বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির যে রমরমা দাপাদাপি লক্ষ করা গিয়েছিল এমনকি দোর্দন্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তের বিজেপিতে যোগদান তৃণমূল শিবিরের অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়। বছর নয় মাস ঘুরতে না ঘুরতে সেই সব্যসাচী এখন আবার তৃণমূলের প্রার্থী। ফলে তৃণমূল শিবিরে যথেষ্ট অস্বস্তি। আর বিজেপিতো ময়দানেই নেই।
বিধাননগর পৌরভোটে শাসক বিরোধীতায় রেড ভল্যান্টিয়ার বামপন্থীরাই! একটাই প্রশ্ন ভোট হবে তো!
করোনায় বিধ্বস্ত বাংলা। সেখানে বিধাননগর পৌরনিগমএর ভোট আগামী ২২শে জানুয়ারি। অথচ এই অঞ্চলেই মোট ২২টি কনটাইনমেন্ট জোন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিধাননগর মহকুমা হাসপাতালে অধিকাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত।
বিধাননগর পৌর নির্বাচন হতে আর ন'দিন। যতদিন এগোচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে পোষ্টার ব্যানার থাকলেও অধিকাংশ বুথে শাসকের বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের দেখা নেই। রাস্তায় আছে বামপন্থীরা। মুলত যেন বহু কেন্দ্রে শাসক দলের সাথে লড়াইএ আছেন রেড ভল্যান্টিয়ারদের। সিপিআইএমের রাজ্য নেতা পলাশ দাশ অভিযোগ করেছেন তার লেখায় বক্তব্যে কোভিড আর লকডাউনে কিভাবে সরকারি দলগুলোর সুবিধে হয়ে যাচ্ছে। তাদের কোনোকিছুর উত্তর দিতে হচ্ছে না।
মোট ৪১ আসনের বিধাননগর পৌরনিগমের নির্বাচনে সিপিআইএমের মোট ৩৬জন প্রার্থী, যাদের মধ্যে অধিকাংশই রেড ভল্যান্টিয়ারের কাজে ছিলেন।
সারাভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের ২ সিপিআই এর ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ১৬ এবং ১৭ ওয়ার্ডে বাম সমর্থিত নির্দল প্রার্থী আছেন। জাতীয় কংগ্রেস মোট ২৯ টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তারা ১২ টি আসনে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের সমর্থন করছে। তৃণমূল কংগ্রেস ৪১ এবং বিজেপি ৪১ আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
রেড ভল্যান্টিয়াররা গত বছর ভয়ংকর প্রানঘাতি দ্বিতীয় ঢেউএর সময়ে রাত দিন
গোটা বিধাননগর জুড়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছেন। নির্বাচনে বামপন্থীদের খারাপ ফল রেড ভল্যান্টিয়ারদের কাজে ভাটা আনেনি। দলমত নির্বিশেষে বহু মানুষ উপকৃত। ৩২নং ওয়ার্ডের সুকান্তা ব্যানার্জী থেকে ১৮ নং ওয়ার্ডের নীলরতন রায় এই সেদিনও ভোট প্রচারের মধ্যেই মাস্ক পরে রুগীর বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছেছেন। ২০নং ওয়ার্ডের জয়ন্ত দাস, ১০নং ওয়ার্ডের অমরনাথ গুহ রেড ভল্যান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার সময় দল দেখেন নি বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
৯নং ওয়ার্ডের বহু পরিচিত রেড ভল্যান্টিয়ার রবী মন্ডল দিন সাতেক আগেই এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে অক্সিজেন পৌঁছে দেন। ১২নং ওয়ার্ডের রিঙ্কু মন্ডল বা গতবারের জেতা প্রার্থী মহঃ মহসীন আহমেদ প্রচারে সাড়া পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
৩৬নং ওয়ার্ডের চন্দনা মন্ডল বা ৫ নং ওয়ার্ডের পরিচিত প্রিয়াঙ্কা বর্মণ অথবা বেশ উল্লেখযোগ্য প্রার্থী ৬ নং ওয়ার্ডের দেবাশীষ হাজরা এলাকায় পরিচিত রেড ভল্যান্টিয়ার।
৩৩নং ওয়ার্ডে বামফ্রন্ট প্রার্থী হয়েছেন প্রাবন্ধিক ও বিশিষ্ট জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সংগঠক বাসব বসাক। তিনি রেড ভল্যান্টিয়ারদের সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করা থেকে শ্রমজীবী ক্যান্টিন পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। একটি ডিজিটাল পথসভায় বাসববাবু বলেছেন গতবছর বিধাননগর পৌরনিগম নির্বাচনে সন্ত্রাসের কথা। তিনি নিজে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকার কথা বলেন।
