বিবিধের মাঝে মিলন মহানের দেশ ভারতবর্ষে তাই স্বাধীন মত প্রকাশের পরিসরে আপন ছন্দে উদযাপিত হোক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।
সম্প্রীতির বঙ্গাব্দ!
এ সময় সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিপন্ন!
অধ্যাপক নিলয়কুমার সাহা ১৫ এপ্রিল ২০২৫
আজ ১ বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। বঙ্গাব্দ শব্দটি বঙ্গ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সম্প্রতি আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের প্রকৃত প্রবর্তক কে এবং প্রবর্তনের সময় সম্পর্কে শুরু হয়েছে এক অস্বাস্থ্যকর বিতর্ক। প্রচলিত মতবাদ অনুযায়ী আজ থেকে ১৪৩২ বছর আগে ভারতবর্ষে বঙ্গাব্দের সূচনা হলেও বঙ্গাব্দের আবির্ভাবের একাধিক আখ্যান আজও বঙ্গজীবনের এক চলমান অনুষঙ্গ। বর্তমানে দেশব্যাপী রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইতিহাস বিনির্মাণের আবহে এই চলমান অনুষঙ্গকে হিন্দুত্বের জারণে নিমজ্জিত করার এক অশুভ প্রয়াস অত্যন্ত সক্রিয়। সমকালীন বিজ্ঞানকে ভিত্তি করেনি পৃথিবীব্যাপী নির্ণীত হয়েছে সময়। বৈদিক যুগেও যাগযজ্ঞের প্রয়োজনে মুনি ঋষিরা সূর্যের উত্তর ও দক্ষিণের গতি পর্যবেক্ষণ কর একটি বছরকে দুটি ঋতুতে ভাগ করেছিলেন উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ন নামে, এই ভাবেই শুরু হয়েছিল ঋতুনিষ্ঠ বছরের গণনা। যজুর্বেদের সময়ে অর্থাৎ ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ে গণনা পদ্ধতিতে আজকের মত ছটি ঋতুর উপস্থিতি না থাকলেও, বর্তমান সময়ের মত সে সময়েও এক বছরে ভিন্ন ভিন্ন নামে বারোটি মাসের বিন্যাস ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সন্নিহিত বেদাঙ্গ জ্যোতিষ সময়কালে অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গণনা পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল এবং সেই গণনা পদ্ধতির সাহায্যেই আমাদের দেশে প্রায় ১৫০০ বছর সময় গণনা ও যজ্ঞাদির কাল নির্ণয় সম্পন্ন হয়েছিল। মহাভারতে পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের বর্ষপূর্তির হিসার নির্ণয়ে বেদাঙ্গ জ্যোতিষ গ্রন্থ নির্ভর গণনা পদ্ধতির উল্লেখ বর্তমান। ইতোমধ্যে সারা বিশ্ব যিশুখ্রিস্টের জন্ম বছরকে ভিত্তি করে সময় গণনায় খ্রিস্টাব্দের অন্তর্ভুক্তি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। খিস্টাব্দ প্রচলনের আনুমানিক চারশো বছর পরে কালজয়ী সূর্য সিদ্ধান্ত গ্রন্থের সাহায্যে ভারতে সুক্ষ্ম গণনা পদ্ধতির সূচনা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরকাল সূর্য সিদ্ধান্ত এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও, অত্যন্ত প্রগতিশীল জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্রাবলী নিরন্তর সংস্কার আজও আমাদের সমৃদ্ধ করে চলেছে। যিশুখিস্টের মত হযরত মুহাম্মদকে ভিত্তি করেই মুসলমান সমাজে গড়ে উঠেছিল হিজরি সংস্কৃতি। কথিত, সপার্ষদ হযরত মুহাম্মদ ৬২২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের ২২ তারিখ থেকে জুলাই মাসের ১ তারিখের মধ্যে মক্কা থেকে মদিনায় দেশান্তরিত হয়েছিলেন এবং এই ঘটনার উপর ভিত্তি করেই হিজরির সূচনা হয়। ধর্মকে ভিত্তি করে খ্রিস্টীয় এবং মুসলীম ধর্মাবলম্বীরা সময় গণনার অধিকারী হলেও এক্ষেত্রে পথ হারালেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এই পথ হারানোর অন্যতম কারণ হল হিন্দু সমাজে সময় গণনার বিভিন্ন ভিত্তি। উদাহরণ স্বরূপ সৌরবর্ষ এবং চান্দ্রবর্ষের উল্লেখ করা যেতে পারে। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন। অপরদিকে, পূর্ণিমা-অমাবস্যার গতিপথে পৃথিবীকে চাঁদের প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে ৩৬০ দিন। সূর্য এবং চন্দ্র নির্ভর গণনা পদ্ধতির এই ভিন্নতাই হিন্দু সমাজে সৃষ্টি করছে দুটি পৃকক গণনা পদ্ধতি, একটি সৌরবর্ষ এবং অপরটি চান্দ্রবর্ষ। ভারতে অধিকাংশ তিথিই চাঁদের আবর্তনের অনুষঙ্গে সম্পৃক্ত আর তারিখ সূর্য নির্ভর হওয়ার ফলে তিথি এবং তারিখের মধ্যে প্রায়শই পার্থক্য লক্ষিত হয় যা ভারতীয় সংস্ক্রিতিতে সৃষ্টি করেছে নানান জটিলতা। বিভিন্ন গণনা পদ্ধতির এই আবর্তেই বঙ্গ সংস্কৃতিতে কখন, কার হাত ধরে বঙ্গাব্দের আগমন ঘটেছিল সেই বিষয়ে বঙ্গবাসী আজও নিশ্চিত নয়। যদিও হিন্দু ধর্মে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এবং রামককৃষ্ণ পরমহংস দেবের জন্ম বছরকে ভিত্তি করে শ্রীগৌরাব্দ এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণাব্দ-এর প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। প্রায় ১৫০০ বছর ধরে যে প্রশ্নের উত্তর ভারতবাসী খুঁজে চলেছেন, নয়া জাতীয়তাবাদীরা এক লহমায় সেই জটিল সমস্যার সমাধানের যে ন্যারেটিভ উপস্থাপনে সচেষ্ট হয়েছেন তা কেবল ভারতীয় সংস্কৃতিকেই আঘাত করছে না, আঘাত করছে দীর্ঘ সময় সযন্তে লালিত ভারতীয় বহুত্ববাদকে। এহেন এক তমসাচ্ছন্ন পরিসরে বঙ্গাব্দের প্রকৃত ইতিহাস পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরী।
বঙ্গাব্দ এবং মহারাজা শশাঙ্কঃ
ভারতবর্ষের ইতিহাসে ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। সুনীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গাব্দের উৎসকথা গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ আমাদের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কারণ রাজা শশাঙ্ক ওই বছর গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করনে। অধ্যাপক দীনেশ্চন্দ্র সেন, অধ্যাপক নিশীথরঞ্জন রায়, নির্মলচন্দ্র লাহিড়ী প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি শশাঙ্কের এই রাজ্যাভিষেক সম্পর্কে তথ্য প্রমাণ দিয়েছেন।” শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যয়ের সাথে দাবি করেছেন, রাজা শশাঙ্কের সময় থেকেই বঙ্গাব্দের শুরু। তাঁর মতে, “যে শশাঙ্ক নিজের প্রতাপে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি যে সেই উপলক্ষে একটি সংবৎ চালু করবেন তাতে আশ্চর্য কি?” এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, “৬০৬ অব্দের পূর্বে শশাঙ্ক একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।” যদিও মহারাজা শশাঙ্ক যে বঙ্গাব্দের সূচনা করেছিলেন এমন কোনও মুদ্রা বা লেখ অথবা পুঁথি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। শশাঙ্কের রাজত্বকাল এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন প্রামাণ্যের ভিত্তিতে দীনেশচন্দ্র সরকার বলেছেন, “প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে কোনো অব্দ বা সালের ব্যবহার সুপ্রচলিত ছিল না। তখন রাজাগণের রাজ্যসংবৎসরই দলিলপত্রের তারিখ হিসাবে ব্যবহৃত হত।” কাজেই তথ্য প্রমান সহ এই কথা কখনোই দাবি করা চলে না যে, মহারাজা শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। যদিও ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে শশাঙ্কের রাজ্যাভিষেকের সময় অর্থাৎ ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ বাদ দিলে আমরা সহজেই আজকের ১৪৩২ বঙ্গাব্দে পৌঁছে যেতে পারি।
বঙ্গাব্দ এবং কামরূপাধিপতি ভাস্কর বর্মাঃ
