হ্যাঁ, সূর্যকান্ত মিশ্রর কথা বলছি। কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রর কথা। দরজায় বেল বাজাতেই ওনার স্ত্রী কমরেড ঊষা মিশ্র দরজা খুলে দিলেন। না আছে নিরাপত্তার বেষ্টনী, না আছে দরজার ভিতর থেকে কে এসেছে জিজ্ঞেস করার বালাই। মেহনতী মানুষের নেতার বাড়ি। সবসময় সকলের অবাধ প্রবেশ। একনজরে দেখে মনে হল, ৬০০-৮০০ স্কোয়ার ফুটের ছোট্ট একটা আবাসন, দুটো ছোট্ট রুম, ঘুপচি একটা রান্নাঘর, রান্নাঘরের পাশেই ফাইবারের একটা ডাইনিং টেবিল, হাজার তিনেক দাম হবে হয়তো। তাতে আবার জলের বোতলে অর্ধেকটা জায়গা ভর্তি। ঠিক যে রুম টায় কমরেড সূর্য মিশ্র বিশ্রাম নেন, সেই রুমের দরজায় সোজাসুজি ৩/৫ ফুটের একটা বাথরুম।'
'নেই AC, ঘুপচি রান্নাঘর রংচটা দেওয়াল', সিপিআইএম নেতা ডাঃ সূর্য মিশ্রের বাড়ির কাহিনি ভাইরাল
একটি ভাইরাল পোস্টে বলা হয়েছে, ‘(সূর্যকান্ত মিশ্রের) পরনে গোলগলা একটা গেঞ্জি, আর লুঙ্গি পরে বসে ব্রাত্য বসুদের কথায় কোটিপতি সূর্য মিশ্র তখন ফ্যানের নীচে, তখন বই পড়ছেন। ঘরজুড়ে বইয়ের ভাণ্ডার। স্পিল্ট এসি? আচ্ছা উইন্ডো এসি? থাক সেটা আর বললাম না।’
নেই এসি, ঘুপচি রান্নাঘর, রংচটা দেওয়াল - ভাইরাল হয়ে গেল সূর্যকান্ত মিশ্রের বাড়ির ইতিবৃত্ত। সিপিআইএম নেতাদের দাবি, একজন প্রাক্তন মন্ত্রী এবং একটি দলের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদকের যে এরকম ছিমছাম বাড়ি হতে পারে, তা চোখে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বিশ্বাস করা যায় না।
গত বুধবার (১০ অগস্ট) সৌম্যশুভ্র চট্টোপাধ্যায় নামে এক বাম সমর্থক ফেসবুকে সূর্যকান্তকে নিয়ে সেই লেখা পোস্ট করেন। যা ‘পটাশপুর কমিউনিস্ট পার্টি - C.P.M’ নামে একটি পেজেও পোস্ট করা হয়। সেই পোস্ট সোশ্য়াল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ১০,০০০-র বেশি শেয়ার হয়েছে। লাইকের সংখ্যা ৯৪,০০০ পেরিয়ে গিয়েছে।
পোস্টে কী লেখা?
'এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গিয়ে দেখি পুরো উল্টো। হ্যাঁ, সূর্যকান্ত মিশ্রর কথা বলছি। কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রর কথা। দরজায় বেল বাজাতেই ওনার স্ত্রী কমরেড ঊষা মিশ্র দরজা খুলে দিলেন। না আছে নিরাপত্তার বেষ্টনী, না আছে দরজার ভিতর থেকে কে এসেছে জিজ্ঞেস করার বালাই। মেহনতী মানুষের নেতার বাড়ি। সবসময় সকলের অবাধ প্রবেশ। একনজরে দেখে মনে হল, ৬০০-৮০০ স্কোয়ার ফুটের ছোট্ট একটা আবাসন, দুটো ছোট্ট রুম, ঘুপচি একটা রান্নাঘর, রান্নাঘরের পাশেই ফাইবারের একটা ডাইনিং টেবিল, হাজার তিনেক দাম হবে হয়তো। তাতে আবার জলের বোতলে অর্ধেকটা জায়গা ভর্তি। ঠিক যে রুম টায় কমরেড সূর্য মিশ্র বিশ্রাম নেন, সেই রুমের দরজায় সোজাসুজি ৩/৫ ফুটের একটা বাথরুম।'
‘প্রথম বিষয় হল, একজন কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক হয়েও আমি যা দেখে চমকে গিয়েছি। নিজেকে প্রশ্ন করছি, এটা সূর্য মিশ্রের বাড়ি? রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের আমলের মন্ত্রীর বাড়ি? কিন্তু কথায় আছে না, নিজের চোখে দেখে তবেই বিশ্বাস কর। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারি না। পরনে গোলগলা একটা গেঞ্জি, আর লুঙ্গি পরে বসে ব্রাত্য বসুদের কথায় (সম্প্রতি তৃণমূলের তরফে অভিযোগ করা হয়, সূর্যকান্তদের সম্পত্তি বহু বেড়েছে) কোটিপতি সূর্য মিশ্র তখন ফ্যানের নীচে, তখন বই পড়ছেন। ঘরজুড়ে বইয়ের ভাণ্ডার। স্পিল্ট এসি? আচ্ছা উইন্ডো এসি? থাক সেটা আর বললাম না। দেওয়াল থেকে রঙ খসে পড়ছে। ওঁনার বাবার ছবি, ওঁনার পুরস্কার পাওয়ার ছবি - জানালার উপরে একটা তাক বানিয়ে সেখানেই সাজিয়ে রাখা। কাঁচের অভাবে তাতে ধুলোও জমেছে। শ্রদ্ধার পাহাড়টা যেন হিমালয়ের চেয়েও উঁচু হয়ে যাচ্ছে।’
