তিনি বলেছেন, ‘যে ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে, আমরা কি এই সব ইতিহাস মনে রাখব? যে পৃথিবীতে যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক অগ্ন্যুৎপাতকে ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেখানে গুরনাহ আমাদের বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন তানজানিয়ার আব্দুলরাজাক গুরনাহ
তানজানিয়ার লেখক আব্দুলরাজাক গুরনাহকে সাহিত্যের জন্য এ বছরের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সুইডিশ একাডেমি বলছে “উপনিবেশবাদের প্রতিক্রিয়ায় তাঁর আপোষহীন এবং সমবেদনামূলক প্রকাশের“ স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো
আফ্রিকায় দীর্ঘদিন উপনিবেশ গড়েছিল জার্মানরা। জার্মানদের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ের ইতিবাচক আলোচনাই করা হয়েছে। তাদের নেতিবাচকতা নিয়ে আলোচনা প্রায় করেননি কোনো ইউরোপিয়ান আলোচক। অথচ উনিশ শতকের শেষ দিকে জার্মান সাম্রাজ্য বর্তমান নামিবিয়া, ক্যামেরুন, টোগো, তানজানিয়া, কেনিয়া, রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডিতে খুবই নিষ্ঠুর উপনিবেশ তৈরি করেছিল। জার্মান ঔপনিবেশিক শাসনে নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করতেন তাদের নির্মমভাবে হত্যাও করা হয়েছে। ১৯০৪ সালে জার্মানিরা নামিবিয়ার হেরো এবং নামায় বিদ্রোহ দমনে গণহত্যা চালিয়েছিল।
পূর্ব আফ্রিকার মহাদেশ জুড়ে জার্মানদের এই নৃশংসতার পটভূমি উঠে এসেছে আব্দুলরাজাক গুরনাহরের ‘আফটারলাইভস’ উপন্যাসে।
ঔপনিবেশিক শাসন ও উপনিবেশ বিরোধী বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী আফ্রিকার জনজীবন কেমন হয়েছে, ধ্বংসের ভেতর থেকে কিসের ভিত্তিতে আবার গড়ার প্রত্যয় পেয়েছে তারা তারই আখ্যান উঠে এসেছে আফটারলাইভসে।
উপন্যাসের শুরু হয়েছে একটি সরল বাক্য দিয়ে, খলিফা যখন ছাব্বিশ বছর বয়সী ছিলেন যখন তিনি বণিক আমুর বিয়াশারার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বণিক বিয়াশারার ভাইয়ের মেয়ে আশাকে ১৯০৭ সালে বিয়ে করেন। এরপরই গুরনাহ জার্মান শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধগুলো তৈরি হয়েছে তারই ভয়াবহ পরিণতি দেখিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন জনজীবনে সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে এই ঔপনিবেশিক দমন পীড়ন কতটা প্রভাব ফেলেছে। তিনি জার্মান খামারে কর্মরত শিক্ষিত মার্জিত তরুণ ইলিয়াস নামের একটি চরিত্রকে দাঁড় করিয়েছেন শান্ত প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। সেখানে গণহত্যার বিষয়ে ইলিয়াস তার সহকর্মীদের বর্ণনা করে যে, ‘জার্মানরা এত লোককে হত্যা করেছে যে দেশটি মাথার খুলি এবং হাড় দিয়ে ভরে গেছে এবং পৃথিবী রক্তে ভিজছে।’ তারপর গুরনাহর ফিরে আসেন সেই তরুণ খলিফার দাম্পত্য জীবনে। যারা চেয়ে আছেন বন্ধু ইলিয়াসের ফিরে আসার পথ চেয়ে। তাদের প্রতিশোধের স্পৃহা ক্রমাগত কমে যাচ্ছিল, তবু তারা অপেক্ষা করেই যাচ্ছিল।
গুরনাহ মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে আফ্রিকানদের শান্ত ও স্বাভাবিক জীবনের দিকে মনোনিবেশ করিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যদিও তারা শান্ত জীবনে ফিরে যাবে বা অভ্যস্ত হবে তবু তাদের মন থেকে সাম্রাজ্যবাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি মুছে যাবে না।
