আজ সকালে ওরা দুজন একটা গাড়ি করে বনগাঁ যাচ্ছে বেড়াতে। স্বাধীন কোনোদিন বর্ডার দেখেনি, দুর্গা দেখেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে।
র্যাডক্লিফ লাইনের একটু আগে থেকে
সৌম্য ঘোষাল
newscopes.in 15th august
দাঙ্গার খবর ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই সুধন্য আর তার বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলো ভিটেছাড়ার।যে কথা সেই কাজ। দুদিনের মধ্যে প্রায় জনা চল্লিশ ছেলে বৌ বাল বাচ্চা বাড়ির বয়স্কদের কান্নার রোল এর মধ্য দিয়ে কিছু টাকা পয়সা আর পোঁটলায় চিঁড়ে গুড় নিয়ে বাড়ি ছাড়লো।
সুধন্যরা যশোর থেকে ঝিকরগাছা , বেনাপোল হয়ে বনগাঁ, হাবরা পেরিয়ে এসে পৌঁছল দমদমা।পথে চোখে পড়লো একই রকম বিপরীতমুখী জনস্রোত।না ডোবা, না ডাঙ্গা কিছু জায়গা পেরিয়ে একটা বটগাছের নিচে শেষ পর্যন্ত ক'দিন বাদে আশ্রয় নিল সকলে । রাস্তার ধারে মাইলস্টোনে "যশোর - ৮০ মাইল"লেখা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুধন্য।
পরদিনই সকালবেলা ছেলেরা সবাই মিলে চলল শ্যামবাজার।ওখান থেকে দুটো সাইকেল, কটা ত্রিপল,নারকেল দড়ি, চাল, ডাল,তেল ,নুন আর কটা হাঁড়ি, কড়া কিনে সাইকেল চড়ে দুজন আগে চলে গেল। বাদবাকিরা হেঁটে ফিরবে ঠিক হলো।
চালের দোকানে হল এক মজার কান্ড।সুধন্য ছিল বিএ পাস,চালের দোকানে অত চটপট হিসেব করছে দেখে মালিক সব কথা শুনে খাতা লেখার কাজ করবে কিনা জানতে চাইলে সুধন্য হাতে চাঁদ পেলো।ফেরার পথে বুদ্ধি করে হাতের আংটিটা বিক্রি করে একটা সাইকেল কিনে নিল নিজের জন্য,কিছু টাকা বেঁচে ছিলো, তাতে বুদ্ধি করে একটা পাম্পার আর এক জোড়া টায়ার টিউব ও নিয়ে নিলো সুধন্য।
দমদমা তে ফিরে দেখে সবকটা বৌ মিলে ইতিমধ্যে জায়গাটা খানিক পরিষ্কার করে নিয়েছে। মাটির উনুনে ডালপালা জ্বালিয়ে ভাত বসে গেছে। কে যেন কোথা থেকে কলা পাতা কেটে এনেছে।দুটো তিরপল মাটিতে বিছিয়ে আর দুটো গাছে বেঁধে ঘরের মতো তৈরি।
সুধন্য আবার একটা সাইকেল চেপে হাজির দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো পদ্মা ।সবকথা শুনে বলে উঠল "ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন "।
পরদিন থেকেই সুধন্য কাজে যেতে শুরু করল। অন্যান্য বন্ধুরাও কোন না কোন কাজ করতে শুরু করলো। তার মধ্যে চলে এলো পুজো।সুধন্য অষ্টমীর দিন সকালে সাইকেলে চাপিয়ে পদ্মাকে নিয়ে বাগবাজারের ঠাকুর দেখিয়ে আনলো।
শীতের আগেই ছিটে বেড়া আর টালির চালের কটা ঘর তুলে ফেললো সবাই মিলে। সুধন্যর এখন কাজ হলো রাতে কাজ থেকে ফিরে কারোর বারান্দায় লম্ফের আলোয় বাচ্চাগুলোকে পড়তে বসানো। যে করেই হোক স্কুলে ভর্তি করতে হবে ওগুলোকে,বাপগুলো সব কাজে যায় , নাহলে সারাদিন এখানে ওখানে খেলে বেড়াবে।
