তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ বললেন,ওহে ছোকরা এখানে যখন এসে পড়েছ বেগুনি মুড়ি খাও। ভবিষ্যতে কখনো বেগুনি খাওয়ার সময় আমাদের কথা মনে পড়বে।
হঠাৎ দেখা
জয়ন্তী মন্ডল
অমল, বিদিশাদের বিদায় দিয়ে মৃণাল যখন কলেজ স্ট্রীটের চৌমাথার মোড়েএ সে যখন দাঁড়াল তখন সন্ধে ছুঁইছুঁই। ক্লান্তিতে মৃণালের পাদূটো আর চলছেনা। ড্রাইভার যে কোথায় গাড়িটা দাঁড় করিয়েছে। ফোনটাও ধরছেনা।
সেই সকাল দশটা থেকে টইটই করে কলেজষ্ট্রীট চষে বেড়াচ্ছে চারজনে। মৃণালদের ফাইল পছন্দহয় তো বিদিশার পছন্দ হয়না। বিদিশার পেন পছন্দ হয়তো অমলের হয়না।
বই এর ব্যাপারে ওরা সকলেই একমত। বক্তাদের হাতে একটা করে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির বই উপহার দেওয়া হবে। কিন্তু সেটাও কলেজস্ট্রীটের দোকানে কটা মিললেও সবকটা পাওয়া গেলনা। নানা দোকান ঘুরে শেষে বই গুলো পেলওরা। কলেজের আন্তর্জাতিক সেমিনারে এবার দায়িত্বে ওরা চারজন।তবে চারজনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা আলাদা। সেমিনারের বিষয়
‘বাংলার শিশুসাহিত্য এবং গ্লোবালাইজেশনের যুগে বাংলার শিশুসমাজ’।
কলেজস্ট্রীটের মোড়টায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মৃণালের চোখ চলে গেল রাস্তার ওপারে। দেখে একটা লোক দুহাতে কয়েকটা ঠোঙা নিয়ে হনহন করে রাস্তা পার হয়ে এদিকে আসছে।
মৃণালের মনে হল সিরাজুল না!
হ্যাঁ সিরাজুলই তো!
রাস্তাটা পার হয়ে সিরাজুল মৃণালকে এখানে হঠাত দেখতে পেয়ে বলল,
আরেব্বাস মৃণালযে! কতদিনপর! কেমন আছিস?
ভালো। তোর কিখবর? সেই যে ইউনিভার্সিটি ছেড়ে চলে গেলি আর খবর পেলাম না। হাতে এত বেগুনিমুড়ি? কোথায় চলেছিস? অফিসের টিফিন বুঝি?
সিরাজুল এক গাল হেসে বলে সেসবনা। অফিস কখন ছুটি হয়ে গেছে। এটা আমাদের বিকেলের আড্ডার জলখাবার। বেগুনি আর মুড়ি। ওই দেখ গাছতলায় সব বেগুনিমুড়ির জন্য কেমন অপেক্ষা করছে।বলে সিরাজুল বামদিক ঘুরে টেমারলেনের মুখে কয়েকজন দাঁড়িয়ে তাদের হাত বাড়িয়ে দেখায়।
সিরাজুল মৃণাল ইউনিভার্সিটির বন্ধু। এত ভালো পড়াশোনায় ছিল সিরাজুল। হঠাত প্রেসে কাজ নিয়ে পড়াশোনা ছাড়ল। তারপর আর দেখা হয়নি দুজনের। সেও প্রায় বছর বারো হবে।
মৃণাল তাকিয়ে দেখে টেমারলেনের মুখে একটা বাঁধানো কদমগাছের গোড়ায় কতকগুলো ছেলে কাকে ঘিরে ধরে জটলা করছে। তার মধ্যে দু একজন বয়স্কমানুষ ও আছেন। দু এক কথার পর টেমারলেনের দিকে তাকিয়ে সিরাজুল বলল, চল মৃণাল একবার গাছতলায় আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে যাবি। মৃণাল ভাবে কি বিপদে পড়লাম রে বাবা! একেই তো ব্যাগপত্রের ভার। তার উপর সারাদিনের ক্লান্তি। এরপর এদের সঙ্গে গল্প। ওই তো ছেলেছোকরারদল। কলেজস্ট্রীটে বই এর দোকানে, প্রেসে সব কাজ করে। এদের সঙ্গে কি ই বা গল্প করব?
মৃণাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে হাতে তেমন সময় নেই। আজ আসি। আর একদিন আলাপ করব তোর বন্ধুদের সঙ্গে।
সিরাজুল ছাড়লনা । একপ্রকার জোর করেই ধরে নিয়ে গেল মৃণালকে।
কয়েক কদম গিয়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুলকে একটা ঈশারা করতেই, একটা হাফপ্যান্ট পরা ছেলে এসে সিরাজুলের হাত থেকে মুড়ি আর বেগুনির ঠোঙা গুলো নিয়ে চলে গেল।
চায়ের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুল বলল দিদি সাতটা চা। এখন দুটো।
দুজনে দুটো চায়ের ভাঁড় নিয়ে মৃণাল সিরাজুলের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন তুই কি করিস সিরাজুল?
সিরাজুল খানিক অপ্রস্তুত হয়ে বলে ছোট একটা কাগজের অফিসে কাজ করি।
মৃণালের ঠাটবাট দেখে ,মৃণাল কি করে সেসব কথায় আর না গিয়ে সিরাজুল বলে, তুই এখন কোথায় থাকিস মৃণাল?
মৃণাল বলে, আমি যে কলেজে পড়াই সেই কলেজের পাশেই একটা ফ্ল্যাট নিয়েছি।
এমন সময় একটা হাফপ্যান্ট পরা ছেলে এসে বলল, সিরাজুলদা। দাদা তোমায় ডাকছে ।
সিরাজুল বলল ,চল মৃণাল।ওঁরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।
দুজনে পৌঁছে দেখে সকলের বেগুনি মুড়ি তখন প্রায় শেষ। কদমগাছের গোড়ায় বাঁধানো সিমেন্টের উপর ওদের দুজনের জন্য একটা মুড়ির ঠোঙা রাখা আছে।
ঠোঙ্গার দিকে তাকিয়ে মৃণাল আগেভাগেই বলল, আমি কিন্তু মুড়ি খাব না।
তখন বাঁধানো সিমেন্টের উপর যাঁরা বসেছিলেন, তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ বললেন,ওহে ছোকরা এখানে যখন এসে পড়েছ বেগুনি মুড়ি খাও। ভবিষ্যতে কখনো বেগুনি খাওয়ার সময় আমদের কথা মনে পড়বে।
মৃণাল মনে মনে ভাবে তোমরা কি কেউকেটা হে! যার জন্য তোমাদের কথা ভবিষ্যতে আমি স্মরণ করবো! যত্তসব!
সিরাজুল বলল, আয় মৃণাল আলাপ করিয়ে দিই, ইনি কান্তদা।
মৃণালকে দেখিয়ে সিরাজুল বলল, কান্তদা এ মৃণাল। আমার কলেজের বন্ধু।
মৃণাল হাত তুলে নমস্কার জানাল বৃদ্ধকে। উল্টোদিক থেকে বৃদ্ধটিও প্রতিনমস্কার জানালেন মৃণালকে। দুএককথা বলতে বলতেই একটা ছোকরা একটা বড়ভাঁড়ে রসগোল্লা এনে বৃদ্ধের হাতে দিয়ে বলল, আপনার জন্য মিষ্টি পাঠালেন সংসদের দেবজ্যোতি জ্যেঠু।
বৃদ্ধ বললেন, কিসের মিষ্টি?
ছেলেটি একগাল হেসে বলল, আপনার পুরষ্কারের খুশিতে!
একটি ছেলে চোখ বড়বড় করে বলে, আরেব্বাস! এত মিষ্টি?
