এ সময়ই তিনি দেশবাসীকে একটি নতুন পদ্ধতি প্রদান করেন। এ সময় তাঁকে আর Hindu Chauvinist-রূপে আমরা পাইনি। এ সময়ে তিনি ভারতের গণসমূহকে জাগিয়ে হিন্দু-মুসলমান ও ব্রাহ্মণ-শূদ্রকে এক কৃষ্টির ভিতর এনে একটা নতুন জাতিতে পরিণত করবার কথা বলেছিলেন। এ জন্যই তিনি বলেছিলেন ,- “বেরুক ভূনুরির দোকান থেকে,চাষার লাঙলের ফলা থেকে নূতন সভ্যতা।” যাঁরা পাশ্চাত্যের সাম্যবাদী ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত আছেন তারাঁই জানেন যে, একে ‘প্রোলেটারিয়ান্ কালচার্’ বলা হয়। এটি ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া-কৃষ্টি হতে পৃথক
আজকের সময়ে বিবেকানন্দকে নতুন করে চিনতে হবে
পৃথিবীর ইতিহাসে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ইউরোপের বাইরে আর একমাত্র ভারতের বাংলাদেশে হয়েছিল। তার সেই সময়কালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের সেই নবজাগরণের কালে জাতীয় জীবনে রাজা রামমােহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ মনীষীগণ এক যুক্তিনিষ্ঠ মুক্ত বুদ্ধির চেতনা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাদের মানবতাবাদী ধর্মচেতনা সর্বত্রগামী হয়নি। কারন এটাই গোটা সমাজের সামন্ততান্ত্রিক চিন্তন। সমাজের উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্ন শিক্ষিত মহলেই তা আলােড়ন তুলেছিল—এনেছিল নবজাগরণের জোয়ার। সমাজের নিম্নস্তরের জীবন ছিল একই জায়গায় আবদ্ধ। এই ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হয় ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে। যুক্তিবাদী একেশ্বরবাদের বিশ্বজনীনতা নয়, আচার সর্বস্ব, জাত-পাতের ভেদাভেদে জীর্ণ পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের বৈদান্তিক রূপকে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরলেন। আমেরিকার চিকাগােয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে (১৮৯৩) হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে নিজ পরিচয় দিতে উঠে বলেছিলেন, “যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমত সহিষ্ণুতা ও সর্ববিধ মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকে সহ্য করি না, সকল ধর্মকেই স্বীকার করি।” হিন্দু ধর্মের আপামর জনসাধারণ ও ধর্মপ্রবক্তাদের মতামত যাই হােক না কেন স্বামী বিবেকানন্দের হৃদয়ের এই আন্তরিক প্রকাশ সন্দেহাতীত। বর্তমান সময়ে ভারতে এই ভাবধারা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অবশ্য ধর্ম যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে যায় তখন নিশ্চিতরূপে কাউকে পরাজিত করার প্রশ্ন থেকে যায়। তাই সেক্ষেত্রে বিভেদ জরুরী। স্বামী বিবেকানন্দকে কে কতভাবে ব্যবহার করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু কদিন আগে হরিদ্বারের হিন্দু ধর্মসভায় যেভাবে চরম আগ্রাসী বিতর্কিত ভাষন শোনা গেছে এবং সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্য উত্তরপ্রদেশের প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কোনো নিন্দাসুচক মন্তব্য করতে শোনা যায় নি।
সভ্যতা এগিয়েছে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু ধর্ম দিয়ে বিভেদ গড়া বেড়েছে বই কমেনি। বিদ্বেষের ভাষা বরং আরও বীভৎস হয়েছে। তাই এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দের বাণী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
শিকাগোর ধর্ম সম্মেলনে দাঁড়িয়ে ১২৮ বছর আগে যা কিছু বলেছিলেন বিবেকানন্দ, তার কতটুকু আজ সত্যি? ‘হিন্দু’ নামের দর্শনকে রোজকার জীবনে একটু একটু করে সংকীর্ণ করে তুলতে তুলতে কোথায় আনা হচ্ছে তাই বিচার্য।
তার ভাইপো ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত মার্কসবাদী দৃষ্টিতে তাকে বিচার করেছিলেন। নিঃসন্দেহে স্বামীজীর বহু বক্তব্য আজ সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় শোষনের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য জাতপাত ও উচ্চশ্রেণীর লোকেরা শ্রমজীবী জনগনকে শোষণ করে এসেছেন স্বামীজি তাদের কাজ এবং চিন্তাধারাকে চিহ্নিত করে তীব্র নিন্দা করেছেন। মাত্র ৩৯ বছরের মধ্যে একজন সাধকের চিন্তা কতদুর পর্যন্ত বিস্তারিত হতে পারে তা গবেষনার বিষয়। এই শোষনই দেশের পশ্চাদপদতার মূল কারন
উচ্চ থেকে নীচ সমস্ত ভারতবাসীই এখন বিদেশী শাসকের দাসে পরিণত। ভারতীয় সমাজের এই দুরবস্থা এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সর্বহারাদের অধঃপতিত দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ‘তবুও এমন একদিন আসবে যেদিন শূদ্রত্ব বিয়েই শুদ্রশ্রেণীর জাগরন হবে… তারা প্রত্যেক সমাজেই পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ করবে।’ ….
