মগজাস্ত্রের মালিক আদপে সকলেই, তা শুধু ব্যবহারের অপেক্ষা, সঠিক সময়ের অপেক্ষা। এখন মনে হয় সেইটে প্রতিষ্ঠা করতেই এই এত গল্প ফাঁদা হয়েছে - যাকে সৌমিত্রর নিজের বয়ান বলতে কোথাও দ্বিধা নেই। শ্রেনী, বর্ণ, রিফিউজির দেশ-কাল পেরিয়ে ইন্টেলেক্টের আধিপত্য যে কেবল একচেটিয়া ‘শিক্ষিত বড়লোকের’ সম্পত্তি নয়, সেইটে বলাই যেন মূল উদ্দ্যেশ্য।
পর্দায় ফেলুদার চরিত্রে আত্মপ্রকাশ, অভিনেতা হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একা নয়। কিন্তু বাঙালি, কোনো বিশেষ কারনে তাঁকে ছাড়া ফেলুদা হিসেবে কাউকেই সেভাবে গ্রহন করেছে কিনা, সে এই প্রশ্ন জটিল। তবে সৌমিত্র যে স্বাচ্ছন্দে চরিত্রটিকে নিজের জীবনের কাছাকাছি টেনে এনেছিলেন, তা বিরল।
অভিনেতার কাজ গল্পকার এবং পরিচালকের ভাবনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু অভিনেতা নিজেই যখন গল্পকার? তাও সেই ঘরানার গল্প যেখানে অভিনেতা হিসেবে তার সাবলীল বিচরণ? সৌমিত্র ছিলেন সেরকমই একজন। মগজাস্ত্রকে হাতিয়ার করে সত্যজিৎ রায় তৈরী করেছিলেন ফেলুদাকে। হয়তো তার হাত ধরেই সৌমিত্র গড়েন রোহিতাশ্ব সেনের চরিত্র। প্রায় এক দশক আগের থ্রিলার টেলিফিল্ম ‘টিকটিকি’ যারা দেখেছেন তাদের কাছে এই গোয়েন্দার নাম অপরিচিত নয়। ‘টিকটিকি’ গল্পের লেখক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গল্পের নাট্যরূপ তিনি নিজেই দিয়েছেন, ছবি পরিচালনা করেছেন রাজা দাশগুপ্ত। গোয়েন্দার ক্ষুরধার চোখে স্ক্রিপ্ট পড়ার পাঠ সৌমিত্র নিয়েছিলেন অভিনয় শেখার শুরুর দিকে। তাই গোয়েন্দার মগজকেও আত্বস্থ করা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল না।
‘টিকটিকি’ ছবিতে স্বয়ং সৌমিত্র অভিনয় করেছেন একজন গোয়েন্দা গল্পকারের ভূমিকায়। পর্দায় গোয়েন্দার চরিত্র থেকে গোয়েন্দা-গল্পকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার এই জার্নি নিঃসন্দেহে বাঙালি অভিনেতাদের মধ্যে দুর্লভ। কিন্তু এই গল্পে আসলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, গোয়েন্দা এবং গোয়েন্দা গল্প সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত অভিমত কী।
ছবিতে সৌমিত্র একজন অভিজাত, শিক্ষিত লেখক, নাম সত্যসিন্ধু চৌধুরী। ক্রাইমের সমস্ত অলিগলি তার নখদর্পনে। বাড়ি জুড়ে বিভিন্নরকম ব্লকিং গেম, যা খেলতে হলে খরচ করতে হয় মস্তিস্ক। তারই কলমে আঁকা গোয়েন্দা চরিত্র, অর্থাৎ রোহিতাশ্ব সেনের, অপরাধী খুঁজে বের করতে কেবল বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট। মারপিট তার কাছে খেলো বিষয়। এবং অবশ্যই সেসব গল্পের পুলিশ বিশেষভাবে অপটু। লেখক সত্যসিন্ধু মনে করেন গোয়েন্দা গল্প পড়তে, বুঝতে এবং সল্ভ করতে পাঠককে হতে হবে ‘ইন্টেলেকচুয়ালি আরিস্ট্রকেট’। গল্পে থাকতে হবে ক্রাসিকাল টাচ। তথাকথিত ‘ভদ্র ও শিক্ষিত শ্রেণী’ না থাকলে গোয়েন্দা কাহিনী লেখা যায় না। তা মহৎ মানুষের মনের খোরাক। ফিলিপ গেদেলার ভাষায় যা ‘ডিটেক্টিভ স্টোরি ইজ দ্যা নর্মাল রিক্রিয়েশন অব নোবেল মাইন্ডস’। অন্যদিকে, কাহিনী ফাঁদতে গোয়েন্দা গল্পের লেখককেও হতে হবে একজন ধুরন্ধার গোয়েন্দা।
গল্পের দ্বিতীয় চরিত্রের নাম বিমল নন্দী, অভিনয় করেছেন কৌশিক সেন। গল্পে বিমলের অবস্থান এই অভিজাত লেখকের থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে অনেকটা দুরত্বে। উপরন্তু সে রিফিউজি! ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে একে যে কোনো উপায়ে ক্রাইমের ফাঁদে ফেলে নাস্তানাবুদ করা সত্যসিন্ধুর উদ্দ্যেশ্য। বারবার বিমলকে মনে করিয়ে দেওয়া যে স্বল্পবুদ্ধি ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা তাকে কোনো দিনই লেখকদের আরিস্ট্রকেট সমাজের আসে-পাশে ঘেঁষতে দেবে না। সৌমিত্র প্রথমাংশে সর্বতো ভাবে প্রতিষ্ঠা করে দেন যে, গোয়েন্দার প্রখর বুদ্ধির সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা বিমলের মতো সাধারণ মানুষের নেই। প্রশ্ন আসে সৌমিত্র কি তাহলে নিজেও সেই কথাই মনে করেন? সত্যসিন্ধুর বয়ানে ঘুরপথে নিজের সেই কথাই প্রচার করেন?
