Tranding

05:44 PM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / "অন্ধকারের দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ" সৌম্যদীপ্ত রায় চৌধুরী

"অন্ধকারের দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ" সৌম্যদীপ্ত রায় চৌধুরী

"অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকটে প্রকাশিত হও। রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ, তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদাই রক্ষা করো। রবীন্দ্রনাথ ভাববাদী - একথা চট করে মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হই। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ধারণাকে নস্যাৎ করার ক্ষেত্রেও সেই দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদের কাছেই আমাদের ফিরতে হয়।

"অন্ধকারের দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ"  সৌম্যদীপ্ত রায় চৌধুরী

 

"অন্ধকারের দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ" 
সৌম্যদীপ্ত রায় চৌধুরী 


বাইপাস ধরে ফিরছি রাত্তিরে। সায়েন্স সিটি পেরিয়ে গোটা রাস্তায় ছড়িয়ে আছে সাদা খই। শেষ যাত্রায় ঋণ শোধ করে চলে যাচ্ছেন কেউ নিরুদ্দেশের পথে। 

মৃত্যু প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে উঠে আসে অন্ধকারের কথা! তাহলে মৃত্যু আর অন্ধকার কি সমার্থক? নাকি অন্ধকার আসলে আমাদের সাপেক্ষে বাঁচার উদাহরণ মাত্র। 

 

কথাপ্রসঙ্গে এক বান্ধবী মেসেজ করে বলেছিল :-

" The way out of this darkness too, lies in your mind. Just like the darkness itself."

অন্ধকার তবে কি প্রচ্ছন্ন ধারণা? আলোর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিস্পর্ধা?
ইদানিং মৃত্যু আমাকে ভাবাচ্ছে। আমাকে ভাবাচ্ছে অন্ধকারের দর্শন। কাকে বলে অন্ধকার? আমরা যারা আপেক্ষিক উপেক্ষায় বেঁচে থাকি তাদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অন্ধকার? অন্ধকার কি স্রেফ মৃত্যুর হাত ধরে আসা সহযাত্রী? অথচ সৃষ্টির আদিতেই আছে অন্ধকার। কৃষ্ণগহ্বরের বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দনে জন্ম এ পৃথিবীর। ব্ল্যাক হোলের আদি লগ্নে মহাবিশ্বের অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল নূতন সৃষ্টির আভাস। মাতৃগর্ভে লুকিয়ে থাকা প্রাণের প্রথম পুলকও সেই অন্ধকারেই সঞ্জাত। তাহলে মৃত্যু প্রসঙ্গেই কেন উঠে আসে অন্ধকারের কথা? 

 

উপনিষদের শ্লোক

"অসতো মা সদ্‌গময় তমসো মা জ্যোতির্গময়

মৃত্যোর্মামৃতং গময়। আবিরাবীর্ম এধি।

রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্‌।" 

এর ব্যাখায় ১৩১১ বঙ্গাব্দে 'প্রার্থনা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :-

 

 "অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকটে প্রকাশিত হও। রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ, তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদাই রক্ষা করো।

 

রবীন্দ্রনাথ ভাববাদী - একথা চট করে মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হই। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ধারণাকে নস্যাৎ করার ক্ষেত্রেও সেই দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদের কাছেই আমাদের ফিরতে হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাববাদ হেগেলের ভাববাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত কি না তা তর্কসাপেক্ষ। রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের জীবনের কেন্দ্রে স্থিত । পক্ষান্তরে জার্মান দার্শনিক হেগেলের কাছে বাস্তবতা হল পরম মন বা অ্যাবসালুট মাইন্ড ; রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা ও হেগেল এর ‘পরম মন’ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তদুপরি প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাস এর সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে হেগেল বলেছিলেন:"Being and non-being are the same" 

 

এখানে ফের এসে পড়ে অস্তিত্ববাদের তর্ক। সে তর্কে যাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গান মনে পড়ে গেল। 

