বাংলাদেশের মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়তে হবে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে জানকবুল করতে হবে, তার রণকৌশল ৭ ই মার্চের বক্তৃতার ভিতর দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্সের মাঠে( এখন নাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) বক্তৃতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়কালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা , সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে লড়াইয়ের প্রশ্নে একটি মাইলফলক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদের যে পরিবর্তিত স্বরূপটি ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, তার ই এক নগ্ন প্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্থানের সার্বিক আচার, আচরণের ভিতর দিয়ে। ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল ভারত ভেঙে পাকিস্থান।সেই পাকিস্থানের দুই প্রান্ত, পূর্ব পাকিস্থান আর পশ্চিম পাকিস্থান, এই দুটি অংশের ভিতরে ধর্মের সাদৃশ্য থাকলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে বৈসাদৃশ্য ই ছিল সবথেকে বেশি।ব্রিটিশ যে কায়দায় ভারতবাসীকে শাসনের নামে শোষণ করতো, পশ্চিম পাকিস্থানের শাসকেরা ঠিক সেই কায়দায় নামিয়ে এনেছিল পূর্বের বাঙালিদের উপর।
বাহান্নোর মহান একুশের আন্দোলন মুসলিম জাতীয়তাবাদের কফিনে পেরেক পোঁতার যে সূচনাপর্ব ঘটিয়েছিল, ভাষার ভিত্তিকে , সংস্কৃতির ভিত্তিকে ধর্মের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব করেছিলেন এই ৭ ই মার্চের বক্তৃতার ভিতর দিয়ে।পশ্চিম পাকিস্থানের স্বৈরশাসকেরা যে ভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের মানুষদের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবরোধ তৈরি করে বাঙালিকে সাংস্কৃতিক ভাবে ছিন্নভিন্ন করে শোষণের একটা নোতুন অত্যাচারের স্টিমরোলার নামিয়ে আনছিল, সেই পাশবিকতাকে কিভাবে সশস্ত্র গণ অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, তার বীজমন্ত্র স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতার ভিতর দিয়ে।অর্থনৈতিক অবরোধের পাল্টা অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আড়ালে পশ্চিম পাকিস্থানের সাম্রাজ্যবাদ, যা আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ই একটি দক্ষিণ এশিয় সংস্করণ, তার কিভাবে প্রতিবাদ ই শুধু নয়, প্রতিরোধ করতে হবে, জিততে হবে সেই লড়াই , তার পদ্ধতি এবং রণকৌশল বঙ্গবন্ধু তাঁর সাধের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের হিন্দু- মুসলমান,শিখ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে' বাঙ্গালী' র সামনে তুলে ধরেছিলেন এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার ভিতর দিয়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর দক্ষিণ এশিয়াতে সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রভাব খর্ব করতে অবিভক্ত পাঞ্জাবের শাসকদের আড়কাঠি হিশেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।ভারতের সঙ্গে সোভিয়েটের সখ্যতাও পশ্চিম পাকিস্থানের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের বাঙালিদের উপর সার্বিক অবরোধ তৈরিতে মার্কিন কার্যক্রমের একটি কারন। বঙ্গবন্ধু এই অর্থনৈতিক অবরোধের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী অভিষ্পাকে নস্যাৎ করবার লক্ষ্যেই ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলন করে চলছিলেন।ছয় দফার আন্দোলন, আইয়ুব খান বিরোধী উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান , এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতার নির্যাস কে অবলম্বন করে বাংলাদেশের মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়তে হবে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে জানকবুল করতে হবে, তার রণকৌশল ৭ ই মার্চের বক্তৃতার ভিতর দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু।
মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ কোন পর্যায়ে থাকলে গভীর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে মানুষকে আগামীদিনের আন্দোলন সম্পর্কে ওই ভাবে আদেশ করা যায়, তা উপলব্ধি করার জন্যে যেকোনো গণ আন্দোলনের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের কাছে গত অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে ৭ ই মার্চের বক্তৃতাটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।অতি সাধারণ মেঠো ভাষা তে মানুষের জীবন- জীবিকার সংগ্রামের দৈনন্দিন পারশ্বরিকতাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দিয়ে মুক্তিসংগ্রামে সেই লড়াইকে রূপান্তরিত করবার যাদুকাঠি জননায়কের ভিতর কিভাবে প্রতিফলিত হতে পারে, তা বোঝার জন্যে আমাদের এই বক্তৃতা শোনার এবং পড়বার ঐতিহাসিক গুরুত্ব চিরদিন অম্লান থাকবে।
এই বক্তৃতায় কখনো ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রকম ভাবনা ঠাঁই পায় নি।সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গটি। শত্রু প্রবেশ করেছে।আর সেই শত্রু নিজেদের মধ্যে কিভাবে ধর্মের নামে, জাত্যাভিমানের নামে, ভাষার নামে বিবাদ তৈরি করে নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ পূরণ করতে চায় , সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু মানুষকে সাবধান করে দিচ্ছেন।পঞ্চাশ বছরের সময়কে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধুর সেই সাবধানবাণীর প্রাসঙ্গিকতা আজ ও অটুট।গোটা উপমহাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয় করে কায়েমী স্বার্থান্বেষী শিবির আজ নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ বজায় রেখে চলেছেন।শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি প্রত্যক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধু কখনো করেন নি।কিন্তু ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের বক্তৃতায় তিনি যেভাবে শ্রেণী সচেতনতার কথা বলেছেন, ইতিহাসের সেই শিক্ষা আজ ও আমাদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সম্প্রদায় এবং অবশ্য ই দেশ নির্বিশেষে লড়াইয়ের ময়দানে নতুন করে কোমরে জোর আনবার শক্তি জোগান দেয়।
We hate spam as much as you do