Tranding

01:57 PM - 04 Feb 2026

Home / Article / মনুস্মৃতিকে কি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ?

মনুস্মৃতিকে কি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ?

প্রায় এক শতাব্দী আগে, এই আধুনিক সময়ের প্রথম দলিত বিদ্রোহের সময়, দলিতদের কিংবদন্তি নেতা ডঃ বি আর আম্বেদকর মহাদ -এ অনুষ্ঠিত একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে মনুস্মৃতি পোড়ান। শোনা যায় ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৭-এ, মহাদ সত্যাগ্রহে, তিনি বোম্বাই প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, যে এই মনুস্মৃতি একটা "প্রতিবিপ্লবের গসপেল"।

মনুস্মৃতিকে কি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ?

মনুস্মৃতিকে কি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ?


সুভাষ গাতাদে (সাংবাদিক)
12 Mar 2023
অনুবাদ - চিরন্তন গাঙ্গুলী 


পুরাতন ধ্রুপদী সাহিত্যে জ্ঞানের মুক্তো থাকতে পারে, কিন্তু সময় এর কিছু অংশকে ভুল প্রমানিত করেছে। মহান নাট্যকার শেক্সপিয়র অনুপ্রেরণা সৃষ্টি  করতে পারেন কিন্তু তাকে  এন্টি-সেমিটিজমের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল । এমনকি গৌতম বুদ্ধকেও নারী সম্পর্কে তার তথাকথিত  বিতর্কিত পর্যবেক্ষণের জন্য যাচাই করা হয়েছে।


সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে, ১৭ শতকের কবি-সন্ত তুলসীদাসের মহাকাব্য রামচরিতমানস এবং এর 'নারী এবং তথাকথিত নিম্নবর্ণের প্রতি কথিত অন্যায় এবং অবমাননাকর আচরণ' নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। এই ধরনের বই ও ধর্মগ্রন্থ সম্পাদনা করার বা স্ক্র্যাপ করার আওয়াজ আরও জোরে বেড়েছে। তবুও, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তর প্রদেশের একটি প্রধান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, এমন কিছু প্রস্তাব করেছে যা বিতর্কের মীমাংসার পরিবর্তে জলকে আরও ঘোলা করে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মশাস্ত্র এবং মীমাংসা বিভাগ, যার পাঠ্যক্রমে ইতিমধ্যেই প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মনুস্মৃতির পঠনপাঠন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে , ভারতীয় সমাজে মনুস্মৃতির "প্রযোজ্যতা" নিয়ে গবেষণার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ এই গবেষনা কাজে কেন্দ্রের ইন্সটিটিউট অফ এমিনেন্স স্কিমের অধীনে দশটি নির্বাচিত পাবলিক-ফান্ডেড প্রতিষ্ঠানের  তহবিল  খরচ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার পরিমান ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত।

বিএইচইউ-এর প্রস্তাবটি অনাবশ‍্যক ব‍্যায়ের প্রস্তাব বলা যেতে পারে - এবং শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে এটি একটি গুপ্ত বিষয়ের উপর অর্থ ব্যয়ের সাথে জড়িত, যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি একটি গুরুতর তহবিল সংকটের সম্মুখীন হয়েছে যাতে তারা অত‍্যন্ত প্রয়োজনীয় খরচও কমাতে বাধ্য হচ্ছে । 

প্রায় এক শতাব্দী আগে, এই আধুনিক সময়ের  প্রথম দলিত বিদ্রোহের সময়, দলিতদের কিংবদন্তি নেতা ডঃ বি আর আম্বেদকর মহাদ -এ অনুষ্ঠিত একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে মনুস্মৃতি পোড়ান। শোনা যায় ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৭-এ, মহাদ সত্যাগ্রহে, তিনি বোম্বাই প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বলেছিলেন,  যে এই মনুস্মৃতি একটা "প্রতিবিপ্লবের গসপেল"।


