Tranding

10:11 AM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / চিরবিদায় ট্র্যাজিক নায়ক

চিরবিদায় ট্র্যাজিক নায়ক

পুঁজির দালাল বলে সেদিন যাকে দেগে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি কিষেণজি থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেউই, আজ তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা মানুষের সামনে দিনের আলোর মতো প্রতিভাত। অন্যদিকে সেদিন হয়তো মানুষটি আড়ালে মুচকি হেসেছিলেন। তিনিও কি অনুভব করেননি, একদিন বাংলার মানুষ উপলব্ধি করবে তাঁরা কি হারিয়েছেন? পাম অ্যাভিনিউয়ের দু’কামরার ফ্ল্যাটে তাঁর সাদামাটা জীবন যাপন আজকের রাজনীতির দাঁত - নখ বের করা কদর্য রুপের সামনে একপ্রকার যেন মিথেই পরিণত হয়েছে। যেখানে সামান্য কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, মায় ব্লক সভাপতিদের প্রসঙ্গ উঠলেই উন্নয়নের জোয়ার স্বরূপ কয়েক কোটি টাকার গাড়ি, দেশে বিদেশে প্রাসাদপম বাড়ি, রিসর্ট, স্পা, হোটেল ইত্যাদি চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেখানে এক দশক মুখ্যমন্ত্রী থাকা ও তারও আগে কয়েক বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক , তথ্য - সংস্কৃতি মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলানো এবং দীর্ঘ সাড়ে - তিন দশক বিধায়ক থাকা একজন নেতার আড়ম্বরহীন জীবন যাত্রা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে

চিরবিদায় ট্র্যাজিক নায়ক

চিরবিদায় ট্র্যাজিক নায়ক

উত্থান দাশ


আরএসএস - বিজেপি - তৃণমূল - মাওবাদী...। চরম দক্ষিণপন্থী থেকে চরম বামপন্থী, সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার ‘কান্ডারি’কে সেদিন হারিয়ে দিয়েছিল। বরং বলা ভালো বাংলা তথা বাঙালীকেই হারিয়ে দিয়েছিল। সেদিন তিনি সফল হলে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সহ বেশ কিছু আঙ্গিকে বাংলার সমগ্র চিত্রটাই পাল্টে যেত। তা অনুধাবন করেই, নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক আকাঙ্খা চরিতার্থ করতে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তথা বামফ্রন্ট সরকার তথা বাংলার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের ডাক দেয় সেই অশুভ আঁতাত।

 ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।’ বাংলার যুব সমাজের হৃদয় উদ্বেলিত হয়েছিল যার এই স্লোগানে, সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা একজন ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবেই আপামর বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
কিন্তু এই ট্র্যাজিক নায়কের স্মৃতি মেদুরতায় আচ্ছন্ন বাঙালির মননে ম্যাকবেথের মতো,ক্ষমতার নেশায় উন্মত্ত  এক নরসংহারকের রক্তাক্ত কলেবর ভেসে উঠবে না। তাদের চোখে ভেসে উঠবে বাংলার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত হবে, দু'চোখ ভরা এই স্বপ্ন নিয়ে শিল্পায়নের জন্যে আকুল এক সৌম্য সুদর্শন অথচ অসহায় এক পথের দিশারী


 পুঁজির দালাল বলে সেদিন যাকে দেগে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি কিষেণজি থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেউই, আজ তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা মানুষের সামনে দিনের আলোর মতো প্রতিভাত। অন্যদিকে সেদিন হয়তো মানুষটি আড়ালে মুচকি হেসেছিলেন। তিনিও কি অনুভব করেননি, একদিন বাংলার মানুষ উপলব্ধি করবে তাঁরা কি হারিয়েছেন? পাম অ্যাভিনিউয়ের দু’কামরার ফ্ল্যাটে তাঁর সাদামাটা জীবন যাপন আজকের রাজনীতির দাঁত - নখ বের করা কদর্য রুপের সামনে একপ্রকার যেন মিথেই পরিণত হয়েছে। যেখানে সামান্য কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, মায় ব্লক সভাপতিদের প্রসঙ্গ উঠলেই উন্নয়নের জোয়ার স্বরূপ কয়েক কোটি টাকার গাড়ি, দেশে বিদেশে প্রাসাদপম বাড়ি, রিসর্ট, স্পা, হোটেল ইত্যাদি চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেখানে এক দশক মুখ্যমন্ত্রী থাকা ও তারও আগে কয়েক বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক , তথ্য - সংস্কৃতি মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলানো এবং দীর্ঘ সাড়ে - তিন দশক বিধায়ক থাকা একজন নেতার আড়ম্বরহীন জীবন যাত্রা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। জীবনের শেষ দিন অবধি তাঁর সম্বল বলতে ছিল কেবল একটি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েক হাজার টাকা। পাম অ্যাভিনিউয়ের সরকারি আবাসনে তাঁর দু'কামরার ফ্ল্যাটে বিলাসিতার লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই ‘পুঁজির দালালের’ ঘরে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রও নেই।