গতকাল ফেরার পর থেকেই মাথায় ঘুরছে "আঁধার", "অন্ধকার" এর মতো শব্দ গুচ্ছ। বাইপাসের দাঁড়িয়ে ঐ হাওয়ায় ভেসে যাওয়া খই দেখে গুনগুন করছিলাম -

 "আমার এই      দেহখানি   তুলে ধরো,

তোমার ওই     দেবালয়ের   প্রদীপ করো--

নিশিদিন          আলোক-শিখা   জ্বলুক গানে ॥" 

 

এইখানে এসে খানিকটা থমকালাম। আমার এই দেহখানি তুলে ধরো - নশ্বরতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে অবিনশ্বর আত্মার প্রতি এই সমর্পণ আমাকে ভাবিয়ে তোলে। নিজের দহনে আলোর উদ্ভাসন - এ বড় সহজ কথা নয়। আমার কথা প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় আরেকটি কথা -

 

"বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা আত্মহোমের বহ্নি জ্বালা--

          জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি-আশে।" 
এই বন্ধনহীনতার গানে রবীন্দ্রনাথ ফের বলে ওঠেন আত্মহোমের কথা। আত্মাহুতির কথা। কিন্তু এই আহুতি কি হনন? আমার মাথায় বারংবার প্রশ্ন জেগে ওঠে! 

 

১৯১৪ সালে গৌড় সারঙ্গ রাগে এই গান রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। সমসাময়িক চিঠিতে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখেন:- 

‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে। মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না, আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ; —অন্যদের সকলের সম্বন্ধেই নৈরাশ্য এবং অনাস্থা।'

 

এই কি তবে "আঁধারের গায়ে পরশ করা নূতন তারকা?" মৃত্যুর মুক্তি? রবীন্দ্রনাথ তো লিখেছেন

"আঁধারের         গায়ে গায়ে   পরশ তব

সারা রাত        ফোটাক তারা   নব নব।

নয়নের           দৃষ্টি হতে   ঘুচবে কালো,

যেখানে           পড়বে সেথায়   দেখবে আলো"

উপনিষদের ব্যাখায় রবীন্দ্রনাথ আলোর কথা বলেন। আঁধার এবং আলোর এই খেলায় কে কার উপজীব্য তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।

 

উপনিষদে মৃত্যু এবং অমৃত শব্দটি বিবিধার্থে ব্যপ্ত। কখনও মৃত্যু এবং অমৃত একার্থে আবার কখনও বিবিধ প্রেক্ষিতে ভিন্নার্থে আমাদের সামনে উঠে আসে। সমস্যা হল অমৃত শব্দটিকে নিয়ে
উপনিষদে অমৃত কখনও অমর্ত্য অর্থাৎ মৃত্যু হইতে মুক্ত আবার কখনও আনন্দের সমার্থক হিসেবে উঠে আসে! সেক্ষেত্রে অন্ধকার থেকে মৃত্যু অথবা মৃত্যু থেকে অমৃত - এ যাত্রাপথের শেষ কোথায়?

 

উপনিষদ মৃত্যুর ব্যাখা করেছে তিনটি পর্যায়ে।

 

প্রথম পর্বে - ব্রহ্মের স্বরূপ - যে পর্যায়ে সৃষ্টির কোনও প্রবাহ নেই, আর যেহেতু সৃষ্টি নেই তাই মৃত্যুও নেই। জন্ম - মৃত্যুর এই অনুপস্থিতি ব্রহ্মের অমূর্ত পর্যায়। মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

 

দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্রহ্মের দ্বৈত ভাব - যেখানে জন্ম প্রবাহ স্থান কাল এবং মৃত্যু বর্তমান। এক্ষেত্রে অবিদ্যা এবং একত্বের ধারণা চলে আসে। কিন্তু সে সব আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।

 

