Tranding

10:40 AM - 04 Feb 2026

Home / Article / নির্মাণ ও সৃষ্টি ;- রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চিন্তা ও আইনস্টাইন; কয়েকটি প্রসঙ্গ

নির্মাণ ও সৃষ্টি ;- রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চিন্তা ও আইনস্টাইন; কয়েকটি প্রসঙ্গ

Theory of inderteminacy ‘ বা অনির্দেশ্যতার নীতি। যদিও অনেকেই একে বলে থাকেন ‘ Theory of Uncertainty’ বা অনিশ্চয়তার নীতি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কিন্তু এই সূত্রকে অস্বীকার করেছেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রতি আইনস্টাইনের মনোভাব সুস্পষ্ট ছিল না। ১৯২৫ সালএর পর থেকে যখন ধীরে ধীরে কোয়ান্টাম তত্ত্ব একে একে পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের বেশ কিছু সমস্যার সমধান করে দিল যা এতদিনের প্রচলিত ধ্রুপদী বলবিদ্যা করতে পারেনি ।

নির্মাণ ও সৃষ্টি ;- রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চিন্তা ও আইনস্টাইন; কয়েকটি প্রসঙ্গ

নির্মাণ ও সৃষ্টি ;- রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চিন্তা ও আইনস্টাইন; কয়েকটি প্রসঙ্গ                     
              
সৌম্যদীপ্ত রায়চৌধুরী

অতিথি অধ্যাপক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, যোগমায়া দেবী গার্লস কলেজ
                                               

‘ নির্মাণ’ ও ‘ সৃষ্টি ’ – এই দুই আপাত সমতুল বিষয়বস্তুকে রবীন্দ্রনাথ রাখেন দুই বিপরীত মেরুতে। ১৮৮৭ সালে ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধে নির্মাণ ও সৃষ্টির স্বরুপ সম্পর্কে তার ধারণা সুস্পষ্ট করে রবীন্দ্রনাথ লেখেন ;-
“ সৃষ্টির উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, নির্মাণের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়। ফুল কেন ফোটে তাহা কাহার সাধ্য অনুমান করে, কিন্তু ইঁটের পাঁজা কেন পোড়ে, সুরকির কল কেন চলে, তাহা সকলেই জানে। সাহিত্য সেইরূপ সৃজনধর্মী; দর্শন,বিজ্ঞান ইত্যাদি নির্মাণধর্মী।  সৃষ্টির ন্যায় সাহিত্যই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।“ ১
মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্ব কে দূরে সরিয়ে রেখেও এটুকু বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের নির্মাণ ও সৃষ্টির ধারণা মার্ক্সীয় উৎপাদন তত্ত্বের থেকে কিঞ্চিৎ পৃথক। এক হিসেবে আমরা এটুকু বলতেই পারিঃ- যা নির্মাণ তা সৃষ্টি নয়, যা সৃষ্টি তা নির্মাণ নয়। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে বিজ্ঞানকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দেখছেন? যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন তার উত্তরাধিকার কোথায়? নির্মাণ ধর্মী বিজ্ঞান চেতনার যে আভাস তার মধ্যে সুপ্ত ছিল, পরবর্তীকালে কীভাবে সে চেতনা হয়ে উঠল রবীন্দ্র দর্শনের দিশারী? ১৯৩৭ সালে ‘বিশ্বপরিচয়  গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লেখেন;-
“ বিশ্ব রচনার মূলতম উপকরণ পরমাণু; সেই পরমাণুগুলি অচিন্তনীয় বিশেষ নিয়মে অতি সূক্ষ্ম জীবকোষরূপে সংহত হল। প্রত্যেক কোষটি সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র,তাদের প্রত্যেকের নিজের ভেতরেই একটা আশ্চর্য শক্তি আছে যাতে করে বাইরে থেকে খাদ্য নিয়ে নিজেকে পুষ্ট, অনাবশ্যককে ত্যাগ ও নিজেকে বহুগুনিত করতে পারে। এই বহুগুনিত করার শক্তি দ্বারা ক্ষয়ের ভিতর দিয়ে মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রাণের ধারা প্রবাহিত হয়ে চলে।‘২