ফাল্গুন মাস আসতে না আসতেই সবাইকার মধ্যে একটা খুশির খবর ছড়িয়ে পড়লো। পদ্মা পোয়াতি হয়েছে। সুধন্য একদিন ছুটি নিয়ে 'কারমাইকেল হাসপাতালে' পদ্মা কে নিয়ে গিয়ে নাম লিখিয়ে আসলো ।
শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে একদিন গরুর গাড়ি করে পদ্মাকে নিয়ে 'কারমাইকেলে' ভর্তি করলো সুধন্য।চারদিক কেমন যেন থমথমে ভাব , দেশভাগ হবে। শ্রাবনের ২৯,আগস্ট এর ১৫, সুধন্য আর তার বন্ধুদের মধ্যে দেশভাগের দুঃখকে প্রলেপ দিল সুধন্যর ছেলে হওয়ার খবর।
হাসপাতালে ডাক্তার বাবু বাচ্চা হওয়ার পরে সব শুনে ছুটি দিয়ে নিজের হিন্দুস্তান টেন গাড়িতে করে সুধন্য আর তার বৌ বাচ্চাকে দমদমাতে নামিয়ে দিয়ে যাবার সময় বললেন "আরে ব্রিটিশ তো গেছে, ছেলের নাম দিয়ো স্বাধীন"।
_____________________________________________
পাকিস্তানের গন্ডগোলের খবর বের হতো কাগজে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিদ্রোহ করছে । শ্যামবাজারের গদিতে বসে সুধন্য 'বসুমতী', 'যুগান্তর' পড়তো আর বাড়ি ফিরে অন্যদের কাছে সে গল্প করতো।
খান সেনাদের অত্যাচার দিন দিন চরমে উঠছিল । এরমধ্যে একদিন বর্ডার পেরিয়ে সুধন্যর এক আত্মীয় তার মেয়ে দুর্গাকে নিয়ে এসে হাজির। বহুদিন আগেই তার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে অনেক লড়াই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুধন্যদের ওখানে 'কলোনি কমিটি' তৈরি হয়েছে।কমিটিকে বলে সুধন্যদের পাশের ফাঁকা জায়গায় ছিটে বেড়ার ঘর তুলে দেওয়া হলো বাপ বেটির জন্য।
ইতিমধ্যে স্বাধীন বড় হয়েছে ,হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেও কাজকর্ম কিছু জোটে নি।সারাদিন কলোনি কমিটির ঘরে আড্ডা মারে, পার্টির লোকেরা এলে কিসব মিটিং করে আর সন্ধ্যেবেলা সুধন্য ফিরলে ওর সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। লোকের মধ্যে কান পাতলে শোনা যায় স্বাধীন আর নতুন আসা মেয়েটাকে দমদম স্টেশনের দিকে নাকি মাঝেমধ্যেই একসাথে দেখা যায় ।
মাসখানেক যেতে না যেতেই বাড়ি ফিরে দেখে মেয়েটা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে, হাতে একটা চিঠি। চিঠিটা খুলেই স্বাধীনের মাথায় বাজ পরলো - "প্রিয় সুধন্য,মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চললাম । জানিনা আর আমার মেয়েকে নিজের হাতে তোমার ছেলেকে সম্প্রদান করতে পারবো কিনা। আশা করি তুমি আমায় ভুল বুঝবে না'। -ইতি ভগবান দাস। "
স্বাধীন রাতে ঘরে ঢুকতেই চিৎকার করতে শুরু করল সুধন্য - 'কাজকর্মের তো ধান্দা নেই ।খানেয়ালা একটা তো বাড়িয়ে বসেছো।পদ্মা চুপ করাতে চাইলো - "আহা মেয়েটা তো ভালো"। কে শোনে কার কথা।
রাতে কলোনি কমিটির মাতব্বরদের সঙ্গে কথা বলে পরেরদিনই বিয়ে হলো স্বাধীনের । সবাই পাড়া ঘরের, বাইরের বলতে পার্টির কজন এসেছিল ,খায় দায়নি, কটা বই উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করে চলে গেছে ।
