Tranding

01:39 PM - 04 Feb 2026

Home / Entertainment / নজরুল তুমি কার - হিন্দুর না মুসলমানের ?

নজরুল তুমি কার - হিন্দুর না মুসলমানের ?

নজরুল ইসলামিক ভক্তি সঙ্গীতের পাশাপাশি ৫০০ টিরও বেশি আগমনী, ভজন, শ্যামা সঙ্গীত এবং কীর্তন গান লিখেছেন| তিনি ভগবান শিব, দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমের জন্য আমন্ত্রণের অনেক গানও রচনা করেছিলেন। নজরুলের কবিতা ও গান ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের দর্শনকে অন্বেষণ করেছে।

নজরুল তুমি কার - হিন্দুর না মুসলমানের ?

নজরুল তুমি কার - হিন্দুর না মুসলমানের ?

পারভেজুর  রহমান

২৬ মে ২০২৩

আজ ১১ই জৈষ্ঠ্য, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ। কাজী নজরুল ইসলামের ১২৪ তম জন্মদিবস। তাঁর জন্ম তারিখ বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১১ই জৈষ্ঠ্য, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ। যেমন ২৫শে বৈশাখ তারিখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিবস পালিত হয়, ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী নয়, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিবসও বঙ্গাব্দ অনুযায়ীই পালিত হয়। তার মৃত্যু হয় ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ তখন তার বয়স ৭৭ বছর।
নজরুল ইসলামের জীবদ্দশাতেও যেমন তার জন্মগত ধর্মীয় পরিচয়ের কারনে তাকে আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তেমনই তার মৃত্যুর ৪৬ বছর পরেও তার এই পরিচয়টাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসে তাকে একই আক্রমণের সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে।
২১ মে ২০২৩ রবিবার সন্ধ্যায় হেরিটেজ তকমা প্রাপ্ত নবদ্বীপের রানির ঘাট সংলগ্ন রাধারানি মন্দিরের নাট মন্দিরে স্থানীয় একটি স্কুল রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার আয়োজন করেছিল। সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবি নজরুলের ছবি লাগানো নিয়ে আপত্তি তোলে মন্দির কমিটি। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের জানানো হয় ভিন্ন ধর্মের কবির কোনও পোস্টার-ফেক্স মঞ্চে টাঙানো যাবে না। যেহেতু তিনি ভিন্ন ধর্মের মানুষ, তাই তাঁর ছবিতে মাল্যদানও  করা যাবে না।
এক শতাব্দী আগে যে কবির কলম থেকে বেরিয়েছে, 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মসুলমান', ‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’র মতো ভক্তিগীতি থেকে শ্যামাগীতি, তার নাম ইসলাম থাকায় তাকেও এই আক্রমণের সামনে পড়তে হল সেই নবদ্বীপে, যে নবদ্বীপের সোনার গৌরাঙ্গ মন্দিরে যেখানে মন্দিরে যখন ৬৪ মোহান্তের ভোগের আয়োজন হয়, সেখানে মহাপ্রভুর সঙ্গে যবন হরিদাসেরও একটি আসন থাকে।”
নজরুল ইসলামিক ভক্তি সঙ্গীতের পাশাপাশি ৫০০ টিরও বেশি আগমনী, ভজন, শ্যামা সঙ্গীত এবং কীর্তন গান লিখেছেন| তিনি ভগবান শিব, দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমের জন্য আমন্ত্রণের অনেক গানও রচনা করেছিলেন। নজরুলের কবিতা ও গান ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের দর্শনকে অন্বেষণ করেছে। নজরুলের কবিতা শক্তির আবেগ এবং সৃজনশীলতাকে আত্মসাৎ করেছে, যা, আদিম শক্তির মূর্ত রূপ ব্রহ্ম হিসেবে চিহ্নিত। 