জার্মানরা যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ইলিয়াস নিজে থেকে শুটজট্রুপ্পে আসকারিদের (জার্মানদের পক্ষে দেশীয় সৈনিক) সঙ্গে যোগ দেয়, জার্মান সাম্রাজ্যের নামে তাদের সহকর্মী আফ্রিকানদের ওপর অকথ্য নিষ্ঠুরতা খবর তিনি সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। ইলিয়াসকে ধরেই মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। যুদ্ধের সময়কালে স্বাভাবিকভাবে দেখলে মনে হতে পারে চরিত্রটি কম গুরুত্বের তবে চরিত্রটি যে গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক সেটিই দেখাতে চেয়েছেন।
এখানে আফ্রিকান অন্য একটি গল্পও উন্মোচিত হয়। ইলিয়াসের ছোট বোন আফিয়া, রক্ষণশীল পরিবারে থেকে যার পড়ালেখা শিখতে চাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি মারধরের শিকারও হন। শেষমেশ এই কারণে ইলিয়াসের বন্ধু খলিফার কাছে সাহায্যও নিতে হয়েছে। পরে আফিয়াকে আশ্রয় নিতে হয় খলিফার বাসায়।
অন্যদিকে উপন্যাসে হামজা নামের একটি চরিত্র আছে। যিনি জার্মান ও তানজানিয়ার মানুষদের মধ্যে একটি সম্পর্ককে নির্দেশ করেন। তিনি একজন আসকারি (জার্মানদের পক্ষে দেশিয় সৈনিক) স্বেচ্ছাসেবক, বিরুদ্ধ শিবিরে কাজ করতেন। তিনি দ্রুত তার ভুল বুঝতে পারেন। হামজার গল্পটি উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অসহ্যকর। স্বজাতির বিরুদ্ধে প্রথমত অবস্থান করেন। তাকে যখন ওবারলিউট্যান্টের ব্যক্তিগত চাকর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তখন আরেক আসকারি (জার্মানদের পক্ষে দেশীয় সৈনিক) হামজাকে সতর্ক করে বলে, ‘এই জার্মানরা সুন্দর যুবকদের সঙ্গে তামাশা করতে পছন্দ করে।’
জার্মান অফিসার হামজাকে জোরপূর্বক জার্মান শেখাতে চান যাতে সে শিলারের প্রশংসা করতে পারে। তাকে শাসন ও শোষণের কৌশলও শেখান জার্মানরা। তারা বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া এবং অসভ্য মানুষদের শাসন করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদের মধ্যে সন্ত্রাস তৈরি করা।’
হামজা ক্রমে মানসিক জটিলতার মুখোমুখি হন। ঔপন্যাসিক শেষে হামজাকে ফিরিয়ে আনেন স্বজাতির ভেতরে, বিশ্বাসঘাতকতার দায় থেকে মুক্তি দেন। হামজাকে আফিয়ার প্রেমে ডুবিয়ে দিয়ে তিনি কলঙ্কমুক্তির একটা প্রশস্ত পথ তৈরি করেন।
১৯৯৪ সালে গুরনাহর উপন্যাস বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে ছিল। গুরনাহ মূলত ইউরোপীয়দের রচিত আফ্রিকার ইতিহাসের বিপরীতে মূল ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। যুক্তি, কাঠামো, ও রাজনৈতিকভাবে তার উপস্থাপন বেশ শক্তিশালী। ‘আফটারলাইভস’ এ তিনি সাম্রাজ্যবাদের ও যুদ্ধের কারণে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে তারই একটি বিবেচনা দাঁড় করিয়েছেন। এত ধ্বংসের পরে কী অবশিষ্ট আছে তা বিবেচনা করতে বলেন।
সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পরিণতিকে আফ্রিকানদের চোখ দিয়ে দেখলে কী দেখা যায় সেটিই তিনি তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘যে ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে, আমরা কি এই সব ইতিহাস মনে রাখব? যে পৃথিবীতে যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক অগ্ন্যুৎপাতকে ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেখানে গুরনাহ আমাদের বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, পারস্পরিক সাহায্য সহায়তা একে অপরের বেঁচে থাকার অবলম্বন। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান হাতিয়ার। আফটারলাইভসে তিনি এমন কিছু চরিত্রকে তুলে এনেছেন, যাদের অতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যাদের বাতিল করা হয়, তাদের নিয়ে আলাপ করাও হয়নি কখনো।
We hate spam as much as you do