘটকের শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যেন খুঁজে ফিরেছেন নিজেকেই। আত্ম-উপলব্ধি ও আত্মবিশ্লেষণের নির্মোহ শিল্পরূপ এই ছবি। এই চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। বাঙালির জনজীবনের অসাধারণ রূপকার হিসেবে তিনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ঋত্বিক ঘটকের সাথে কখনো কখনো তুলনা টানা হয় সত‍্যজিৎ রায় মৃনাল সেনের। যদিও এরকম তুলনা খুব সমীচিন নয়। কিন্তু তারপরও সত্যজিতের প্রসঙ্গ এলে ঋত্বিক ঘটক আসবেই।  সত্যজিতের 'পথের পাঁচালী' একটা যুগান্তকারী ছবি,  ঋত্বিক-ভক্তরা এর সাথে তুলনা টানতে পারেন  'সুবর্ণরেখা'র। অতএব তখন সেই আলোচনায় অটোমেটিক্যালি দুটো দল তৈরি হয়েই যায়।  ঋত্বিকের মাঝে পাওয়া যায় চলচ্চিত্র এবং দেশকে । তাঁর 'নাগরিক', 'অযান্ত্রিক', 'কোমলগান্ধার', 'সুবর্ণরেখা', 'যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো' অথবা 'তিতাস একটি নদীর নাম' বা 'মেঘে ঢাকা তারাসহ তাঁর প্রতিটা সিনেমাতেই মানুষ, মানুষের আর্তি, জয়জয়কার, দুঃখ এবং একই সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, নির্যতিত মানুষের চিৎকার দেখা যায় । বলা যায় ঋত্বিক আপোষহীন, দেশকে ভালোবেসে তিনি শিল্পের জন্যে নিজের গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। দেশভাগ নিয়ে একমাত্র তিনিই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। 

পথের পাঁচালী সত্যজিতের সিনেমা।  এ কথা সত্য যে  মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিরা বেড়ে উঠেছি পশ্চিমের চিন্তা, রোমান্টিকতা, চলাফেরা, কথাবার্তা, আদব-কায়দা—এসব ধারণ করে। এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে বাঙালির  চিন্তা ও মননে সুস্পষ্টভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতির একটি প্রভাব আছে। সাহিত্যে যেভাবে রবীন্দ্রনাথ, ঠিক একইভাবে চলচ্চিত্রেও সত্যজিৎ রায় বাঙালির অন্তর্গত ভাবনায় সে চিন্তাটি বুনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। আরেকটা বিষয় হলো তাঁর 'মেকিং'। অভিনয়, সংগীত, চিত্রনাট্য, সংলাপ, কোনটাকে বাদ দেওয়া যায়? সিনেমার এই সব শিল্পকে তিনি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সত্যজিৎ রায় খুব যথাযথ এবং সাবলীলভাবে শিল্পের নানা মাধ্যমগুলোকে তাঁর সিনেমায় যেভাবে ব্যবহার করেছিলেন, ঋত্বিক তা করেননি। যথাযথ শিল্প উপাদানের অনুপস্থিতিতে একটি কবিতা যেমন স্লোগানে পরিণত হয়, ঠিক একই কথা সিনেমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেখা যায় ঋত্বিক তাঁর সিনেমায় শিল্প উপাদান (কয়েকটি ছাড়া) ব্যবহারে তেমন ভাবে করতে আগ্রহী ছিলেন না।   অনেকেই হয়তো বলবেন শিল্প মানেই কি 'রিফাইন্ড' কোনো কিছু?  কাঁচামালকে একটু ঘষামাজা করলেই তো সেটি চিকচিক করে উঠবে? 
তাহলে ইউরোপীয়রা যেভাবে সিনেমায় শিল্পরস তৈরি করেছে, সেটাই কি একমাত্র ফর্ম? ফেলিনির “এইট অ্যান্ড হাফ”, অথবা আন্দ্রেই তারাকোভস্কির “মিরর” অনেকেই এক বসায় দেখতে পারেন না। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে তারাকোভস্কি ভালো চলচ্চিত্রকার নন? ফেলিনি সিনেমা বানাতে জানেন না?'

