প্রায় এক দশক ধরে আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমের জগতে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, তা হচ্ছে মালিকানার কাঠামো পরিবর্তন। এর প্রধান কারণ চড়া লগ্নি। ফলে আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ না হয়ে সংবাদমাধ্যমের, বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।
ন্যাশনাল প্রেস ডে-১৬ নভে: 'আচ্ছে ভারতে' মিডিয়ার স্বাধীনতা নিম্নগামী
16 November 2023
প্রতি বছর ভারতে ১৬ নভেম্বর ন্যাশনাল প্রেস ডে (National Press Day) পালিত হয় । ১৯৬৬ সালে আজকের দিনেই প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার পথ চলা শুরু হয়েছিল।
বছর কুড়ি আগেও সাংবাদিকতা একটি আলাদা পেশা ছিল যখন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে সাংবাদিকতা পড়ার সুযোগ অনেকটাই অল্প ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে, সাদা কালো কাগজের জমানা পেরিয়ে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পাড়ায় জ্বলজ্বল করছে আধুনিক সাংবাদিক। কিন্তু গুরুত্ব বেড়েছে কি?
আজ ন্যাশনাল প্রেস ডে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে গতবারের থেকে ১১ ধাপ নেমে গেছে ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গ্রাফ ক্রমশ নেমেই চলেছে। এই নিয়ে একটানা দ্বিতীয় বছর প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে নীচে নামল ভারত। ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান দাঁড়িয়েছে ১৬১। গতবছর এই র্যাঙ্কিং-এ ভারতের স্থান ছিল ১৫০। ২০২১-এ ছিল ১৪২। তার মানে মাত্র তিন বছরে আমাদের পতন ১৯ ধাপ। 'অচ্ছে ভারত' এর উদাহরন ।
পাকিস্তান পর্যন্ত সেই তুলনায় তালিকায় অনেক ওপরে রয়েছে। গত বছর যেখানে ১৫৭তম স্থানে ছিল তারা, এ বছর ১৫০তম স্থান দখল করেছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় ভারতের চেয়ে ঢের এগিয়ে রয়েছে আরেক প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা। ২০২২ সালে ১৪৬তম স্থান দখল করেছিল তারা। এ বছর আরও ওপরে উঠে, ১৩৫ তম স্থান দখল করেছে। যদিও আরেক প্রতিবেশী দেশ নেপালেরও ১৯ ধাপ পতন হয়েছে। স্থান ৯৫। বাংলাদেশেরও পতন হয়েছে।
তবে ১ ধাপ। গত বছর ছিল ১৬২, এ বছরে তা দাঁড়িয়েছে ১৬৩। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে রয়েছে নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড এবং ডেনমার্ক।
দ্য রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস বা আরএসএফ এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। শুধু পতনই নয়, ওই রিপোর্টে যে সমস্ত দেশে সাংবাদিকরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করেন, সেই ৩১ দেশের মধ্যে রাখা হয়েছে ভারতকে। ভারতের পরিস্থিতিতে 'অত্যন্ত গুরুতর' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় রাখে, যার ভিত্তিতে সূচকের গণনা করা হয় এবং তার ভিত্তিতে দেশগুলিকে স্থান দেওয়া হয়।
এই পাঁচটি হল, রাজনৈতিক সূচক, অর্থনৈতিক সূচক, আইন সূচক, সামাজিক সূচক এবং নিরাপত্তা সূচক। ভারতের এই শেষ সূচকটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই ক্ষেত্রে আমরা ১৮০টি দেশের মধ্যে আছি ১৭২তম স্থানে।
এখন কথা হল, কেন দেখা যাচ্ছে না? কেন কেউ বলছেন না, 'রাজা তোর পোশাক কোথায়?' তার কারণও আছে ওই রিপোর্টে। বলা হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যম 'রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট', ভারতে 'সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন', 'বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সঙ্কটাপন্ন'। বর্তমানে ভারতে ১ লাখেরও বেশি সংবাদপত্র, যার মধ্যে ৩৬ হাজার সাপ্তাহিক এবং ৩৮০টি টিভি নিউজ চ্যানেল রয়েছে।
ভারতে প্রতি বছর কাজ করতে করতে গড়ে তিন বা চারজন সাংবাদিক নিহত হন। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত এই চার মাসে দেশে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং ১০ জন সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন। আরএসএফ যে প্যারামিটারগুলো দেখে যেমন, সংবাদ পরিবেশনে কতটা স্বাধীনতা রয়েছে, কতটা নিরপেক্ষভাবে খবর পরিবেশন করা যায়, সরকার বা কারও তাঁবেদারি না করে জনস্বার্থকে এগিয়ে রাখা যায় কতটা, এছাড়াও, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বিষয়ে কতটা খোলাখুলি সমালোচনা করার সুযোগ থাকে, তা-ও দেখে। দেখে সাংবাদিকদের প্রাণের ঝুঁকি কতটা, মানসিকভাবে তাঁরা কোন জায়গায়, কতটা কমিটেড কোনও রাজনৈতিক শক্তির প্রতি। এরসঙ্গে আছে নিত্যনতুন আইন, সাংবাদিকদের ওপরে প্রত্যক্ষ হামলা, সাংবাদিকদের দলীয়করণ আর সংবামাধ্যমের মালিককে নানা কায়দায় বেঁধে ফেলা। আমরা দেখছি বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ, তা রিজিওনাল বা ন্যাশনাল, এডিটোরিয়াল হেড পলিটিক্যাল অ্যাপয়ন্টেমন্ট।