উপরোক্ত উদ্ধৃতি অবলোকন করলে  আমরা স্পষ্টত দেখতে পাব রবীন্দ্রনাথ যে প্রাণ এবং অপ্রাণের মূলগত পার্থক্যের কথা বলছেন তা স্রেফ আবেগসর্বস্ব হয়ে এমনটা নয়। রবীন্দ্রনাথ আসলে যা বলতে চান তা হল পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান।   ১৯৩৭-৩৮ সালে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন –‘
“ সেই পরমাণুগুলি অচিন্তনীয় বিশেষ নিয়মে অতি সূক্ষ্ম জীবকোষরূপে সংহত হল।“
তখনও আণবিক জীববিদ্যা বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়নি, অথচ জীব কোষে অনু পরমাণুর এই যে খেলা, রবীন্দ্রনাথ তাকে চিনেছিলেন, তাকে বুঝেছিলেন। অর্থাৎ বিজ্ঞান চেতনা নামক যে ধারণা আমাদের মধ্যে আবহমান তার শরিক ছিলেন রবীন্দ্রনাথও। আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার কোনও সুযোগ তার ছিল না, অথচ কী অবলীলায় তিনি লিখে গেছেন বিজ্ঞানের এই গূঢ় রহস্য নিয়ে। শুধুমাত্র বিশ্বপরিচয় গ্রন্থের এই কয়েকটি পংক্তি নয়, প্রায় সমসাময়িক ‘ নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতাতেও বাঙময় হয়ে উঠেছে কবির এই উপলব্ধি। ১৯৩৮ সালের ৭ই ডিসেম্বরে লেখা সে কবিতায় তিনি লেখেনঃ-
“ চতুর্দিকে বহ্নিবাস্প শূন্যাকাশে ধায় বহুদুরে,
কেন্দ্রে তার তারাপুঞ্জ মহাকাল- চক্রপথে ঘুরে।
কত বেগ কত তাপ কত ভার কত আয়তন,
সূক্ষ অঙ্কে করেছে গণন পণ্ডিতেরা, লক্ষ কোটি ক্রোশ দূর হতে
দুর্লক্ষ্য আলোতে।“ ৩
আমাদের এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের পারস্পরিক বিনিময়। কীভাবে সাক্ষাত হচ্ছে তাদের? রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ডের ম্যানচেষ্টার কলেজে ১৯৩০ সালের  মে মাসের  ১৯, ২১ ও ২৬ তারিখ হিবার্ট বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই বিশেষ বক্তৃতামালার  বিষয় বস্তু ছিল Religion of Man বা মানুষের ধর্ম,  ইংল্যান্ড থেকে জুলাই মাসে তিনি বার্লিন যাত্রা করেন। কাপুথে আইনস্টাইনের গ্রীষ্মাবাসে ১৪ই জুলাই , তাঁদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ এবং কথোপকথন হয়। এই সাক্ষাতকারের সারমর্ম অনুধাবন করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের মনন ও চেতনার অভ্যন্তরে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। সুদীর্ঘ সাহিত্য জীবনে যে বিপুল সম্ভার তিনি সাজিয়ে রেখে  গেছেন আপামর মানুষের জন্য  তার সারবস্তুই জীবনদর্শন এবং উপলব্ধি সত্য । নিচে রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের কথোপকথনের আলাপচারিতার কিছু অংশ অনুবাদে তুলে দেওয়া হলঃ-

