Tranding

07:01 PM - 04 Feb 2026

Home / Article / রো জ না ম চা র ন তু ন ব ছ র -- শঙ্খজিৎ

রো জ না ম চা র ন তু ন ব ছ র -- শঙ্খজিৎ

আমাদের দেশের বিদ্বজ্জনেরা অজন্তা-ইলোরা-খাজুরাহোর স্থাপত্য-ভাষ্কর্যের মতো। গুণে সমন্বিত,দেখতেও পরিপাট্যময়,অথচ নিথর! ভারাভারা রাও এর কবিতা অবলম্বনে নাটক—শাসক এসে বেদম মারবে,ওরা সহ্য করে নেয়! কেক উৎসবের নামে নাট্যোৎসব বন্ধ করতে শাসক নাট্যকারের গায়ে হরদম হাত তুলবে—ওরা সহ্য করে নেয়! কৃষক শ্রমিকের ঘরের ছেলে হলে তো কোনো কথাই নেই। কোনো শব্দও ওদের খরচ করতে হয়না। এই নতুন বছরেও করবেনা। এভাবেই চলছে,চলতে থাকছে!

রো জ  না ম চা র  ন তু ন  ব ছ র   --  শঙ্খজিৎ

রো জ  না ম চা র  ন তু ন  ব ছ র 

শঙ্খজিৎ 
১লা বৈশাখ ১৪৩০
(১৪ এপ্রিল ২০২৩)


লেখাটা শুরু করি এক বিষাদের অন্তর্দহন দিয়ে। আজ,চৈত্রের খরতপ্ত শেষ দুপুরে খবর পেলাম উদীয়মান এক কবি সুইসাইড করেছে। সন্ধ্যায় খবর পেলাম বরিষ্ঠ কবি,যিনি ঘটনাচক্রে আমার প্রতিবেশীও হন, বার্ধক্যজনিত অসুখে প্রয়াত হয়েছেন। আজ পর্যন্ত আমার লেখা একটি শব্দও যদি কবিতা হয়ে থাকে,তাহলে বিশুদ্ধ নীরবতার প্রকাণ্ড আগুনে দাউদাউ করে নিজেকে পোড়ানো ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিলনা। দ্বিতীয়জন ছিন্নমূল বাঙালি। সর্বাঙ্গে লেগে আছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার দাগ,ওপারের কাদামাটির আশ্চর্য গন্ধ! যে গন্ধের কাছাকাছি আজ,পঁচাত্তর বছর বাদেও ঘরবসত করে স্মৃতিসম্বলিত যৌবন। আমরা,আমাদের প্রজন্ম সেই যৌবনের,সেই বৃষ্টির কাছাকাছি প্রসন্ন হয়ে বসতে পারিনি কখনও। আর প্রথম জন? হয়তো ভেবেচিন্তেই বেছে নিলেন আজকের দিনটা...মায়াকোভষ্কির চলে যাওয়ার দিনটা। যেদিনটা,সন্ধ্যে তারার মত মৃদু আলো জ্বালিয়ে আমাদের ধাক্কা দেবে...কবিতা লেখার আগে ধাক্কা দেবে,হাত থেকে কেড়ে নেবে কলম, জিহ্বা থেকে শব্দব্রহ্মের গাম্ভীর্য। আমরা কোনোদিনও স্বস্তিতে ঘুমোতে পারবো না! 


একটা মৃত্যু। একটা আত্মহনন। রাষ্ট্রের দামড়া শরীর একজন মানুষকে গিলে খায়। গিলে খাওয়ার আগে তার চামড়া ছিঁড়ে,চোখের শিরাগুলোকে ছিঁড়ে,দলা পাকিয়ে খায়। অথচ কোন আশ্চর্য বাঁধনে আমাদের চারপাশের লোকেরা আত্মহনন-কে বানিয়ে রাখে একান্ত! আত্মহনন-কে ব্যক্তিকৃত ত্রুটি হিসেবে দেখায়! আমরা বুঝিনা। রাষ্ট্র খাবার দেবেনা,চাকরি দেবেনা,বাড়িঘর কেড়ে নেবে সস্তায়;রাষ্ট্র না কাড়ুক,রাষ্ট্রের লুঠেরা স্বজনেরা কেড়ে নেবে! অথচ আমরা এখনও গলায় ফাঁস লাগানোর কাপড়গুলো নিয়ে রাস্তায় নামতে পারিনা! আর কবে নামবো ফাঁসের দড়িটা, কাপড়টা কিম্বা বিছানার চাদরটাকে ঝাণ্ডার মতো ওড়াতে ওড়াতে কলকাতার রাস্তায়? আর কবে বুঝবো,পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রতিটি আত্মহত্যা আসলেই ব্যবস্থাকৃত গণহত্যা? এই নির্মমতার সামনে আদি-অনন্তকাল বধির হয়ে থাকতে থাকতেই কি আরো একটা নতুন বছর কেটে যাবে? 


আমাদের দেশের বিদ্বজ্জনেরা অজন্তা-ইলোরা-খাজুরাহোর স্থাপত্য-ভাষ্কর্যের মতো। গুণে সমন্বিত,দেখতেও পরিপাট্যময়,অথচ নিথর! ভারাভারা রাও এর কবিতা অবলম্বনে নাটক—শাসক এসে বেদম মারবে,ওরা সহ্য করে নেয়! কেক উৎসবের নামে নাট্যোৎসব বন্ধ করতে শাসক নাট্যকারের গায়ে হরদম হাত তুলবে—ওরা সহ্য করে নেয়! কৃষক শ্রমিকের ঘরের ছেলে হলে তো কোনো কথাই নেই। কোনো শব্দও ওদের খরচ করতে হয়না। এই নতুন বছরেও করবেনা। এভাবেই চলছে,চলতে থাকছে! 


