Tranding

01:39 PM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / রবিবারের বড় গল্প , যেমন খুশি তেমন সাজো অনির্বাণ বসু

রবিবারের বড় গল্প , যেমন খুশি তেমন সাজো অনির্বাণ বসু

আজ তাকে নতুন ভূমিকায় নামতে হবে, অফিস জানিয়েছে। সেইমতো চোখের কোলে সুর্মা, থুতনিতে দাড়ি, মাথায় ফেজ-টুপি, গলায় কালো সুতোয় বাঁধা তাবিজ—সে অফিসে পৌঁছায়। মাঝারি নেতা দাড়িটা খুলে নেয়, বলে, বাকিটুকুই যথেষ্ট।

রবিবারের বড় গল্প , যেমন খুশি তেমন সাজো  অনির্বাণ বসু

যেমন খুশি তেমন সাজো

অনির্বাণ বসু

ওর কোনও নাম নেই। থাকলেও কেউ জানে না। ও মেয়ে না ছেলে, অপরিচিত কারও পক্ষে হলফ করে বলা সম্ভব নয়। যখন যেমন সাজে এবং যতক্ষণ সেই সাজের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ ওই রূপটিই তার পরিচিতি। কখনও হয়তো বেপাড়ার চায়ের দোকানদার অবাক হয়ে শোনে শিব ঠাকুরের গলা থেকে বেরোনো মেয়েলি স্বর, তো আবার কখনও কোনও দিন কালীঠাকুর নকল জিভ সরিয়ে কথা বললে আশপাশের লোকে শুনতে পায় পুরুষালি কণ্ঠ। মানুষটা বোধহয় ইচ্ছা করেই এমন একটা ধাঁধা তৈরি করে নিজেকে নিয়ে। স্কুলে ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার সময় ফেল করেছিল। পড়া ছেড়ে দিল তখন। না-ছেড়ে উপায়ও ছিল না কোনও। সেই স্কুলের খাতায় নিশ্চিত আসল নামখানা মিলবে। যদিও যে-মানুষ নিজে আড়াল চায়, তাকে প্রকাশ্যে আনতে নেই; এই বহুরূপীও নিজের পুরোনো দিন, ঘটনা, পূর্ব-পরিচয়—ভুলে যেতে চায় সব। তবু ভুলে যাওয়া সহজ নয়; এই যেমন সে মনে রেখে দিয়েছে স্কুলের প্রতি বছরের অ্যানুয়াল স্পোর্টস্‌ : এমনিতে কোনও খেলায় নাম দিত না, একমাত্র গো অ্যাজ ইউ লাইক ছাড়া। যেমন খুশি সাজো বিভাগে প্রথম পুরস্কার, যত বছর স্কুলে ছিল, ওর জন্যই যেন বাঁধা থাকত। গায়ে রং করে শ্যাওলার আদল দিয়েছিল একবার, মাথায় চড়িয়েছিল কালচে মাঙ্কিক্যাপ, হাতে ওই রঙেরই উলের দস্তানা, পিঠের উপর চাপিয়ে নিয়েছিল বড়োসড়ো একটা ঝুড়ি, তার উপর আর্টপেপার চিটিয়ে রং-তুলি দিয়ে বানিয়েছিল খোলস—কচ্ছপের; তারপর হাঁটু আর কনুই ঘষে-ঘষে চড়ে বেরিয়েছিল গোটা স্কুলমাঠ।

 

 

