বাবা মিহির এই কথা বললে কী হবে, মা মিতা কোনোমতেই এই কথায় সন্তুষ্ট নয়। ভিলেনের এরকম বদমাইশি দেখতে দেখতে ঠিক বদমাইশিই শিখবে।“
কবিতা ও ছোট গল্প newscopes.in 25th july
দেব চক্রবর্তী
মনজিৎ গাইন
পরিযায়ী
দেব চক্রবর্তী
ইদানীং যেন ভালোই লাগে না আর
ইচ্ছে হয় আগুনে পুড়ে হই ছারখার ॥
বিরুদ্ধতা যদি হয় পরাবাস্তব মুখ
তবে জেনো আমিই সেই আগুনমুখর সুখ ॥
শ্রাবণ আনে নি বর্ষা এখনও আকাশে
সব ফেলে রেখে যাই চলে তবে মৃত মেঘেদের দেশে ।
এমন কথা ছিলো কি কখনও স্থায়ী
মৃত্যু ক্ষুধায় কাটাবে এতো ভাই-বোন পরিযায়ী!
তবে তন্ত্রসাধনা ভুলে যাও ,হোক ক্ষীণ
এই শ্রাবণেই মেটাবো আমি মরা মানুষের ঋণ
ছোট গল্প
আসল হিরো
মনজিৎ গাইন
রবি খুব সিনেমা দেখতে ভালোবাসে। সময় পেলেই সে টিভি খুলে বসে যায়। তারপর সে খুব মন দিয়ে সিনেমা দেখে। ওর মা তো রবিকে সিনেমা দেখতে দেখলেই চ্যাঁচায়, “সারাদিন ধরে তোর শুধু সিনেমা দেখা, পড়াশুনোয় একেবারেই মন নেই।“
“ও মা, তুমি এরকম করছ কেন, এই তো আমি সারাদিন স্কুলে পড়াশুনো করেছি, বিকেলে শুধু একটু সিনেমা দেখছি।“
“না, সবসময় তোর ওই ঢিসুম-ঢিসুম সিনেমা দেখা।“
“না মা, তুমি ওরকম বলো না। ওই সিনেমাগুলো খুব ভালো হয়। জানো কত কিছু শেখা যায় ওইসব সিনেমা দেখে।।“
“কী শেখা যায় ওইসব সিনেমা থেকে?”
“ওই যে অন্যায় করা ভালো না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়, যে অন্যায় করে সে সবসময় শাস্তি পায়, এইসব।“
“এই হচ্ছে তোর সব পাকা-পাকা কথা।“
“না মা, তুমি একবার দেখো একটা সিনেমা, তারপর দেখবে তুমিও ঢিসুম-ঢিসুম সিনেমার ফ্যান হয়ে গিয়েছ।“
রবির কথায় মা মিতা শেষপর্যন্ত রাজি হয় রবির সঙ্গে ওর পছন্দের ঢিসুম-ঢিসুম সিনেমা একদিন দেখতে। ঠিক হল সন্ধের সময় ওরা একসঙ্গে সিনেমা দেখবে যেসময় ওর বাবাও ফিরে আসে।
সবাই মিলে তাই সিনেমা দেখা শুরু করেছে সেদিন সন্ধেবেলায়। ওর বাবা তখনও ফেরিনি। ওর বাবা দিল্লির একটা বেসরকারি জায়গায় কাজ করে। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়।
এদিকে ওদের সিনেমা শুরু হয়ে গিয়েছে। রবি আর ওর মা দেখছে। বাবা তখনও ফেরেনি। সিনেমার শুরু থেকেই শুধু মারপিট আর মারপিট। যে ভিলেন হয়েছে সে সে খুবই বদমাইশ। সবার ওপর তার অত্যাচার।
মা দেখছে আর রবিকে বলছে, “তুই এই ভিলেনের অত্যাচার দেখছিস টিভি খুলে। আগে বন্ধ কর টিভি। কী বদমাইশ এই লোকটা রে!”
“তুমি দেখো না, শেষপর্যন্ত নায়ক কীরকম ওই ভিলেনকে শাস্তি দেয়।“
“ধুস্, আমার এইসব বদমাইশি দেখতে দেখতে একদম ভালো লাগে না। এই ভিলেনটার নাম কী রে?”