ওদিক থেকে নব্য-ফ্যাসিবাদের ঝনঝনানি অস্ত্রের দাপটে বস্তিতে বস্তিতে স্নায়ুচাপ বাড়ে। কাজহারানো বখাটে ছেলেটা কখনও তৃণমূল,কখনও গেরুয়া তিলকধারী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। নাগপুরের সঙ্গে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের অদৃশ্য বোঝাপড়া —এদিকে দাঙ্গার অপরাধ ঘাড়ে চেপে বসে রিক্সাওয়ালার ছেলের। ফলশ্রুতিতে জেল। আবার জেল থেকে ফিরে সে খুঁজতে থাকে নতুন অপরাধের চক্র,অপরাধের জগত! আপনি ততক্ষণে বুঝতেও পারেননি এদের এই দো দিল চুপকে চুপকে অঙ্কের সারাংশ... 


পার্থ চ্যাটার্জির পর অনুব্রত,অনুব্রত-র পর ফিরহাদ হাকিম,তারপর কে? তারপর? সাসপেন্স বাড়ে। পুজোর টাকা ঢুকে যায় ক্লাবের একাউন্টে,অথবা নেতা এসে চেক লেখে। রোজা না রেখেও ইফতার পার্টিতে ভিড় জমায় ভোট গেলা রাক্ষস! আপনি ভড়কে যান। যাওয়াটাই স্বাভাবিক, মধ্য,নিম্ন-মধ্যবিত্তের সাইকেলের চাকায় সর্বক্ষণ হাওয়া থাকেনা! কাজ শেষে আপনাকে পাড়ার গুমটি সাইকেলের দোকানে যেতে হয়। নিজের বাহনকে হাওয়া দিতে হয়। ঘাম গড়িয়ে পড়ে শরীরে! আপনি ভাবেন তখন—উঁহু ওরা জানে,ওদের মগজ দখলের ম্যাথমেটিক্সটা দারুণ! আপনি নিজেও জানেন না কাল কি ভাববেন,ওরা কিন্তু জানে... 


সকালে বৌদি রুটি গড়ে দেবে কাঁচুমাচু মুখে। সঙ্গে সব্জী। আপনি হন্তদন্ত হয়ে বাজার থেকে হাত পুড়িয়ে ফেরেন। অফিসে যাওয়ার আগে নিয়ম করে ফেসবুকে হনুমানের ছবি শেয়ার করে দ্যান। মাইনে না বাড়ার সংকট যে সংকটমুখী হনুমানের ছবি শেয়ার করলে কাটেনা ওরা জানে,ভালমতো জানে। আপনি জেনে,না জেনে লুটিয়ে পড়েন! আসলে আপনাকে বলতেই হয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—ওসব করতেই হয়! আয়নাটা ভাঙছে,চিড় ধরেছে—সেদিনের অশান্তির সময় আপনি অ্যাস্ট্রে ছুড়লেন। কোণায় লেগেছে। আপনি দেখতে পান? পান কি? রাষ্ট্রের দিকে কবে অ্যাস্ট্রে ছুড়বেন? 


এত সব বধিরতার মধ্যেও,অন্ধ কারাবাসের মধ্যেও আপনার বাগানে অনাকাঙ্ক্ষিত যে ফুলটা আজ সকালে ফুটে উঠেছে,আপনি তার সৌকর্যের দিকে চেয়ে আমরা আমরা আমরা হওয়ার বাসনা কেন করবেন না! আমরা না হলে ওদের জিভ,নখ,দাঁত আপনাকে,আপনার সমস্ত শ্রমার্জিত সম্পদ ছিঁড়ে খাবে! আর কবে বুঝবেন? 


পাড়ার চ্যাঙড়া ছেলেগুলো আপনার ঘরের মেয়েদের দিকে তাকায়? আপনার রাগ হয়। আগুন জ্বলে ওঠে। কাজ না পাওয়া হাত,খাবার না পাওয়া পেটের যে মাথাটা থাকে সেটা নৈরাজ্যে ছেয়ে যায়...জানেন দাদা। রাষ্ট্রকে এর দায়মুক্ত প্রমাণ করার তাগিদ আপনার নয়! বরং তা রাষ্ট্রেরই! আপনি বুঝুন... 


জানি এই নতুন সকালে এতগুলো তিতকুটে কড়া কথা দুপুরে আপনার হাঁড়িতে সেদ্ধ হওয়া মুড়্গির ঠ্যাঙ টা হজম করাবে না। মঙ্গল শোভাযাত্রা করে আপনাকে সম্প্রীতি প্রমাণে নামতে হবে,দাঙ্গার পিছনের ক্লেদ-পুতুলগুলোকে রাস্তায় নামিয়ে শেষ করার আবিষ্ট পূরণে আপনি তৎপর হবেন। আর হাসবেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবেন,আগুনের রঙ আর আলোর কথা বলবেন। আমরা বাসে ট্রেনে,শুনবো,ভিতরের তেষ্টা মেটাবো...ওই কথাই রইল তবে। 

বছরটা ভাল কাটুক...

Your Opinion

We hate spam as much as you do