তাই কাজের মাসী 'কাত্তিকের মা’, পেপারওয়ালা ‘তারক’ বা দুধওয়ালা সুশান্তের জন্য ভ্যাক্সিনের স্লট বুকিংটা আপনি নিজেই করে দিয়েছেন। 'কাত্তিকের মা’, তারক, সুশান্তরা হল আমাদের সমাজ। এদের সকলের স্বাস্থ্য একসাথে ভাল না থাকলে আপনি এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে না।
ভ্যাক্সিন কেলেঙ্কারি ও দেশের স্বাস্থ্য - (একটি লেখা )
জিডিপির মাত্র ১.৩% স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যয় করে সরকার চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যক্তিগত ভাবে বুঝে নিন, এসব ষ্টেটের দায়িত্ব নয়। আমরা যারা মধ্যবিত্ত, বেসরকারী স্বাস্থ্য বিমা কিনতে পারি তাদের কাছে ব্যাপার টা গা সওয়া হয়ে উঠছিল। ঝাঁ চক চকে বেসরকারী হাসপাতালে কুড়িয়ে কাচিয়ে, জোড়া তাপ্পিতে নিজেদের চিকিৎসা আমরা নিজে রাই বুঝে নিচ্ছিলাম। অনেক বাজে কিছুর মধ্যে করোনা অতিমারি আমাদের একটা ধাক্কা দিয়েছে, মধ্যবিত্তরা বুঝেছে নিজেদের পরিবারের স্বাস্থ্যের বাইরে ও নিজেদের পরিবার কে ঘিরে থাকা বাকি মানুষ গুলির স্বাস্থ্য নিয়ে ও আমাদের ভাবতে হবে। তাই কাজের মাসী 'কাত্তিকের মা’, পেপারওয়ালা ‘তারক’ বা দুধওয়ালা সুশান্তের জন্য ভ্যাক্সিনের স্লট বুকিংটা আপনি নিজেই করে দিয়েছেন। 'কাত্তিকের মা’, তারক, সুশান্তরা হল আমাদের সমাজ। এদের সকলের স্বাস্থ্য একসাথে ভাল না থাকলে আপনি এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে না। এই কালেক্টিভ স্বাস্থ্যের কথা সরকার নিমরাজি হয়ে কিছু টা ভেবেছে, এবং সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেবার কথা অন্তত খাতায় কলমে বলছে।
১৪০ কোটি মানুষের জন্য রাতারাতি ভ্যাক্সিন তৈরি করা তো এই সরকারের কাছে মুখের কথা নয়। কারণ এই সরকার প্রথম দিন থেকেই শিল্পপতিদের দালালি করে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে ভারতে প্রচলিত কোভ্যাক্সিন ও কভিশিল্ড নামের দুটি ভ্যাক্সিনের ফরমুলা ভারত বায়োটেক ও সেরামের থেকে নিয়ে অন্য ওষুধের কোম্পানিকে দিয়ে একসাথে, অনেক দ্রুত, অনেক বেশী পরিমাণে ভ্যাক্সিন বানাতে পারত। ভারত সরকার তা করেনি, করবে ও না কারণ এই সরকার এই ঔষধ কোম্পানি গুলির পুঁজির দাসে পরিণত হয়েছে। কোভিড এর ফলে যেখানে সারা দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, কয়েক কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন, সেখানে দ্রুত ভ্যাক্সিনেশন এই মুহূর্তে একমাত্র সমাধান। যদি ভারত বায়োটেক ও সেরাম দ্রুত ভ্যাক্সিন না বানাতে পারে তবে এই দুই কোম্পানি কে প্রতি ডোজ প্রতি রয়ালটি দিয়ে কেন ভ্যাক্সিন উৎপাদন ডিস্ট্রিবিউট করা হবে না? এই কঠিন সময়ে যুদ্ধ কালীন তৎপরতায় প্রয়োজনে সৈন্য দের ভ্যাক্সিন বানানোর কাজে লাগান হোক। সরকার পোলিওর মত ঘরে ঘরে গিয়ে ভ্যাক্সিন দিক। ইনজেকশন দেওয়ার লোক কম পড়লে শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারী কর্মচারীদের ট্রেনিং দিয়ে কাজে লাগানো হোক।
এই সব কিছুই হয়নি। রাজ্যসহ সারা দেশে সরকারী ভ্যাক্সিন কেন্দ্র গুলিতে ভ্যাক্সিনের হাহাকার। অপর্যাপ্ত ভ্যাক্সিনের জন্য ভ্যাক্সিন সেন্টার গুলি নিত্য নতুন নিয়ম চালু করে চলছে। রাত তিনটে থেকে লাইন দিয়ে ও বহু মানুষ ভ্যাক্সিন পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি কাজে লাগাচ্ছেন দেবাঞ্জন দেবের মতো ভুয়ো আই এ এস অফিসাররা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়মে কোন জিনিসের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হলে দুটি জিনিস হয়। এক: জিনিসটির দাম বাড়তে থাকে, এক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয় কারণ ভারত সরকার সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দিচ্ছে এবং বেসারকারি ভ্যাক্সিন কেন্দ্র দাম বেঁধে দিয়েছে। দুই: জিনিসটির নকল করা শুরু হয়। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি ঘটেছে এবং সরকারের গাফিলতির সুযোগ নিয়েছেন দেবাঞ্জন। নিজেকে কলকাতা পুরসভার জয়েন্ট সেক্রেটারি পরিচয় দিয়ে সিটি কলেজ এবং কসবা তে দুটি জাল ভ্যাক্সিন ক্যাম্প করেন দেবাঞ্জন, যেখানে শতাধিক মানুষকে এই নকল ভ্যাক্সিন প্রদান করা হয়। করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে দ্রুত ভ্যাকসিনেশন জরুরি। আর ভ্যাকসিনেশনের মতো জনস্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবনের প্রশ্ন জড়িত, তা নিয়েই ভয়ঙ্কর প্রতারণায় অভিযুক্ত এই দেবাঞ্জন দেব। দেবাঞ্জনের কীর্তি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। দেবাঞ্জনের সাথে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, তৃনমূলের রাজ্যসভার মেম্বার ও কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলার শান্তনু সেন, মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তৃনমূল বিধায়ক লাভলি মৈত্রর একাধিক ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কলকাতা পুরসভার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই বড় নেতা নেত্রীদের সাথে মঞ্চ শেয়ার করতে দেখা যায় দেবাঞ্জন দেবকে। সারদা, রোজভ্যালি, প্রয়াগ ইত্যাদি চিটফান্ডের কেলেঙ্কারি নিয়ে যখন হইচই শুরু হয়, একাধিক মন্ত্রী, নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চিটফান্ড কর্তাদের সঙ্গে ছবি প্রকাশ হতে থাকে। সেই সময় শুধু ছবিই প্রকাশ হয়নি, সংশ্লিষ্ট চিটফান্ড সংস্থায় টাকা রাখার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য বক্তব্যও রেখেছেন তৃনমূল নেতাদের একাংশ। তবু তাঁদের নাকি জানাই ছিল না এটা কোনও বেআইনি চিটফান্ড সংস্থা। সুদীপ্ত সেন বা গৌতম কুন্ডুদের তাঁরা চিনতেনও না, এমনই ছিল তাঁদের বক্তব্য। সেই ঘটনার রেওয়াজ একইভাবে ঘটে চলেছে ভুয়ো ভ্যাক্সিন কেলেঙ্কারিতে। তবে দেবাঞ্জন দেবের প্রতারণার বৈচিত্র্য চিট ফান্ডের কেলেঙ্কারিকে ও হার মানায়। কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা যায় দেবাঞ্জন গাড়িতে নীল বাতি ও বিশ্ব বাংলার লোগো লাগাতেন, নিজেকে পুরসভার যুগ্ম কমিশনার পরিচয় দিতেন, নবান্নের জাল লেটারহেডে ব্যক্তিগত রক্ষী নিয়োগ করেছিলেন, বিভিন্ন ধরনের নথি জালিয়াতি করেছিলেন, পুরসভার অফিসারের সই জাল করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলেন, পুরসভার নথি জাল করে বাগড়ি থেকে ওষুধ ক্রয় করেন, শিয়ালদহ থেকে কোভিশিল্ড, স্পুটনিকের জাল লেবেল ছাপান, বিভিন্ন জায়গায় সরকারি ব্যানার টাঙিয়ে ভুয়ো টিকাকরণ শিবির করেন, টিকা দেওয়ার নামে একটি সংস্থা থেকে ১.১১ লক্ষ টাকা হাতান, স্টেডিয়ামের বরাত দেওয়ার নামে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ৩৬ লক্ষ টাকা নেন, টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার আশায় বেহালার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নেন।
দেবাঞ্জন দেব কোন সাধারণ মানুষ নন, সাধারণ মানুষ একজন মেয়র বা রাজ্যসভার মেম্বারের সাথে ঘুরে বেড়াতে পারে না বা কোন সরকারী মূর্তির ফলকে মেয়রের সাথে নিজের নাম শেয়ার করতে পারেন না বা থানা থেকে কয়েকশ মিটার দূরে নকল ভ্যাক্সিন ক্যাম্প আয়োজন করতে পারেন না। রাজ্য সরকারের প্রছন্ন মদতে যে ভাবে সুদীপ্ত সেন বা গৌতম কুন্ডুরা সাধারণ মানুষ কে প্রতারিত করে তাদের জালিয়াতির ব্যাবসা দিনের পর দিন চালিয়ে গেছেন। সেই একই পথের যাত্রী হলেন দেবাঞ্জন। কেন্দ্রীয় সরকারের অপ্রতুল ভ্যাক্সিন জোগানের সুযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের মদত পুষ্ট নকল আই এ এস দেবাঞ্জন দেব এই যুদ্ধসম হেলথ ইমারজেন্সিতে সাধারণ মানুষদের চূড়ান্ত প্রতারণা করেছেন।
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
We hate spam as much as you do