       স্কুলে প্রত্যেকবার গতবারের নিজেকেই যেন ছাপিয়ে যেতে চাইত বহুরূপী। শীতকালের সেই শেষদুপুরে, বস্তির ঠিক পিছনের এঁদো ডোবায় গিয়ে, ডুব দিয়ে, গায়ে-মাথায় পাঁক মেখে উঠে এসেছিল ও। ওইভাবেই সোজা স্কুলে গিয়ে জোগাড় করেছিল লম্বা টুল আর একটা ফুটবল, তারপর সেই টুলে চড়ে ডান পা মেলে দিয়েছিল পিছনে। বাঁ পায়ের পাশে কাদায় আটকানো ফুটবল, স্থির। পুরো ছবিটা একবারে ধরা দিলে বোঝা যায়, সামনে-রাখা ফুটবলে লাথি মারতে চলেছে ফুটবলার। বিচারকরা রায় ঘোষণার সময় বলেছিল : ‘এ-বছর গো অ্যাজ ইউ লাইকে প্রথম হয়েছে গোষ্ঠ পালের মূর্তি।’ উত্তুরে হাওয়ায় কাঁপতে-কাঁপতে কাদামাখা শরীরে—হাতে সোনালি মেডেল, লাল রিবন—ঘরে ফিরে এসেছিল সে। তখনও তার মা বেঁচে। কাজ করে লোকের বাড়ি-বাড়ি। বাবা ততদিনে নতুন করে সংসার পেতেছে। মোটে আসে না তাদের বাড়ি, খোঁজখবরও নেয় না কোনও। বাড়ি ফিরে ওই ঠান্ডায় ছোটো বালতিটা হাতে কলতলায় চলে গিয়েছিল ও, স্নান সেরেছিল ভালো করে আর পরদিন সকাল হয়েছিল ধূমজ্বর গায়ে। চোখ জ্বলছিল, নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছিল গরম শ্বাস, তবু মা কামাই দেয়নি কাজে। বিছানায় শুয়ে জ্বরের ঘোরে নতুন জেতা মেডেলটায় হাত বুলোত। ফি-বছর এমনটাই হত : গো অ্যাজ ইউ লাইক থেকে জিতে-আনা মেডেলখানা পরের বছর স্পোর্টসের আগে পর্যন্ত পুরোনো হত না; তেলচিটে বালিশের তলায় রেখে শান্তির ঘুম।স্বপ্নের মধ্যে খেলা করত নানান অবয়ব; আগামী বছর কী সাজবে—তারকল্পনা।

       কয়েক মাসের খুসখুসে কাশি যখন রক্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছিল, মা মারা গিয়েছিল। বস্তির সামনে মায়ের নিথর শরীরটা শোয়ানো ছিল। বার দুয়েক এর-তার মুখের দিকে তাকিয়ে বহুরূপী দেখেছিল, কাঁদছে না কেউ; তার মায়ের মৃত্যু কাউকে নাড়া দেয়নি দেখে নিজের চোখের কোলে আঙুল ধরেছিল সে, বুঝেছিল, সেই চোখও অন্যদের মতোই—নির্জলা।

       মা মারা যাওয়াতে অবশ্য তার দুনিয়ায় খুব-একটা বদল হয় না। শুধু দু’ বেলা খাওয়ার বন্দোবস্ত হয় মোড়ের মাথার ভাতের হোটেলে। প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুর দোকান, ফলে কখনও টাকা দিতে পারলে দেয়, নয়তো লেখা থাকে বাকির খাতায়; সেই খাতা যে কোথায় থাকে, কেমন দেখতে—কেউ জানে না। মা মরে গিয়ে একদিক দিয়ে ভালোই হয় তার, খাওয়ার সময় অহেতুক খিটখিটানি শুনতে হয় না আর। হোটেল-লাগোয়া চায়ের দোকানেও একই ব্যবস্থা : দিনে দু’ ভাঁড় চা আর একটা করে বিস্কুট মাগনায়। তার বেশি চাইলে পয়সা লাগে। সাজগোজের কারণে পথে-ঘাটে রোজ কিছু-না-কিছু মিলে যায়; সেই টাকায় বাড়তি চা আর প্রয়োজনমতো বিড়ি। চায়ের দোকানের বেঞ্চে অজিনাসন ছড়িয়ে বসে ফুক-ফুক বিড়ি ফোঁকে শিবঠাকুর।