নজরুল ইসলামের জীবনাদর্শের সমালোচনা করে শনিবারের চিঠি, ইসলাম দর্শন ও মোসলে দর্পণ প্রভৃতি পত্রিকায় যে সমস্ত নজরুল বিরোধী প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে সেই সময়, তার প্রত্যুত্তর হিসাবে 'আমার কৈফিয়ৎ' কবিতাটি 'বিজলী' পত্রিকায় ১৩৩২ বঙ্গাব্দে আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। (পরে কবিতাটি নজরুলের সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়।)  কবিতায় কবি যে কৈফিয়ৎ দিয়েছেন তা কেবল তাঁর সমালোচনার জবাব নয়, তা দেশ কাল সমাজের কাছে স্পষ্ট ও নির্ভীক ভাষায তার নিজের জীবন দর্শনের উপস্থাপনা| এর পাশাপাশি তৎকালীন সমাজ তাকে যেভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলো তার প্রতি খানিকটা অভিমানও ঝরে  পড়ে তার এই কবিতায়| 
সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস কবিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে জর্জরিত করে, সমালোচনা করে, অভিযোগ তুলে কবিতা প্রকাশ করতে লাগলেন| নজরুল জন্মগতভাবে মুসলমান কিন্তু মুসলিম হয়ে বিয়ে করেছিলেন এক হিন্দুর মেয়েকে। যার জন্য হিন্দুরাও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে । কবি সে কথা বলতে দ্বিধা করেননি—
“হিন্দুরা ভাবে, ফার্সি শব্দে
কবিতা লেখে ও পাত নেড়ে।”
জন্মগতভাবে কবি মুসলমান, তাই মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও কবির বিরুদ্ধে তিনি কাব্য কবিতায় হিন্দুর দেবদেবীর নাম উচ্চারণ করে থাকেন বলেও  নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। 
“দেব দেবীর নাম মুখে আনে 
সবে দাও পাজিটার জাতি মেরে।”
তারা সমাজ থেকে কবিকে জাতিচ্যুত করতে চেয়েছেন।
আবার নজরুলকে ভর করে বাঙালি সমাজে পা রাখার জন্য তাকে বিকৃত ভাবে ব্যাখ্যা করে ব্যবহার করার প্রচেষ্টাও করেছে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো | ২০১৭  সালে আর এস এস এর বাংলা শাখা কবির "কাজ এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ" সম্পর্কে দেশে সচেতনতা বাড়াতে নজরুল ইসলামের ২৫টি "দেশাত্মবোধক গান" হিন্দিতে অনুবাদ করে তাকে সারা দেশের মানুষের সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন| আরএসএস কাজী নজরুল ইসলামকে একজন "ভালো হিন্দু" হিসেবে ঘোষণা করেছে। আরএসএস-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সম্পাদক জিষ্ণু বসু বলেন: “হিন্দু হওয়া মানে কোনো ধর্ম পালন করা নয়, বরং জীবনযাপন করা। কাজী নসরুল ইসলাম পালন করতেন, তবুও তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ হিন্দু হিসেবে জীবনযাপন করেছিলেন এবং ভারতীয় নীতি ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।” তারা  ঘোষণা করে দেবী দুর্গা এবং দেবী কালী সম্পর্কে নজরুলের লেখাকে সবার সাথে পরিচয় করানো হবে| তাদের প্রভাতী শাখাতে নজরুলের কিছু গান গাওয়াও তারা শুরু করেন,এগুলি হল: হে পার্থসারথি, বাজাও পাঞ্চজন্য শঙ্খ (ভগবান কৃষ্ণের ভক্ত), তোমার হাতের রাখি খানি বান্ধো আমার দখিন হাতে (রাখি বন্ধন উদযাপন) এবং হে মা দনুজ-দলনী মহাশক্তি নমোহ (দেবী দুর্গার প্রশংসা)।