উত্তর পাওয়া যাবে দ্বিতীয়ার্ধে। যে ধাপ বেয়ে বেয়ে এতক্ষন দর্শক মননে সৌমিত্র প্রায় প্রতিষ্ঠা করে দেন, গোয়েন্দার ইন্টেলেক্টের ধারেকাছে যাওয়া সাধারনের কম্ম নয়, এখন সেই ধাপ একে একে ওলটপালট করে দেওয়ার সময়। বিমল এই পর্বে সরাসরি আঘাত করে ক্রাইমের মাস্টারমাইন্ডকে। প্রমান করে রোহিতাশ্ব সেন বা তাদের স্রষ্টার মগজ কাফি নয়। পরাজয় শিকার করে সমানে-সমানে লড়তে, কদর করতে হয় গল্পকারকেও। ক্রিমিনাল ও ডিটেক্টিভের ভিন্নমূখী অবস্থান ফিকে হয়ে যায়।
মগজাস্ত্রের মালিক আদপে সকলেই, তা শুধু ব্যবহারের অপেক্ষা, সঠিক সময়ের অপেক্ষা। এখন মনে হয় সেইটে প্রতিষ্ঠা করতেই এই এত গল্প ফাঁদা হয়েছে - যাকে সৌমিত্রর নিজের বয়ান বলতে কোথাও দ্বিধা নেই। শ্রেনী, বর্ণ, রিফিউজির দেশ-কাল পেরিয়ে ইন্টেলেক্টের আধিপত্য যে কেবল একচেটিয়া ‘শিক্ষিত বড়লোকের’ সম্পত্তি নয়, সেইটে বলাই যেন মূল উদ্দ্যেশ্য। সত্যসিন্ধু শুরুর দিকে বলেছিলেন এদেশে ডিটেক্টিভ গল্প চর্চা তেমনটা জোরদার নয়। ইংল্যান্ডে ক্যাবিনেট মিনিস্টারদের নিয়মিত থ্রিলার চর্চা করার হেরিটেজ রয়েছে। ‘এলিমেন্টারি ওয়াটসন’ বললেই কারোর বুঝতে অসুবিধে হয় না কার বয়ান। এখন তা ভাঙার সময়। এদেশে গঙ্গা ধারের এক ছোট্ট শহরতলীতে ‘গোয়েন্দার’ শাণিত ক্যারিশমা অতি সাধারনের মেধার কাছাকাছি সহজে স্থান করে নেয়। প্রচলিত ব্যবধানের ট্র্যাডিশন ভেঙে দেয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন ধরে যে আদর্শকে লালন করেছেন, ‘টিকটিকি’ যেন তারই প্রতিনিধিত্ব করে।
গল্পের শেষে সত্যসিন্ধুর বিচিত্র যবনিকা পতন হয়। গোয়েন্দা কাহিনীর বাইরে বাস্তবের পুলিশও অপটু কিনা, জানার সুযোগ হয়ত তার ঘটে। দর্শক জানতে পারে না।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের যবনিকা পতন আকস্মিক নয়। অভিনেতা গতবছর ছেড়ে চলে গিয়েছেন আমাদের। এ ক্ষতি পূরণের নয়। তবে এই বিরতিটুকুতে সৌমিত্রর গদ্যগ্রন্থনা আমাদের সম্রদ্ধ করুক।
We hate spam as much as you do