Tranding

12:36 PM - 04 Feb 2026

Home / Article / বঙ্গাব্দ- উৎপত্তি- মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব

বঙ্গাব্দ- উৎপত্তি- মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব

এই যে সন বা সাল শব্দটি আমরা ব্যবহার করি, এই শব্দযুগলের ব্যবহার ও হিন্দু- মুসলমানের যৌথ সাধনার একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ।সন শব্দটি এসেছে আরবী থেকে আর সাল শব্দটির উৎপত্তি ফার্সী থেকে। হিন্দু- মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি বাংলার সামাজিক পরিবেশ কে যুগ যুগ ধরে কিভাবে ঋদ্ধ করেছে এই শব্দদুটির উৎপত্তি এবং বহুল প্রচলনের ভিতর দিয়েই তা পরিস্কার হয়ে যায়।

বঙ্গাব্দ- উৎপত্তি- মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব

বঙ্গাব্দ- উৎপত্তি- মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব


বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঠিক কবে থেকে , এ নিয়ে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কিছু বলা যায় না।ঐতিহাসিকদের ভিতরে বঙ্গাব্দের প্রচলন ঘিরে সাধারণ ভাবে দুটি মত আছে।একাংশের ইতিহাসবিদেরা মনে করেন; শশাঙ্কের রাজত্বকালে বঙ্গাব্দের প্রথম প্রচলন হন।ইতিহাসবিদেরা আনুমানিক ভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে শশাঙ্ক রাজত্ব করেছিলেন বলে মনে করেন।সপ্তম শতাব্দীতে শশাঙ্কের এই শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভারতে এখন ভৌগলিক এবং রাজনৈতিক ভাবে বিহার অঞ্চলটি শশাকের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।জুলীয় বর্ষপঞ্জীর ১৮ ই মার্চ ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এই ' বঙ্গাব্দে' র সূচনা বলে একাংশের ইতিহাসবিদদের ধারণা। এইদিনটি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে মার্চ।
                      অনেকের অনুমান মুসলমান শাসকদের সময় যে হিজরি পঞ্জিকার প্রচলন ছিল তারফলে নিত্যনৈমিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সমস্যা র সৃষ্টি হতো ।কারন, চান্দ্র মাস কে ভিত্তি করে এই হিজরি পঞ্জিকা পরিচালিত হয়( এখানে বলা দরকার যে, ভারতের উত্তরপ্রদেশ বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দি ভাষী যে হিন্দুরা আছেন, তাঁদের ভিতরেও এই চান্দ্রমাস অনুসরণে পঞ্জিকা ব্যবহারের রীতি আছে)। সৌর বছরের তুলনায় চান্দ্র বছর সাধারণত এগারো থেকে বারো দিন কম হয়।সৌরবছর হল ৩৬৫ দিনের।আর চান্দ্র বছর হল ৩৫৪ দিনের। তাই চান্দ্র বছর কে নির্ভর করলে ঋতু পরিবর্তনের সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা তৈরি হয়। আর বাংলা তথা ভারতের অর্থনীতি সেই সময়ে ছিল পুরোপুরিই কৃষি নির্ভর।
                      মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে যে হিজরি পঞ্জিকার প্রচলন ছিল , সেটিকে অর্থাৎ , চান্দ্র পঞ্জিকা কে রূপান্তরিত করা হয় সৌর পঞ্জিকাতে।সম্রাট আকবর সেই সময়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন  জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজি কে চান্দ্র বর্ষপজ্ঞি কে সৌর বর্ষপজ্ঞি তে রূপান্তরিত করবার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ।শিরাজি সুদূর ইরান থেকে সম্রাট আকবরের রাজসভা অলঙ্কৃত করতে এসেছিলেন। শিরাজি সুপারিশ করেন; পারস্য দেশে যে ফার্সি বর্ষপজ্ঞির প্রচলন রয়েছে, সেই বর্ষপজ্ঞির অনুসরণে   হিজরি চান্দ্র বর্ষপজ্ঞি কে সৌর বর্ষপজ্ঞির প্রচলন করতে।