বাংলার তথা দেশের নবজাগরণের প্রতীক এর ২৫০ তম জন্মদিবসে আমরা দেখতে পাচ্ছি এখনকার ভারতবর্ষে মৌলবাদী চিন্তা ও সংস্কারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে । বাংলার তথা দেশের নবজাগরণের প্রতীক বেঁচে থাকলে এই নতুন অধ্যায় হয়তো সহ্য করতে পারতেন না।
ভারত পথিক রামমোহন ২৫০ ।এক নিরন্তর সত্য সন্ধানী ও আজকের ভারত
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ রাজা রামমোহন রায়কে বলেছিলেন ভারত পথিক । কবির ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ রামমোহন রায়ের প্রিয় পাত্র ছিলেন । শিক্ষা সমাজ সংস্কার ক্ষেত্রে রাজা ছিলেন তার সময়ে একা । একা যেন এক দীর্ঘকায় প্রকাণ্ড মানুষ সত্যের সন্ধানে পরিক্রমা করছেন ।
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার অগ্রদূত ।ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের আদি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, যেসব মানুষ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজে যে যে ধরনের পরিবর্তন এনেছেন, তাদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ের নাম থাকবে সবার উপরে। এর কারণ হচ্ছে আঠারো এবং উনিশ শতকে বাংলার মাটিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা- এসব ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্তন এসেছে তার জন্য পুরো কৃতিত্ব রাজা রামমোহন রায়ের। তার সাথে আরও অনেকেই সে সময় কাজ করেছেন। কিন্তু শুরুটা করে দিয়েছিলেন তিনিই। আজকে আমরা বাংলায় যে সমাজ দেখি, শিক্ষার দিক দিয়ে যে পরিবর্তনের ধারা দেখি, তার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তার অবদান আরও বেশি করে মনে রাখার মতো এবং গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সে সময় ইংরেজদের আধিপত্য ছিল বেশি। তাদের নির্দেশেই সকল কাজ হতো। এরকম সময়ে বাঙালি হয়ে নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করা এবং প্রচার করা অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ ছিল নিঃসন্দেহে।
রাজা রামমোহন রায় নিজেকে শুধু শিক্ষিত করে তোলেননি, বরং সমাজের অন্যান্য মানুষও যেন সঠিক শিক্ষার আলো পায় সেজন্য তিনি আধুনিক বাংলা ভাষায় সংস্কৃত উপনিষদগুলোকে অনুবাদ করেছিলেন। এই কাজটি তিনি করেছিলেন সমাজের মানুষদের কুসংস্কার এবং সামাজিক কিছু নিষ্ঠুর রীতিনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য। তখন সমাজের একটু নিম্ন শ্রেণির মানুষদের খুব সহজেই শিক্ষিত কেউ উপনিষদের কথা বলে প্রভাবিত করতে পারতো। যেহেতু এগুলো সংস্কৃতে লেখা ছিল, তাই অনেকেই তা পড়তে পারতো না। যাতে সবাই নিজেদের পরিচিত ভাষায় পড়াশোনা করতে পারে, সেজন্য তিনি এই কাজটি করেছিলেন। সমাজ সংস্কারে তার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বাইরের দেশে ভ্রমণ এবং সেখানে যা কাজ হচ্ছে, সেগুলোর সাথে বাংলার মানুষদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা ছাড়া এই দেশের মানুষ কখনও উন্নতি করতে পারবে না। আবার উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাদের মতো করে ভাবতে হবে, তাদের কাজগুলো বুঝতে হবে, তাদের সংস্কৃতির সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে হবে। রাজা রামমোহন রায়ের পশ্চিমা দেশের সংস্কৃতি নিয়ে এবং তাদের সেখানে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া জ্ঞান নিয়ে আমূল আগ্রহ ছিল।
তার সময়ে বিজ্ঞানে চলছিল নিউটন পরবর্তী যুগ এবং শিল্প-কারখানা সৃষ্টির একটি রেনেসাঁ যুগ। তখন পশ্চিমারা নিজেদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত করার চেষ্টা করছে। রাজা রামমোহন রায়ের মনে হয়েছিল, পশ্চিমে বিশেষ করে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যা হচ্ছে, তা কখনোই ফেলে দেয়ার মতো না এবং এসবকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। এজন্য তিনি দেশে ফিরে নিজেদের পড়াশোনার মধ্যে ইংরেজি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেন এবং সমাজের মানুষদেরকে বোঝান যে নিজেদের দেশকে উন্নতির শিখরে নিতে হলে অবশ্যই সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাটাও রপ্ত করতে হবে। সে সময়ের চিত্র যদি আমরা এখন পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশ এবং ইউরোপের মধ্যে সেসময় কী পরিমাণ পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছিলো, যেটা তখন রামমোহন রায় বুঝতে পেরেছিলেন।