“র : আপনি অংকশাস্ত্রের দুটো প্রাচীন জিনিস, স্থান এবং কাল-এর অনুসন্ধানে ব্যস্ত। আর আমি এদেশে পরমপুরুষের অনন্ত-শাশ্বত বিশ্ব-সত্যের জগৎ নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ঘুরছি।]
আ : আপনি ঐশী শক্তিকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিশ্বাস করেন?
র : বিচ্ছিন্ন নয়। পরমপুরুষের (eternal man) অনন্ত সত্তা বিশ্বপ্রকৃতিকে অনুধাবন করে। এমন কিছুই নেই যা মানবিক সত্তা বুঝতে অপারগ, এবং এটাই প্রমাণ করে যে বিশ্বজগতের সত্য মানবিক সত্য।
আ : বিশ্বজগতের প্রকৃতি সম্বন্ধে দুটো ধারণা রয়েছে :
১. মানবিকতার ওপর নির্ভরশীল জগৎসত্তা,
২. মানবিকতার ওপর অনির্ভর জগৎসত্তা।
র : যখন বিশ্বজগৎ চিরন্তন পরমপুরুষের সঙ্গে একাত্ম হয় তখন আমরা সত্যকে জানি, একে সুন্দর হিসেবে গ্রহণ করি।
আ : এটা বিশ্বজগতের সম্পর্কে একান্ত মানবনির্ভর ধারণা।
[র : অন্য কোন ধারণা থাকতে পারে না। জগৎ হচ্ছে মানবিক জগৎ, এর বৈজ্ঞানিক ধারণা বৈজ্ঞানিক মানুষেরই। অতএব আমাদের ত্যাজ্য করে জগতের অস্তিত্ব অবান্তর, কেননা জগৎসত্তার বোধ আপেক্ষিক, এবং এর বাস্তবতা আমাদের চৈতন্যনির্ভর। সত্যতা দেওয়ার জন্য যুক্তি এবং বোধের একটা মানদণ্ড রয়েছে : তা হচ্ছে পরম পুরুষের মানদণ্ড, যাঁর অনুভব আমাদের অনুভবের মধ্যে দিয়েই প্রবাহিত।
আ : এটি মানব সত্তা সম্পর্কে প্রকাশিত ধারণা ]
র : হ্যাঁ তা এক অনন্ত সত্তার ধারণা। তাঁকে আমাদের মানসিক চৈতন্য এবং কর্মের মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করি, আমাদের সসীমতার মধ্যে পরমপুরুষের অসীমতাকে গ্রহণ করি। ব্যক্তির মধ্যে যা সীমিত নয় বিজ্ঞান তাই নিয়ে সচেষ্ট; সেটি নৈর্ব্যক্তিক সত্যের বিশ্বজগৎ। ধর্ম এই সব সত্যকে সজ্ঞাত করে এবং মনের গভীরতর আর্তির সঙ্গে স¤পৃক্ত করে, ব্যক্তিগত চৈতন্য মহাজাগতিক মূল্য অর্জন করে। ধর্ম সত্যকে মূলোত্তীর্ণ করে : ঐক্য-সুসামঞ্জস্যের ভিতর দিয়ে সত্যকে মঙ্গল হিসেবে আমরা জানতে পারি ।
আ : তা হলে সত্য বা সৌন্দর্য নৈর্ব্যক্তিক নয়।
[র : না ।
আ : সৌন্দর্যবোধ সম্পর্কে আমি এক মত, কিন্তু সত্য সম্পর্কে নয়।
র : কেন নয়? সত্য তো মানুষের মধ্যে দিয়েই গৃহীত হয়।
[আ : আমার ধারণার কোনো প্রমাণ দিতে আমি অপারগ, কিন্তু সেইটে আমার বিশ্বাস।]
র : সৌন্দর্য হচ্ছে ঐক্য-সুসামঞ্জস্যের শ্রেষ্ঠ আদর্শ এবং সেইটেই বিশ্বপুরুষের মধ্যে প্রবাহিত। আমাদের সমন্বিত অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে ব্যক্তিবিশেষে আমরা তাঁকে উপলব্ধি করি আমাদের আলোকিত চৈতন্যে; এ ছাড়া আমরা কি ভাবে সত্যকে চিনতে পারবো?]
আ : বিজ্ঞান দিয়ে আমি প্রমাণ করতে অপারগ যে, সেই সত্যই সত্য বলে নির্ধারিত হবে যা মানবিকতার অপরোক্ষ। কিন্তু একথা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যেমন জ্যামিতির পিথাগোরাসের উপপাদ্য এমন কিছু প্রস্তাব করে যা মানুষের
অস্তিত্ব ব্যতিরেকেও প্রায় সত্য। যা হোক, মানবিকতার বাইরে যদি কোন বাস্তব থেকে থাকে, তবে ঐ বাস্তবের আপেক্ষিক একটি সত্যও রয়েছে। একইভাবে প্রথম বক্তব্যের নেতি সম্পূরক যুক্তির বিলোপ ঘটায়।
র : [ভারতীয় দর্শন অনুসারে পরমসত্য ব্রহ্ম বিদ্যমান, যাকে বাক্যে বর্ণনা করা যায় না, অথবা ব্যক্তিগত মনকে বিচ্ছিন্ন করে যাকে বোঝা যায় না; তাঁকে অনন্ত সত্তার সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ মিলনেই লাভ করা সম্ভব। কিন্তু এই ধরনের সত্য বিজ্ঞানের জগতের নয়।] সত্যের যে ধরনের চারিত্র্য আমরা আলোচনা করছি, সেটি একটি আবির্ভাব, মানে মানবিক মনে যা সমুদ্ভাসিত হয়, এবং সেহেতু তা মানবিক। একে মায়া বলা যেতে পারে।
আ : সমস্যার শুরু হয় তখন, যখন জিজ্ঞাসা ওঠে যে সত্য মানুষের সজ্ঞানতার নিরপেক্ষ কি না।
র : আমরা যাকে সত্য বলি তা সত্তা-নিরপেক্ষতা এবং সত্তা-সাপেক্ষতা এই দুটোর সমঝোতার মধ্যে নিহিত। এবং এই দুই দৃষ্টিই পরমপুরুষের সঙ্গে সংযুক্ত।
র : [ বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, কঠিন বস্তু, টেবিল একটি প্রতিভাষ (appearance)। অতএব মানবিক মন যাকে টেবিল হিসেবে অনুভব করে তার অস্তিত্ব থাকবে না যদি মন না থাকে। সঙ্গে-সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে, টেবিলের চূড়ান্ত বাস্তব সত্তা কতগুলো তড়িৎ শক্তির ঘূর্ণায়মান কেন্দ্র ছাড়া কিছুই নয়, এবং সেগুলোও মানব মনের অন্তর্ভুক্ত।] সত্যের উপলব্ধির ক্ষেত্রে পরমপুরুষের মানব (universal human mind) এবং ব্যক্তিক মানুষী মনের (mind confined in the human individual) মধ্যে নিরন্তর দ্বৈত রয়েছে। বিজ্ঞান , দর্শন এবং নীতিশাস্ত্রে সমঝোতার চিরন্তন চেষ্টা চলছে। যা হোক, যদি কোনো সত্য বিদ্যমান থাকে যা মানবিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিশ্লিষ্ট, তবে আমাদের জন্য তা চরমভাবে অনধিষ্টিত। [এমন কোনো মন কল্পনা করা কঠিন নয় যাতে ঘটনা পরম্পরা স্থানে না ঘটে কালে ঘটে, যেমন সংগীতের স্বর রচনায় এমনটা হয়ে থাকে। এই ধরনের চিন্তায় বাস্তবতা বরং সাংগীতিক সত্যের অনুরূপ এবং সেখানে পিথাগোরাসের জ্যমিতির কোনো অর্থ নেই। কাগজের অস্তিত্ব সাহিত্যের অস্তিত্বের চেয়ে কতো পৃথক। কাগজভুক কীটের জন্য সাহিত্য নিরর্থক, অথচ মানুষের জন্য কাগজের চেয়ে সাহিত্যের সত্য-মূল্য অনেক বেশি। ] একইভাবে, যদি কোনো সত্য থেকে থেকে যার সঙ্গে মানুষী মনের কোনো ইন্দ্রিয়গত বা যুক্তিসম্মত সম্পর্ক নেই, তবে সেটা যতোদিন মানুষ আছে ততোদিন অনর্থকই রইবে।
আ : তা হলে আপনার চেয়ে আমি বেশি ধার্মিক।
র : আমার ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে পরমপুরুষের, বিশ্বপুরুষসত্তার সামঞ্জস্য সমন্বয়। হিবার্ট বক্তৃতায় এইটেই আমার বিষয়, যাকে আমি নাম দিয়েছি ‘মানুষের ধর্ম’।“

