হঠাৎই মেয়েটির বাঁ হাতে নজর যায় ভদ্রলোকের। দু’টি ছোটো পাখি উড়ে যাচ্ছে; ফরসা হাতের উপর গাঢ় সবুজ রঙের উল্কি। খাবার ছেড়ে উঠে পড়েন তিনি।
কবিতা ও গল্প
শাম্ব
সোমা দত্ত
অনির্বাণ বসু
পাথার ঠুকে আগুন,আজও-
শাম্ব
সামান্যের প্রজ্ঞ-প্রকৃতি নিয়ে
বিশ্লেষণের পূর্বে সভা হবে
আদুল বণিকগনের।
তাদের তর্জনীর রং বিষ কালো।
একখন্ড তঞ্চকের হার তুলতুল
করছে তাদের গলায়।
বৃশ্চিকের দেশ,আমরা সবাই জানি।
রজনের হাঁক-ডাক শুনে
পিশাচ কালের নাচন
আর পতঙ্গভূক বিকলাঙ্গ চন্দ্রের
দিনে যারা কবরের পাথর ভেঙে
তর্জনী ঘষে আগুন জ্বালায়
কবন্ধের সঙ্গে ফিরে আসে লোহিত
অঙ্গ তার।আপনাদের সভা শেষের
পূর্বে আলো জ্বলে উঠবে,প্রান্তে।
যেভাবে সামান্যের মধ্যে আগুনের
বিশ্লেষক জাগে।
-----------------------------------
*বয়স*
সোমা দত্ত
শুধু দেখবো বলেই চোখ বুজলে দেখতে পাই ।
ভরা নদীর বুকের মত, চোখ বুজলেই ভানুমতি
লক্ষ রঙে শ্যাম আলোতে বৃষ্টি আনে মুখের উপর
আশ্চর্য কারিকুরি
রেখায় রেখায় ছুঁয়ে ফেলি কনকলতা
রাত বাড়ে আর মধ্য আঁচে সেঁকে নেয় তার যাবতীয় দাগ
বছর ঠেলে নদীর উপর চরা ফেলে লবটুলিয়া
দূরের কোনো শহর মেখে বারান্দাতে
নেশার মত গন্ধ শুঁকি একশো বছর পার
প্রাচীন হলে, জোয়ার নামে
বাকল খসে নরম ত্বকের যত্ন থেকে গাঢ়
নরুনচেরা সেই ছবিটি দিনের উপর দিন
উপন্যাস গড়িয়ে জমায় আয়ূরেখার ঢাল
বয়স যেন এক আধলা ডটচিহ্ন
---------------------------------
উটপাখি
অনির্বাণ বসু
ভদ্রলোক বামপন্থী। সংসদীয় পথ থেকে আলাদা তাঁর বিশ্বাস।ওঁর সব পথ শুরু এবং শেষ হয় নিজের লাইব্রেরিতে। সেখানে এক কোণে একটা টেবিল-চেয়ার। পাশে ইজিচেয়ার একটা। অধিকাংশ সময়ই ওই আরামকেদারায় আধশোওয়া হয়ে কোনও-না-কোনও বই পড়েন তিনি। তারপর রাতের খাওয়া সারতে-সারতে ওই সময়টুকু টিভি-তে খবর দেখেন। টিভি দেখে আর খবরের কাগজ পড়ে তিনি পেয়ে যান দুনিয়ার যাবতীয় খবরাখবর।
ভদ্রলোকের এক মেয়ে। শহরের নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আপাতত শিক্ষকতার পাঠ নিচ্ছে। মাঝে-মধ্যেই মেয়ে অনুযোগের সুরে জানায়, রাজ্যে চাকরি নেই, পড়া শেষ করে কী করবে ইত্যাদি-ইত্যাদি। ভদ্রলোক ফুৎকারে উড়িয়ে দেন সেসব দুর্ভাবনা, জোরের সঙ্গে জানান খবরে দেখা মুখ্যমন্ত্রীর উদাত্ত ঘোষণার কথা: দশলাখ বেকারের কর্মসংস্থানের যে-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ওঁর তরফে, মাত্র এক বছরের সময়কালেই তা বাস্তব করে দিয়েছেন তিনি।মেয়েটি, এত দিনের অভিজ্ঞতায় জানে, বাবা যা বলে সেটাই ঠিক বলে মনে করে যেহেতু, চুপ করে যায়। মেয়ের দিকে না-তাকিয়ে সেই সব সময়ে হাতের সামনে খুলে রাখা বইটির পৃষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন ভদ্রলোক।
দুপুরের রান্না সেরে খাবারগুলো টেবিলের উপর ঢাকা দিয়ে কাজের মেয়েটা বেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। টিভি-টা চালিয়ে দিয়ে খেতে বসেন ভদ্রলোক। সরু চালের ভাত, ঝিঙে-পোস্ত, পাবদার ঝাল। প্রমাণ মাপের মাছখানার মাথা বেরিয়ে আছে পোর্সেলিনের বাটি টপকে। ঝিঙে-পোস্ত দিয়ে ভাত মেখে মেজাজে মুখে তোলেন প্রথম গ্রাস। টিভি-র পর্দা জুড়ে একটা মিছিল দেখাচ্ছে। অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের মিছিল। নিচে লেখা : চাকরির দাবিতে মিছিল। ভদ্রলোক অবজ্ঞাসূচক মাথা নেড়ে পোস্তর দিকে মন দেন।
পোস্ত শেষ করে পাবদার দিকে হাত বাড়ান ভদ্রলোক। টিভি-র পর্দায় সঞ্চালক খবর বলে যায়। ইনসেটে দেখা যায় মিছিলের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের চলচ্ছবি। লম্বা শিরদাঁড়া থেকে মাছ আলাদা করেন তিনি। মুখে মাছের অংশ পুরে টিভি-র দিকে তাকান। একটি মেয়েকে কয়েকজন ধরাধরি করে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় বেশি দূর পর্যন্ত চ্যানেলের ক্যামেরা পৌঁছায় না। আহত মেয়েটির কপাল থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। এলোচুলে মুখ ঢাকা। হঠাৎই মেয়েটির বাঁ হাতে নজর যায় ভদ্রলোকের। দু’টি ছোটো পাখি উড়ে যাচ্ছে; ফরসা হাতের উপর গাঢ় সবুজ রঙের উল্কি। খাবার ছেড়ে উঠে পড়েন তিনি। এঁটোহাতে রিডিংরুমে এসে নিজের মোবাইল ফোনখানা খুঁজতে থাকেন। আধখাওয়া পাবদা মাছ আঢাকা পড়ে থাকে।
ছবি - সংগৃহীত
We hate spam as much as you do