বুধবার দুপুরের দিকে কালিয়াচক-2 ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কিছু মানুষ ৷ তাদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাদের নাম বাদ গিয়েছে ৷ পরে গভীর রাত পর্যন্ত সেই বিক্ষোভ চলে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর । যদিও মাঝরাতে বিচার বিভাগের আধিকারিকদের উদ্ধার করে পুলিশ ৷ আর গোটা ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ডিজির রিপোর্ট তলব করেছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ৷
মালদা কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে DM, SP শো-কজ, প্রয়োজনে CBI-NIA তদন্ত
April 2, 2026
মালদায় বিচারবিভাগের আধিকারিকদের ঘেরাওয়ের ঘটনায় এবার কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট ৷ সাত আধিকারিকদের ঘেরাও করে রাখার ঘটনায় সিবিআই (CBI) অথবা এনআইএ (NIA)-এর তদন্ত চাইতে পারে নির্বাচন কমিশন ৷ কমিশনকে সেই মোতাবেক সিবিআই বা এনআইএ তদন্তের আর্জি জানানোর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সঙ্গে, মালদার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে বলেও এদিন মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ ৷
মালদার ঘটনায় জেলাশাসক, পুলিশ সুপারকে শো-কজ করার পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজির রিপোর্ট তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট ৷ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার লক্ষ্যে এটি একটি সুপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে ।
সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, বিচারবিভাগের আধিকারিকদের উপর মানসিক আঘাত হানার উদ্দেশে কাউকে হস্তক্ষেপ করতে বা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে তারা দেবে না । এই ঘটনা কেবল বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ভীতি প্রদর্শনেরই একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা নয়, বরং এই ঘটনা শীর্ষ আদালতের কর্তৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ করার সামিল বলেও মনে করছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ।
পাশাপাশি এদিন শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলেছে, মালদা জেলায় তিন মহিলা-সহ সাতজন বিচারবিভাগের আধিকারিকদের রাতভর ঘেরাও করে রাখার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় । SIR (এসআইআর) সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল—সেখানকার বিক্ষোভের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে ৷
এদিন নির্দেশে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, এসআইআরে আবেদন দাখিল করার সময় বা শুনানির সময় দুই বা তিন জনের বেশি ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না ৷ পাশাপাশি পাঁচজনের বেশি লোককে জমায়েত হতে দেওয়া হবে না, সেই মর্মে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, জেলাশাসক এবং সব জেলা পুলিশ আধিকারিকদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলেও নির্দেশে বলা হয়েছে । পাশাপাশি বিক্ষোভ ঘেরাওয়ের ঘটনায় মুখ্যসচিব, ডিজি এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত ।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার কারণ দর্শানোর জন্য মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত । এই সব রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকদের আগামী 6 এপ্রিল বিকেল চারটে অনলাইনে শুনানিতে উপস্থিত থাকার নির্দেশও দিয়েছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ ।
একই সঙ্গে আদালত একগুচ্ছ নির্দেশও দিয়েছে ৷ আদালত নির্দেশে জানিয়েছে, জুডিশিয়াল অফিসাররা নিরাপদে কাজ সম্পাদনের জন্য নির্বাচন কমিশন (ECI) কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করবে । জুডিশিয়াল অফিসারদের বাসভবন ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য বাহিনী মোতায়েন করতে হবে । প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, "বুধবার রাতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে জানানো হয়, কালিয়াচক এলাকায় তিন মহিলা-সহ মোট সাতজন বিচারককে দুষ্কৃতীরা ঘেরাও করে রেখেছিল ।"
প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলে, "এই ঘেরাও বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে শুরু হয় । জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার, কেউই ঘটনাস্থলে পৌঁছননি । পরিস্থিতি সামাল দিতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি নিজে থেকে ডিজিপি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে ফোন করেন ৷ অবশেষে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব এবং ডিজিপি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বাসভবনে পৌঁছন । শেষ পর্যন্ত রাত 12টার পর বিচারকদের মুক্ত করা হয়। তাদের গাড়ির উপর পাথর ছোড়া হয় এবং লাঠি, বাঁশ দিয়ে আক্রমণ করা হয় ।"
শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি বলেন, "এই ঘটনা বিচারকদের উপর ভয়ের প্রভাব ফেলবে । চিঠির শেষের আগের অনুচ্ছেদ নিয়ে আমরা অত্যন্ত হতাশ । মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি এবং হোয়াটসঅ্যাপ পাঠানোর জন্য তাঁর নম্বরও পাওয়া যায়নি !"
এরপরই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলে, "এই ঘটনা রাজ্য প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতাকে প্রকাশ করেছে । মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি এবং এসপি-র আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় । এটা কোনও সাধারণ ঘটনা নয়; বরং মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ ৷ আমরা কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বা বিচারকদের মনে ভয় তৈরি করার মাধ্যমে কাজে বাধা দিতে দেব না । এই কাজটি ফৌজদারি অবমাননা হিসেবেও গণ্য হয় । এই ঘটনা রাজ্য সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার উদাহরণ । দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জানাতে হবে, কেন বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তারা বিচারকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেননি ?"
অন্যদিকে, এদিন শীর্ষ আদালতে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত নির্বাচন কমিশনের কড়া সমালোচনা করে বলেন, "নির্বাচন কমিশনের রাজ্যে বিরোধী পক্ষের ভুমিকা পালন করা উচিত নয়।" যদিও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, "এটা আপনার রাজ্যে ঘটেছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। প্রত্যকে রাজনীতি করছেন এই বিষয় নিয়ে। রাজনৈতিক নেতাদের ভাষায় কথা বলছেন। ভাববেন না আমরা জানি না কারা এই অশান্তির ইন্ধনদাতা। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।" আইনজীবী কপিল সিব্বল বলেন, "রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যাবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত এটা।" বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি আশ্বস্ত করেন, "শীর্ষ আদালত কড়া নজর রাখছে পরিস্থিতির উপর ৷"
বুধবার দুপুরের দিকে কালিয়াচক-2 ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কিছু মানুষ ৷ তাদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাদের নাম বাদ গিয়েছে ৷ পরে গভীর রাত পর্যন্ত সেই বিক্ষোভ চলে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর । যদিও মাঝরাতে বিচার বিভাগের আধিকারিকদের উদ্ধার করে পুলিশ ৷ আর গোটা ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ডিজির রিপোর্ট তলব করেছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ৷
জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা প্রথমে ওই বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি করেন । অফিসে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে বিকেল চারটে নাগাদ তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন ৷ কার্যত গোটা বিডিও অফিস চত্বরটি ঘেরাও করে ফেলে বিক্ষোভকারীরা ।
We hate spam as much as you do