‘মানুষের ধর্ম’ নিবন্ধের নির্যাস, ‘পরমপুরুষ’, ‘ব্যক্তিগত মানুষ নয়, সে বিশ্বগত মানুষের একাত্ম’ ‘তথা মানুষের সম্বল কিন্তু সত্য তার ঐশ্বর্য’, ‘অসীমের সঙ্গে সীমার একাত্ম প্রকাশ’–এই সব উপাদান আসলে রবীন্দ্রনাথের কবিতামসগ্র, গান এবং অনেক প্রবন্ধাবলীর মধ্যেকার প্রধান সূত্র। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ থেকে ‘মানস-সুন্দরী’, ‘জীবন দেবতা’ অবশেষে ‘পরমপুরুষ’ অভিষেক অব্দি এই রাবীন্দ্রিক সারবত্তার প্রকাশ ও বিস্তৃতি।
এই রবীন্দ্রবোধের উৎস অবশ্যই উপনিষদ।এক জায়গায় তিনি লিখছেন ,
“সেইটেকেই বড়ো করে দেখো যে ইতিহাস সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের সারথ্যে চলেছে বিরাটের মধ্যে, ইতিহাসের অতীত সেই মানবের আত্মার কেন্দ্রস্থলে, আমাদের উপনিষদ সে কথা জেনেছিলো এবং সেই উপনিষদের কাছ থেকে আমি যে বাণী গ্রহণ করেছি সে আমিই করেছি, তার মধ্যে আমারই কর্তৃত্ব।”৪ 
এই উপনিষদীয় দর্শনের সারমর্ম হচ্ছে :  নিরাকার পরম পিতা অর্থাৎ পরমেশ্বর ব্রহ্ম আত্মপ্রকাশ করেছেন সৃষ্টির মাধ্যমে। সার্থক সৃষ্টির পরম পরিণতি হল  পুনরায় ব্রহ্মত্বে বিলীন হয়ে যাওয়া। এই আবর্তনের বৃত্তাকার প্রক্রিয়াই হল ‘লীলা  বা ‘মায়া।পরমপুরুষ বা পরমব্রহ্মের  সঙ্গে ব্যক্তিপুরুষ বা “আত্ম” এর  সংযোগ ঘটে আত্মায়।ব্যক্তিপুরুষের  অভিজ্ঞতা যখন জাগতিক আনন্দ নিত্যতায় একাত্ম হয় তখনই ব্যক্তিগত সত্য পরমপুরুষের সত্যে উত্তীর্ণ হয়। এই উপনিষদীয় দর্শনকে কীভাবে আত্ম্যস্থ করেছেন রবীন্দ্রনাথ?  রবীন্দ্রনাথ লিখছেন-
.    …‘আপন সত্তার মধ্যে দুটি উপলব্ধির দিক আছে। এক যাকে বলি আমি, আর তারই সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে যা-কিছু, যেমন আমার সংসার, আমার দেশ, আমার ধনজনমাল, এই যা-কিছু নিয়ে মারামারি কাটাকাটি ভাবনা-চিন্তা। কিন্তু পরমপুরুষ আছেন, সেই সমস্তকে অধিকার করে এবং অতিক্রম করে…। বিশ্বদেবতা আছেন তাঁর আসন লোকে, গ্রহচন্দ্রতারায়। জীবনদেবতা বিশেষভাবে জীবনের আসনে, হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর পীঠস্থান সকল অনুভূতি সকল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। …আমার মন যে সাধনাকে স্বীকার করে তার কথাটা হচ্ছে এই যে, আপনাকে ত্যাগ না করে আপনার মধ্যেই সেই মহান পুরুষকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্র আছে,তিনি নিখিল মানবের আত্মা। তাঁকে সম্পূর্ণ উত্তীর্ণ হয়ে কোনো মানব বা অতিমানব-সত্যে উপনীত হওয়ার কথা যদি কেউ বলেন, সে কথা বোঝবার শক্তি আমার নেই। কেননা আমার বুদ্ধি মানববুদ্ধি। আমার হৃদয় মানবহৃদয়, আমার কল্পনা মানবকল্পনা। তাকে যতই মার্জনা করি, শোধন করি, মানবচিত্ত তা কখনোই ছাড়তে পারে না। আমরা যাকে বিজ্ঞান বলি তা মানববুদ্ধিতে প্রমাণিত বিজ্ঞান । আমরা যাকে ব্রহ্মানন্দ বলি তাও মানবের চৈতন্যে প্রকাশিত আনন্দ। এই বুদ্ধিতে এই আনন্দে যাঁকে উপলব্ধি করি তিনি ভূমা, কিন্তু মানবিক ভূমা। তার বাইরে অন্য কিছু থাকা না থাকা মানুষের পক্ষে সমান।’—মানুষের ধর্ম।

