Tranding

07:03 PM - 04 Feb 2026

Home / Article / ঘুম ভাঙানিয়া🔥 লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

ঘুম ভাঙানিয়া🔥 লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

প্রখর পাণ্ডিত্য, পরিশ্রম ও মেধা, গতানুগতিকতাকে বর্জন, যুক্তির হাতুড়ির ঘায়ে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারকে চূর্ণ করা এবং হৃদয়ের গভীরতা ও অনুভব দিয়ে ছাত্রদের আকর্ষণ করা, এই ছিল তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ••• জয় করে নিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্রদের। অপার বিস্ময় ও গভীর মুগ্ধতা নিয়ে তারা শুনতো ও মর্মে গেঁথে নিতো এই তরুণ অধ্যাপকের বিদগ্ধ আলোচনা।

ঘুম ভাঙানিয়া🔥 লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

ঘুম ভাঙানিয়া🔥 লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

 

অধ্যাপক সুদীন চট্টোপাধ্যায়
 (ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত )


ঘুম ভাঙানোর গান শুনিয়েছিলেন তিনি। হিন্দু কলেজের অলিন্দে বাতায়নে ভোরের আলো ফুটেছিল, নবীন প্রাণে জেগেছিল জিজ্ঞাসার জোয়ার। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনায়  আগুন জ্বালানোর স্পর্ধা জাগিয়েছিলেন । তিনি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। 
স্বল্পায়ু জীবন, মাত্র ২২ বছর দেখেছেন এই পৃথিবীর আলো, কিন্তু যে আলো তিনি জ্বেলে দিয়ে গেছেন আজও তা মশাল হয়ে জ্বলছে। রবীন্দ্রনাথ হয়তো এঁদেরই মতো মানুষের কথা ভেবে লিখেছিলেন :
"কোন্‌ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।" 

 

ইউরেশীয় পরিবার, বাবা ফ্রান্সিস ডিরোজিও  আর মা সোফিয়া জনসন, জন্ম কলকাতার এন্টালি এলাকায় ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল। শৈশবেই মাতৃহারা , ইউরেশীয় হওয়ার জন্যে ইউরোপীয় এবং ভারতীয়, উভয় সম্প্রদায়ের কাছে অনাদৃত, ডিরোজিও সমস্ত প্রতিরোধ ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সূর্যকিরণের মতো নিজেকে মেলে ধরেছিলেন , তাঁকে মেঘে ঢেকে রাখতে পারেনি।            


ডেভিড ড্রামন্ড-এর ধর্মতলা আকাডেমিতে ৮ বছর পড়েছেন  ডিরোজিও । মাথাভর্তি চুল, মাঝখানে সিঁথি, জিজ্ঞাসায় ব্যাকুল চকচকে একজোড়া চোখ।ড্রামন্ডেরই প্রেরণায় যুক্তিবোধ ও মননশীলতা ডালপালা ছড়িয়ে বৃক্ষ হয়ে ওঠেছে তাঁর মধ্যে। যুক্তির কষ্টিপাথরে না ঘষে কোনো কিছু গ্ৰহণ করেননি, স্বপ্ন দেখেছেন এক আলোকিত প্রভাতের,পড়েছেন হিউম, স্মিথ, রবার্টসন, রীড, স্টুয়ার্ট, বেকন, পেইনসহ অনেকের গ্ৰন্থ ; বার্নসের ক্যাম্পবেলের কবিতার দ্রোহের দর্শন বুকে ভরে নিয়েছেন।  তারপর এক পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে হিন্দু কলেজের শিক্ষকতায় এসেছেন। তখন তাঁর বয়েস মাত্র ১৭ বছর ,পড়ানোর বিষয় ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস। কিন্তু বিষয়ের সীমানা পেরিয়ে তাঁর পড়ানো ছড়িয়ে পড়তো দর্শন ও বিজ্ঞান সহ অন্যান্য বিষয়ের আঙিনাতেও । 

 