মাস তিনেক বাদে হঠাৎ একদিন মাঝরাতে পুলিশ এসে হাজির। কি ব্যাপার - সার্চ করবে । ঘরদোর তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষ পর্যন্ত হাবিলদার চারটে বই নিয়ে এসে দেখালো,রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি, সুভাষচন্দ্রের তরুণের স্বপ্ন, শরৎচন্দ্রের পথের দাবী ,লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব । ওসি খুব হতাশ হয়ে বললেন - 'আর কিছু পেলে না? যাক, ওতেই হবে'।যাওয়ার সময় হাতে হাতকড়া দিয়ে নিয়ে গেল স্বাধীনকে। পুলিশের গাড়িটা কলোনি থেকে বেরোনোর মুখেই গাড়ির হেডলাইটের আলোর মনে হল পার্টি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া একজন যেন সরে গেল,আগে খুব আসতো কলোনীতে।
পরেরদিন খবর হতেই আশপাশের কলোনির ছেলেরা সবাই মিলে থানায় ছুটলো, সেখান থেকে কোর্টে । জামিন হলো না স্বাধীনের, উকিল বলল রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ ,স্বাধীনের কাছে নাকি কতগুলো দেশবিরোধী বই আর একটা পাইপগান পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ বিচারের পালা শেষে স্বাধীনের মিসা হয়ে গেল।ইতিমধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে মুজিবুর রহমানের সই করা একটা মানপত্র এসে পৌঁছল দমদমের কলোনিতে "মুক্তিযোদ্ধা বীর শহীদ ভগবান দাস এর পরিবারকে সমবেদনা জানাই"।
পরপর মানসিক ধাক্কায় স্বাধীনের বউ দুর্গা অজ্ঞান হয়ে গেলো। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ডাক্তার এসে দেখে বললেন, দুর্গা পাঁচ মাসের গর্ভবতী। ক'মাস বাদেই দুর্গার ছেলে হলো, 'কারমাইকেল' তখন নাম বদলে আর জি কর। পাড়ার লোকেরা স্বাধীনের ছেলের নাম দিল বিপ্লব।
____________________________________________
বছর খানেক বাদে দিল্লিতে সরকার বদলের পর ছাড়া পেলো স্বাধীন।বাপ জেলে ছিলে বলে সুধন্য অনেক বলে কয়েও নাতিকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেনি।জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিপ্লবকে "দমদম কুমার আশুতোষে ' ভর্তি করলো স্বাধীন । সুধন্যর উৎসাহে একটা সেলাই মেশিন কিনে একটা দোকান দিল স্বাধীন, দোকানের নাম দিল 'পদ্মা স্টোর্স '।
হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর থেকে থেকেই ছেলের মতিগতি ভালো ঠেকছিল ছিল না স্বাধীনের। গভীর রাতে নেশা করে বাড়ি ফেরা, গলায় সোনার চেন, পাচ্ছে কোত্থেকে ,এসব প্রশ্ন মনে আসতো তো মুখে কিছু বলত না।
ইতিমধ্যে হঠাৎই সুধন্য মারা গেল।মালিকের ছেলে স্বাধীনকে ডেকে বললো - ' কাকার কাজটা তুমি করো, তোমরা বিশ্বাসী লোক ,আমি তো আর চাকরি ছেড়ে গোডাউনে বসতে পারবো না।'
বাড়িতে কথা তোলার পর খেঁকিয়ে উঠল বিপ্লব - 'ওসব তোমায় ভাবতে হবে না, পার্টি করে তো শুধু জেলই খেটেছো, আর কি পেয়েছো।যেমন সেলাইয়ের দোকান চালাচ্ছো তেমন চালাও। '