তাহলে মৃত্যু এবং অন্ধকারকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দেখেন? এই দেখা কি তাহলে বেদান্ত দর্শন সঞ্জাত? প্রসঙ্গত স্মর্তব্য এই উপনিষদীয় দর্শনকে কীভাবে আত্ম্যস্থ করেছেন রবীন্দ্রনাথ?  রবীন্দ্রনাথ লিখছেন- 

 

  …‘আপন সত্তার মধ্যে দুটি উপলব্ধির দিক আছে। এক যাকে বলি আমি, আর তারই সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে যা-কিছু, যেমন আমার সংসার, আমার দেশ, আমার ধনজনমাল, এই যা-কিছু নিয়ে মারামারি কাটাকাটি ভাবনা-চিন্তা। কিন্তু পরমপুরুষ আছেন, সেই সমস্তকে অধিকার করে এবং অতিক্রম করে…। বিশ্বদেবতা আছেন তাঁর আসন লোকে, গ্রহচন্দ্রতারায়। জীবনদেবতা বিশেষভাবে জীবনের আসনে, হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর পীঠস্থান সকল অনুভূতি সকল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। …আমার মন যে সাধনাকে স্বীকার করে তার কথাটা হচ্ছে এই যে, আপনাকে ত্যাগ না করে আপনার মধ্যেই সেই মহান পুরুষকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্র আছে,তিনি নিখিল মানবের আত্মা। তাঁকে সম্পূর্ণ উত্তীর্ণ হয়ে কোনো মানব বা অতিমানব-সত্যে উপনীত হওয়ার কথা যদি কেউ বলেন, সে কথা বোঝবার শক্তি আমার নেই। কেননা আমার বুদ্ধি মানববুদ্ধি। আমার হৃদয় মানবহৃদয়, আমার কল্পনা মানবকল্পনা। তাকে যতই মার্জনা করি, শোধন করি, মানবচিত্ত তা কখনোই ছাড়তে পারে না। আমরা যাকে বিজ্ঞান বলি তা মানববুদ্ধিতে প্রমাণিত বিজ্ঞান । আমরা যাকে ব্রহ্মানন্দ বলি তাও মানবের চৈতন্যে প্রকাশিত আনন্দ। এই বুদ্ধিতে এই আনন্দে যাঁকে উপলব্ধি করি তিনি ভূমা, কিন্তু মানবিক ভূমা। তার বাইরে অন্য কিছু থাকা না থাকা মানুষের পক্ষে সমান।’—মানুষের ধর্ম। 

 

    

 

উপরোক্ত উদ্ধৃতির থেকে এটা স্পষ্ট যে, রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের সঙ্গে যে আলাপ করেছিলেন তার সারবস্তু  কবির উপনিষদীয় দর্শন, সত্য-বোধ সঞ্জাত। এবং একজন কবি একজন বিজ্ঞানী একত্রে  ‘সত্য  নিয়ে আলাপ করেছেন, অথচ তাঁদের দুজনের ‘সত্য’র সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইনস্টাইন পক্ষ নিচ্ছেন বৈজ্ঞানিক সত্য-র । কারণ তার সত্য যাচিত,তার সত্যের ইতিহাস আর্কিমিডিস থেকে নিউটন পর্যন্ত এই দীর্ঘ দুই হাজার বছরের পরীক্ষিত সত্যের ইতিহাস । এই সত্যের ভিত্তি  প্রচলিত নিয়মাবলীর অস্তিত্ব এবং কারণিক বাস্তবতার (Objective Reality) অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে। একথাও স্মরণযোগ্য যে, স্বয়ং আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সূত্রের মাধ্যমে স্থান ও কালের Objective Reality মূর্ত করেছিলেন।, Absolute Space এবং Absolute Time-এর যে ধারণা  নিউটন আমাদের দিয়েছিলেন তাকে নস্যাৎ করে এই যুক্তি। আইনস্টাইন তাঁর স্বল্প বক্তব্যে  মানবিক অভিমুখ হীন জগৎকে স্বীকার করেছেন এবং তার ভিতর থেকে যে প্রাকৃতিক সত্য বেরোতে পারে সে-দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কবির সত্য এবং বিজ্ঞানীর সত্য ঠিক কেমন হতে পারে? নোবেলজয়ী বেলজিয়ান রসায়নবিদ ইলিয়া প্রিগইন তার বিখ্যাত গ্রন্থ  “Order out of Chaos”  এ  লিখছেনঃ- 