       সেবার নাকের ডগায় শুঁড় ঝুলিয়ে গণেশ সেজেছিল বহুরূপী। তারপর গিয়ে দঁড়িয়েছিল দুধের দোকানের সামনে। ছোটোবেলায় তাদের বস্তির সামনের রাস্তায় বাঁধানো যে-গাছতলাটা ছিল, স্কুল যাওয়ার পথে সে দেখেছিল, বড়োবাড়ির বউ-মেয়েরা দুধের বাটি আর প্যাকেট হাতে—যে যেমন পেরেছিল নিয়ে এসেছিল—সেখানে লাইন করে দাঁড়িয়ে; গাছের গোড়ায়, বাঁধানো চাতালে, একটা ছোটো পাথুরে গণেশ। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তার আগে সে কখনও দেখেনি ওটা। লাইন মেনে একের-পর-এক আসছিল সবাই, দুধের পাত্র তুলে ধরছিল শুঁড়ের ডগায় আর অমনি চোঁ-চোঁ করে পুরোটা টেনে নিচ্ছিল হাতিমুখো পাথর। চারপাশ জুড়ে তখন ভগবানের মহিমা-সংকীর্তন। বহু-বহুদিন পর, সেবার, একটু দুধ খাওয়ার ইচ্ছা জেগেছিল, মনে পড়ে গিয়েছিল ছোটোবেলার কথা : সিদ্ধিদাতা বিনায়ক এসে দাঁড়িয়েছিল দুধের দোকানের সামনে। হাত দিয়ে দু’-একবার শুঁড়খানায় দোলা দিয়েছিল। অন্য দিনের মতো হাতে খুচরো পয়সা গুঁজে দিয়েছিল দোকানি। পয়সা পাওয়ার পর হাত তুলে অভয় দিলেও চলে যায়নি সে, হাতির মতো চোখ ছোটো করে তাকিয়েছিল রেফ্রিজারেটরের দিকে; বাইরে থেকে দেখা যায় ভিতরে-রাখা ক্যাডবেরি, কোল্ড-ড্রিঙ্ক, দুধের প্যাকেট। তার দাঁড়িয়ে-থাকায় দোকানি গা না-করায় সে নিজেই দুধ চেয়েছিল, বলেছিল, ভগবানকে খাওয়ালে অশেষ পুণ্য। ধাক্কা দিয়ে দোকানের চৌহদ্দি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাকে। পথচলতি মানুষেরা দেখেছিল, একটা সামান্য মানুষের হাতে ঘাড়ধাক্কা খাচ্ছে স্বয়ং ভগবান।

       তারপর থেকে বহুবার সে দেখেছে, মানুষ ভগবানের মূর্তিতে বা ছবিতে ফুল চড়ায়, টাকা ভেড়ায়, খাবার দেয়; ভগবান শরীরী অবয়বে সামনে এলে বড়োজোর দু’-চার পয়সা খুচরো, তার বেশি কিছু নয়।

       অবশ্য এই চেয়ে-চিন্তে চলার দিন শেষ হয়ে এল অচিরেই। সে-দিন রাতে একটা দেশি মদের পাঁইট কিনে কাঁধের গেরুয়া ঝোলাখানায় ভরে হোটেলে ঢুকেছিল সে। মাথায় শিকাগো ধর্মমহাসভার পাগড়ি। দোকানে ঢুকে হাতের উপর হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ, তারপর দোকানিকে বলে রাতের খাবার বেঁধে নিয়ে ফিরে এসেছিল ঘরে।