২১ নংওয়ার্ডে সঞ্জয় বিশ্বাস এবং ২২ নং এ তোতাই ওরফে সৌম্যকান্তি রায় প্রত্যেকেই গতবছর গোটা সময়টা রাস্তাতেই ছিলেন। ৩০ নং ওয়ার্ডের অরিন্দম দাস জানিয়েছেন গতবছরের বিভৎস সময়ে বাড়ি না ফিরতে পারা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা ।
২৮নং ওয়ার্ডে তফশিলী উপজাতি সংরক্ষিত কেন্দ্রের প্রার্থী বেলপতি মুন্ডা একটু পিছিয়ে পড়া এলাকায় উন্নয়নে ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন।
২নং ওয়ার্ডে সুস্মিতা ফৌজদার,১৫ নং এর সজল সাহা ২৪ নং এর অলোক রায় বা ২৫ নং এ সোমা মিত্র, ২৬ নং এ গৌরি নন্দী, ২৭ নং ওয়ার্ডে শুভম দাস প্রার্থী হয়েছেন। এরাও রেড ভল্যান্টিয়ারের কাজে ছিলেন। অভিযোগ শুভমের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে শাসক দলের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
বামপন্থীদের পক্ষ থেকে উন্নয়নের প্রশ্নে বিভিন্ন অভিযোগ আনা হচ্ছে। ১নং ওয়ার্ডে উজ্জ্বলকান্তি পাল এবং ৪নং ওয়ার্ডে বামফ্রন্ট প্রার্থী অসীম ঘোষ উন্নয়নের ঘাটতির অভিযোগ শুনছেন।
নানা রঙ আলো পার্ক এর মত কসমেটিক উন্নয়ন হলেও বারবার বিভিন্ন এলাকা থেকে জল নিকাশে অব্যবস্থার কথা উঠে আসছে। ৩নং ওয়ার্ডের প্রার্থী আসগার আলি মন্ডল প্রচার চালাচ্ছেন।
৪১ নং ওয়ার্ডে বামফ্রন্ট প্রার্থী হয়েছেন সুতনুকা ব্যানার্জী। তিনি লোকের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে বিডি ব্লকে আশাবাদী। ২৩নং এ দেবীকা দাস মন্ডল এবং ২৬ নম্বরের গৌরী নন্দীর প্রচার চলছে। কংগ্রেস সমর্থিত ৩৪নং ওয়ার্ডে কমল পাত্র এবং ৩৫ নং এ শান্তনু বর ৩৭নং ওয়ার্ডে সোমা প্রামানিক ভোট সুস্থ ভাবে হওয়ার দাবী রাখছেন।
৩৮ নং ওয়ার্ডে অনুপ মালিক যথেষ্ট জনপ্রিয়। আশংকা নির্বাচন সুষ্ঠ ভাবে হওয়া নিয়ে। ১৩ নম্বরে মহসীন আহমেদ, ৩৯ নং এ রাধানাথ চাঁদ ২৯নং এ শিক্ষিকা শ্বাস্বতী মন্ডল এর প্রচার যথেষ্ট এগিয়ে। ১১নং ওয়ার্ডে দেবাশিষ নস্কর পাড়ার ছেলে এই হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ১৯ নং ওয়ার্ডএর মিঠু দত্ত কেষ্টপুর খাল সংস্কারের বিষয় উল্লেখ করেছেন।
১৪ নং ওয়ার্ডে ফরওয়ার্ড ব্লকের অনিমা মন্ডল ওয়ার্ডে জল জমার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ শোনেন। এখানে জল জমার ফলে পাঁচিল ধ্বসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। তাতে তৃণমূল প্রার্থীকে মানুষ তাড়া করেন।
৩২ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী সুকান্তা ব্যানার্জী করুনাময়ীতে গনতান্ত্রিক অবস্থা রাখার কথা বলেন।
করোনার দাপট যত বাড়ছে ততই সন্দেহ বাড়ছে। বহুতল আবাসন বা জনপদ থেকে মানুষ ভোট দিতে আসবেন তো! চারিদিকে একটা অস্বস্তি আর ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ করলেন বিধাননগরের বামপন্থী প্রার্থীরা। বারবার মনে আসছে গত ২০১৫ সালে হওয়া শেষ নির্বাচনের কথা। বিধাননগরে গত পৌর নির্বাচনে শাসক দলের সন্ত্রাস চরমে উঠেছিল। বিভিন্ন খবরের উৎস থেকে প্রাপ্ত।
এবছর চেহারাটা একটু অন্যরকম হতে পারত। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির যে রমরমা দাপাদাপি লক্ষ করা গিয়েছিল এমনকি দোর্দন্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তের বিজেপিতে যোগদান তৃণমূল শিবিরের অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়। বছর নয় মাস ঘুরতে না ঘুরতে সেই সব্যসাচী এখন আবার তৃণমূলের প্রার্থী। ফলে তৃণমূল শিবিরে যথেষ্ট অস্বস্তি। আর বিজেপিতো ময়দানেই নেই।
এদিকে বেশ কয়েকটা ওয়ার্ডে শাসক দলের খারাপ ফলের সম্ভাবনা হওয়ায় সন্ত্রাসে অভিযোগ আসছে। ৭নং ওয়ার্ডের প্রার্থী হাসান আলি ওস্তাগারের পোষ্টার ফ্লেক্স ছেঁড়ার অভিযোগ এসেছে।
সবচেয়ে বড় কথা ভোট হবে তো? গত ২০১৫ এর সময়ের ভিডিও প্রচারে আসছে। সাধারন মানুষ এমনিতেই প্যান্ডেমিক ( ইদানিং যাকে প্ল্যানডেমিক বলা হচ্ছে ) এর প্যানিকে ভারাক্রান্ত। তার ওপর গতবারের মত রাস্তা জুড়ে তথাকথিত "উন্নয়ন" দাঁড়িয়ে থাকলে গনতন্ত্র বিপন্ন হবে বলে ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য। তাই বিরোধীরা বিশেষ করে বাম ও কংগ্রেসের দাবী ভোট সঠিকভাবে হতে দিতে হবে। আপাতত বিধাননগর তাই চায়।
We hate spam as much as you do