প্রখর পাণ্ডিত্য, পরিশ্রম ও মেধা, গতানুগতিকতাকে বর্জন, যুক্তির হাতুড়ির ঘায়ে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারকে চূর্ণ করা এবং হৃদয়ের গভীরতা ও অনুভব দিয়ে ছাত্রদের আকর্ষণ করা, এই ছিল তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ••• জয় করে নিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্রদের। অপার বিস্ময় ও গভীর মুগ্ধতা নিয়ে তারা শুনতো ও মর্মে গেঁথে নিতো এই তরুণ অধ্যাপকের বিদগ্ধ আলোচনা। জ্ঞানতৃষ্ণায় চঞ্চল ছাত্ররা শ্রেণিকক্ষের বাইরেও, এমনকি ডিরোজিওর বাড়িতেও অফুরন্ত আলোচনায় মেতে উঠতো। তাঁর অনুপ্রেরণায় ছাত্রদের নিয়ে তৈরি হলো ‘অ্যাকাডেমিক এসোসিয়েশন’, ‘সোসাইটি ফর দ্য অ্যাকুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ’, তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রকাশিত হলো ছাত্র কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘দ্য এনকোয়ারার’ ও দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদনায় ‘জ্ঞানান্বেষণ’ । 

 

সেযুগের সবচেয়ে মেধাবী, মনস্বী , উদ্যোগী ও সম্ভাবনাময়  ছাত্রেরা, কেশব সেন, রামতনু লাহিড়ী, রাধানাথ শিকদার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গৌরদাস বসাক, ভূদেব মুখোপাধায়, বঙ্কুবিহারী দত্ত, শ্যামাচরণ লাহা প্রমুখ তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেন নব চিন্তাধারায়, দীক্ষিত হলেন নতুন জীবন জিজ্ঞাসায়। সকলেই যে তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র এমন নয়, কিন্তু সকলেই আকৃষ্ট তাঁর অনুপ্রাণিত আলোচনা ও অধ্যাপনায়।

 

ঝড় উঠলো কলেজের অলিন্দে বাতায়নে, অন্ধকার সরিয়ে আলো ফুটলো। তর্কমুখর ও জিজ্ঞাসায় জীবন্ত  ডিরোজিওর ছাত্রদল "ইয়ং বেঙ্গল" নামে ছড়িয়ে পড়লেন কলকাতায়, টুকরো করে ছিঁড়ে দিতে উদ্যত হলেন সব অন্ধতা ও কুসংস্কারের বন্ধন। আলোড়ন পড়ে গেলো,••রক্ষণশীল সমাজ যেন সর্পদংশনের বিষক্রিয়ায় ছটফটিয়ে উঠলো। বিচলিত অভিভাবকবৃন্দ, সমাজ পিতারা, কলেজ পরিচালকগণ খড়্গহস্ত হলেন তরুণ অধ্যাপকের ওপর। কিন্তু ততক্ষণে যে স্ফুলিঙ্গ তিনি জ্বালিয়েছিলেন তা প্রেয়ারির অরণ্যে দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়েছে আর আগুনখেকো তরুণ শিক্ষক ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কৃত ও বিতাড়িত হতে হয়েছে। তবে আগুন তাতে নেভেনি। 

 


ধিকি ধিকি জ্বলেছে, আজও জ্বলছে সে আগুন  জিজ্ঞাসু , তার্কিক, আলোচনাপ্রবণ,  সত্যান্বেষণে স্পর্ধিত নবীন শিক্ষার্থীদের মনে।
বহিষ্কৃত ডিরোজিও ১৮৩১ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে শোকাতুর ছাত্রেরা অশ্রু, শ্রদ্ধা ও ব্যথায় তাঁদের অন্তিম দক্ষিণা দেন। সে ছিল এক মর্মন্তুদ দৃশ্য । তাঁরাই বয়ে নিয়ে যান তাঁদের দীক্ষাগুরুর দেহ। কিন্তু বিরূপ গির্জা ও খ্রিষ্টধর্ম কর্তৃপক্ষ ধর্ম সম্পর্কে ডিরোজিওর অভিমতের কারণে পার্ক স্ট্রিটের সমাধিস্থলে তাঁকে সমাহিত করা নিষিদ্ধ করে। সমাধিক্ষেত্রের বাইরে  অদৃষ্টপূর্ব আবেগ ও শ্রদ্ধায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজও তাঁর সমাধি স্তম্ভ সমস্ত রকমের প্রগতিবিরোধী অবক্ষয়,অন্ধকার ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে স্পর্ধিত প্রতিবাদ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আলো'কে আবাহন জানাচ্ছে।  

Your Opinion

We hate spam as much as you do