ছেলেটির কথা শেষ হবার আগেই উল্লাসে ফেটে পড়ল সকলে।
মৃণাল একটু বিরক্ত মুখে সিরাজুলকে জিজ্ঞেস করল, উনি কিসের পুরস্কার পেয়েছেন? যে শিশুসাহিত্য সংসদ থেকে ওনাকে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছেন।
সিরাজুল বলল,একাডেমি পুরস্কার।
মানে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের?
সিরাজুল বলল, হ্যাঁ।
মৃণাল বিস্ফারিত চোখে বলল,মানে সাহিত্য একাডেমি ? সেতো এ বছর শিশুসাহিত্যে রজনীকান্ত সমাদ্দার পেয়েছেন!
সিরাজুল বলল হ্যাঁ ইনিই রজনীকান্তদা ।
তবে তুমি যে বললে উনি কান্তদা!
সিরাজুল বলল, আমরা ওনাকে কান্তদা বলেই ডাকি।
মৃণাল হঠাত কি যেন একটু ভেবে নিয়ে এগিয়ে গেল বৃদ্ধের কাছে।
আমার নাম মৃণাল কান্তি সেন । আপনার সঙ্গে আগেই আমার পরিচয় হয়েছে। মুঠোফোনে।
বৃদ্ধ চিন্তিত মুখে মনে করার চেষ্টা করলেন । তারপর বললেন হ্যাঁ নামটা শোনা শোনা মনে হচ্ছে। কিন্তু এখনই মনে করতে পাচ্ছিনা। কোথায় দেখেছি বলো তো ভাই?
মৃণালবলে, সেদিন বাঁকুড়ার সিধুকানু কলেজ থেকে আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।
বৃদ্ধ তখন একগাল হেসে বললেন, ঠিক বলেছ । সেদিন সিধুকানু কলেজের প্রিন্সসিপ্যাল স্যার আমায় ফোন করেছিলেন বটে। কলেজের সেমিনার আছে। সেখানে শিশুসাহিত্য নিয়ে কিছু বলার জন্য।
তুমি তাঁকে চেনো নাকি হে?
মৃণাল একটু ইতস্তত করে বলল, আমিই সিধুকানু কলেজের প্রিন্সসিপ্যাল মৃণাল কান্তি সেন।
বৃদ্ধ বললেন, বলো কি? তুমি ওই কলেজের প্রিন্সিপ্যাল? কি সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার বলো তো! আমি নিজে কখনো কলেজে পড়িনি । আর কলেজের প্রিন্সিপ্যাল কিনা ফোন করে আমায় বলছেন কলেজে বক্তৃতা দিতে। সেই থেকে আমি ভয়েই মরছি!
মৃণাল খানিক হেসে বলে, কি যে বলেন আপনি। এ সময়ের শিশুসাহিত্যে এখনো আপনি প্রথমসারিতে শিশুদিবসের দিন শিশুকিশোরদের উদ্দেশে রেডিওতে চমৎকার কটি কথা বললেন সেদিন। তা এসময়ে শিশুকিশোরদের পাথেয়। আপনার লেখাতে ও সেসব কথায় উঠে এসেছে বারবার।
বৃদ্ধ খানিক চিন্তা করে বললেন, দেখো ভাই -উপেন্দ্রকিশোর, অবনঠাকুর, লীলা মজুমদার সব এঁদের হাতে বাংলার শিশুসাহিত্য সোনার কলমে লেখা। আর আমাদের হাতে আছে কেবল ডটপেন।
মৃণাল আর বেশি কথা বাড়ালনা । বাংলা নিয়ে পড়লেও শিশুসাহিত্য নিয়ে ওর তেমন পড়াশুনানেই। যেটুকু ছিল চাকরি পাওয়ার আগে। এখন সেসব গুলে জল হয়ে গেছে।
মৃণাল খানিক এগিয়ে এসে বৃদ্ধের সঙ্গে করমর্দন করে বলল, সেমিনারে দেখাহচ্ছে । আজ আসি?
রজনীকান্তবাবু একগাল হেসে বললেন, নিশ্চয়!
ছবি - সংগৃহীত
We hate spam as much as you do