দোল আর হোলির প্রেক্ষিত অবশ্য ভিন্ন। হোলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদ আর তার বিষ্ণু বিদ্বেষী পিতা হিরণ্যকশিপূ ও তার বোন হোলিকার কাহিনি। স্কন্দ পূরানে উল্লেখ আছে যে প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য অগ্নিস্পর্শ প্রতিরোধী বসনে আচ্ছাদিত হোলিকা শিশু প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে তার সেই বসন তার গা থেকে খুলে গিয়ে প্রহ্লাদকে আচ্ছাদিত করে তাকে রক্ষা করে এবং আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে কুচক্রী হোলিকাকেই। সেই কারনে হোলি উৎসবের সূচনা হয় হোলিকা দহনের মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে মুখ্যত বৈষ্ণবদের দোলযাত্রা আসলে সূচিত করে রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের প্রথম প্রেম নিবেদনের দিনটিকে। কথিত আছে পলাশের ফাগে এমনই এক বসন্ত দিনে রাধার মুখমন্ডল নাকি রাঙিয়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণ। এই দিনটি শ্রী চৈতন্যের জন্মতিথিও
আজ দোল। কাল হোলি। দোল মানেই রঙের উৎসবে জীবনকে রাঙিয়ে নেওয়া। জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি, মলিনতা, জীর্ণতাকে ধুয়ে পলাশরাঙা বসন্তের আবাহন। দোল আর হোলির প্রেক্ষিত অবশ্য ভিন্ন। হোলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদ আর তার বিষ্ণু বিদ্বেষী পিতা হিরণ্যকশিপূ ও তার বোন হোলিকার কাহিনি। স্কন্দ পূরানে উল্লেখ আছে যে প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য অগ্নিস্পর্শ প্রতিরোধী বসনে আচ্ছাদিত হোলিকা শিশু প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে তার সেই বসন তার গা থেকে খুলে গিয়ে প্রহ্লাদকে আচ্ছাদিত করে তাকে রক্ষা করে এবং আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে কুচক্রী হোলিকাকেই। সেই কারনে হোলি উৎসবের সূচনা হয় হোলিকা দহনের মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে মুখ্যত বৈষ্ণবদের দোলযাত্রা আসলে সূচিত করে রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের প্রথম প্রেম নিবেদনের দিনটিকে। কথিত আছে পলাশের ফাগে এমনই এক বসন্ত দিনে রাধার মুখমন্ডল নাকি রাঙিয়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণ। এই দিনটি শ্রী চৈতন্যের জন্মতিথিও। দোল উৎসবে হোলিকা দহনের জায়গা না থাকলেও উৎসবের আগের রাতে ঝরা পাতা ডালপালা জড়ো ক'রে নেড়াপোড়া উদযাপনের চল কিন্তু অাছে - আজ আমাদের নেড়া পোড়া কাল আমাদের দোল। আসলে হোলিকা দহন হোক আর নেড়াপোড়া মূল উদ্দেশ্য বোধহয় সম্বৎসরের জমে ওঠা ক্লেদ গ্লানি বিষন্নতাকে পুড়িয়ে ফেলে নতুন ক'রে পথ চলার অঙ্গীকার গ্রহণ।
ভারতে হোলির ইতিহাস বেশ পুরানো। বিভিন্ন পুরাণ বা চতুর্থ শতকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সভাকবি কালিদাসের রচনায় অথবা সপ্তম শতকে লেখা উদয়ন-রত্নাবলীর কাহিনিতে হোলির উল্লেখ আছে। দোল হোক বা হোলি, যে নামেই ডাকি না কেন রঙের এই উৎসবের এমন একটা সার্বজনীন আবেদন আছে যে এই রঙদার উৎসবটিকে কেবলমাত্র ধর্মের গন্ডীতে বেঁধে রাখা সম্ভব হয় নি কোনোদিনই। ইতিহাস বলে আকবর বা শাহজাহানের মত মুঘল বাদশাহরা রীতিমত মহা ধুমধাম করেই হোলির উৎসবে মাততেন। মুঘল বাদশাহরা এই উৎসবের নাম দিয়েছিলেন আব-এ-পাশি, অর্থাৎ রঙিন ফুলের বৃষ্টি। জাহাঙ্গিরের আত্মচরিত 'তুজ্ক্-এ-জাহাঙ্গিরিতে তিনি হোলি উপলক্ষে জমজমাট মেহফিল বসানোর কথা উল্লেখ করেছেন। গোবর্ধন ও রসিকের মত শিল্পীদের আঁকা ছবিতে জাহাঙ্গির ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহানের হোলি খেলার চমৎকার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। শেষতম মুঘল সম্রাট বাহাদূর শাহ জাফর তাঁর মন্ত্রীসভার হিন্দু মন্ত্রীদের হোলির দিন তাঁর কপালে আবির মাখানোর অনুমতি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, ১৮৪৪ এ 'জাম-এ-জাহানুমা' নামক একটি উর্দূ সাময়িকীতে উল্লিখিত আছে যে বাহাদুর শাহ জাফর হোলি উৎসব উদযাপনের জন্য বিশদ আয়োজন করেছিলেন।