সম্রাট আকবর শিরাজির সুপারিশ কিছুটা পরিবর্তিত আকারে মেনে নেন। সম্রাট সেই সময় থেকে উনত্রিশ বছর আগে , যখন তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন, সেই সময়কালটিকেই , সেই ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দটিকে হিজরি সৌর বর্ষপজ্ঞি  হিশেবে প্রচলন করেন। এই কারন থেকেই হিজরি ৯৬৩  থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। সেই বছর পবিত্র মুহররমের মাস ছিল বৈশাখ। এখান থেকেই বাংলা বর্ষপজ্ঞির প্রথম মাস হিশেবে বৈশাখ কে ধরা হয়। আর নববর্ষ হিশেবে ধরা হয় পহেলা বৈশাখকে।তবে বঙ্গাব্দ ঘিরে ইসলামীয় প্রভাবের সাথে সাথে অনেকেই বৌদ্ধ প্রভাবের একটা ভাবনার কথাও বলে থাকেন।মধ্যকালীন ভারতে বহুত্ববাদী ভাবধারার চর্চার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিশেবে এই বঙ্গাব্দের সূচনা কাল , বাংলা নববর্ষ ঘিরে অনুপুঙ্খ আলোচনা বাঙালির চিরকালীন ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চরিত্রচিত্রণের একটি দিকদর্শী ধারা হিশেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
              এই যে সন বা সাল শব্দটি আমরা ব্যবহার করি, এই শব্দযুগলের ব্যবহার ও হিন্দু- মুসলমানের যৌথ সাধনার একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ।সন শব্দটি এসেছে আরবী থেকে আর সাল শব্দটির উৎপত্তি ফার্সী থেকে। হিন্দু- মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি বাংলার সামাজিক পরিবেশ কে যুগ যুগ ধরে কিভাবে ঋদ্ধ করেছে এই শব্দদুটির উৎপত্তি এবং বহুল প্রচলনের ভিতর দিয়েই তা পরিস্কার হয়ে যায়। সন এবং সাল - এই শব্দ দুটি যেভাবে বঙ্গাব্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে, বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে, সেই ভৃবে কিন্তু এই শব্দদুটির উৎপত্তি ঘিরে দুই বাংলাতেই আলাপ আলোচনা হয় না।পবিত্র ইসলাম বাংলার সংস্কৃতিকে কিভাবে সমৃদ্ধ করেছে, বাংলা  নববর্ষের , বঙ্গাব্দের আলোচনা প্রসঙ্গে এই বিষয়গুলি খানিকটা অনালোচিত ই থেকে যায়।রাজা শশাঙ্ককে ঘিরে আবেগ তৈরি করতে গিয়ে বঙ্গাব্দ ঘিরে বহুল প্রচলিত সন, সাল শব্দদুটির প্রতি সমাজতাত্ত্বিকেরা সেভাবে নজর ই দেন নি।ফলে হিন্দু - মুসলমানের প্রভাবহান মিশ্র সংস্কৃতি বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনাকে মধ্যকালীন সময়কালে এই বঙ্গাব্দের সূচনাকে কেন্দ্র করে কতোখানি উচ্চসুরে বেঁধেছিল, তার সম্যক চর্চা প্রায় হয় ই নি।
                  আকবরের সময়কালে এই বঙ্গাব্দকে তারিখ ই ইলাহি বলার প্রচলন ছিল বলেও অনেকের অভিমত। সেখান থেকে সম্রাট শাহজাহানের সময়কালে রবিবার কে কেন্দ্র করে সপ্তাহের সাতটি দিন নির্ধারিত হতে শুরু করে- এমনটাও একাংশের ইতিহাসবিদদের অভিমত। মুঘল শাসনকালে যে চান্দ্র বর্ষপজ্ঞিকে কেন্দ্র করে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো,সেই চান্দ্রমাসের হিশেব থেকে বেশ কিছু জটিলতা দেখা দিত।চান্দ্রমাস কে কেন্দ্র করে ঋতু জনিত যে ফারাকটা তৈরি হতো , সেই ফারাকের কারনে ফসল তোলার সময়ের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই সামঞ্জস্য থাকতো না।আর এই সামঞ্জস্য না থাকার কারনে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও নানা ধরণের সমস্যা তৈরি হতো। সেই সমস্যার নিরসনের বাস্তব প্রয়োজন থেকে এই সৌর বর্ষপজ্ঞির প্রচলন, বঙ্গাব্দ, বাংলা নববর্ষের রেওয়াজ চালুর একটা বড় রকমের আর্থ- সামাজিক তাৎপর্য ও রয়েছে। এই সৌর বর্যপজ্ঞি র বা বাংলা সাল কে ধরে বঙ্গাব্দ শব্দটির প্রচলনের সঙ্গেই খাজনা প্রদানের সাথেই উৎসবের আয়োজন ও সম্রাট আকবরের সময় কাল থেকেই শুরু হয়।
