সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এন ভি রমনা শনিবার বলেছেন, সরকার আদালতের নির্দেশ না মানলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে মঙ্গলজনক হয় না। গণতন্ত্রে আইনসভা, বিচার বিভাগ ও সরকারের কাজের পরিধি নির্দিষ্ট করা রয়েছে। প্রত্যেকেরই সেই পরিধির মধ্যে থাকা দরকার। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। লক্ষ্মণরেখা কারও অতিক্রম করা উচিত নয়।
"সরকার আদালতের রায় মানছে না" প্রধান বিচারপতির মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর সামনে
সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনেই সরকারের সমালোচনায় সরব দেশের প্রধান বিচারপতি এন ভি রামনা। স্পষ্ট জানালেন, ‘দেখা যাচ্ছে, আদালতের বহু নির্দেশ সরকার মানতে চাইছে না। এটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে চরম বিপজ্জনক।’ সম্প্রতি দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীতে উচ্ছেদ অভিযানে সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ দেওয়া সত্ত্বেও বুলডোজার চালানো হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত। অর্থাৎ শুধু সরকার নয়, পুরসভাও যে সুপ্রিম কোর্টের রায় মানছে না, সেটা স্পষ্ট। শনিবার প্রধান বিচারপতির কণ্ঠে শোনা গেল সেই ক্ষোভেরই সুর।
দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী ও হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলনে এদিন হাজির ছিলেন এন ভি রামনা। সেখানে তিনি বলেন, ‘দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানে তিন বিভাগের অধিকার ও দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। প্রশাসন, আইনসভা এবং বিচার ব্যবস্থা—প্রত্যেকের অধিকারের একটি লক্ষ্মণরেখা আছে। সেই গণ্ডি অতিক্রম করা উচিত নয়। বিচার বিভাগ কখনও সরকারের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু মানুষ যখন আদালতে এসে সুবিচার চায়, তখন বিচার বিভাগ তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। কারণ, মানুষের জন্যই সংবিধান। কিন্তু, বহু ক্ষেত্রে সরকারগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে বিচার বিভাগের নির্দেশিকা অমান্য করে। এই প্রবণতা উদ্বেগজনক।’ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি যখন এভাবে সরকারকে বিদ্ধ করছেন, তখন মঞ্চে উপবিষ্ট স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি।
এদিনের বৈঠকটির পোশাকি নাম জয়েন্ট কনফারেন্স অব চিফ মিনিস্টার্স অব দ্য স্টেটস অ্যান্ড চিফ জাস্টিসেস অব দ্য হাইকোর্টস। বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে আরও বেশি সমন্বয় গড়ে তোলার লক্ষ্যেই হয়ে থাকে এই সম্মেলন। ২০১৬ সালের পর এদিন আবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বসেছিল সেই আসর। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সামনেই সরকারের পাশাপাশি আইনসভাকেও সতর্ক করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেছেন, ‘কোনও আলোচনা ছাড়া যথেচ্ছভাবে আইন পাশ করা নীতিসম্মত নয়। বরং তা সমস্যাই তৈরি করে।’
এক্ষেত্রে রামনা সরাসরি কোনও উদাহরণ না দিলেও নিঃসন্দেহে এর অতি সাম্প্রতিকতম নমুনা তিন কৃষি আইন। প্রধান বিচারপতির সতর্কবার্তা থেকে মনে করা হচ্ছে, তিনি সরকারকে আরও বেশি সহিষ্ণু ও আলোচনার পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে দেশজুড়ে যখন হঠাৎ হিন্দি বনাম আঞ্চলিক ভাষা বিতর্ক চরমে, তখন এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জয়গান গেয়েছেন মাতৃভাষার। মোদি বলেন, ‘আইনের নানাবিধ পরিভাষা আছে। তা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাই আমরা একটা আইন আনতে চলেছি, যাতে আইনি পরিভাষাগুলি স্থানীয় সহজবোধ্য ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।’
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এন ভি রমনা শনিবার বলেছেন, সরকার আদালতের নির্দেশ না মানলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে মঙ্গলজনক হয় না। গণতন্ত্রে আইনসভা, বিচার বিভাগ ও সরকারের কাজের পরিধি নির্দিষ্ট করা রয়েছে। প্রত্যেকেরই সেই পরিধির মধ্যে থাকা দরকার। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। লক্ষ্মণরেখা কারও অতিক্রম করা উচিত নয়।
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে এন ভি রমনা বুঝিয়ে দিলেন, স্পষ্ট বিভাজিকা থাকলেও সরকার সময়–সময় অনধিকার চর্চা করছে। সরকারের ভূমিকার সরাসরি সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের নির্দেশ পালনেও প্রায়ই সরকারকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে এই প্রবণতা ভালো নয়।
প্রধান বিচারপতি রমনা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, সরকারের দুই বিভাগের ঝগড়া কেন আদালতে পৌঁছায়, তা বোধগম্য হয় না। এতে বিচার বিভাগের ওপর অনর্থক চাপের সৃষ্টি হয়। জমি বিবাদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ধরনের সমস্যার সমাধান পঞ্চায়েত স্তরে হয়ে গেলে আদালতে আসার প্রয়োজন হয় না। এসব ঘটনা আদালতের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি দুই পৃথক মামলায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীসহ বেশ কয়েকজন বিভাগীয় সচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন কলকাতা হাইকোর্ট। দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী এলাকায় দাঙ্গার পর উচ্ছেদ অভিযানে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়। উচ্ছেদ বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বেশ কিছু সময় অমান্য করে স্থানীয় পৌরসভা। এই ধরনের প্রবণতার প্রেক্ষাপটে গতকাল প্রধান বিচারপতির মন্তব্য সরকারের বিরুদ্ধাচরণেরই শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের নির্দেশ পালনে সরকারি নিষ্ক্রিয়তার প্রসঙ্গ উত্থাপন কার্যত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে ভর্ৎসনারও শামিল। সরকারকে তিনি দেশের সবচেয়ে বড় মামলাবাজ বলেও অভিহিত করেন। তিনি বলেন, দেশের মোট মামলার ৫০ শতাংশে সরকার একটা পক্ষ।
ভারতে সম্প্রতি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হওয়ার সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলা পত্রপাঠ খারিজ করার পাশাপাশি আদালতের সময় নষ্টের জন্য মামলাকারীদের জরিমানাও করেছেন। এই প্রবণতার সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থ মামলা ব্যক্তিস্বার্থের মামলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আদালত এই বিষয়ে ইদানীং খুবই সজাগ ও সতর্ক।
দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের যৌথ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে আদালতে স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এ সময় মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অপ্রাসঙ্গিক আইন চিহ্নিত করে সেগুলো দ্রুত বাতিল করা দরকার
We hate spam as much as you do