গা ধুয়ে গামছা পরে ক্যালেন্ডারের ঠাকুরকে প্রণাম করেছিল। ধূপ জ্বেলে ঠাকুরের ছবির সামনে দেখিয়ে গুঁজে দিয়েছিল জানলার কাঠের ফোকরে।তারপর লুঙ্গি পরে ভেজা গামছাটা মেলে দিয়েছিল দড়িতে। রান্নাঘর থেকে ছোট্ট একটা বাটিতে পরিমাণমতো চানাচুর—টক-ঝাল-মিষ্টি—নিয়ে বিছানায় রেখেছিল। দু’ বোতল জল আর স্টিলের একটা গ্লাস নিয়ে ফিরে এসেছিল দ্রুত। বিবেকানন্দের ঝোলা থেকে বেরিয়েছিল প্ল্যাস্টিকের বোতলে টইটম্বুর ঝাঁঝালো তরল। গ্লাসে মদ ঢেলে জল মিশিয়েছিল মাপমতো, দেওয়ালে ঝুলতে-থাকা ভগবানের দিকে তুলে ধরেছিল খানিকক্ষণের জন্য, তারপর প্রথম চুমুক দিয়েছিল।

নেশা তখন চড়তে শুরু করেছে সবে, জমে উঠছে একাকী মৌতাত, দরজা ধাক্কানোর শব্দে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল। অনিচ্ছার সঙ্গে খাট থেকে নেমে গিয়ে দরজা খুলেছিল।

বাইরে দাঁড়িয়ে দুটো হাট্টাকাট্টা লোক। স্ট্রিটলাইট রাস্তার ওপারে, ফলে ওই আধো-অন্ধকারে ঠাহর হয় না তাদের মুখ। জড়ানো গলায় বিরক্তি তখন : ‘কী চাই?’

‘দরকার ছিল। তোর সঙ্গে।’

ওদের তুই-তোকারিতে ওর মনে হয়, যারা এইভাবে কথা বলে থাকে, তাদের ‘আপনি’ কিংবা নিদেনপক্ষে ‘তুমি’ করে বলতে হয়; কেন-না, ওই দু’জন তার বন্ধু নয় যে সেও পালটা তুই-তোকারি করবে : ‘যার সঙ্গে আপনাদের দরকার, তিনি এখন ব্যস্ত আছেন। আপনারা পরে আসবেন।’

দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল সে কিন্তু ওরা দু’জন ততক্ষণে ঢুকে এসেছে ঘরের ভিতর। বিছানায় মদের বোতল, গ্লাস, চানাচুর দেখে একজন বলে : ‘তা আসরে বসা হয়েছে, দেখছি। বেশ, বেশ।’

বিছানার চাদরটা একদিকে সামান্য একটু উঠে গিয়েছিল, সেটা ঠিক করে দিয়ে অন্যজন বলে : ‘বাংলা না-খেয়ে ইংলিশ খেতে পারিস না?’

‘আমার অত রেস্ত নেই।’

‘ট্যাঁকের জোর বাড়লে ইংলিশ খাবি?’ ঘরের এককোণে থাকা টুলটা টেনে নিয়ে বসতে-বসতে জিজ্ঞাসা করে দ্বিতীয়জন।

‘খাব।’

‘চাকরি করবি?’

‘না, চাকরি করব না। আমি বহুরূপী। আমি সাজব।’

‘তোর ওই রং মেখে সং সাজাটাই তো চাকরি রে! তাও রোজ-রোজ সাজার ঝামেলা নেই। বাকি দিনগুলো নিজের মতো সাজ না, কে বারণ করেছে! এবার বল, চাকরি করবি?’

‘মেকআপ আর কস্টিউম?’

‘অফিস দেবে। মেলা ফ্যাচফ্যাচ না-করে রাজি কিনা বল।’

‘করব। তবে টাকা-পয়সা কত পাব?’

