বাংলাতে দোলযাত্রার আগের দিন হয় 'ন্যাড়াপোড়া ' বা বুড়ির ঘর পোড়ানো। হোলিকা বুড়ির ঘর পোড়ানো হয় এবং তাকে ঘিরে সমবেত ভক্তরা বলে ওঠে 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল ' । ভারতের কিছু অংশে হোলিকা দহন উৎসবকে 'ছোটি হোলি' ও বলা হয়।
হোলি - দোল উৎসব:কথার পিঠে কয়েকটি কথা
রাজলক্ষ্মী কর
হিন্দু পুরাণ ও কিংবদন্তি অনুসারে হোলি একটি সুপ্রাচীন উৎসব। এই উৎসবের শুরু কিভাবে হয়েছিল তা নিয়ে নানা ধরনের ভাষ্য আছে।
বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন উত্তর ভারতে ' হোলি ' দক্ষিণ ভারতে 'মাদন দাহন ' বা ' কামায়ন ' উৎসব, আবার মধ্য ভারতে এটি পরিচিত ' হোরি ' বলে , উড়িষ্যায় এটি 'দোলা উৎসব' এবং বাংলায় ' দোল যাত্রা ' নামে পরিচিত। নাম যাই হোক না কেন সব জায়গায় এই উৎসবের চরিত্র এক রকম।
হোলি শব্দটা এসেছে হিন্দি শব্দ ' হোলিকা দহন ' থেকে। হোলিকা ছিলেন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর এর বোন । ব্রহ্মার কাছ থেকে অমরত্ব লাভের পর দৈত্যরাজ নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় মেতে ওঠেন। অন্যদিকে তার পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণু ভক্ত । এতে দৈত্যরাজ ক্ষিপ্ত হন এবং নিজের পুত্রকে হত্যা করতে উদ্যত হন। প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করেন হোলিকা কিন্তু বিষ্ণুর আশীর্বাদে অক্ষত থেকে যান প্রহ্লাদ আর দগ্ধ হন হোলিকা । আগুনে হোলিকার মৃত্যুর ঘটনাটি হল হলিকা দহন। পরদিন ফাল্গুন পূর্ণিমার দিনে শুরু হয় খুশির উৎসব হোলি।
বাংলাতে দোলযাত্রার আগের দিন হয় 'ন্যাড়াপোড়া ' বা বুড়ির ঘর পোড়ানো। হোলিকা বুড়ির ঘর পোড়ানো হয় এবং তাকে ঘিরে সমবেত ভক্তরা বলে ওঠে 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল ' । ভারতের কিছু অংশে হোলিকা দহন উৎসবকে 'ছোটি হোলি' ও বলা হয়।
কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যে বলা আছে তারকা সুরকে বধ করার জন্য একজন মহা পরাক্রমশালী যোদ্ধার প্রয়োজন হয়। এর জন্য দেবতারা স্থির করেন মহাদেব এবং উমার মিলনে যে সন্তান হবেন তিনি হবেন দেব সেনাপতি। কিন্তু এই সময় দেবাদিদেব গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকার জন্য উমা শরণ নেন কামদেবের। মদন দেবের তীরে ধ্যান ভগ্ন হয় তাঁর কিন্তু ক্রোধান্বিত মহাদেব তাঁর তৃতীয় নয়নের আগুনে ভষ্ম করলেন মদনকে। এই
ঘটনাকে স্মরণ করে কোথাও কোথাও দোল বা হোলির আগের দিন কাম দহন উৎসব পালিত হয়।
বাংলার বাইরের হোলি উৎসবের মত বাংলার দোলযাত্রা হল একটি সনাতন হিন্দু ও বৈষ্ণব উৎসব | এর আরেকটি নাম বসন্ত উৎসব। বৈষ্ণবদের মতে দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা রং নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপিদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠেছিলেন। সেই থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি।এই দোলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাধা কৃষ্ণের অমর প্রেম কাহিনী। ব্রজভূমিতে এই উৎসব হল রাধা কৃষ্ণের প্রেমের উৎসব।এই ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়েছিল বলে একে গৌর পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
এই উৎসবটি জৈন এবং নেপালের বৌদ্ধদের মধ্যে দেখা যায়। এছাড়া জানা যায় যে উনিশ শতক জুড়ে শিখরা এই উৎসব পালন করেছে ৷ শিখদের শেষ গুরু গোবিন্দ সিংহ হোলিকে পরিবর্তন করে 'হোলা মহল্লা ' নামে এক উৎসবের প্রচলন করেছিলেন। যেখানে এই উৎসবের মধ্যে মার্শাল আর্ট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আনন্দপুর সাহেবে এই উৎসবের পর হোলি উৎসবের সূচনা ঘটে। মহারাজা রঞ্জিত সিং এর সময় ঠিক রাজ্যে হোলি খেলা হতো এবং এটি ক্রমশ পাকিস্তানের উত্তর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।
সবশেষে বলতে হয় এই উৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে । এটি এমন একটি উৎসব যেখানে বর্ণ, ধর্ম ও জাতপাত , বৈষম্য ভুলে মানুষ এক আনন্দ উৎসবে শামিল হয়। এই উৎসব শীতের শেষে এক ঋতু পরিবর্তনের সূচনা করে। অনেক জায়গায় এটি নতুন বছরের সূচনা হিসাবেও গণ্য হয়।
অনেকের মতে এই উৎসব অনেক পুরনো - প্রাক - ঐতিহাসিক যুগের ৷ আদিম সমাজের এই উৎসব পরবর্তী সময়ে আর্জিকরণের ফলে বৃহত্তর সমাজে স্বীকৃতি লাভ করে ।
We hate spam as much as you do