Tranding

12:27 PM - 04 Feb 2026

Home / Article / ৩০শে জুন সাঁওতাল “হুল” এর ১৬৬ বছর , প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গনসংগ্রাম

৩০শে জুন সাঁওতাল “হুল” এর ১৬৬ বছর , প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গনসংগ্রাম

সাঁওতাল হুলে সাঁওতালরা পরাজয় বরণ করলেও তারা শোষকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। তারই ধারাবাহিকতায় তেভাগা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাঁওতালদের অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এই লড়াকু জাতি আজও নিপীড়িত এবং শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

৩০শে জুন সাঁওতাল “হুল” এর ১৬৬ বছর , প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গনসংগ্রাম

৩০শে জুন সাঁওতাল “হুল” এর ১৬৬ বছর , প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গনসংগ্রাম

ভারতবর্ষের ইতিহাসে সিপাহী বিদ্রোহের মত এক সর্বব্যাপী বিদ্রোহ হওয়ার আগে দেশজুড়ে যেসব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামগুলোর ইতিহাস পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাঁওতাল বিদ্রোহ । আর এই বিদ্রোহে শোষিত নিপীড়িত আদিবাসী জনতার জোতদার জমিদারদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে এক তীব্র শ্রেণী সংগ্রাম ।

মুশকিল হল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত  শুধুমাত্র সমাজের তথাকথিত সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর আন্দোলনের কথা লিখে গেছেন । গান্ধীজীর এই সংগ্রামে যোগদানের পর সেই অর্থে শ্রেণী সংগ্রাম না হলেও তার  গনচরিত্র প্রকাশ পায় । অথচ তার অনেক আগে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে মিলিয়ে সাঁওতালরা যে বিদ্রোহ করেছিলেন তা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ।

“আদিবাসীরাই ভারতের প্রকৃত স্বদেশী বা প্রাচীন বা প্রাচীনতম আদিবাসী; তাদের কাছে আর সকলেই বিদেশী। এই প্রাচীন জাতিরই নৈতিক দাবি ও অধিকার হাজার হাজার বছরের পুরানো।” (সি. বি. মেমোরিয়া, ‘ট্রাইবাল ডেমোগ্রাফি ইন ইণ্ডিয়া’, পৃ. ১৪২)

ভারতের ঐতিহাসিকদের প্রতি অভিমানে ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে তার বইতে উল্লেখ করেছেন ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতীয় ইতিহাস আজ পর্যন্ত আদিবাসীদের এবং সেই সঙ্গে জনসাধারনের ইতিহাসকেও স্বীকৃতি দেন নি । প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যে সব জাতি অনুন্নত জাতি বলে গণ্য হচ্ছে, তাদের কথা তাঁরা লিখলেন না। বরং একটু স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, যারা বনজঙ্গলের বাঘ-ভালুক তাড়িয়ে তৈরি করল দেশ, বন-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তৈরি করল জমি-জায়গা, চাষ-আবাদ করল, মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বের করল সোনা-রূপা, তারা স্বীকৃতি তো পেলই না, বরং ইতিহাসে পরিচিত হল অসভ্য বর্বর জাতি বলে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা রেলপথ তৈরির কাজে যোগ দিল, তারা তার বিনিময়ে পেল অকথ্য অত্যাচার। বীরের মত যে জাতি দেশের জন্য প্রাণ দিল, বিদেশী শাসন লুপ্ত করার জন্য তীর-ধনুক, বল্লম, টাঙ্গি-তরোয়াল সম্বল করে কামান বন্দুকে সুসজ্জিত দুর্ধর্ষ ইংরাজ সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করল, তাদের কথা লেখা হল ‘খণ্ড জাতির বিদ্রোহ’ কিংবা নিছক একটা স্থানীয় হাঙ্গামা বলে। দেশের প্রতি ভালবাসা তাদেরও যথেষ্ট এবং তারাও ভারতকে, এ দেশকে, সমানভাবে ভালবাসত, সেটা ঐতিহাসিকরা দেখেও দেখলেন না।