ভারতবর্ষের প্রচলিত বিভিন্ন অব্দের উৎস হল প্রবল পরাক্রমশালী কোনও রাজা, বাদশা অথবা সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের তারিখ অথবা কোনও মহাপুরুষের জন্ম তারিখ। খ্রিস্টের জন্মের সময় থেকে সারা বিশ্বে খ্রিস্টাব্দের পথ চলা শুরু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনের সৌরবৎসর ধরে নিয়ে বঙ্গদেশে প্রচলিত সব অব্দকে খ্রিস্টাব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছিল। এই নিয়মেই সম্রাট কনিষ্কের সিংহাসন আরোহণের সময় অর্থাৎ ৭৮ খিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল শকাব্দ-র পথ চলা। হর্ষাব্দ-এর সূচনা হয়েছিল কান্যকুজ্বরাজ হর্ষবর্ধনের সিংহাসন আরোহণ বর্ষ ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে। হিউয়েন সান-এর বিবরণ থেকে জানা যায়, মহারাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পূর্ব ভারতের প্রতাপশালী রাজা কামরূপাধিপতি ভাস্কর বর্মা সমগ্র বঙ্গের অধিপতি হয়েছিলেন। ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কামরূপের সিংহাসনে উপনীত হন এবং ভাস্করাব্দ-এর সূচনা হয়েছিল ওই ৫৯৩ বঙ্গাব্দে। অনেকেই বিশ্বাস করেন এই ভাস্করাব্দ-ই হল বঙ্গাব্দ। সেই অংশের যুক্তি অনুসারে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বাদ দিলে সহজেই ১৮৩২ বঙ্গাব্দে পৌঁছানো যায়।
বঙ্গাব্দ এবং সম্রাট আকবরঃ
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, মহামতি আকবর সৌরবর্ষ নির্ভর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন যা মুসলিম সংস্কৃতিতে চান্দ্রবর্ষ নির্ভর ৯৬৩ হিজরি সনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্ষ গণনার উদ্দেশ্যে সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন তারিখ-ই-ইলাহি নামক এক নতুন ক্যালেন্ডার। সেই সময় এই উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত ছিল চান্দ্রবর্ষ নির্ভর হিজরি সন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই রাজদরবারে ব্যবহৃত হতে থাকে হিজরি সন। কেউ কেউ দাবি করেন বিভিন্ন সংস্কৃতির সম্বন্বয়ের লক্ষ্যেই সম্রাট আকবর তাঁর রাজ্যাভিষেকের সময়কে অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরি সনকে সমসংখ্যক বঙ্গাব্দের সাথে মিলিয়ে নেনে এবং সেই সময় থেকেই সৌরবর্ষ অনুসারে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন প্রত্যক্ষ করেন তামাম ভারতবাসী। অর্থাৎ বঙ্গাব্দের উৎস ৯৬৩ হিজরির সাথে বর্তমান খ্রিস্টাব্দ এবং আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময়ের পার্থক্য ৪৬৯ বছর (২০২৫-১৫৫৬) যোগ করলে আমরা সহজেই পৌঁছে যাই ১৪৩২ বঙ্গাব্দে। সম্ভবত টোডরমলী বিধান অনুসারে রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে ৯৬৩ হিজরি সনকে সমসংখ্যক বঙ্গাব্দের সাথে মেলানো হয়েছিল। সুবে বাংলায় ফসলী, কর ইত্যাদি আদায়ের সুবিধার্থে সৌরবর্ষ প্রচলিত বাংলা সনকে কার্যকর করতেই ১১ দিনের গরমিলকে মুছে ফেলে হিজরি সনের বর্ষারম্ভ এবং বঙ্গাব্দের নববর্ষকে মেলানো হয়েছিল। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সন এবং বঙ্গাব্দের সামঞ্জস্য বিধান কখনোই হিজরি সন এবং বঙ্গাব্দ সমার্থক এমন দাবি করা যায় না। যদিও এই বিষয়টিকে ভিত্তি করে একদল গবেষক সম্রাট আকবরের রাজ্যাভিষেকের সাথে বঙ্গাব্দের যোগসূত্র রচনা করেন। সুতরাং সম্রাট আকবরের উপর বঙ্গাব্দের পিতৃত্ব যে ভাবে আরোপিত হয়েছে সেটিও সর্বজনগ্রাহ্য নয়।
বঙ্গাব্দ তুমি কারঃ
বঙ্গাব্দের জনক গৌড়াধিপতি হিন্দুরাজা শশাঙ্ক, না কি কামরূপাধিপতি ভাস্কর বর্মা, না কি দিল্লির সম্রাট মহামতি আকবর – এই বিতর্কের যবনিকা টানার উপাদান আজও অজানা। গবেষণালব্ধ প্রকৃত সত্য উদঘাটনের অছিলায়, কৌশলে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করে আপাত নিরিহ অমিমাংসিত এই বিষয়টির উপর যদি কোনও রঙ আরোপের অশুভ প্রয়াস ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে তা কেবল ভারতীয় সনাতনী ঐতিহ্যকে আঘাত করবে না, বদলে দিতে পারে আন্তর্জাতিক স্তরে আদৃত ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষতার গরিমা। বিবিধের মাঝে মিলন মহানের দেশ ভারতবর্ষে তাই স্বাধীন মত প্রকাশের পরিসরে আপন ছন্দে উদযাপিত হোক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।
We hate spam as much as you do