Tranding

01:33 PM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / 'ভাইফোঁটা' ★ পুরুষ শাসিত সমাজের আচার

'ভাইফোঁটা' ★ পুরুষ শাসিত সমাজের আচার

তলিয়ে দেখলে এর মধ্যে পুরুষ শাসিত সমাজের গুঢ় মনোভাব ও মানসিকতার আঁচটা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। একটা 'মিথ', ভাইফোঁটার এই আবেগকে লালন করে আসছে পুরনো কাল থেকে আর তার গোড়ায় আছে পুরুষের কর্ত্তৃত্বে ও পরিচালনায় পুষ্ট সমাজ, যেখানে পুরুষের দীর্ঘ জীবন কামনা করা যতটা জরুরি, নারীদের জন্যে ততটা নয়। কারণ পুরুষ পরিবার প্রতিপালন করে, সমাজ পরিচালনা করে, দেশের প্রশাসন চালায়। মিথটা হলো, মৃত্যুর দেবতা যম তার বোন যমুনার হাতে ফোঁটা নিয়েছিলেন।

'ভাইফোঁটা' ★ পুরুষ শাসিত সমাজের আচার

'ভাইফোঁটা' ★ পুরুষ শাসিত সমাজের আচার


অধ্যাপক সুদীন চট্টোপাধ্যায় এর ফেসবুক ওয়াল থেকে।

 

'ভাইফোঁটা' আমাদের সমাজে 'বারো মাসে তের পার্বন'- এর একটি। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়াতে ভাইয়ের কপালে তিলক দিয়ে শারদোৎসব শেষ হয় ।বোনের হাতে ফোঁটা, তারপর থালা ভরা মিষ্টি  কার না ভালো লাগে ? সঙ্গে ভালোবাসার,উপহারের  দেওয়া নেওয়া তো আছেই। শীত শীত সকালে, বাড়ির বৈঠকখানায়, প্রদীপের আলোয়, শাঁখ আর উলুতে জমাটি অনুষ্ঠান। এখন লেখাপড়া অনেক ছড়িয়েছে,  পরিবারে এবং বাইরেও ভাই বোনের , পুরুষ নারীর স্থান  অনেক কাছাকাছি, প্রায় সমান সমান, তাই হয়তো আলাদা করে তেমন কিছু  মনে হয় না। কিন্তু তলিয়ে দেখলে এর মধ্যে পুরুষ শাসিত সমাজের গুঢ় মনোভাব ও মানসিকতার আঁচটা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
একটা 'মিথ', ভাইফোঁটার এই আবেগকে লালন করে আসছে পুরনো কাল থেকে আর তার গোড়ায় আছে পুরুষের কর্ত্তৃত্বে ও পরিচালনায় পুষ্ট সমাজ, যেখানে পুরুষের দীর্ঘ জীবন কামনা করা যতটা জরুরি, নারীদের জন্যে ততটা নয়। কারণ পুরুষ পরিবার প্রতিপালন করে, সমাজ পরিচালনা করে, দেশের প্রশাসন চালায়। মিথটা হলো, মৃত্যুর দেবতা যম তার বোন যমুনার হাতে ফোঁটা নিয়েছিলেন।


 যমুনা ভাইয়ের 'অমরত্ব' প্রার্থনা করেছিলেন। আর একটা মত,  নরকাসুর  দৈত্যকে বধ করার পর কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে এলে, সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা ও মিষ্টি দিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবন কামনা করেছিলেন।  'ভাইফোঁটা'র মতো  ভাইকে 'রাখি' পরিয়ে রক্ষা করার সংকল্পও আর একটা 'মিথ' থেকে জন্মেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব 'মিথ'ই পুরুষের দীর্ঘ জীবন প্রার্থনা করেছে, নারীর নয়। 


কারণ সেকালের কর্তাদের কাছে পরিবারে ও সমাজে নারীর অপরিহার্যতার প্রয়োজন স্বীকৃত ছিল না। বরং উল্টোটাই ঘটেছে বারংবার, পুরুষ তার অহং এবং কর্ত্তৃত্ব বজায় রাখতে নারীকে মৃত্যুর মুখে পাঠিয়েছে, সীতা'কে আগুনের লেলিহান গ্ৰাসের মধ্যে দাঁড়াতে হয়েছে, দ্রৌপদীকে পাশা খেলার পণ হয়ে  উন্মুক্ত রাজ দরবারে উদ্ধত, অসভ্য মানুষগুলোর সামনে নতমুখে হাজির হতে হয়েছে । এ কাজে পুরুষ 'রাম' বা পুরুষ 'পাণ্ডবেরা' নৈতিক দ্বিধা বোধ করেনি, প্রেম ও প্রতিশ্রুতির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতেও পিছু পা হয়নি। 