                    খাজনা প্রদান কে কেন্দ্র করে যে উৎসবের প্রচলন সম্রাট আকবরের আমলে শুরু হয়েছিল, সেটিই কোনো রকম ধর্মীয় দ্যোতনা ব্যাতিরেকে , হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির কাছে একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব হিশেবে ক্রমে পরিগণিত হতে শুরু করে।ইরানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ সিরাজি  চান্দ্র ইসলামীয় বর্ষপজ্ঞির সঙ্গে সৌর বর্ষপজ্ঞির অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন করে যে বর্ষপজ্ঞি তৈরি করেছিলেন তা বাঙালি সংস্কৃতিকে ধর্মীয় নিগড়ের বাইরে একটা সাংস্কৃতিক, সামাজিক পটভূমিকার উপর স্থাপিত করতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।'৫২ র মহান ভাষা আন্দোলন, '৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ যে সাংস্কৃতিক ভিত্তি র উপর বাঙালি জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই জাতিসত্তার অঙ্কুর স্থাপিত হয়েছিল সম্রাট আকবরের শাসন কাল, মধ্যকালীন ভারতে এই বঙ্গাব্দের প্রচলনের ভিতর দিয়ে।
                           মুঘল প্রতিনিধি হিশেবে মুর্শিদকুলী খাঁ পুণ্যাহের রীতির যে প্রচলন করেছিলেন, সেই রীতি সময়ের নিরিখে সামন্ততান্ত্রিক শোষণের একটি ধারাতে পরিণত হলেও নোতুন বছরের শুরু কে কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ব্যাতিরেকে একটা সামাজিক প্রথা র প্রচলন সেখান থেকেই শুরু হয়। এখন হিন্দু সমাজের ভিতরে নববর্ষ আর হালখাতাকে কেন্দ্র করে নোতুন খাতার পূজার্চনার সঙ্গে যে দেবদেবীদের সম্পৃক্ত করে ফেলা হয়েছে , সেটি পরবর্তী সময়ের সংযোজন।নববর্ষের সূচনায় যে খাজনা প্রদানের রীতি বা পুণ্যাহের রীতি অভিভক্ত বাংলায় জমিদারি প্রথার সঙ্গে যুক্ত ছিল , সেগুলির সঙ্গে দেবদেবীর পূজার্চনার কোনো সম্পর্ক ভারতভাগের আগে পর্যন্ত সচরাচর দেখা যায় নি।প্রবন্ধকারের পিতা ১৯৪৪ সালে তাঁদের এস্টেট অবিভক্ত পাবনার সাফল্লাতে নিয়মিত পুণ্যাহে অংশ নিয়েছিলেন।সেই সময়ের প্রচলিত পুণ্যাহের সঙ্গে এতোটুকু ধর্মীয় অনুসঙ্গের যোগ ছিল না।ছিল সামাজিক বন্ধনির যোগ।খাওয়া দাওয়া , কুশল বিনিময় ইত্যাদি। নববর্ষের সঙ্গে হালখাতাকে সংযুক্ত করে তার ধর্মীয় অনুসঙ্গ দানের বিষয়টি নির্মিত হয়েছে মূলত বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীদের ভিতর থেকে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের গন্ধবণিক,স্বর্ণবণিক ইত্যাদি যে ব্যবসায়ী রা ছিলেন তাঁরা গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজার্চনা কে কেন্দ্র করে তাঁদের ব্যবসায়ের নোতুন খাতা শুরু করতেন।এই প্রথা তাঁরা ভারতভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে এসেও বজায় রেখেছেন।কলকাতা কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা এই হালখাতা বিষয়টির সঙ্গে বিশেষ বিশেষ মন্দিরে পুজো দেওয়া, নিজেদের দোকানে পুজো করা ইত্যাদির ভিতর দিয়ে এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিগড়ে পরিবর্তিত করেছেন।

Your Opinion

We hate spam as much as you do