মহালয়ার দিন এলেই মনে পড়ে রেডিয়োর কথা। আর তাই বছরের এই একটি দিন যেন তাকে ছাড়া চলে না প্রবীণ বাঙালির। তাই বাড়ির আর পাঁচটা অকেজো জিনিসের সঙ্গে এককোনায় পড়ে থাকা রেডিয়ো-র ধুলো মুছতে মুছতেই অনেকে হাজির হচ্ছেন পাড়ার টিভি, রেডিয়ো সারাইয়ের দোকানে। কারণ, সামনেই যে মহালয়া। বাড়িতে টিভি থাকলেও ভোররাতে রেডিয়োয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ ও দেবীর আগমনী বার্তা না শুনলে যেন মনেই হয় না দুর্গাপুজো আসছে।
বাঙালির সংস্কৃতি, বীরেন্ ভদ্র , মহালয়ার ভোর আর সেই পুরোনো রেডিওটা !
Oct 14, 2023
|
সালটা ১৯৭০ । মহালয়ার ভোর । ভেসে আসছে মহিষাসুরমর্দিনীর সুর, আগমনীর সুর... আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির... । রেডিওর সামনে বসে মহালয়া শুনছেন বাড়ির ছোট থেকে বড় প্রত্যেকেই । কাট টু ২০২৩ । টেলিভিশনে চলছে মহালয়া । দুর্গা রূপে অভিনেত্রীদের মহিষাসুরমর্দিনী দেখছেন বাঙালি । কয়েক বছরে কি সত্যিই বদলে গেল মহালয়ার ভোরের ছবি ? সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া, চোখে জল এনে দেওয়া দরাজ কণ্ঠের মানুষটাকে ভুলে গেল বাঙালি ? না, বাঙালিকে আত্মবিস্মৃত জাতি বলা হলেও, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে কিন্তু ভোলেননি কেউ । তাঁকে ছাড়া মহালয়ার ভোর যে অসম্পূর্ণ । আজও, এতবছর পরেও । বাঙালির দুর্গাপুজো শুরু হয় তাঁর চণ্ডীপাঠ শুনেই ।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জন্ম ১৯০৫ সালে। তিনি ছিলেন একাধারে বেতার সম্প্রচারক, নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক। কলম ধরতেন বীরুপাক্ষ নামে। ১৯৩২ এ আকাশবাণীতে প্রথম সম্প্রচারিত হয়েছিল মহিষাসুরমর্দিনী। প্রতিবার লাইভ সম্প্রচারিত হত এই অনুষ্ঠান। শেষবার সম্প্রচারিত হয় ১৯৭২ এ। মহিষাসুরমর্দিনীর রচনা বাণী কুমারের, সংগীত পরিচালনায় ছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।
জানা গিয়েছে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মহালয়ার আগের দিন রাতে রেডিও স্টেশনে থেকে যেতেন। বাকি শিল্পীরা রাত ২টোর পর একে একে আসতেন। ভোরে অনুষ্ঠান শুরুর আগে স্নান করে গরদের ধুতি এবং পাঞ্জাবি পরে চণ্ডীপাঠে বসতেন তিনি ।
মহালয়ার সকালের এই দৃশ্যটা কয়েক বছরের পুরনো। তবে এখন সেই ছবিটা একটু হলেও বদলে গিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাঙালি আর রেডিয়োতে (Radio) নয়, মোবাইলেই শুনে নেয় মহালয়া। কেউ আবার রিমোট হাতে নিয়ে বসে পড়ে টিভির সামনে। সেখানেও মহালয়া দেখা হয়। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের জোড়া হামলায় সেই রেডিয়োর কদর এখন অনেকটাই কমেছে। আর রেডিয়োর দোকানগুলিতেও আর আগের মতো ভিড় লক্ষ্য করা যায় না। রেডিয়োতে জমছে ধুলো। তবে প্রবীণদের মধ্যে এখনও রেডিয়োর চল দেখা যায়।
মহালয়ার দিন এলেই মনে পড়ে রেডিয়োর কথা। আর তাই বছরের এই একটি দিন যেন তাকে ছাড়া চলে না প্রবীণ বাঙালির। তাই বাড়ির আর পাঁচটা অকেজো জিনিসের সঙ্গে এককোনায় পড়ে থাকা রেডিয়ো-র ধুলো মুছতে মুছতেই অনেকে হাজির হচ্ছেন পাড়ার টিভি, রেডিয়ো সারাইয়ের দোকানে। কারণ, সামনেই যে মহালয়া। বাড়িতে টিভি থাকলেও ভোররাতে রেডিয়োয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ ও দেবীর আগমনী বার্তা না শুনলে যেন মনেই হয় না দুর্গাপুজো আসছে।
দিন আসে দিন যায়, বয়ে যায় সময়, কিন্তু, মহালয়ার ভোর থেকে মুছে যাননি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র । মানুষটার গলা না শুনলে মনে হয় মা দুর্গাও বুঝি সবার মতো তাঁর জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন ।
We hate spam as much as you do