উপরোক্ত উদ্ধৃতির থেকে এটা স্পষ্ট যে, রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের সঙ্গে যে আলাপ করেছিলেন তার সারবস্তু  কবির উপনিষদীয় দর্শন, সত্য-বোধ সঞ্জাত। এবং একজন কবি একজন বিজ্ঞানী একত্রে  ‘সত্য  নিয়ে আলাপ করেছেন, অথচ তাঁদের দুজনের ‘সত্য’র সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইনস্টাইন পক্ষ নিচ্ছেন বৈজ্ঞানিক সত্য-র । কারণ তার সত্য যাচিত,তার সত্যের ইতিহাস আর্কিমিডিস থেকে নিউটন পর্যন্ত এই দীর্ঘ দুই হাজার বছরের পরীক্ষিত সত্যের ইতিহাস । এই সত্যের ভিত্তি  প্রচলিত নিয়মাবলীর অস্তিত্ব এবং কারণিক বাস্তবতার (Objective Reality) অস্তিত্বের স্ ওপর দাঁড়িয়ে। একথাও স্মরণযোগ্য যে, স্বয়ং আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সূত্রের মাধ্যমে স্থান ও কালের Objective Reality মূর্ত করেছিলেন।, Absolute Space এবং Absolute Time-এর যে ধারণা  নিউটন আমাদের দিয়েছিলেন তাকে নস্যাৎ করে এই যুক্তি। আইনস্টাইন তাঁর স্বল্প বক্তব্যে  মানবিক অভিমুখ হীন জগৎকে স্বীকার করেছেন এবং তার ভিতর থেকে যে প্রাকৃতিক সত্য বেরোতে পারে সে-দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কবির সত্য এবং বিজ্ঞানীর সত্য ঠিক কেমন হতে পারে? নোবেলজয়ী বেলজিয়ান রসায়নবিদ ইলিয়া প্রিগইন তার বিখ্যাত গ্রন্থ  “Order out of Chaos”  এ  লিখছেনঃ-