 

প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ হোরেস উইলসন, ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী মুরিয়েল ম্যারিয়ন আন্ডারহিল , প্রাচ্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ সুকুমারী ভট্টাচার্য এই প্রথার উৎস , বিকাশ ও বিস্তার নিয়ে নানাবিধ বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। সে সব  পাণ্ডিত্যপূর্ণ তত্ত্বালোচনার গভীরে না গিয়েও শুধু মনুসংহিতার  উল্লেখ করেই বলা যায় যে উপনিষদ, পুরাণ-পরবর্তী ভারতীয় সমাজের যে অনুশাসন ও আচরণবিধি মনু তৈরি করেছিলেন সেখানে নারীর জন্যে কোনো  মর্যাদার বিবেচনা তো ছিলই না, বরং তাকে সংসারবন্দি, কর্তব্যবদ্ধ, বাধ্য বালিকা রূপেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। " ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যতং অর্হতি "। মনুর মতে স্ত্রীলোকের কোনো 'স্বাতন্ত্র্য' বা 'স্বাধীনতা' প্রাপ্যই নয়। কারণ,এই নারীকে "পিতা রক্ষতি শৈশবে, ভর্তা রক্ষতি যৌবনে, রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা •••" অর্থাৎ পিতা শৈশবে, পতি যৌবনে ও পুত্র বার্দ্ধক্যে রক্ষা করে। অতএব নারী পরজীবী, পিতা, পতি ও পুত্রের পালনে তার জীবন নির্ভর । সুতরাং নারীর স্বাধীনতা অপ্রয়োজনীয় । তার জন্যে অমরত্বের প্রার্থনাও অবান্তর। তাই, সমাজে এবং পরিবারে নারীর  দীর্ঘ জীবন ও অমরত্বের কামনায় 'ভাইফোঁটা'র মতো কোনো আচার বা আরাধনা প্রচলিত হয়নি। সমাজতত্ত্বের এই সরল পাঠটুকু আমাদের জানা জরুরি। 

 

ইদানীং, 'ভাইফোঁটা' বাণিজ্য দুনিয়াতেও সগৌরবে সিংহাসন পেতেছে। পণ্যের শাসন অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে আমাদের জীবন। ভোগবাদের সঙ্গে  শক্ত করে তার গাঁটছড়া বাঁধা। তাই  ভাইফোঁটার বিজ্ঞাপনে সকাল বেলার কাগজগুলো ভরে ওঠে। কার্ড কোম্পানি শুভেচ্ছা বিনিময়ের কার্ড ছাপছে, মিষ্টির দোকানে মিষ্টি, বোনের উপহারে সোনার গয়না, ভাইয়ের মনোরঞ্জনে ব্র্যান্ডেড জামাকাপড়, বৈদ্যুতিন ভোগ্যপন্য। কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যসম্ভারের সচিত্র বিজ্ঞাপনে প্রলোভনের জাল ছড়িয়ে দেয় অনেকদিন আগে থেকেই। 


এর ওপর আছে হোটেল, রেস্তোরাঁর উন্মুক্ত আহ্বান। হাতে রান্না করে ভাইকে পঞ্চপদ খাওয়ানোর অনিক ঝক্কি। অতএব, ফেলো কড়ি, মাখো তেল। নগদ পয়সা খরচ করে হোটেল-রেস্তোরাঁর টেবিল বুক এবং সাড়ম্বরে ভাইফোঁটা উদযাপন।

 

এখন আর শুধু ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় শুদ্ধাচারে তার কপালে বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের চুয়া-চন্দনের ফোঁটা, মাথায় ধান দূর্বা আর মুখে 'যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা' যথেষ্ট নয়।  দু তরফেই দরকার উপহার-উপঢৌকনের পাহাড়।
ভাইফোঁটার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সঙ্গে অর্থনৈতিক দিকটাও আজ ভেবে দেখার মতো। 
     
``````````````````````````````````

Your Opinion

We hate spam as much as you do