এই দিগন্ত বিস্তৃত শিক্ষাঙ্গণ,অপূর্ব মনোরম বৃক্ষরাজি, শিক্ষক কূলের অদ্ভুত স্নেহময়তার সাথে কঠিন জ্যোতির্বিজ্ঞান এর শিক্ষা দান,কে চায় এই সব কিছু ছেড়ে রুক্ষ জীবন যাপনের দিকে পা বাড়াতে? কে চায় প্রাজ্ঞ অতীশ দীপঙ্কর এর বাহুডোর মুক্ত করে শুধু চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব কষতে? তবু যেতে হবে।এই শিক্ষা তীর্থভূমির তেমনই নিয়ম।
যদি যেতে নাহি দাও
শঙ্কর ভট্টাচার্য
কালকে রাতে খাওয়া ভাত আর তরকারি র মন্ডটা গলার কাছে যেন পিন্ডের মত আটকে আছে।কয়েকবার জল খেয়ে এসেছে পিং তবু নামতে চাইছে না।
পুরো নাম কিম পিং। কোরিয়া তার মাতৃভূমি। এদেশের এই মহাবিদ্যালয়ে তার আসা প্রভূত শিক্ষা লাভের আশায়।আজ সপ্তম বর্ষ শেষে তার গৃহে ফেরার পালা।কিন্ত মন যে অন্য কথা বলে।
গতকাল সারা রাত নিদ্রা নিদ্রাহীন কাটিয়েছে পিং।কখনও এই বৃক্ষতল, কখনও সেই বৃক্ষরাজির বনান্চল। সব কিছু ঘুরে অবশেষে যখন ভোর প্রায় আসন্ন তখন তারই নিজের হাতে একদা পোতা যে গুল্ম গোলাপের চারা,যা আজ অতি বৃহৎ আকার ধারন করে আর অসংখ্য গোলাপ বুকে নিয়ে এক অপূর্ব শোভা বর্ধন করে তারই পদমূলে বসে শেষ বারের মত অতীতের স্মৃতি চারনায় অন্য মনষ্ক।
কতবার এই প্রাঙ্গন পরে ঝরেছে রক্ত আক্রান্ত হয়েছে তাদের প্রানপ্রিয় এই মহাবিদ্যালয়।আক্রমন করেছে যেমন মুসলিম মৌলবাদীরা আবার তেমনই হিন্দু ব্রাহ্মণ্য বাদীরা। জীবন পণ করে দাঁড়িয়েছে ছাত্ররা তাদের এই প্রানপ্রিয় স্হানটির যাতে মর্যাদার হানি না হয় আর সর্বাগ্রে আচার্য অতীশ দীপঙ্কর।
পিং জানে এই সময় আচার্য আসবেন মূল দ্বারপ্রান্তে। কারন রাত চারটে থেকে শুরু হয় স্হানীয় দরিদ্র মানুষদের অন্ন বিতরনের কাজ সব সম্পূর্ণ হতে সাড়ে পাঁচটা ।আর তারপর আচার্য নিজে আসেন তার অতি আদরের সরলমতি কিন্ত অসুস্থ শিশু সুভদ্রাকে নিজ হাতে আহার এবং ওষুধ সেবন করাতে।যতক্ষন আচার্য না আসেন দ্বার প্রান্তে অপেক্ষা করে সে শিশু তার পিতার আগমনের আশায়।তারপর স্নেহবৎসল একটি ঘন্টার পিতা,কন্যার এক অপূর্ব মিলনক্ষন।
পিং ভেবেছিল এইটিই সঠিক সময় আচার্যর কাছে আরও একটা বছর সময় ভিক্ষা করবার।তাই পাঁচটা বাজতে সে এসে হাত লাগিয়েছে অন্ন পরিবেশনের কাজে।
ঠিক সাড়ে পাঁচটায় সেই দীর্ঘ দেহী আপাত গম্ভীর মানুষটির দেখা মিলল।পিং এগিয়ে গিয়ে তাঁর পদস্পর্শ করে প্রণাম করলেন।মুখ তুলে চাইলেন আচার্য। "কে তুমি?"
সত্যিই তো।এতে মন খারাপের কিছু নেই।দশহজার ছাত্রের মুখমন্ডল দুই হাজার শিক্ষকের পক্ষে মনে রাখা সম্ভব নয়।
আপন পরিচয় দিয়ে সব কথা বলতেই গায়ে আদরের হাত বুলিয়ে মাথায় দশ দশটি আঙুল স্পর্শ করে বললেন গুরুদেব "তুমি জ্যোতির্বিজ্ঞান এর ছাত্র। আমি স্বপ্ন দেখি মানুষ একদিন জ্যোতির্লোককে আপন তালুতে বন্দী করেছে।যাও দেশে ফিরে যাও।বিজ্ঞানের জন্য কাজ কর।মানুষের জন্য কাজ কর।"
নিজের বুকে টেনে নিলেন ছাত্র পিং এর অশ্রুসিক্ত মাথা।
We hate spam as much as you do