 

 

৩০ জুন, ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিবস, যা ঐতিহাসিক সাঁওতাল হুল দিবস বা সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস নামে পরিচিত। মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ-নিপীড়ন এবং ব্রিটিশ পুলিশ-দারোগাদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত সাঁওতাল জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে ১৮৫৫ সালে সিধু মুরমু ও কানু মুরমু এবং দুই ভাই চান্দ ও ভাইরো ভারতের নিজ গ্রাম ভগনাডিহতে এক বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। সাঁওতাল জনগণ মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের নিপীড়নে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল সে সময়। মহাজনের ঋণের ফাঁদে পড়তে হতো বংশ পরম্পরায়। স্ত্রী-পুত্ররা মহাজনের সম্পত্তি হয়ে পড়ত। পুলিশের সহায়তায় তাদের গবাদি পশু ও জমি কেড়ে নেওয়া হতো। প্রতিবাদ করলে পাল্টা গ্রেপ্তারের শিকার হতো; এমনকি সে সময় ব্রিটিশ সরকারের উল্টো খড়্গ নেমে আসত তাদের ওপর।
 

১৮৫৫ সালেই যে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা তা নয়, এর আরও ৭৫ বছর আগে ১৭৮০ সালে সাঁওতাল জননেতা তিলকা মুরমুর (যিনি তিলকা মাঞ্জহী নামে পরিচিত) নেতৃত্বে শোষকদের বিরুদ্ধে সাঁওতাল গণসংগ্রামের সূচনা হয়। তিনি সর্বপ্রথম সাঁওতাল মুক্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে পাঁচ বছর ধরে ইংরেজ শাষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালান। তিলকা মুর্মুর নেতৃত্বে ১৭৮৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভাগলপুর ও রাজমহলের কালেক্টর ক্লিভল্যান্ডকে হত্যা করে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা। । ১৭৮৫ সালে তিলকা মাঞ্জহী ধরা পড়েন এবং তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৮১১ সালে বিভিন্ন সাঁওতাল নেতার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এরপর ১৮২০ সালে তৃতীয়বার এবং ১৮৩১ সালে চতুর্থবার সাঁওতাল গণসংগ্রাম গড়ে ওঠে।
 

অবশেষে শোষণহীন স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ৩০ হাজারেরও অধিক সাঁওতালকে নিয়ে সমাবেশ এবং স্বরাজ প্রতিষ্ঠার শপথ নেয়। শুরু হয় বিদ্রোহ এবং কলকাতা অভিমুখে প্রথম গণ-পদযাত্রা। কলকাতা অভিমুখে প্রথম গণযাত্রা করেন বীর সিধু-কানুরা। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য মিছিল বা গণযাত্রার সূচনা এটাই প্রথম; যার ধারাবাহিকতায় আজও উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মিছিল-লংমার্চ করে আসছে। পদযাত্রার সময় অত্যাচারী মহাজন কেনারাম ভগত ও জঙ্গিপুরের দারোগা মহেশাল দত্ত ছয়-সাতজন সাঁওতাল নেতাকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করেন। সিধু ও কানুকে গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হলে বিক্ষুব্ধ সাঁওতাল বিপ্লবীরা ৭ জুলাই পাঁচকাঠিয়া নামক স্থানে মহাজন কেনারাম ভগত, মহেশাল দত্তসহ তাঁদের দলের ১৯ জনকে হত্যা করে এবং সেখানেই সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন প্রজ্বলিত হয়।