কর্পোরেশন ভোটে দাঁড়াল বিপ্লব ।ভোটের রেজাল্ট বেরোনোর দিন ফিরল সবুজ আবীর মেখে গলায় মালা পড়ে মাঝরাতে টলতে টলতে। দুর্গা উঠে দরজা খুলেই ভয় পেয়ে গেল।
সকাল বেলা বিপ্লব বাড়ি থেকে বেরোলেই স্বাধীন কে বললো - 'ছেলেটার বিয়ে দাও, যদি মতিগতি ফেরে'।রাতে খাবার সময়ে কথাটা পাড়তেই বিপ্লব বলল 'মেয়ে আমার দেখা আছে,কটা মাস যাক , তারপর তোমরা দিন ঠিক করো।'
ছমাসের মধ্যে বিপ্লবের বিয়ে হয়ে গেল। তার মধ্যেই স্বাধীনের বাড়ি ভেঙে দোতলা হল । বিয়েতে এক স্থানীয় প্রোমোটার উপহার দিল স্করপিও । বিপ্লব সেই স্করপিও চেপে অস্টমঙ্গলা করতে গেল।
দুপুরবেলা খেতে বসে স্বাধীন হাসতে হাসতে বলল 'দিনকাল সব বদলে গেছে ,আমাদের বিয়েতে অস্টমঙ্গলা ও হয়নি আর বিয়েতে পেয়েছিলাম কটা বই আর কাঁসা পিতলের থালা বাটি'।
অষ্টমঙ্গলা থেকে ফিরে এসেই বিপ্লব তার বাবাকে বললো - 'তোমরা গুছিয়ে নাও, নিউটাউনে একটা ভালো বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ পেয়েছি, এসি, এ্যাটাচড বাথ, ডবল বেড, মেডিকেল ফেসিলিটি, লাইব্রেরী, তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না , মাঝে মাঝে আমি দেখা করে আসবো।' রাতের বেলা অঝোরে কাঁদলো দুর্গা - 'এই ছিল কপালে।'
________________________________________
স্বাধীন বেশ কয়েকবার বাড়ি গিয়েছিল গত ছ' মাসের মধ্যে। গাড়ি পাঠিয়ে বিপ্লবই নিয়ে যেতো।আশপাশের কলোনী গুলোতে 'নো ভোট টু বিজেপি ' আর 'সি এ এ বিরোধী মঞ্চ ' র ব্যানারে মিটিংগুলোতে নিয়ে যেতো বিপ্লব,দু কথা বলতেও হতো। সব মিটিং এ সভাপতি হতেন পূর্ণেন্দু বাবু, উনিই স্বাধীনের অ্যারেস্ট হবার দিন পুলিশকে বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিলেন ।ভোটের দিন স্বাধীন আর দুর্গাকে ভোট দিতে নিয়ে গিয়ে নিজেই বোতাম টিপে দিয়েছিল স্বাধীনের অপছন্দের চিহ্নে। তার মধ্যেই দুর্গা খবর পেয়েছিল তার সাধের 'পদ্মা স্টোর্স' এখন নাম বদলে ' পদ্মা ফরেন লিকার স্টোর্স'। ভোটের দিন নিউটাউনে বৃদ্ধাশ্রমে ফিরে দুজনে ঠিক করে নিয়েছিল আর জীবনে দমদম মুখি হবে না।
কদিন আগে বিপ্লব লোক পাঠিয়েছিলো, নতুন ধুতি, পাঞ্জাবী,জুতো,একটা তেরঙ্গা স্কার্ফ আর একটা কার্ড দিয়ে ---
'আগামী ১৫ ই আগস্ট, ২০২১,সকাল আটটায় আমাদের কলোনীতে ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন শ্রী স্বাধীন পাল। ঐ দিন তারও ৭৫ তম জন্মদিন। এতদুপলক্ষে ঐ দিন মধ্যাহ্ন ভোজে সবাইকে সবান্ধবে অংশ নেবার অনুরোধ করছি।
-জাতীয়তাবাদী অভিনন্দন সহ
শ্রী বিপ্লব পাল।
(ওয়ার্ড কো অর্ডিনেটর)
[ মধ্যাহ্নভোজ : পরিবর্তন ডেভলপার্সের সৌজন্যে ]
আজ সকালে ওরা দুজন একটা গাড়ি করে বনগাঁ যাচ্ছে বেড়াতে। স্বাধীন কোনোদিন বর্ডার দেখেনি, দুর্গা দেখেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে।
We hate spam as much as you do