নিউটনের সময়ে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি সাধন হয়, সেটার পেছনে সেই দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। রয়্যাল সোসাইটি এবং এর মতো আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারকে প্রচার করেছিলো এবং বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। অন্যদিকে বাংলার মাটিতে এমন কাজ করার কেউ ছিল না। ইংরেজদেরও একধরনের অনিচ্ছা ছিল এই দেশের মানুষদের উন্নত করার প্রতি। এখানকার মানুষদের খাটিয়ে নিয়ে তারা নিজেদের দেশের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ক্রমেই যে দুই দেশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, রামমোহন রায় তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই যখন ইংরেজরা কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ তৈরি করার কথা বলে, তখন তিনি প্রচণ্ডভাবে সেটার বিরোধিতা করেন। সেখানে তিনি প্রস্তাব করেন শুধু সংস্কৃতি নয়, সেখানে বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, ভূগোল এসব বিষয়ও পড়াতে হবে। তার ধারণা ছিল পশ্চিমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং তাদের নিত্য-নতুন আবিষ্কার এবং ধারণাগুলোকে বুঝতে হলে উপমহাদেশ তথা বাংলার ছেলেমেয়েদেরকেও এসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান দিতে হবে, যাতে তারা নিজ দেশকে উন্নত করতে পারে এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সাথে যেন প্রতিযোগিতা করতে পারে। তার এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধারণা আমাদের দেশের সমাজে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিলো।
অনেকেই মনে করেন, রাজা রামমোহন রায় পশ্চিমাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন, কিন্তু আদৌ ব্যাপারটি এরকম ছিল না। তিনি বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায় যখন খ্রিস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক সমালোচিত হতো, তখন কড়া ভাষায় সেগুলোর প্রতিবাদ করতেন। ঠিকভাবে প্রতিবাদ করার জন্যই তিনি গ্রিক এবং হিব্রু ভাষা শিখেছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলার মানুষদের স্বাধীন চিন্তাধারার পক্ষে ছিলেন। সেজন্য ব্রাহ্ম সমাজ নামক একটি ধর্মীয় সংঘও গড়ে তোলেন, যেখানে স্বাধীন চিন্তাধারার বিষয়ে আলোচনা করা হতো এবং তাদের বিশ্বাস সমাজে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এমনকি তিনি যখন দিল্লির সম্রাটের পক্ষ থেকে ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে যান, তখন তার কথা এবং আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ যে জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ দেশ, তা পুরোপুরি প্রকাশ পায়। ১৮৩৩ সালের সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখে বাংলার এই মহান পণ্ডিত এবং সমাজ-সংস্কারক ইংল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন।
রাজা রামমোহন রায়ের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এবং প্রযুক্তিতে যেন কোনো পার্থক্য না থাকে, এই দেশের মানুষ যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না থাকে। তিনি যদি এখন কোনোভাবে দেখতে পারতেন যে দু’শ বছর আগে তার দেখিয়ে দেয়া পরিবর্তনগুলো এখন সমাজে পরিবর্তন এনেছে এবং আধুনিক সমাজ গড়ে তুলেছে, তাহলে হয়তো তিনি খুশি হতেন; কিন্তু আধুনিক সমাজে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা-বিদ্বেষ এবং শিক্ষিত মানুষের মাঝেও যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে বা ঘটছে, সেগুলো দেখে হয়তো মন খারাপও করতেন।
বাংলার তথা দেশের নবজাগরণের প্রতীক এর ২৫০ তম জন্মদিবসে আমরা দেখতে পাচ্ছি এখনকার ভারতবর্ষে মৌলবাদী চিন্তা ও সংস্কারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে । বাংলার তথা দেশের নবজাগরণের প্রতীক বেঁচে থাকলে এই নতুন অধ্যায় হয়তো সহ্য করতে পারতেন না।