মোদ্দা কথা শিল্পরস ছাড়া সিনেমা কীভাবে তৈরি হতে পারে? ঋত্বিকের 'অযান্ত্রিক'-এর  গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল। বাবু বললেন, 'আমরা এখন যাব কী করে?' কিন্তু তাঁর সেই ডায়ালগে যে পরিমান মেলোড্রামা ছিল, আমরা কি জীবনে সেই মেলোড্রামা ব্যবহার করি? কেউ বলছেন  তাঁর সিনেমায় মেলোড্রামা খুব বেশি পরিমাণে উপস্থিত, যে কারণে অনেক সময় চরিত্রটি খুব স্বাভাবিক লাগে না। চরিত্রের কেথায় যেন একটা ধাক্কা খাই। 


কিন্তু ঋত্বিকপন্থীদের মত 'মেলোড্রামাও তো আমাদের জীবনের বিশাল একটা অংশ।  মেলোড্রামাকে কি মানুষ চরিত্রের আসনে বসাই না? মেলোড্রামা খারাপ কিছু না। সমস্যা হলো  চলচ্চিত্রে্য নির্দিষ্ট একটা ফরম্যাট থেকে বেরিয়েছিলেন ঋত্ত্বিক।


 পথের পাঁচালী'র অপু অথবা দুর্গার চরিত্র। অথবা চারুলতা! 'মহানগর' ! আমার কাছে মনে হয়েছে মহানগর সত্যজিৎ রায়ের এক অনন্য সৃষ্টি। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের রূঢ় বাস্তবতাগুলোকে অত্যন্ত নিপুণ আঁচড়ে সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন। ষাটের দশকে বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনে সৃষ্ট নানা জটিলতা এবং তাদের মানসিক জগতের পরিবর্তন সত্যজিৎ রায় 'মহানগর'-এ রূপায়িত করেছেন। বাঙালির সামাজিক সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলো কত অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে তিনি চিত্রিত করেছেন!


। বাংলা সিনেমা যত দিন আছে, তত দিন এই চরিত্রগুলো ঘুরে ফিরে বাঙালির চিন্তা আর মননে থাকবেই। ঋত্বিক এমন কোনো চরিত্র তৈরি করে যেতে পেরেছে কী?

ঋত্ত্বিক ভক্তদের মত' তাকে বুঝতে হলে মানুষের অন্তরাত্মায় যে প্রতিনিয়ত কান্নার সুরটা বাজে, সেটি আপনার ধরতে হবে। ঋত্বিক সেই আর্তনাদটি শুনতে পেয়েছিলেন। আর সে কারণে তিনি চলচ্চিত্র সংলাপের ক্ষেত্রে অনেক সাহসী ছিলেন। তাঁর “যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো”র প্রথম থেকেই দেশভাগ এর  যন্ত্রনা। ঋত্ত্বিকের একটা বোহেমিয়ান ধারা ছিল  তিনি বলেছিলেন, “আজ যদি চলচ্চিত্রের চাইতে আরও বেশি কোনো শক্তিশালী মাধ্যমের আবির্ভাব ঘটে, চলচ্চিত্রকে লাথি মেরে চলে যাব। আমি মশাই চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়িনি।” এই কথা ভূভারতে একমাত্র ঋত্বিকের পক্ষেই বলা সম্ভব।'


আসলে ঋত্বিক আর সত্যজিৎকে নিয়ে এই তর্ক কখনোই শেষ হবে না।  এটাই সঠিক 'ঋত্বিক আর সত্যজিৎ দুজনই দুই ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাতা। সত্যজিৎ তাঁর কাজ করেছেন আর ঋত্বিক করেছেন তাঁর কাজ। অন‍্যদিকে মৃণাল সেন তাঁর মতো করে সিনেমা তৈরি করছেন !

Your Opinion

We hate spam as much as you do