বলে ----তুর বড় বাড় বেড়িছে। ইখনও সময় আছে।রাজি হইয়ে যা। তুর মাথায় সিঁদূর দুঁব। তুকে আমার মনে ধর্যেছে।
ডাইন
ব্রততী চক্রবর্তী
শালের জঙ্গলে গাছের নীচে টুপটাপ ঝরে পড়ছে পাতা। পাতায় পাতায় বিছানো মাটির উপর অনেক গুলো ব্যস্ত হাত দ্রুত পাতা তুলছে। তারই ফাঁকে টুকটাক কিছু কথা মেয়েলি কন্ঠের রিনরিনে উচ্ছল হাসি ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে। বাহা ক্ষিপ্র হাতে পাতা তুলতে তুলতে কেবলই আশপাশের জঙ্গলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
কি যেন শোনার আশায় উৎকর্ণ হয়ে আছে।
ক্রমশ ভোরের নরম রোদ নববধূর মত কোমল মাধুর্য ভুলে গৃহিনীর মত কঠোর হয়ে উঠছে। তা ভালো।এইসব পাতা শুকাতে তো কড়া রোদই চাই। তারপর ভোরের শিশিরে ভিজিয়ে নরম করে কাঠি দিয়ে গেঁথে থালা বাটি গড়ে কারখানার মেশিনে মোল্ড করা হলে তবেতো বাজারে বেচা যাবে। মালিকের কাছে যেটুকু মজুরি পায় তাতেই কোনমতে খেয়ে পরে বাঁচে ওরা। পাতায় সামান্য সরসর শব্দ হতেই লাফ দিয়ে সরে গেল বাহা। একটা মোটা সোটা সাপ তরতর করে চলে গেল।অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরেকটু হলেই সাপের ঘাড়ে পা দিয়ে ফেলতো। তাড়াহুড়ো করবে নাতোকি? পুরো সময়টা তো সে থাকতে পারেনা। সবমেয়েদের সাথে বাহাও কপালে হাত ঠেকিয়ে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রনাম করে। খুব বাঁচা বেঁচে গেছে আজ। একেবারে গাঁয়ের কোল ঘেঁষা জঙ্গল। ভোরের আলো ফুটলে জন্তুরা একটু ছুটি নিয়েছে। এটুকুই ভরসা।
ঠুন ঠুন। এক বিশেষ সংকেতে বাজছে ছাগলের গলার ঘন্টি। বাহা দ্রুত পায়ে শব্দ লক্ষ্য করে পা চালালো। সঙ্গিনীরা হেসে গড়িয়ে পড়ল এ ওর গায়ে। বংশী বাহাকে দেখে হাসল। পাথরে কোঁদা কালো শরীর। কালোমেঘে বিজলী র মত সাদা দাঁতে ঝলমলে হাসিতে বাহার যেন নেশা লাগে। বংশী বলে---আয় তুর মাথায় ফুল পরায়ি দুঁব।
কোথা দিয়েসময় ছুটে চলে। কথা আর ফুরায় না। বাহার স্বপ্নে ভাসে ছোট মাটির ঘর। নিজের হাতে আঁকা আল্পনায় সাজানো।সে আর বংশী। বংশী শুধু মাঝে মাঝে মহাজনের ঘর থেকে চরাতে আনা ছাগলগুলোর দিকে খেয়াল রাখে।
ঘরের পথে দ্রুত পা চালায় বাহা। পথ আটকে মোড়লের ব্যাটা শ্যাম প্রসাদ।
বলে ----তুর বড় বাড় বেড়িছে। ইখনও সময় আছে।রাজি হইয়ে যা। তুর মাথায় সিঁদূর দুঁব। তুকে আমার মনে ধর্যেছে।
বাহা ধাক্কা দিয়ে শ্যামপ্রসাদ কে সরিয়ে দিয়েছুটতে থাকে। ---তুকে বিয়া করব নাই। বাহা গালি দেয়।
পিছন থেকে শ্যামপ্রসাদের হুংকার ভেসে আসে ----ইত্ত দিমাক। ঐ গতরভরা রূপ থাকবে নাই। জ্বলি খাক হইয়ে যাবে।
দুদিন পর বাহার বন্ধু অলাজ বলে---শ্যাম প্রসাদ মোরগা লিয়ে জানগুরুর ঘরে যায়। হোথাকে উয়ার কি কাম বটেক?
নিজের ঘরে বন্ধ বাহা।বাইরে গ্রামের লোকের পাহারা। জানগুরুর বিধানে কাল ডাইনি বাহাকে পুড়িয়ে মারা হবে। রাত গভীর। ঘুমে ঢুলছে পাহারাদারেরা। বাহা পাতলা মাটির দেওয়াল খুঁড়ে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এল বংশীর ঘরে। বংশী ঘুমোয়নি। দুচোখে জল।বাহা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল---চল পলাঞে যাই।
বংশীর দুচোখে আতঙ্ক আর ঘৃণা উপছে ওঠে।পায়ে পায়ে পিছোতে থাকে। ---আমারে ছাড়ানদে। ডাইন বিয়া করতে লারব।
দূরে কাদের চিৎকার ভেসে আসছে।
We hate spam as much as you do