মাত্র সাড়ে তিন দশক আগেও দেশে সতী প্রথার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসাবে থেকে গিয়েছেন রূপ কানয়ার। ১৮২৯ সালে প্রায় সমগ্র হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে লড়ে এই অসামাজিক প্রথাকে রদ করেছিলেন রামমোহন। প্রায় ২০০ বছর তথা কথিত আধুনিক ভারতে ১৮ বছরের তরুণীকে স্বামীর চিতায় সহমরণে জ্বলতে দেখল দেশ। করোনা মহামারীর জেরে সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ দেশে প্রতি দিন হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, গঙ্গায় ভাসছে লাশ। শ্মশানে ঠাঁই হচ্ছে না মৃতদেহের। তার মধ্যে কত মানুষ গোমূত্র এবং গোবর সারা গায়ে লেপে বসে থাকছেন ঠা ঠা রোদে। নির্দ্বিধায় পান করছেন সে সমস্ত বর্জ্য ! বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে চিতায় তুলে সেখানে যুক্তিকে সহমরণে পোড়ানো হচ্ছে প্রতি দিন। বাংলার তথা দেশের নবজাগরণের প্রতীক বেঁচে থাকলে এই নতুন অধ্যায় হয়তো সহ্য করতে পারতেন না।
ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়কে বলা হয় ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ। তিনি জন্মেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে। কিন্তু পরে হিন্দু ধর্মীয় প্রথা এবং সামাজিক ব্যবস্থায় সংস্কার সাধনই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যেরও জনক। বাংলা গদ্য তখন সবে শুরু হয়েছে। বাংলায়বহু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি। মূলত বিভিন্ন হিন্দু শাস্ত্র তিনি অনুবাদ করেছিলেন বিভিন্ন ভাষায়। যার মধ্যে বাংলা ছিল অন্যতম। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন দেশাচার বা শাস্ত্রে আছে বলে যে গুলো চালানো হয়, সেগুলো শাস্ত্রে কোথাও লেখা নেই।
হিন্দু ধর্মের আচার ও পৌত্তলিকতা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে বাবা মার সঙ্গে তাঁর তীব্র বিরোধ বাঁধে এবং পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেন। রামমোহন রায় কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসেন ১৮১৫ সালে। শুরু হয় সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই। হিন্দু ধর্মকে সংস্কার করতে তিনি আজীবন লড়াই করেছেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্মসমাজ, যা এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পথ-প্রদর্শক হিসাবে কাজ করেছিল।
আঠারোশ একুশে সংবাদ কৌমুদী নামেও একটি পত্রিকা বের করেন তিনি। এর একবছর পর রামমোহন ফারসি ভাষায়ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন যার নাম ছিল -মিরাত-উল-আকবর। সংবাদ কৌমুদী ছিল বাঙালি সম্পাদিত ও বাঙালি পরিচালিত প্রথম সংবাদপত্র। এর আগে "বেঙ্গল গেজেট" নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হত। সংবাদ কৌমুদী প্রকাশিত হয়েছিল দশ বছর। তিনি তার সংবাদপত্রে তুলে ধরতেন কীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লব মানুষকে মুক্তির সন্ধান দিয়েছে। তিনিই প্রথম ভারতে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন।
ভারতে সমাজ সংস্কারের জন্য সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলোপের ক্ষেত্রে । তৎকালীন হিন্দু সমাজের প্রথা অনুযায়ী হিন্দু বিধবাদের স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার বিধান ছিল। হিন্দু ধর্মমতে আঘাত লাগতে পারে বলে ইংরেজরা প্রথমে এই আইন প্রণয়ন করতে চায়নি, বলেছেন কৃষ্ণ ধর। তিনি বলেন অবশেষে ১৮২৯ সালে গর্ভনর জেনারেল বেন্টিঙ্কট এই আইন করেন, যার প্রধান কৃতিত্ব রামমোহন রায়ের।
'রাজা' উপাধি নিয়ে ১৮৩০ সালে রামমোহন রায় তৎকালীন দিল্লির বাদশাহ দ্বিতীয় আকবরের দূত হিসাবে ইংল্যাণ্ডে যান। বাদশাহ তাঁকে ভার দেন ইংল্যাণ্ডের সরকারের কাছে বাদশাহের ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করার জন্য। মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটেনের মাটিতেই ব্রিস্টলে ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রামমোহন রায়ের মৃত্যু হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে রামমোহন যে মুক্ত চিন্তাচেতনার আলো জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই আলো আজ কেমন যেন স্তিমিত, ম্রিয়মান দেখাচ্ছে।
We hate spam as much as you do