ঠিক একই ভাবে একাত্তরের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নজরুলকে ইসলামী কবি বানানোর চেষ্টা হয়েছিল। তথাকথিত "হিন্দু" শব্দগুলি "ইসলামী" শব্দগুলিতে পরিবর্তন করা হয়েছিল; শব্দ, বাক্যাংশ এবং স্তবক বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নজরুল ইসলামি কবি ছিলেন না। তাকে তা বানানোর চেষ্টাও বৃথা হয়েছিল|  তার সমাজতন্ত্রের কবিতায়, তিনি এমন একটি বিশ্বের কথা বলেছেন যেখানে সব ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে।  "সাম্যবাদী"-তে নজরুল চারটি প্রধান ধর্মকে গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ বা মুসলিম হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম মানবতার ধর্ম।
তার ধূমকেতু (ধূমকেতু) পত্রিকা এবং তার কিংবদন্তি কবিতা বিদ্রোহী (বিদ্রোহী) দিয়ে নজরুল একটি স্বৈরাচারী শাসন এবং এর ফলে আসা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। নজরুল হিন্দু এবং মুসলিম উভয় পক্ষের পাশে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। হিন্দু এবং ইসলাম উভয় গ্রন্থেই সুপণ্ডিত, নজরুল সংগঠিত ধর্মের গোঁড়া চর্চার জন্য একটি দৃশ্যমান ঘৃণা প্রদর্শন করেছিলেন এবং ঈশ্বরের সাথে তার সম্পর্ককে ব্যক্তিগত রাখার মতে বিশ্বাস করতেন।
নজরুলের লেখায় ছিল হিন্দু ও ইসলামিক ঐতিহ্যের সুন্দর সমন্বয়। তিনি ভজন এবং কীর্তন রচনা করেছিলেন এবং আধুনিক বাংলা কল্পনায় গজলের ধারণার প্রবর্তন করেছিলেন - ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে শিল্পের একটি স্পষ্ট উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। নজরুলের আইকনিক কবিতা "বিদ্রোহী" ইসলামিক বিদ্যার পাশাপাশি হিন্দু পুরাণ উভয়কেই ব্যবহার করে মানবজাতির প্রতি অমানবিকতা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তিনি "আনন্দময়ীর আগমনি" লিখেছিলেন, যেখানে তিনি দুর্গাকে ব্রিটিশ রাজকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন যেমন দুর্গা মহিষাশুরকে ধ্বংস করেছিলেন।
নজরুল তার একটি চিঠিতে বলেছেন: ‘আমি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যে বিশ্বাস করি। এই কারণেই আমি মুসলিম ভাষ্য ব্যবহার করি এবং প্রচলিত কুসংস্কারগুলিকে ভেঙে ফেলার জন্য হিন্দু দেবতাদের নাম উল্লেখ করি। এ জন্য কখনো কখনো আমার কবিতার গুণগত মান নষ্ট হয়| কিন্তু আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই তা করি।’ এই স্বীকারোক্তিটি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য নজরুলের তাগিদকে ব্যাপকভাবে প্রকাশ করে। তিনিই সম্ভবত একমাত্র কবি যিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় ঐতিহ্যকে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পেরেছেন। এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে কালীর ভক্তিমূলক কবিতা এবং ইসলামিক নাত (প্রশংসার স্তব)-এ ব্যবহৃত চিত্রগুলি একই রকম। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিখ্যাত কালী কীর্তনে নজরুল লিখেছেন:
“এসো, আমার কালো মেয়ের পায়ের নিচে আলোর নাচ দেখি। মায়ের সৌন্দর্য দেখে শিব তার বক্ষ নিবেদন করেন। তাঁর হাতেই আমাদের মৃত্যু ও জীবন"
নজরুল বিবাহ করেছিলেন হিন্দু প্রমিলা দেবীকে | ১৭ মে ১৯২৪ (৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১ ) তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকাতে খবর বের হয় - " হুগলী হইতে শ্রীমতী গিরিবালা সেনগুপ্তা পত্রান্তরে জানাইতেছেন,—গত ১২ই বৈশাখ শুক্রবার কলিকাতার ৬নং হাজি লেনের বাটীতে আমার কন্যা শ্রীমতী প্রমীলা সুন্দরী ওরফে আশালতা সেনগুপ্তার সহিত শ্ৰীমান কাজী নজরুল ইসলামের শুভ বিবাহ ইসলামানুসারে সুসম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। কন্যাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইতে হয় নাই। নজরুলের বন্ধুবর্গ ও দেশবিখ্যাত গুরুজনদিগের অনুরোধ— তাঁহারা এই নবদম্পতীর মঙ্গলের জন্য আশীর্ব্বাদ ও ভগবানের নিকট প্রার্থনা করুন। নজরুলের স্বাস্থ্য ভগ্ন হওয়ায় তিনি হুগলীতে বাস করিতেছেন।" 