অবশ্য মুঘলদেরও আগে ত্রয়োদশ শতকে দিল্লির মুসলমান সুফি সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও তাঁর শিষ্য স্বনামধন্য কবি আমির খুসরুর হাত ধরে বসন্তকে স্বাগত জানাতে মুসলমান সমাজের মধ্যেও যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল হোলি। গোলাপি আর হলুদ রঙকে স্বর্গীয় রঙ হিসাবে বর্ননা করে পার্সি ও হিন্দভি ভাষায় একগুচ্ছ অপূর্ব কবিতা লিখে গেছেন খুসরু - 'খেলুঙ্গি হোলি খাজা ঘর অায়ে...'। উত্তরপ্রদেশের হাজি ওয়ারিশ আলি শাহর দরগা 'দেওয়া শরিফে' আজও ইদ্ এর মতই প্রবল উৎসাহে হোলি উৎসব পালন করা হয়। অযোধ্যার শেষতম নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ তো আবার এতটাই কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর ছিলেন যে নিজেকে কৃষ্ণের এক রূপ হিসাবে গণ্য করতেন এবং স্বভাবতই মহা ধুমধাম সহকারে পালন করতেন দোল উৎসব। তাঁর আমলে কোনো এক বছর হোলি ও মহরম একই দিনে পড়ে গেলে লক্ষ্ণৌ শহরে সকালে খুশির হোলি আর সন্ধ্যায় বেদনার মহরম উৎসব পালনের আয়োজন করেছিলেন ওয়াজিদ আলি। শিল্প রসিক ওয়াজিদ আলি শাহর অনন্য সৃজন, 'মোরে কানহা জো অায়ে পালট কে, আব কে হোরি ম্যায় খেলুঙ্গি ডাট কে' ঠুংরিটি আজও কেবল বেনারস বা বৃন্দাবনে নয়, বরং সারা ভারতে ভীষণ রকম জনপ্রিয়। এমনকি বলিউডে সর্দারি বেগম সিনেমাতেও এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইউরোপীয় বনিকরা ভারতে এসে রঙের এই উৎসব প্রত্যক্ষ করে বারবার মোহিত হয়েছে এবং হোলি উৎসবকে সানন্দে উপভোগ করেছে। তাই বোধহয় অক্সফোর্ড ইংরাজি ডিকশনারিতে সেই ১৬৮৭ সালের সংস্করণেই Houly শব্দটি দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যদিকে দিনটিকে বসন্ত উৎসব হিসাবে পালন করার ডাক দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই থেকে শান্তিনিকেতনে মহা সমারোহে আজও পালিত হয়ে চলেছে পলাশ-শিমুলের রঙে বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার উৎসবটি, যার মূল সুরটিও যেন বেঁধে দিয়েছেন গুরুদেব স্বয়ং -" রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে"।
গত বছর কোভিড অতিমারির ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে রঙের উৎসবে সেই ভাবে মেতে উঠতে পারে নি বাংলা। এ বছরেও কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গের আশঙ্কা ঘাড়ে নিয়ে, ভোটের অশান্ত আবহে রঙ খেলায় কি আদৌ তেমন উৎসাহ আছে বাঙালির? তবে এ কথা ঠিক যে প্রার্থীরা দোল বা হোলির মত সব ধর্মকে মিলিয়ে দিতে পারা এমন মহোৎসবকে কেন্দ্র ক'রে জনসংযোগের সুবর্ণ সুযোগ খুব সহজে ছাড়তে চাইবেন না। ওদিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরে ক্ষতিকর রাসায়নিক রঙের পরিবর্তে আজকাল ভেষজ আবির বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান মঞ্চ এ বছর নানা জায়গায় এই ভেষজ আবির তৈরির একাধিক কর্মশালা আয়োজন করেছে।
দোল, হোলি বা বসন্ত উৎসব - যে নামেই ডাকি না কেন; আমরা যেন বিস্মৃত না হই এই সত্য যে বিগত দেড় হাজার বছরেরও বেশি সময়কাল জুড়ে এই উৎসব ফাগের রঙে রঙে ছড়িয়ে দিয়ে গেছে সম্প্রীতির বার্তা।
নির্বাচনের ময়দানে এ বছর আমাদের প্রাপ্তি বসন্তের প্রতীক হয়ে ওঠা এক ঝাঁক স্বপ্নদ্রষ্টা উজ্জ্বল তরুণ তরুণী। আসুন রঙের উৎসবের সূচনায় তাদের উদ্দেশ্যে বলি - " নবীন আগন্তুক/ নবযুগ তব যাত্রার পথে চেয়ে আছে উৎসুক"। প্রজন্মের চাকরি হীণ, ভবিষ্যৎ হীণ বেরঙ এই জীবনকে স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যাক ওরা।
ছবি - মুঘল দরবারে হোলি খেলা। মিনিয়েচার পেইন্টিং।
We hate spam as much as you do