“The question of the meaning of reality was the central subject of a fascinating dialogue between Einstein and Tagore. Einstein emphasized that science had to be independent of the existence of any observer. This led him to deny the reality of time as irreversibility, as evolution. On the contrary, Tagore maintained that even if absolute truth could exist, it would be inaccessible to human mind. Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet.”৪

রবীন্দ্রনাথের ‘সত্য’  কোনও  কারণিক বাস্তবতাজনিত নয়। এই সত্যের ভিত্তি উপনিষদীয় তত্ত্ব , যেখানে পরম ব্রহ্মের  অস্তিত্ব এবং তাঁর শ্রেয়োবোধের বা প্রবর্তনাকে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে নিতে হবে। পরমপুরুষের সঙ্গে ঐক্য-সামঞ্জস্য–এগুলো রবীন্দ্রনাথের উপনিষদসঞ্জাত ধ্যান-ধারণা। কিন্তু তিনি যখন বলেন, সত্য ‘মানবিক’ এবং ‘সত্য তো মানুষের মধ্যে দিয়েই গৃহীত হয়’, তখন তাঁর উপলব্ধি এবং সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। কেননা তিনি এই ‘গৃহীত হয়’ প্রক্রিয়াকে কেবলমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে ধরেন না। তিনি ‘মানববুদ্ধিতে প্রমাণিত বিজ্ঞান’ এবং ‘ব্রহ্মানন্দ…মানবের চৈতন্যে প্রকাশিত আনন্দ  এ দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। সেই জন্য ‘সত্য’র সঙ্গে যে ‘মানবিক’  বিশেষণ জুড়ে দ্যান, তার ধারণা বিজ্ঞানের মানবিক ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতার বাইরে অন্য কোনও  ক্ষেত্রে স্থাপিত। সেটা মানসিক সত্য হতে পারে, কিন্তু কারণিক সত্য নয়।