কথার মাঝেই প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা আপনার দেশের বাড়ি নারায়ণগড়ে তাই তো? কী যেন একটা গ্রামের নাম বললেন। আর বললেন নারায়ণগড় আমার বিধানসভা এলাকা। এখন তো আর বাড়ি যাওয়া তেমন হয় না। উনি কথা বলে যাচ্ছেন, আমি আশপাশটা একটু ভালো করে মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছি। হঠাৎ চোখ পড়ল, ওঁনার সফরসঙ্গী সেই ছোট্ট ব্রিফকেসটা। মেঝেতেই রাখা আছে। একটা কোণা ঘসা লেগে লেগে রং চটেছে। ভাবতেই পারেন এ আর এমন কী। বিষয় সেটা না। বিষয় সংসদের অধিবেশনে যখন লক্ষাধিক টাকার সাইড ব্যাগ নিয়ে একবারের সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে ক্যামেরা দেখে ব্যাগ লুকোতে হয়, তখন সূর্যকান্ত মিশ্রর ওই রঙচটা ব্রিফকেসটাই আমাদের কাছে অহংকার।'
‘হঠাৎ দেখি একটা বাচ্চা মেয়ে, ওই ক্লাস ৪-৫ এ পড়ে, এসে জিজ্ঞেস করল দাদা চায়ে চিনি দেবে? জেঠিমা জিজ্ঞেস করছে। বললাম না, চা-টা খাব না। কমরেড ঊষা মিশ্র এগিয়ে এসে বললেন, তাহলে এই নাও বিস্কুট অন্তত খাও। জিজ্ঞেস করলাম এটা কি আপনার নাতনি? কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রই মুচকি হেসে বললেন - না ভাইজি। ওর দাদু আমাদের দেশের বাড়িতে থাকত, এখনও এখানেই পড়াশুনো করে। ভাবা যায়, অন্যের সন্তানকে নিজের বাড়িতে রেখে তার পড়াশুনোর দায়িত্ব নিয়েছেন কেউ? এই সমাজে তো না-ই। শ্রদ্ধার পাহাড়টা যেন উচ্চতা বাড়িয়ে পর্বতে পরিণত হচ্ছে।’
‘আজ এতদিন পর এতগুলো কথা বলার হঠাৎ কেন প্রয়োজন নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না। কিন্তু ঠান্ডা ঘরে বসে চুরির টাকায় যখন চলাফেরা করা মন্ত্রী-বিধায়করা সাংবাদিক সম্মেলন করে, তখন আজীবন সুখের ডাক্তারির চাকরি ছেড়ে পার্টির হোলটাইমার হয়ে মাসে কয়েক হাজার টাকার ভাতাতেই ঘর চালান সূর্য মিশ্র-রামচন্দ্র ডোমরা। আর তাঁদের বিরুদ্ধেই যখন সেই সাংবাদিক সম্মেলন থেকে দুর্নীতির আঙুল তোলা হয়, তখন প্রতিবাদ বারবারই কলম বেছে নেয়। সেই পাঞ্জাবিতেই দুর্নীতির কালি ছেটানো হয়, জেলা সফরে গিয়ে যে মানুষটাকে পরপর তিনদিন একই পাঞ্জাবিতে বিভিন্ন পার্টি প্রোগ্রামে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়। ঠিক তখন যেন বুক ঠুকে বারবার বলতে ইচ্ছে হয় – উনিই আমাদের নেতা। আমাদের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক।’
‘সম্পত্তি বলতে দেশের বাড়িতে প্রায় ১০ কাঠা জায়গা পৈতৃক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, ২০১১ সালে যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা। ২০১১ সালে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির পরিমাণ ধরে) সম্পত্তির পরিমাণ সর্বসাকুল্যে ১৫ লক্ষ+ টাকা।। কলকাতা কর্পোরেশনের সামনে যখন দাঁড়িয়ে থাকে তৃণমূলের পুরপিতাদের কোটি টাকার গাড়ি, তখন সুর্য মিশ্রের মতো মানুষের মোটরসাইকেল/চারচাকা নেই একটাও।’
We hate spam as much as you do