‘কাল সকাল এগারোটা নাগাদ চলে আসবি বংশীধর লেনে। বড়োরাস্তা দিয়ে গলিতে ঢুকলে পার্টি-অফিস, ওখানেই আসিস। আমরা থাকব।’

পরের দিন চাকরিটা হয়ে যায় বহুরূপীর। হনুমানের গদা, লেজ, মুকুট, পোশাক আর নকল মুখ নিয়ে ঘরে ফিরে আসে সে। সঙ্গে টাকা। আগাম। মিছিলে হনুমান সাজতে হবে। মিছিলের পর আরও টাকা।

মিছিলের পর বেশ কয়েকটা সমাবেশেও হনুমান সাজতে হয়েছে ওকে। শহরে, শহরের আশেপাশে—মফস্‌সলেও এমন-কি। হনুমানের পাশাপাশি গরুও সেজেছে একদিন; তবে তাতেসমস্যা নেই কোনও। ও শুধু সাজতে চায়, সেজে তাক লাগিয়ে দিতে চায় সবাইকে। রোজ নতুন-নতুন সাজ।

একদিন অফিস জানায়, মিছিলে লোক লাগবে। পার্টি-কর্মী সাজতে হবে।

পাজামা-পাঞ্জাবি পরে গলায় গেরুয়া উত্তরীয় জড়িয়ে, বুকে ফুলের ছবি দেওয়া ব্যাজ লাগিয়ে পার্টির লোক সাজে বহুরূপী। একদিন অফিস জানায়, প্রধানমন্ত্রী সাজতে হবে।

মুখে সাদা দাড়ি-গোঁফ আর চোখে সরু ফ্রেমের চশমা পরে, পাঞ্জাবির উপর কোট চড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী সাজে বহুরূপী।

একদিন অফিস জানায়, সভাপতি এলে অবিকল তাঁর মতো সাজতে হবে।

নকল চামড়া লাগিয়ে মাথার সামনে টাক বানিয়ে, ছোট্ট একটা কুশন পেটে বেঁধে ভুঁড়ি বাগিয়ে সভাপতি সাজে বহুরূপী।

একদিন অফিস জানায়, মারা-যাওয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর স্মরণে সাজতে হবে।

সারা গায়ে তুলো লাগিয়ে মাথার উপর তুলোর ফুল বানিয়ে পরমাণু বোমা সাজে বহুরূপী।

মাঝে-মধ্যে মদ খেতে ইচ্ছা হলে আর বাংলার ঠেকে যায় না সে, সিধে চলে যায় লিকার-শপে। সস্তা চানাচুরের জায়গায় কখনও-সখনও ও-পাড়ার দোকান থেকে আসে মাংস—কাবাব। অতঃপর চোখ ঢুলুঢুলু, ঘরে বিড়ির ফাঁকে-ফাঁকে সিগারেট, কখনও-বা নেশার ঘোরে হাতে লেগে ভরা গ্লাস উলটে পড়ে বিছানা ভিজে চুপচুপে। পরদিন সকালে খোঁয়ারি কেটে গেলে তড়িঘড়ি চাদর আর তোশকের মাঝে, ভেজা জায়গাটায়—যেখানটা ক্রমে ঈষৎ খয়েরি হয়ে উঠছে—দাঁড় করিয়ে দেয় গ্লাসখানা। তারপর কলতলায় গিয়ে গায়ে জল ঢেলে এসে বসে ঝাপসা হয়ে-যাওয়া আয়নার সামনে। মন দিয়ে সাজে।

 

এর মাঝে তাকে খুব বেশি চাপ নিতে হয়নি চাকরিতে। সাধারণত যা সাজত, তার বাইরে খুব কিছু সাজতে হয় না তাকে। সীমান্তে জঙ্গি-হামলা রুখে দেওয়ার পর প্রায় সারাটা দিন পার্টি-অফিসের সামনে জওয়ান সেজে হাতে নকল বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল একবার। তা বাদে মিছিল কিংবা সভা-সমিতিতে সাধারণত পাবলিক সাজে সে: কখনও কপালে তিলক, গায়ে সাদা ফতুয়ার উপর নামাবলি, ভিতরে পৈতে; কখনও-বা চোখে সুর্মার প্রলেপ, চিবুকে দাড়ি—গোঁফহীন।টিকিওয়ালা ন্যাড়ামাথা পুরুতঠাকুর সাজতে সামান্য যা সময় লাগে, কপালে তিলক আঁকতে অত সময় লাগে না। ওর চেয়ে ক্রিশ্চান সাজতে সময় বেশি লাগে; বড়ো বেখাপ্পা পোশাক চড়াতে হয়। একমাত্র ওই পোশাকেই খুব-একটা স্বচ্ছন্দ নয় বহুরূপী। একবার মুসলমান সাজিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ক্যামেরার সামনে। নেতাদের নির্দেশমতো প্রধানমন্ত্রীর কাজেরসম্পর্কে—যেমনটা শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে—ভালো-ভালো কথা বলেছিল সে।

