প্রশ্নটা শুনে ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। খানিকটা সময় নিয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘মনে হচ্ছে, সব ব্যর্থ হয়ে গেল। ক্ষুদিরাম, বিনয়, বাদল, দীনেশ, সূর্য, মাতঙ্গিনী, মহাত্মা, ভগৎদের বলিদান ব্যর্থ হয়ে গেল হে। আমার নাইট উপাধি ত্যাগ, তোমাদের স্বাধীনতার জন্যে কলম ধরা সব ব্যর্থ হয়ে গেল।
বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ
উত্থান দাশ ৯মে ২০২৩
ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। ও! মাপ করবেন। আমি কে, জাতীয় গ্রন্থাগারে কেন এসেছিলাম, সেইসব তো কিছুই বলা হল না। আমার নাম হানিফ মহম্মদ। বাংলায় পিএইচডি করছি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। সেই সূত্রেই জাতীয় গ্রন্থাগারে যাওয়া আসা লেগেই থাকে। সময় থাকলে ঐ ‘রথ দেখা, কলা বেচার মত’ চিড়িয়াখানাতেও ঢুঁ-মেরে যাই। ক্লাস টেন অব্দি তো বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে হয়েছে। বাংলার পর বিজ্ঞানই আমার প্ৰিয় বিষয় ছিল। বিশেষ করে জীবন বিজ্ঞান। আর নম্বরও বেশ ভালো উঠত। এই তো, মাধ্যমিকেও ৯৭ পেয়েছিলাম।
বাঘের ল্যাটিন নাম প্যান্থেরা টাইগ্রিস, সিংহের লিও লিও, সাপের নাজা রাজা, ব্যাঙের রানা টিগ্রীনা... এখনও ঠোঁটস্থ।
‘অ্যানিমাল কিংডম’র উপর ভালো বইয়ের সন্ধান পেলে এখনও ছুটে যাই। বুঝতেই পারছেন, চিড়িয়াখানায় যাওয়ার হেতু।
অসীম, বিনয়, রাহুলদের ডারউইনের বিবর্তনবাদ, কোষ, প্রজনন, ইত্যাদি বুঝিয়ে দিয়ে কতবার যে টিফিনের ভাগ পেয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই।
কাউন্টারে টিকিট কেটে যে দীঘিটার ধারে একটা কাঠামো তৈরী করা আছে, সেদিকে পা বাড়ালাম। ব্যাগের ভেতর টিফিন ক্যারিয়ারে লুচি আর নতুন গুড়ের সন্দেশ আছে। অনেকক্ষণ থাকতে হবে। পেটে কিছু দিয়ে নি আগে। জিরাফদের এনক্লোজার পার করে, সিংহের মর্মস্পর্শী গর্জন শুনতে শুনতে দীঘির ঘরটাতে পৌঁছে গেলাম। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি নেই। আজ সোমবার, তাই বাঁচোয়া। রবিবার বা কোনও ছুটির দিন হলে আর দেখতে হতো না। তিল ধারণের জায়গা থাকে না। ভারত যে জন ঘনত্বের পর জনসংখ্যার নিরিখেও চীনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তাতে আর আশ্চর্য কি। নির্ঘাত জলহস্তীদের চৌবাচ্চাটায় নেমে হিপোদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে খেতে হত।
হাঁসেদের জলক্রীড়া দেখতে দেখতে বেশ আয়েস করে একটা লুচির টুকরো মুখে পুড়তে যাচ্ছি, এমন সময় একটা পায়ের আওয়াজ পেয়ে পিছনে ঘাড় ঘোরালাম। দেখি, ইয়া লম্বা জোব্বা পড়া, পক্ক কেশ আর এক মুখ শ্বেত - শুভ্র দাড়ি নিয়ে এক বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ! হাসিমুখে ভদ্রলোক আমার মুখোমুখি বসলেন। বললাম, ‘আপনি কি যাত্রা - টাত্রা করেন? কাল তো ২৫শে বৈশাখ। কোনও শো - টো আছে বোধহয়। তবে আপনার মেকআপটা কিন্তু জব্বর হয়েছে।’ ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন, ‘মেক আপ নয় হে ভ্রাতা। কাল ২৫শে বৈশাখ, তাই মর্তে আগমন। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর তোমরা কোথায় দাঁড়িয়ে, তাই সরেজমিনে দেখতে এলাম।
প্রিন্সেপ ঘাট, জাদুঘর, এশিয়াটিক সোসাইটি, সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান, নিউ মার্কেট, ন্যাশনাল লাইব্রেরি হয়ে এখানে এলাম। আরও জায়গায় যাওয়ার আছে। সবশেষে জোড়াসাঁকোয় যাব।’