এরপর টানা আট মাস ধরে চলে সাঁওতাল বিদ্রোহ। ২১ জুলাই কাতনা গ্রামে ইংরেজ বাহিনী বিপ্লবীদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে। জুলাই মাসেই বীরভূমের বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র নাগপুর বাজার ধ্বংস করে বিপ্লবীরা, যেখানে সাঁওতাল জনগণকে ন্যায্যমূল্যে মাল দেওয়ার পরিবর্তে অত্যাচার করা হতো। ৩০ জুলাই লেফটেন্যান্ট রুবি কর্তৃক মুনহান ও মুনকাতারা গ্রাম ধ্বংস করা হলে পরে ১৭ আগস্ট ইংরেজ সরকার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় । সাঁওতালরা তা প্রত্যাখ্যান করে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিধু-কানুর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার ‘অস্বা সামরিক আইন’ (অস্ত্রশস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা) জারি করে। ইংরেজ সরকার সামরিক আইন জারি করলেও বিপ্লবের মুখে ১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নেয়। আট মাসব্যাপী বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে লেফটেন্যান্ট ফেগানের পরিচালিত ভাগলপুরে হিল রেঞ্জার্স বাহিনীর হাতে সাঁওতালদের পরাজয় ঘটে।

 

 

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব যে শুধুই সিধু-কানু বা চান্দ-ভাইরোরা দিয়েছেন তা নয়, তাঁদের সঙ্গে সাঁওতাল নারীদের নিয়ে বিপ্লব করেছিলেন দুই বোন ফুলো মুরমু ও ঝানো মুরমু। ব্রিটিশ সেপাইরা ফুলো মুরমুকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করে তাঁর লাশ রেললাইনে ফেলে রেখে যায়। ইতিহাসের প্রথম বীরাঙ্গনা হিসেবে সাঁওতাল জাতিসত্তা তাঁকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

অবশেষে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে সিধু নিহত হন এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে কানুকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

সাঁওতাল হুলে সাঁওতালরা পরাজয় বরণ করলেও তারা শোষকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। তারই ধারাবাহিকতায় তেভাগা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাঁওতালদের অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এই লড়াকু জাতি আজও নিপীড়িত এবং শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।  জাতীয় শিক্ষানীতি মোতাবেক মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম চালু করা হলেও এই জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার বর্ণমালা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে টালবাহানা এখনো চলছে। জমি বেদখল হলে তা পুনরুদ্ধার করতে গেলে আইনের সমস্যা রয়েই গেছে। এর পরও সাঁওতাল হুলের ১৬৬ বছর পর সাঁওতাল জাতিসত্তা, তথা বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষ আজও বীর সিধু-কানুদের  শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।

‘সানতাল রিবেলিয়ন’ প্রবন্ধে কমিউনিস্ট নেতা পি. সি. যোশী লিখেছেন পুলিশ ও মহাজনের অত্যাচারের স্মৃতি যাদের দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিল, আন্দোলন তাদের সকলকেই আকৃষ্ট করল, কিন্তু যে মূল ভাবধারাকে কাজে পরিণত করার চেষ্টা চলছিল তা ছিল সাঁওতাল অঞ্চল ও সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা।”

সমসাময়িক সাঁওতাল গুরু কলিয়াম হাড়ামের শিষ্য জুগিয়া হাড়াম সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন —

 “নুসাসাবোন, নওয়ারাবোন চেলে হুঁ বাকো তেঙ্গোন, / খাঁটি গেবোন হুলগেয়া হো, / খাঁটি গেবোন হুলগেয়া হো, / দিশম দিশম দেশমৌঞ্জহি পারগানা / নাতো নাতো মাপাঞ্জিকো / দ: বোন দানাং বোন বাং গেকো তেঙ্গোন / তবে গেবোন হুলগেয়া হো।”
অর্থাৎ—‘আমরা বাঁচব, আমরা উঠব, কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে না / আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব / আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব / দেশের মাঝি ও পারগানারা / গ্রামের মোড়লরা, / আমাদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করবে , কেউ পাশে দাঁড়াবে না /  আমরা নিশ্চয় বিদ্রোহ করব।’

নিঃসন্দেহে ভারতের ইতিহাসের এই অন্যতম ঐতিহ্য মণ্ডিত সংগ্রামের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে ।

 

Your Opinion

We hate spam as much as you do