আজ তাকে নতুন ভূমিকায় নামতে হবে, অফিস জানিয়েছে। সেইমতো চোখের কোলে সুর্মা, থুতনিতে দাড়ি, মাথায় ফেজ-টুপি, গলায় কালো সুতোয় বাঁধা তাবিজ—সে অফিসে পৌঁছায়। মাঝারি নেতা দাড়িটা খুলে নেয়, বলে, বাকিটুকুই যথেষ্ট।

পার্টির একজন তাকে মোটরবাইকের পিছনে বসিয়ে নিয়ে যায় চারমাথার মোড়ে। দূর থেকে শোনা যায় অভ্রভেদী কলরব। মিছিল এগিয়ে আসছে, বাইকচালক বহুরূপীর হাতে ধরিয়ে দেয় একটা চটের থলে। থলেটা শক্ত হাতে ধরে সে এগিয়ে যায় মিছিলের দিকে।

মিছিলের মুখ চোখে পড়তেই রাস্তার অন্য দিকে চলে যায় সে। হাঁটতে থাকে সন্তর্পণে। পইপই করে সেই মাঝারি নেতা বলে দিয়েছে, কেউ যেন বুঝতে না-পারে সে আসলে ছদ্মবেশী।

মিছিলের সমান্তরালে এসে লাইটপোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে থলে থেকে বের করে আনে কাচের বোতল। ভিতরে নীল তরল। ছিপি ফুটো করে কাপড়ের টুকরো গোঁজা মুখে। ফতুয়ার পকেট থেকে লাইটার বের করে, সলতের মুখে আগুন ধরায়। তারপর ছুঁড়ে দেয় মিছিলের দিকে।

প্রথম আওয়াজটার রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আছড়ে পড়ে দ্বিতীয়টা। মিছিলের সামনে আর পিছনে-থাকা পুলিশেরা এদিক-ওদিক তাকায়। একজন চিৎকার করে ওঠে : ‘ওদিক থেকে ছোঁড়া হয়েছে। ওই যে, ওই মোল্লাটা! শুয়োরের বাচ্চা!’

পুলিশ তেড়ে আসে তার দিকে। সে দৌড়তে শুরু করে। চারমাথার মোড়ে তার জন্য মোটরবাইক দাঁড়িয়ে আছে, সে জানে। সেই দিক লক্ষ্য করেছোটে। ছুটতে-ছুটতে ভাবে, দাঙ্গাবাজের ভূমিকায় তার এই সাজ একেবারে নিখুঁত। পুলিশ পর্যন্ত সত্যি ভেবেছে।

সে হাসে আর ছোটে। ছোটে আর হাসে।

চারমাথার মোড়ে এসে দেখে সব শুনশান। কোথাও কেউ নেই যে তাকে বাঁচাবে। এবার ভিতরে-ভিতরে ভয় পেয়ে যায় সে। ঘাবড়ে গিয়ে বড়োরাস্তা ধরেই ছুটতে থাকে। গলিতে ঢোকার কথা মনেও আসে না। ছুটতে থাকে প্রাণপণে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেও ভয় পায়। পিছনে পুলিশ। বহুরূপী ছোটে। ছুটতে-ছুটতে বদলে যায় তার সাজ : মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সে শুধুই পলাতক।

Your Opinion

We hate spam as much as you do