কিন্তু বাংলা ব্যতীত অন্য বিষয় নিয়ে পড়া? নৈব নৈব চ। আসলে সাহিত্য আমার প্রধান আকর্ষণ। শেক্সপিওর, কিটস, বায়রন থেকে শুরু করে মায়াকভস্কি, দসতয়েভস্কি, কাফকা, কামু, সবই আমার গুলে খাওয়া। তবে ভেবে দেখেছি, সবচেয়ে প্ৰিয় রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্ররাই। ব্যাপারটা অনেকটা ঐ কবি গুরুর তালগাছ কবিতার ‘....মা যে হয় মাটি তার, ভালো লাগে আর বার, পৃথিবীর কোণটি’র মতো আরকি। স্বাভাবিক ভাবেই, উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রেসিডেন্সিতে বাংলা অনার্স নিয়ে ভর্তি হই। যাইহোক, মূল ঘটনায় ফিরে আসা যাক।
বেশ মজা লাগল। বুঝতে পারলাম, কাল পার্ট আছে, তাই চরিত্র থেকে বের হতে পারছেন না। ইনি বোধহয় ‘মেথড অ্যাকটর।’ মানে, এই ধরণের অভিনেতারা যে চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই চরিত্রের মতোই জীবনযাত্রা অতিবাহিত করেন বেশ কয়েক দিন ধরে, যাতে চরিত্রে ঢুকে পড়া যায়। মার্লন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরোদের মতো। বললাম, ‘ তা আমাদের এই পোড়া দেশের বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে আপনার অভিমতটা কী?’
প্রশ্নটা শুনে ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। খানিকটা সময় নিয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘মনে হচ্ছে, সব ব্যর্থ হয়ে গেল। ক্ষুদিরাম, বিনয়, বাদল, দীনেশ, সূর্য, মাতঙ্গিনী, মহাত্মা, ভগৎদের বলিদান ব্যর্থ হয়ে গেল হে। আমার নাইট উপাধি ত্যাগ, তোমাদের স্বাধীনতার জন্যে কলম ধরা সব ব্যর্থ হয়ে গেল। ধর্মতলায় দেখলাম, ন্যায্য চাকরিপ্রার্থীরা রোদে পুড়ে অনশন করছে। হাজরার মোড়ে আবার দেখলাম ডি এর দাবিতে সমাবেশ করতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীরা পুলিশের হাতে নিগৃহীত হচ্ছে। এক জায়গায় দেখি একজন মৃতপ্রায় যুবক রাস্তায় পড়ে আছে। জলের জন্যে কাতর আবেদন জানিয়েও কোনও সারা পাচ্ছে না। হরিনাম সংকীর্তনের জন্যে জোরে মাইক চালানো হয়েছিল স্থানীয় ওয়ার্ডের তরফ থেকে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায়, পার্টি আর পার্শ্ববর্তী ক্লাবের ছেলেরা লাঠিপেটা করে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে। শহীদ মিনারে গরু, কয়লা, বালি, চাকরি চুরির বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করতে হবে, এই জাতীয় স্লোগান দিতে দিতে শয়ে শয়ে ষন্ডা মার্কা যুবক ওয়ান শটার, পাইপ গান, পেটো, কুকরি ইত্যাদি নিয়ে প্রকাশ্যে হুঙ্কার দিতে দিতে চলেছে। স্লোগানে ভুলচুক হলে আবার পুলিশ শুধরে দিচ্ছে। বোঝো! শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। গেরুয়া ফেট্টি পড়া হাজার হাজার ঘাড়ে - গর্দানে যুবক তলোয়ার, রিভলবার, ত্রিশুল নিয়ে মিছিল করছে..... এই যুগে জন্মালে আমিও নির্ঘাত বিদ্রোহী কবির তকমা পেয়ে যেতাম। চারিদিকে যা চলছে, বিদ্রোহই একমাত্র বিকল্প। একমেবাদ্বিতীয়ম! বিশ্বাস করো, মন থেকে বলছি। আমি নই। এখন তোমাদের দরকার হাজার হাজার নজরুল। লাখ লাখ সুকান্ত। যারা বলবে বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনি...।’
‘আরে ও মশাই, উঠুন, পাঁচটা বাজতে চলল যে। চিড়িয়াখানা বন্ধ হয়ে যাবে যে । গরিলাদের সঙ্গে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করতে চান নাকি ’, পাহারাদারের হাঁক ডাকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পাহারাদারকে বললাম, ‘কাল পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানের বক্তৃতার বিষয় পেয়ে গেছি ভাই।’ ‘ও, তাই বুঝি’ বলে, সে মাংসাশী প্রাণীদের সেকশনের দিকে এগিয়ে গেল।
We hate spam as much as you do