এ কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে যে প্রায় এক দশক ধরে আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমের জগতে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, তা হচ্ছে মালিকানার কাঠামো পরিবর্তন। এর প্রধান কারণ চড়া লগ্নি। ফলে আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ না হয়ে সংবাদমাধ্যমের, বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। ফলে বেশিরভাগ মিডিয়ার অ্যাকাউন্টেবিলিটি খবরের প্রতি নেই, দলের প্রতি প্রতিফলিত হচ্ছে।
অথচ সংবাদমাধ্যম হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা, যা ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখোমুখি করে। একে বলা হয় হরাইজন্টাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি বা আনুভূমিক জবাবদিহি। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মিডিয়ার অ্যাক্টিভিটতে তার করুণ অনুপস্থিতি। হয়ত এইসব ভয়ঙ্কর প্রবণতাগুলো বিবেচনা করেই আমাদের নিট যোগফল ১৬১।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর নিউজরুমের সামাজিক বিন্যাস নিয়েও কথা বলেছে আরএসএফ। ওদের পর্যবেক্ষণ, ভারতীয় নিউজরুমে বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের হিন্দু পুরুষরাই সাংবাদিকতায় সিনিয়র পদে বা মিডিয়া এক্সিকিউটিভ পদে বসে আছেন। যার ফলে মিডিয়ার হাইলাইটেড বিষয়বস্তুতে পক্ষপাতদুষ্টতা প্রতিফলিত হয়।
এছাড়াও, প্রাইম টাইমের টক শোতে অংশগ্রহণকারীরাও মোটের ওপর পুরুষপ্রধান। এঁদের মধ্যে ১৫ শতাংশরও কম মহিলা উপস্থাপকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে আরএসএফের মন্তব্য। এছাড়াও সরাসরি বলা হয়েছে, "২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি ভারতে শাসন চালাচ্ছে, যারা কিনা দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী সংগঠন।"
এই সূচক পতনে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া, ভারতীয় মহিলা প্রেস কর্পস এবং প্রেস অ্যাসোসিয়েশন একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সর্বশেষ আরএসএফ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতসহ অনেক দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের অবনতি হয়েছে।"
ওই বিবৃতিতে ম্পষ্ট বলা হয়েছে, "গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল গণতন্ত্রের জন্য, যেখানে গভীর বৈষম্য রয়েছে, সেখানে মিডিয়ার ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। একইভাবে, চুক্তিতে পুনর্বহালের মতো অস্থিতিশীল কাজের পরিস্থিতিও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য চ্যালেঞ্জ। এমন অনিশ্চিত কাজের পরিবেশ কখনোই মুক্ত ও ম্বাধীন গণমাধ্যমে অবদান রাখতে পারে না।"
আসলে প্রেস ফ্রিডম ফাইটার বলে যাঁরা সকাল থেকে গলাবাজি করেন, এগিয়ে রাখেন, মিডিয়া ট্রায়াল করেন, তাঁরা জানেন না তলে তলে তাঁরা কতখানি নিঃস্ব তাই শাসকের মুখাপেক্ষী। দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে আসা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট স্পষ্টতই বাক স্বাধীনতা ও ঘনায়মান রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গেই জড়িত। একটা কমলে অন্যগুলোও কমে যায়।
অর্থনীতির পৃথিবীতে আজ সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হল মিডিয়া হাউসকে বাঁচিয়ে রাখার নিদান। শুধু ভারত কেন, সর্বত্র এই ফর্মুলা খোঁজার লড়াই চলছে। এর সাথে রয়েছে Paid news এর পশ্চিমী ঝঞ্ঝা, যা অনেকটাই নবজাতককে জোর করে ওষুধ খাওয়ানোর মতো! এছাড়া অতিরিক্ত তথ্যের দাপাদাপি তথ্য বিস্ফোরণ নেহাত অমূলক চিন্তা নয়। ব্যাক্তি আক্রমণ থেকে দেশ বিরোধী উস্কানি, সমস্যা রয়েছেই আনাচে কানাচে। এছাড়া বৈচিত্রের অভাবও ভীষণ ভাবে প্রকট। খবরের সিংহভাগ জুড়েই শহরের মানুষের ভাবনা, গ্রামের বা প্রান্তের জেলার মানুষের কথা বা আশা আখাঙ্খার কথা অনেক সময়েই বলার কেউ থাকছেন না। কোভিড পরবর্তী সময়ে অনেক মিডিয়া তাদের জেলার সাংবাদিককে অস্থায়ী ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার তেতো কথা বলছেন। আর সাংবাদিকের উপর আক্রমণের নজির কম নেই। শুধু শারীরিক নিগ্রহ কেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় সাংগঠনিক troll করার প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়।
We hate spam as much as you do