নজরুল বাস্তব জীবনে সম্প্রীতির উদাহরণ স্থাপন করলেও এই আন্তঃধর্মীয় বিয়ের কারণে তিনি কলকাতায় থাকার জায়গা ভাড়া পান না এবং অবশেষে কৃষ্ণনগরে একটি ভাড়ার বাড়ী পান। তিনি তার ছেলেদের নাম রেখেছিলেন হিন্দু ও মুসলিম উভয় নাম দিয়ে, কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। 
 বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ এবং বন্দে মাতরমের মতো মৌলিক রচনাগুলি যখন বাংলায় সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছিল, তখন নজরুল পৃথিবীতে এসেছিলেন ঠিক যখন তার প্রয়োজন ছিল। তার প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল স্থানীয় মসজিদ সংলগ্ন মক্তবে| তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করেন তার পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য। তিনি তার চাচা বজলে করিমের ভ্রমণ থিয়েটার গ্রুপেরও অংশ ছিলেন, যা তাকে পুরাণ শাস্ত্র এবং সংস্কৃত ও বাংলার হিন্দু সাহিত্যিক গ্রন্থগুলির সাথে উন্মোচিত করে| নজরুলের শিক্ষক নজরুলের বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপ দেয়। অবশেষে, তিনি করাচিতে বেঙ্গল ডাবল কোম্পানিতে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য শিক্ষা ত্যাগ করেন। সেখানে তিনি ফার্সি শেখেন|এই সময়ে, তিনি বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীতে তাঁর ভূমিকা এবং একজন লেখক কীভাবে তাঁর সময়ের দ্বারা আকৃতি লাভ করেছিলেন তা উদ্ঘাটন করতে এবং বুঝতে শুরু করেছিলেন।
 এক প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন, “দাসদের কোনো ধর্ম নেই। যুবকদের অবশ্যই জীবনের লড়াইয়ে প্রথম স্থান দিতে হবে এবং ধর্মীয় আদেশ দ্বারা বাধা দেওয়া উচিত নয়”।
 শাক্তধর্ম (দেবী শক্তিকে কেন্দ্র করে হিন্দুধর্মের একটি রূপ) এবং ইসলামী নীতি উভয়ের মিশ্রনের  একজন প্রবক্তা, নজরুল একবার বলেছিলেন, "তোমার হৃদয় খুলে দাও - তোমার মধ্যেই সব ধর্মের বাস। সমস্ত নবী - আপনার হৃদয়. সার্বজনীন মন্দির... কেন তুমি বৃথা ঈশ্বরকে খোঁজো মৃত শাস্ত্রের কঙ্কালের মধ্যে, যখন সে হাসিমুখে তোমার অমর হৃদয়ে বাস করে।
যে সময় নজরুল জন্মগ্রহণ করেন, তখন এদেশে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা উপমহাদেশের চারপাশে গভীরভাবে প্রোথিত এবং লালিত ছিল। বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। তিনি যখন বড় হয়েছিলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিপর্যয় জাতিতে ঝড় তুলেছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আদর্শগত পার্থক্য জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করছিল। অধিকন্তু, তৎকালীন হিন্দুরা প্রায়ই রাজপুত ও মারাঠাদের অতীত বীরত্বের কথা উল্লেখ করত। তাদের বেশিরভাগই পছন্দ করেননি যেভাবে মুসলমানরা তাদের ধর্ম গ্রহণের জন্য মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অন্যদিকে, মুসলমানরাও মুঘল-পাঠানদের উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ববোধ করেছিল। তারা জমিদারি ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়নের জন্য হিন্দুদেরকেও দায়ী করে। এভাবে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম পরিবার থেকে আগত লেখক হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম সহজেই মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং তাদের অধিকারের জন্য লেখার ধারায় যোগ দিতে পারেন। কিন্তু তিনি সেই স্রোতধারা অনুসরণ করেননি, বরং তিনি শ্রেণী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য চিন্তা করেছেন। নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন যিনি অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত ওকালতি করেছিলেন। হিন্দু মুসলমানের মধ্যের এই পারস্পরিক অসম্মানই ছিল দেশের মানুষের স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ। বৃটিশ শাসকেরা হিন্দু অভিজাতদেরকে নিজেদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ঔপনিবেশিক শক্তির দিকে টানতে বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের মধ্যে ঘৃণার সংস্কার গড়ে তোলে। ইন্ডিয়া টুডেতে সাংবাদিক রজনী পাম দত্ত লিখেছেন যে একজন সিনিয়র ব্রিটিশ কর্মকর্তা তার কাছে স্বীকার করেছেন যে, "'ডিভাইড এট ইম্পেরা' ছিল রোমান নীতিবাক্য এবং এটি আমাদের হওয়া উচিত।" কাজী নজরুল ইসলামের মতো আর কেউ ছিলেন না যিনি এই সত্যটি বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করেছিলেন। যেমন তিনি লিখেছেন, “ভারত এখনও অন্যদের দ্বারা শাসিত হওয়ার একমাত্র কারণ এবং স্বাধীনতা আন্দোলন যথেষ্ট গতি পায় না তা হল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঈর্ষা ও অবজ্ঞা।আমরা মুসলমানরা হিন্দুদের কৃতিত্ব দেখে লোভী হয়ে যাই আর হিন্দুরা আমাদের উন্নতি দেখে আমাদের অপমান করে।" (নজরুল রচনাসম্ভার  , খন্ড-১)
“আমার কৈফিয়ত” কবিতার ছত্রে ছত্রে তিনি বুঝিয়েছেন যে, তিনি কোনো সম্প্রদায় বা জাতির কবি নন। তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজের কবি। হিন্দু-মুসলমান সকলেই তার ভাই। হিন্দু-মুসলিম কোনো ধর্মের আচার-আচরণের প্রতি তাঁর অনীহা নেই। তিনি মানবতাবাদী, উদার মানব ধর্মে ছিল তার বিশ্বাস। আর সেই জন্যেই দীপ্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন—হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগন তলের সীমাহারা মুক্তির মাঠে দাঁড়াইয়া—মানব তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি। বল দেখি, আমার মানুষ ধর্ম। দেখিবে দশদিকে সার্ব্বভৌমিক খাড়ার আকুল স্পন্দন কাঁপিয়া উঠিতেছে।” এই হল নজরুলের মানস ধর্ম।
 বর্তমান সময়ে যখন সমাজ টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তখন কবি, সাংবাদিক, সুরকার ও কমিউনিস্ট কর্মী কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অসাধারণ সাহিত্যিক প্রতিভা এবং একজন সত্যিকারের বিদ্রোহী বিদ্রোহের মাধ্যমে আত্ম-প্রকাশ এবং চিন্তার স্বাধীনতার জন্য তাঁর অনুসন্ধানে বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং একটি সমতাবাদী সমাজের গুরুত্ব সম্পর্কে নজরুল মানস ধর্ম প্রতিষ্ঠার যে মানস ধর্ম প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, তার প্রচার আজ অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Your Opinion

We hate spam as much as you do