“রাজিন্দর গোয়েল। এখন হিন্দি সিনেমার একেবারে এক নম্বর ভিলেন, দেখেছ কীরকম অভিনয় করছে, একেবারে অসাধারণ!”
“না, তোর এইসব দেখতে হবে না। অভিনয় না ছাই, যত বদমাইশি। আবার তুই বলছিস অসাধারণ অভিনয়। একদম তোর এই ভিলেনের সিনেমা দেখতে হবে না। তাহলে তুই এই ভিলেনের মতোই হবি, বদমাইশি শিখবি।“
এইসব কথার মধ্যেই রবির বাবা মিহির ঘরে এল। ওরা এক কামরা নিয়ে ভাড়া থাকে একটা বাড়িতে। মিহিরের আয়পত্তর খুব বেশি না। মালদায় ওদের বাড়ি। এখানে এই কাজটা পেয়ে ওরা এখন এখানেই থাকে।
মিহির বাড়িতে এসেই জিজ্ঞাসা করে, “কী ব্যাপার, তোমাদের আবার কী হল, মা-ছেলের মধ্যে এত ঝামেলা কেন?”
মিহির ঢুকতেই মিতা রবির কাছে অভিযোগ জানায়, “দেখো না, রবি কীসব সিনেমা দেখছে, আবার আমাকেও দেখাচ্ছে। এর ভিলেনটা কী বদ! সবার ওপরে অত্যাচার করছে, একেবারে দেখা যাচ্ছে না। আর রবি ওই ভিলেনের বদমাইশি দেখে বলছে, “অসাধারণ অভিনয় করছে। এইসব হিন্দি সিনেমা দেখেই রবি যত বদমাইশি শিখছে। বড়ো হয়ে ও দেখো ঠিক ওই ভিলেনের মতো একজন বদমাইশ হবে।“
রবি মায়ের এত অভিযোগ শুনে একেবারে কাঁদো-কাঁদো। ও শুধু বাবাকে বলে, “দেখো না, মা কীসব বলছে!”
মিহিরও হাত-মুখ ধুয়ে টিভি দেখতে বসে যায়। মিহির ভিলেনকে দেখে বলে, “আরে, এ তো রাজিন্দর গোয়েল। খুব নামি অভিনেতা।“
মিতা মিহিরকে ব্যঙ্গ করেই বলে, “হু, নামি অভিনেতা! এত বদমাইশি, আবার নামি অভিনেতা!”
“তুমি একটু চুপ করো তো, আমি রবিকে বলে দিচ্ছি।“
এটা বলে মিহির ছেলেকে বলে, “অ্যাই রবি, তোকে কিন্তু আমি বলে দিলাম, এরকম সিনেমা দেখছিস দেখ কিন্তু কোনোদিন এই ভিলেনের মতো বড়ো হয়ে বদমাইশি করিস না।“
“না বাবা, আমি শুধু সিনেমা দেখি কিন্তু ওই ভিলেনের মতো বদমাইশি শিখি না। বড়ো হয়ে কোনোদিন ওরকম বদমাইশি করব না, আমি খুব ভালো হয়ে থাকব।“
রবির মুখ থেকে এই কথা শোনার পরে মিহির মিতাকে বলল, “দেখেছ, আমাদের রবি সত্যিই খুব ভালো ছেলে। আর ও তো বলেই দিল বড়ো হয়ে কোনোদিন বদমাইশি শিখবে না। ভালো হয়ে থাকবে।“
বাবা মিহির এই কথা বললে কী হবে, মা মিতা কোনোমতেই এই কথায় সন্তুষ্ট নয়। ভিলেনের এরকম বদমাইশি দেখতে দেখতে ঠিক বদমাইশিই শিখবে।“
মিতার ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও রবি মাঝেমাঝেই ওরকম ঢিসুম-ঢিসুম সিনেমা দেখে। আর মা-ও সমানে গজ-গজ করে। এইভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন সব গন্ডগোল হয়ে গেল। মারাত্মক করোনা ভাইরাস আক্রমণ করেছে। সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতেও এসেছে আর করোনা থেকে বাঁচতে হঠাৎ করেই লকডাউন সারা দেশে। কেউ কোথাও বেরোতে পারবে না। সব অফিস-স্কুল-কলেজ-বাস-ট্রেন বন্ধ।
রবির বাবা মিহিরেরও অফিস বন্ধ হয়ে গেল। মিতা খুবই চিন্তিত। সে মিহিরকে বলছে, “কী হল বলো তো, আবার কবে সব স্বাভাবিক হবে?”