ভারতীয় জনগণের কানের কাছে সব সময়েইএই কথা বলা হয়ে থাকে যে, ভারতবর্ষ একটা আধ্যাত্মিক দেশ এবং আদিযুগ থেকেই ‘অহিংসা’ মন্ত্রে সে দীক্ষিত। কিন্তু রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শোষণের বেলায় এই অহিংসা কোথায়? বর্তমান ভারতীয় সমাজে আধ্যাত্মিকতাই বা কোথায় সে সম্পর্কে স্বামীজি বলেছেন, “তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না যে সত্ত্বগুণের ধুয়া তুলে দেশ ধীরে ধীরে তমোগুণ বা অজ্ঞতার সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে।”
ভূপেন্দ্রনাথ তার বইতে লিখছেন --------
" তাঁর জীবনের এই শেষ সময়েই প্যারিসে রুশ বৈপ্লবিক ও অনার্কিস্ট-কমুনিস্ট নেতা পিটার ক্রপ্টকিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।স্বামিজীর আমেরিকান ও ইংরেজ শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই ক্রপটকিনের বন্ধু ছিলেন । তাঁরাই এ সাক্ষাতের যোগাযোগ করে দেন। আমি এ দলের একজন আমেরিকান শিষ্যের নিকট শুনেছি যে, ক্রপটকিন ও স্বামিজী উভয়ে নিভৃতে বারো ঘণ্টাকাল আলোচনা করেন। এ দীর্ঘ আলোচনার বস্তু কী ছিল তা আমরা জানি না। অবশ্য এটা যেন কেউ মনে না করেন যে, স্বামিজী ক্রপটকিনের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন, কারণ ভগ্নী ক্রিস্টিন আমায় বলেছিলেন যে স্বামিজী শেষকালের জন্য নিউ ইয়র্ক ছাড়বার আগেই জগতের কোথায় সর্বপ্রথম “প্রলেটারিয়ান্” স্টেট স্থাপিত হবে সে বিষয়ে চিন্তা করতেন।
ক্রিস্টিন আমায় বলেন -“স্বামিজী ঘরে পাইচারী করছিলেন এবং বলছিলেন,- ‘জগতে প্রথমে ব্রাহ্মণের (পুরোহিত) রাজ্য ও সর্বশেষে আসবে শূদ্রের (শ্রমজীবীর) রাজ্য।’ কিন্তু কোথায় সর্বপ্রথমে এ রাজ্য কায়েম হবে, তা আমি এখনও নির্দ্ধারণ করতে পারিনি।” তিনি বলেছিলেন- Either Russia or China will be the first proletariat state in the world; কারণ উভয় দেশেই কৃষক শ্রেণী দুর্দশাগ্রস্ত ও অধঃপতিত। (রোঁম্যা রোলাঁ প্রণীত -The Life of Vivekananda and the Universal Gospel,পৃ.১৭৪ দ্রষ্টব্য)
এ সময়ই তিনি দেশবাসীকে একটি নতুন পদ্ধতি প্রদান করেন। এ সময় তাঁকে আর Hindu Chauvinist-রূপে আমরা পাইনি। এ সময়ে তিনি ভারতের গণসমূহকে জাগিয়ে হিন্দু-মুসলমান ও ব্রাহ্মণ-শূদ্রকে এক কৃষ্টির ভিতর এনে একটা নতুন জাতিতে পরিণত করবার কথা বলেছিলেন। এ জন্যই তিনি বলেছিলেন ,- “বেরুক ভূনুরির দোকান থেকে,চাষার লাঙলের ফলা থেকে নূতন সভ্যতা।” যাঁরা পাশ্চাত্যের সাম্যবাদী ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত আছেন তারাঁই জানেন যে, একে ‘প্রোলেটারিয়ান্ কালচার্’ বলা হয়। এটি ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া-কৃষ্টি হতে পৃথক। এই প্রোলেটারিয়ান্ কালচার্ কে এদেশে উদ্ভূত করবার জন্যই তিনি এ দেশে বনিয়াদী স্বার্থের(Vested Interest) দলকে বলেছিলেন- “অতীতের কঙ্কালচয় শুন্যে বিলীন হও…তোমরা বিলীন হলে তোমরা বিলীন হলে ভারতে নূতন সভ্যতার উদয় হবে।”
আজ যারা প্রকৃত স্বামীজীকে জানতে চান তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই বিচার করতে হবে। দেশের সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ভাষন দিয়েছেন। তিনি আজকের যুবদিবসে যুবকদের দেশগঠনের কাজে নিয়োজিত হতে বলেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের কথা বলেছেন, কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় দেশের জলন্ত প্রশ্ন হরিদ্বারের ধর্ম সংসদের বক্তব্যের তার মত বলেন নি।
We hate spam as much as you do