“The question of the meaning of reality was the central subject of a fascinating dialogue between Einstein and Tagore. Einstein emphasized that science had to be independent of the existence of any observer. This led him to deny the reality of time as irreversibility, as evolution. On the contrary, Tagore maintained that even if absolute truth could exist, it would be inaccessible to human mind. Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet.”

 

রবীন্দ্রনাথের ‘সত্য’  কোনও  কারণিক বাস্তবতাজনিত নয়। এই সত্যের ভিত্তি উপনিষদীয় তত্ত্ব , যেখানে পরম ব্রহ্মের  অস্তিত্ব এবং তাঁর শ্রেয়োবোধের বা প্রবর্তনাকে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে নিতে হবে। পরমপুরুষের সঙ্গে ঐক্য-সামঞ্জস্য–এগুলো রবীন্দ্রনাথের উপনিষদসঞ্জাত ধ্যান-ধারণা। কিন্তু তিনি যখন বলেন, সত্য ‘মানবিক’ এবং ‘সত্য তো মানুষের মধ্যে দিয়েই গৃহীত হয়’, তখন তাঁর উপলব্ধি এবং সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। কেননা তিনি এই ‘গৃহীত হয়’ প্রক্রিয়াকে কেবলমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে ধরেন না। তিনি ‘মানববুদ্ধিতে প্রমাণিত বিজ্ঞান’ এবং ‘ব্রহ্মানন্দ…মানবের চৈতন্যে প্রকাশিত আনন্দ  এ দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। সেই জন্য ‘সত্য’র সঙ্গে যে ‘মানবিক’  বিশেষণ জুড়ে দ্যান, তার ধারণা বিজ্ঞানের মানবিক ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতার বাইরে অন্য কোনও  ক্ষেত্রে স্থাপিত। সেটা মানসিক সত্য হতে পারে, কিন্তু কারণিক সত্য নয়।

 

সত্যের একধরণের স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে তুলে ধরেন.. সে সত্য উপনিষদের সত্য। কিন্তু মৃত্যু এবং অন্ধকারকে উপনিষদ যেভাবে ব্যাখা করে রবীন্দ্রনাথ কি সেই একইভাবে দেখেন? 

 

১৯১৪ সালে আরেকটি গানে রবীন্দ্রনাথ লেখেন 

"ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে,

          অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে।

              পুরাতনের হৃদয় টুটে   আপনি নূতন উঠবে ফুটে,

                   জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে ॥" 

 

 

আবার সেই অন্ধকারের কথা - অন্ধকারের দর্শন তাহলে ঠিক কী? অন্ধকারের দর্শন কি সেই দিগন্তরেখা যেখানে জীবন ও মৃত্যু একাত্ম হয়ে -
"প্রাণ" নামক ধারণার জন্ম দিচ্ছে? 

নবোকভ Speak, Memory তে বলেন -

" The cradle rocks above an abyss, and common sense tells us that our existence is but a brief crack of light between two eternities of darkness." 