“সেটাই তো ভাবছি। তবে নিশ্চয়ই খুব তাড়াতাড়ি সব স্বাভাবিক হবে।“
মিহির যতই এই কথা বলুক তার মনেও আশঙ্কার মেঘ! এপ্রিলের মাইনে হয়নি। লকডাউন উঠে কবে যে কোম্পানি খুলবে তা যে কেউই বলতে পারছে না। এদিকে বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া মেটানোর জন্যে চাপ দিচ্ছে। জমানো টাকাও যে সব শেষ হয়ে আসছে আস্তে আস্তে কী যে হবে!
পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে দিল্লিতে। ক্রমশ করোনা বাড়ছে। সারা দেশে লকডাউন বাড়ছে। বাড়িওয়ালা সেদিন পরিষ্কার বলে গেল, “দেখো আমি ওসব কিছু বুঝি না। তুমি হয় বাড়িভাড়া মেটাও নাহলে আমার কামরা ছেড়ে দাও। কামরা ভাড়া নেওয়ার লোক অনেক আছে!”
“আমায় আর একটু সময় দিন দাদা। দেখছেন তো কোম্পানি বন্ধ, সারা দেশে লকডাউন চলছে।“
“ওসব আমি কছু বুঝি না। যত সব ছিঁচকাঁদুনে! আমি তোমাকে এই মাসের শেষপর্যন্ত সময় দিচ্ছি তারমধ্যে হয় তুমি এই দুই মাসের ঘরভাড়া মেটাবে নাহলে ঘর ছেড়ে দেবে, পরিষ্কার বলে দিলাম।“
কিন্তু মিহির কোথা থেকে ঘরভাড়া মেটাবে তার হাতে তো এখন কোনো টাকাই নেই। সংসার চালাবে, সেই খরচাই নেই, তা আবার ঘরভাড়া!
মাস শেষ হতেই সেই বাড়িওয়ালা খুব বাজে ব্যবহার করে তাদের ঘর থেকে বার করে দিল। মিতা অনেক কেঁদেকেটে ওর পায়ে ধরল কিন্তু কোনোভাবেই তার মন গলাতে পারল না। একেবারে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল রবিরা। কী হবে এবার? এদিকে চারপাশে করোনার ভয়। এইভাবে তারা থাকবে কী করে?
তারা যে মালদায় ফিরে যাবে তারও কোনো উপায় নেই। সব ট্রেন-বাস-গাড়ি বন্ধ। কয়েকদিন তারা কোনোভাবে কাটাল কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না। মিতা জিজ্ঞাসা করল, “কী করবে বলো তো?”
“ভাবছি বাড়ি চলে যাব।“
“কিন্তু আমরা বাড়ি যাব কী করে? সব গাড়িই তো বন্ধ।“
“ভাবছি আমরা হেঁটেই ফিরব।“
“কিন্তু সে তো অনেক দূর! কীভাবে আমরা হেঁটে যেতে পারব?”
“ঠিক পারব, চলো না আমরা হাঁটি। একটু চেষ্টা করি।“
“সে না হয় আমরা কোনোরকমে হাঁটলাম কিন্তু ছোটো রবি পারবে কী করে?”
রবি অবশ্য বাবার কথা শুনে বলল, “না-না, আমি ঠিক পারব।“
তারপর সত্যিই ওরা হাঁটা শুরু করে। খুব কষ্ট হচ্ছে ওদের, তবুও ওরা হাঁটছে। ওদের আগে, পরে হাঁটছে আরও অনেকজন। তারা কেউ পরিযায়ী শ্রমিক, কেউবা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করে। কেউ ফিরবে বিহারে, কেউ ঝাড়খন্ডে, কেউবা আবার ওড়িশায়।
অনেক অনেক মানুষ হাঁটছে। খুব কষ্ট হয়ে গেলে তারা কেউ একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। তবুও তারা হাঁটছে। তাদের যে বাড়ি পৌঁছোতে হবেই।
রবিরাও হাঁটছে। রবির খুব কষ্ট হচ্ছে। সে বারবার পিছিয়ে পড়ছে। তবুও সে হাঁটছে। কিন্তু এবারে সে আর পারছে না। খুব খিদে কষ্টে সে রাস্তার মাঝে লুটিয়ে পড়ল। খুব খুব হাঁফাচ্ছে সে। মিতা তার চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। এদিকে জলও কমে আসছে। মিহির জিজ্ঞাসা করছে, “রবি কী হচ্ছে রে তোর?”