আম্বেদকরের সহযোগী গঙ্গাধর নীলকান্ত সহস্রবুদ্ধে কর্তৃক প্রস্তাবিত মনুস্মৃতির প্রতীকী প্রকাশ্য "পুড়িয়ে ফেলার" সময় বলেন এটা সম্মেলনের আয়োজকদের প্রস্তাব অনুসারেই করা হচ্ছে। মনুস্মৃতির শ্লোকগুলির মুল‍্যায়ন করে  , সম্মেলন থেকে "দৃঢ় মতামত" তৈরি করা হয়েছিল যে এই মনুস্মৃতিতে "শূদ্র জাতিকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্বকে চিরস্থায়ী করেছে"। রেজুলেশনে বলা হয়েছে, এই বই এর প্রেক্ষাপট ধর্মীয় বা পবিত্র গ্রন্থের অযোগ্য। সেই কারণেই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বইটির "পোড়ানোর" অনুষ্ঠান করে। এমনকি গৃহীত প্রস্তাবে বইটিকে "বিভাজনকারী" এবং "মানবতার ধ্বংসকারী" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সমস্ত তথ্য পাবলিক বুদ্ধিজীবী আনন্দ তেলতুম্বদে-এর বই, Mahad: The Making of the First Dalit Revolt, ২০১৭ সালে "নবায়ন" দ্বারা প্রকাশিত বইতে লিখেছেন ।

প্রায় এক পঁচিশ বছর পরে, সংবিধানকে জাতির কাছে উৎসর্গ করার সময়, আম্বেদকর, যিনি এর খসড়া কমিটির প্রধান ছিলেন, তার বিখ‍্যাত ঘোষণা সংবিধান "মনুর শাসনকালের অবসান" ঘটালো ।

যাইহোক, হিন্দু মহাসভা এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের জন্য একটি আধুনিক সংবিধানের সাথে কখনোই চোখে চোখ রেখে চ‍্যালেঞ্জ করেনি।। তাদের নেতারা মনুস্মৃতির প্রতি তাদের আনুগত‍্য হিসেবে ভারতীয় ঐতিহ্যকে আধুনিকীকরণে তাদের আপত্তি তুলে ধরেন। ষাটের দশকের শেষের দিকে, মারাঠি সংবাদপত্র, নাভা কালের সাথে একটি সাক্ষাত্কারে মনুস্মৃতির প্রশংসা করে আরএসএস সুপ্রিমোর মন্তব্যের প্রতিবাদে মহারাষ্ট্র দলিত এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক অংশগুলির একটি বিশাল আন্দোলন সংগঠিত হয় ।

তবুও গত বছর, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি প্রতিভা সিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা FICCI- আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মনুস্মৃতির উচ্ছসিত প্রশংসা   করেছিলেন। তিনি বলেন, মনুস্মৃতির মতো ধর্মগ্রন্থ নারীদের "খুবই সম্মানজনক অবস্থান" দেয়, তার এই মন্তব্য সেই সময় ক্ষোভের সৃষ্টি করে, "বর্ণবাদ এবং শ্রেণীবাদ" এর জঘন্য পশ্চাদপসরণমূলক ধারণাগুলিকে প্রচার করার জন্য তার প্রচুর সমালোচনা হয়।


মনে হয় বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদরা এই বইটি নিয়ে চরম বিতর্কিত ইতিহাস  এবং নারী ও দেশের তথাকথিত অ-অভিজাত জাতিগুলি সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যগুলি সম্পর্কে জানেন না। তাদের এই সিদ্ধান্ত 
 অবিশ্বাস সৃষ্টি করবে । নিঃসন্দেহে, এই সিদ্ধান্ত ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় সমাজে পরিবর্তনের জন্য সমস্ত বৈপ্লবিক সংগ্রাম এবং আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।  কিন্তু সমাজ  পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা শেষ হতে চায় না, তা হবেই। কিন্তু  বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠান এবং এইমতের  ব‍্যাক্তিরা এই চরম দক্ষিনপন্থী এবং পশ্চাদপন্থী বক্তব্যকে নতুনভাবে  বৈধতা দিতে চায়  এবং এই 
" প্রতিবিপ্লবী গসপেল " পুনঃপ্রতিষ্ঠিত  করতে চায়, তা মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক তাদের কিছু যায় আসেনা।

বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
newsclick থেকে গৃহীত

.

Your Opinion

We hate spam as much as you do