অর্থাৎ দুই প্রান্তের আঁধারের মাঝে আমাদের অস্তিত্ব আমাদের বেঁচে থাকাই যেন এক ক্ষণিকের আলোকবর্তিকা। অর্থাৎ অন্ধকারের সাপেক্ষে দাঁড়িয়ে আলোর অস্তিত্ব শুধু প্রাণ অর্থেই সীমাবদ্ধ। তাহলে সৃষ্টির আদি মুহূর্তের যে অন্ধকার, গর্ভে যে অন্ধকারে প্রথম প্রাণের স্পন্দন - সে অন্ধকার কি তাহলে মৃত্যু সঞ্জাত? 

এখানেই প্রশ্ন করেন হাইডেগার এবং দেরিদা। What is metaphysics? এ মৃত্যু প্রসঙ্গে হাইডেগার বলেন - 
 “The end of the world e is death. The ‘end’
that belongs to existence limits and defines the whole of Existence
… death is just a fellow Existence.” 

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য দর্শনে - "আলোর উপমা" বা "Light Meraphor" নিয়ে দুটি ভিন্ন মত প্রচলিত। হাইডেগার এবং দেরিদা - "আলো" - অর্থেই সজীব, প্রাণোচ্ছল, স্বচ্ছ - পাশ্চাত্য মেটাফিজিক্সের ধারণাকে নস্যাৎ করেছেন। প্রাচ্যের চৈনিক ডাওইজম্ আবার অন্ধকারকেই উৎস মূখ হিসেবে দেখে আসেন। তাহলে এক্ষেত্রে দর্শন সঞ্জাত সত্যের রূপ কী? 

 

'রাজা' - নাটকে রবীন্দ্রনাথ রাজার সংলাপে লেখেন:- 

'আজ এই অন্ধকার ঘরের দ্বার একেবারে খুলে দিলুম- এখানকার লীলা শেষ হলো। এসো, এবার আমার সঙ্গে এসো, বাইরে চলে এসো- আলোয়।
সুদর্শনা। যাবার আগে আমার অন্ধকারের প্রভুকে, আমার নিষ্ঠুরকে, আমার ভয়ানককে প্রণাম করে নিই।' 

অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। ইংরেজিতে Transformation শব্দটির ব্যবহার আমাকে এক্ষেত্রে খানিক ভাবিয়ে তুলবে। 

'রাজা' নাটকে রবীন্দ্রনাথ বারংবার অন্ধকারকে ফিরিয়ে আনেন। যে অন্ধকারকে একসময় তিনি মৃত্যুর দ্যোতক হিসেবে দেখেছেন সেই অন্ধকারই আজ তার মিলনের আলো। নাটকের শুরু এবং শেষে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আসেন - "অন্ধকার ঘর" - এই অন্ধকার ঘরেই সুদর্শনার সত্যের স্বরূপ নিরুপণ। নাটকের গানে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :-

"এ অন্ধকার ডুবাও তোমার অতল অন্ধকারে,
ওহে অন্ধকারের স্বামী!" 

আরেকটি সংলাপ আমাকে ভাবিয়ে তোলে। দাসী সুরঙ্গমা বলে -

 "আলোর ঘরে সকলেরই আনাগোনা এই অন্ধকারের কেবল একলা তোমার সঙ্গে মিলন।" 

এই অন্ধকারকেই রবীন্দ্রনাথ একদা দেখেছিলেন মৃত্যুর বিচ্ছেদী দ্যোতক হিসেবে আর আজ এই অন্ধকারেই তিনি খোঁজেন মিলনের গান। 

রবীন্দ্রনাথের দর্শনে অন্ধকার কি তবে আপেক্ষিক কোনো অবস্থান? 

রবীন্দ্রনাথের বহু লেখায় উঠে আসে অন্ধকারের কথা। হয়তো আলোয় দেখা'র দর্শন খানিকটা অসম্পূর্ণ। হয়তো সাপেক্ষে বাঁচার জীবন দর্শনে অন্ধকারে অনুভূত সত্তার ব্যাপ্তি অসীম। 

তাই কি রবীন্দ্রনাথ লেখেন

"অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো?"

 

Your Opinion

We hate spam as much as you do