 বুদ্ধবাবুর সাদা পাঞ্জাবীতে সেদিন কালি ছেটানো যুগল - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী, বর্তমানে পালা করে তাঁর জীবন যাত্রা, রাজনৈতিক বোধ, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বোধ তথা রুচি নিয়ে ঢালাও প্রশংসা করে থাকেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে তো নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে একে অপরকে দোষী সাব্যস্ত করে কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, বুদ্ধবাবু নির্দোষ। অতঃপর, টেমস দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। কিন্তু নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, জঙ্গলমহলের সেই রক্তাক্ত অধ্যায় এবং বাংলার বেকার যুবকদের ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্নের হাহাকারের প্রতিধ্বনি বাংলার আকাশে, বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়। বুদ্ধবাবু ২০১৬ অবধি ভগ্নপ্রায় শরীর নিয়েও দল ও বাংলাকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সিওপিডি'র মরণ কামড়ে শয্যাশায়ী হয়েই জীবনের শেষ কয়েকটা বছর কাটাতে হয়েছে। একে একে পলিটিব্যুরো, রাজ্য সম্পাদকমন্ডলী, রাজ্য, কমিটি, জেলা কমিটি। পার্টির যাবতীয় পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে নেন অশীতিপর স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। মন তথা মস্তিষ্ক তখনও চাইছে, আরও একবার ব্রিগেডের ময়দান থেকে কমরেডদের তথা বাংলার যুবকদের পুনরুজ্জিবনের স্বপ্ন দেখাতে। কিন্তু শরীর অপারগ! ট্র্যাজেডির কি নির্মম পরিহাস। চোখের দৃষ্টিও ক্রমে ক্ষীণ হতে লাগল। বই পড়ার প্ৰিয় অভ্যাসেরও সলিল সমাধি ঘটাল ‘ট্র্যাজিক ফ্ল।’ কিন্তু মস্তিষ্ক তো পুরো মাত্রায় সচল। অতএব কোনো এক কান্ডারীর নেতৃত্বে বাংলার যুবকেরা অধরা মাধুরী ছুঁতে পারবেন। ‘আশায় বাঁচে চাষা।’ অতএব স্ত্রী মিরা ভট্টাচার্যকে অনুরোধ করলেন, রোজ সংবাদপত্র পড়ে শোনাতে। কিন্তু অন্ধকার তো কাটল না। নতুন ভোরের আগমনীর সুরের মূর্ছনা তো বাংলার মাঠে - ঘাটে, ক্ষেত - খামারে শোনা গেল না। ব্যর্থতার দায়ভার নিয়েই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু স্বপ্নের জাল বোনা তো শেষ হয়নি। রক্ত পতাকার লালিমা তো শহীদদের রক্তে আজও দৃশ্যমান। তাই দৃপ্ত কণ্ঠে লাল সৈনিকরা বুদ্ধবাবুর পথেই চলার বার্তা দেবে। অলিতে - গলিতে, রকে, চায়ের দোকানে, রেস্তোরাঁ, হোটেল, সমস্ত জায়গায় পাখি পড়ার মতো মানুষকে বোঝাবে - ‘উত্তর বিশ্বায়নের যুগে শিল্পায়ন অনিবার্য। এবং সেখানে পুঁজির অবদানও অনস্বীকার্য। রাজ্যে কৃষি জমির পরিমাণ এক কোটি তিরিশ লক্ষ একর। শিল্পের জন্যে সম্মিলিত জমির চাহিদা ছিল মাত্র এক লক্ষ একর যা কিনা মোট জমির পরিমানণের শতকরা এক ভাগ মাত্র। তবুও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে হারিয়ে দেওয়া হল। বাংলার বেকার যুবকদের হারিয়ে দেওয়া হল। জীবদ্দশায় বুদ্ধদেব হেরে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মরনোত্তর অধ্যায়ে আমরা নতুন ইতিহাস রচনা করব। তাঁকে জেতাব, আপনাদের জেতাব, বাংলাকে জেতাব...।’ বুদ্ধবাবু আপনি শান্তিতে ঘুমান। আপনার কমরেডরা বাংলার অতীন্দ্র প্রহরী রূপে জেগে রয়েছে।

Your Opinion

We hate spam as much as you do