১৯৩০ সালের ১৪ই জুলাই সেই সাক্ষাতকার ফলপ্রসূ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের এই গোটা আলাপচারিতা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানের যে শাখার ওপর আস্থা রাখছেন তা কোয়ান্টাম তত্ত্ব। অপরদিকে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বকে অস্বীকার করেছেন বহু আগেই। কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক হিসেবে যিনি পরিচিত সেই ওয়ার্‌নার হাইজেনবার্গ  বলেছিলেন ;-
“ The laws of nature which we formulate mathematically in quantum theory deal no longer with the elementary particles themselves but with our knowledge of the particles.”

প্রথম জীবনে আইনস্টাইনের অগাধ বিশ্বাস ছিল পজিটিভিজমের ওপর। কিন্তু বিশের দশকে এসে তার এই ধারনার আমূল পরিবর্তন ঘটে। শেষ জীবনে দার্শনিক কার্ল পপারকে তিনি জানান গোড়াতে যে তিনি পজিটিভিজমে বিশ্বাস করতেন সেইটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক বছর আগেই আইনস্টাইনের এই মত পরিবর্তন হয়। ১৯২৬ সালে বিজ্ঞানি হাইজেনবার্গের সঙ্গে সাক্ষাত কালে আইনস্টাইন তার এই মতামত ব্যক্ত করেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রকৃতি আসলে কেমন তা নিয়ে নীরব, বরং প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের কী ধারণা সেটাই তার অধীতব্য। এবং এই কারনেই ১৯৩০ সালের জুলাই মাসের সেই সাক্ষাতকার ফলপ্রসূ হয়নি। দ্বিতীয়বার ১৯৩০ সালের ১৯শে আগস্ট আরেকটি আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেন আধুনিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ বলছেনঃ-
“ শুনছি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুলোকে আকস্মিকতার একটা ভূমিকা আছে। অস্ত্বিত্বের নাটক সেখানে আগে থেকেই পুরোপুরি সুনির্দিষ্ট হয়ে যায় না।“
আকস্মিকতা বলতে কী বোঝাতে চাইছেন রবীন্দ্রনাথ? ধরা যাক একটি পাত্রে অনেকগুলি ইলেকট্রন আছে যার একটি নির্দিষ্ট কণাকে দেখতে আপনি ইচ্ছুক। ইলেকট্রন স্থির নয়, সর্বদা সঞ্চারণশীল। কিন্তু ইলেকট্রন কেমন দেখতে? ইলেকট্রনের  ওজন এবং আয়তন নগন্য। ফলত সহজে একটি নির্দিষ্ট ইলেকট্রনকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।  যে আলোক তরঙ্গের সাহায্যে আমরা ইলেকট্রনকে দেখার ছেস্তা করছি সেই আলোক তরঙ্গের কম্পন এবং গতিবেগের কারণে ইলেকট্রনের গতিবেগ বেড়ে যাবে এবং তার অবস্থানও বদলে বদলে যাবে। বিজ্ঞানি হাইজেনবার্গ যাকে বলবেন
‘Theory of inderteminacy ‘  বা অনির্দেশ্যতার নীতি। যদিও অনেকেই একে বলে থাকেন ‘ Theory of Uncertainty’ বা অনিশ্চয়তার নীতি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কিন্তু এই সূত্রকে অস্বীকার করেছেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রতি আইনস্টাইনের মনোভাব সুস্পষ্ট ছিল না। ১৯২৫ সালএর পর থেকে যখন ধীরে ধীরে কোয়ান্টাম তত্ত্ব একে একে পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের বেশ কিছু সমস্যার সমধান করে দিল যা এতদিনের প্রচলিত ধ্রুপদী বলবিদ্যা করতে পারেনি । কিন্তু আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের তত্ত্বগত ভিত্তিকে কোনদিনই মেনে নিতে পারেন নি।