“আমি আর পারছি না বাবা, আমার খুব খুব কষ্ট হচ্ছে।“
কী করবে এবার মিহির আর মিতা এইভাবে রাস্তায় চলতে চলতে অসুস্থ হয়ে পড়া রবিকে নিয়ে? কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তারা।। রাস্তা দিয়ে অন্য যারা হাঁটছিল তারা দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাদেরও যে কিছু করার নেই। চোখের সামনে রবি আরও নেতিয়ে পড়তে লাগল। মিহির আর মিতা হাউ-হাউ করে কাঁদছে।
এমন সময়ে একটা বড়ো গাড়ি তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। যারা হাঁটছে তাদের জন্যে খাবার আর জল এনেছে। সবার জন্যে। রবিকে ওইভাবে অসুস্থ দেখে তারা আর দেরি করল না। ওখানে যারা ছিল সকলের জন্যে খাবার-জল আর খাবার রেখে ওদের তিনজনকে তুলে নিয়ে হসপিটালের দিকে রওনা দিল ওই গাড়ি।
খুব তাড়াতাড়ি বড়ো একটা হসপিটালে ভর্তি করে রবিকে ওই গাড়ির মধ্যে থাকা মানুষরা। ডাক্তার রবিকে দেখে বলল, “একে আনতে আরেকটু দেরি হলে মনে হয় বাঁচানো যেত না।“
ওদের তিনজনেরই হসপিটালে করোনা টেস্ট হয়েছে। চিকিৎসা পেয়ে রবি কয়েক ঘন্টার মধ্যে একটু সুস্থ হয়েছে। সে এখন কথা বলতে পারছে।
রবি ওর বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করছে, “আমাকে এখানে কে আনল, তোমরা?”
“না রে, তুই যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলিস তখন একটা গাড়ি ওখানে এসে খাবার দিয়ে তোকে তুলে নিয়ে আসে এই হসপিটালে, সঙ্গে আমাদেরও আনে।“
“কিন্তু বাবা, এ তো খুব বড়ো হসপিটাল আর তাই এখানে নিশ্চয়ই অনেক টাকা বিল হবে, সেটা কী হবে?”
রবির এই কথা শুনে ওখানে যে নার্স ছিল সে বলল, “এসব তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, তোমাকে হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছে বিখ্যাত অভিনেতা রাজিন্দর গোয়েলের পাঠানো ব্যক্তিরা। রাজিন্দর গোয়েলই তোমার সব বিল মিটিয়ে দেবেন। তোমার এসব একদম চিন্তা করতে হবে না, তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো।“
রবি তাই শুনে খুব অবাক হয়ে বলে, “রাজিন্দর গোয়েল মানে তো হিন্দি সিনেমার সেই বিখ্যাত ভিলেন যে শুধু বদমাইশির অভিনয় করে।“
নার্স রবির কথায় হেসে বলে, “সে তো শুধু সিনেমায়, এমনিতে রাজিন্দর গোয়েল খুব ভালো মানুষ। এই লকডাউনে আটকে পড়া কত মানুষকে খাওয়াচ্ছেন, তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। আর তোমাদেরও গোয়েলজির সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে তোমার এখান থেকে ছুটি দেওয়া হলে। সেখানে তোমরা যতদিন সবকিছু স্বাভাবিক না হয়, থাকবে। তোমাদের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব সব ওঁনার।“
এই কথা শুনে ওদের তিনজনেরই কেমন যেন হতে লাগল। রবির মা শুধু বলল, “রবি, তোকে এতদিন বলেছি ওই ভিলেনের মতো না হতে, এখন আমি তোকে বলছি তুই বড়ো হয়ে ওই ভিলেনের মতো হোস। আর এইভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াস। ওই ভিলেনই হচ্ছে আসল হিরো!”
We hate spam as much as you do