জীবনের প্রায় সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ফের একবার চেষ্টা করলেন বস্তুবিশ্বকে জানার। শেষবার দেখে নিতে চাইলেন বস্তুবিশ্ব। ‘জন্মদিনে’ কাব্যগ্রন্থের ৫ সংখ্যক কবিতায় তিনি লিখলেন ;-

‘ জীবনের আশি বরষে প্রবেশিনু যবে
এ বিস্ময় মনে আজ জাগে-
লক্ষ কোটি নক্ষত্রের অগ্নিনির্ঝরের  যেথা  নিঃশব্দ জ্যোতির বন্যাধারা
ছুটেছে অচিন্ত্য বেগে নিরুদ্দেশ শূন্যতা প্লাবিয়া দিকে দিকে।
তমোঘন সেই আকাশের বক্ষস্তলে অকস্মাৎ করেছি উত্থান
অসীম সৃষ্টির যজ্ঞে মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গের মতো ধারাবাহী শতাব্দীর ইতিহাসে।“ ...
বস্তুতপক্ষে যে অনুসন্ধিৎসু মনন নিয়ে  একদিন রবীন্দ্রনাথ হেঁটে গেছেন পিতৃদেবের সাথে হিমালয়ে্‌, যে অপার বিস্ময়ে সূর্যাস্ত দেখেছেন পদ্মার বোটে, যে শোক তিনি যাপন করেছেন মৃত্যুর নির্মম সত্যে তা আদতে এক দর্শন... যে দর্শন প্রতিনিয়ত খুঁজেছিল প্রকৃতি ও জীবনের অপার রহস্য, যাপনের এক ভিন্নতর মার্গ, সন্ধানের আবিল দৃষ্টি। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ ভাবতে শেখান আমাদের্, ভাবাতে শেখান...।

তথ্যসূত্র

১- রবীন্দ্র রচনাবলী খণ্ড- ১, ৩৮২।

২- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ বিশ্বপরিচয় ’ , রবীন্দ্ররচনাবলী ২৫শ খণ্ড ( বিশ্বভারতী ), ৪১১।

৩- প্রশ্ন, নবজাতক, রবীন্দ্ররচনাবলী ২৪শ খণ্ড ( বিশ্বভারতী , ১৩৮৪ ), ৪৫-৪৬।

৪-  I Prigogine and I Stengers, ‘ Order Out Of Chaos’, (Fontana, London, 1984)

গ্রন্থপঞ্জী
১- আবু সায়ীদ আইয়ুব, পান্থজনের সখা,  দে’জ পাবলিশিং, ।
২- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘মানুষের ধর্ম’ রবীন্দ্ররচনাবলী, দশম খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১২৫তম জন্ম-জয়ন্তী সংস্করণ ।
৩- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘জীবনস্মৃতি,’  রবীন্দ্ররচনাবলী নবম খণ্ড বিশ্বভারতী, ১২৫তম জন্ম-জয়ন্তী সংস্করণ ।
৪- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘জীবনস্মৃতি,’ রবীন্দ্ররচনাবলী নবম খণ্ড বিশ্বভারতী, ১২৫তম জন্ম-জয়ন্তী সংস্করণ ।
৫- রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য , ‘ মার্‌ক্সীয়  নন্দনতত্ত্ব’ , অবভাস, জানুয়ারি ২০১৭। 
৫- Rabindranath Tagore, `My Memories of Einstein’, Asia, 1931।
৬- Amiya Chakravarty, ed. . A Tagore Reader, Boston University Press, 1961।
৭- Nature of Reality, American Hebrew, 11 September, 1931
৮- Rabindranath Tagore, The Religion of Man, George Allen & Unwin Ltd।
৯- Stephen W. Hawking, A Brief History of Time, Bantam Books.1988।

Your Opinion

We hate spam as much as you do